অঞ্জন – রঞ্জিত অসাধারন এক জুটি – অস্থির কবি

‘জুটি’ শব্দটা সিনেমার জগতে কোন অপরিচিত শব্দ নয়। যেমন- বাংলা ছবির ইতিহাসের কিংবদন্তি জুটি উত্তম-সুচিত্রা। তুলনা চলে না কিন্তু এই যুগের বেশ সফল জুটি ঋতুপর্ণা-প্রসেনজিৎ। সব সময় যে নায়ক নায়িকার জুটিই বিখ্যাত হবে তা কিন্তু নয়। অনেক পরিচালক ও অভিনেতার জুটি এই অভাগা বাংলাদেশের হিটের খরায় ভরা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ছুটিয়েছিল করতালির জোয়ার এবং অর্থের বানভাসী। তেমনই কিছু জুটি সত্যজিৎ-সৌমিত্র বা তরুণ  মজুমদার-অনুপকুমার। এই সব ডিরেক্টর আর অভিনেতার যুগলবন্দীতে কোন বুদ্ধিদীপ্ত ছবি যখন সেলুলয়েডের পর্দায় এসেছে, মানুষ সেই কেমিস্ট্রী দেখে খুবই অভিভূত হয়ে গেছে। এরকমই এক বাংলা ছবির সফল জুটিকে নিয়ে আজ লিখব। সেই জুটির নাম অঞ্জন চৌধুরী-রঞ্জিত মল্লিক। হয়তো কিছু বিতর্ক হতে পারে এ নিয়ে কিন্তু তা নিয়ে বেশী মাথা ঘামালে একটা লেখাও লেখা যাবে না। ভারত ফিল্ম বোদ্ধা আর ক্রিকেট বিশেষজ্ঞতে ভরা দেশ। আমি লিখছি আমার বিশ্বাস থেকে সততা থেকে, নিজের মতো করে। মূল্যায়ন যা হবার তা হবে।

১৯৮০ সালে উত্তমকুমার মারা যাবার পর বাংলা ছবিতে সাময়িক বিপর্যয় নামে। উত্তমকুমারের একটি ছবিতে কাজ করার কথা ছিল। সেই ছবিটির নাম – ‘হব ইতিহাস’। ভিলেনের ভূমিকায় ছিলেন তিনি। পরিচালক ছিলেন – শুভেন্দু চ্যাটার্জী। মূখ্য ভূমিকায় পুলিশের রোলে শুভেন্দুর ও অভিনয় করার কথা ছিল। কিন্তু উত্তমকুমারের অকাল প্রয়াণে সেই ছবির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। সেই ছবির কাহিনীকার ও চিত্রনাট্যকার অঞ্জন চৌধুরী ‘চুমকি’ নামে একটি পত্রিকা চালাতেন। সেই পত্রিকায় ইন্টারভিউ নিতে গিয়ে ভবানীপুরের বনেদী মল্লিকদের বাড়ির ছেলে যিনি মৃণাল সেনের সাথে ‘ইন্টারভিউ’, উত্তমকুমারের সাথে ‘মৌচাক’, মিঠু মুখার্জীর সাথে ‘স্বয়ংসিদ্ধা’, সুচিত্রা সেনের সাথে ‘দেবী চৌধুরানী’ করে ফিল্ম জগতে মোটামুটি সফল আবির্ভাব ঘটিয়ে ফেলেছিলেন, সেই রঞ্জিত মল্লিকের সাথে তাঁর আলাপ হয়। ক্রমে দুজনার যোগাযোগ বাড়ে এবং এরপর অঞ্জন চৌধুরী যখন হব ইতিহাসের চিত্রনাট্যে ছবি করেন, রঞ্জিত মল্লিকই হন তার নায়ক। হব ইতিহাস ‘শত্রু’ নাম নিয়ে রিলিজ করে এবং সত্যিই ইতিহাস গড়ে। এই ছবি দেখতে সিনেমা হলে উপচে পড়ে দর্শকের ভিড়। তখন সবে ভিডিও দেখার কনসেপ্ট এসেছে মফস্বলে। আমার মনে আছে ভিডিও ভাড়া নিয়ে যেখানেই ছবি দেখানো হত সেখানে কমন ছবি ছিল শত্রু। সেই সুযোগে দু তিনবার ছবিটি দেখা হয়ে যায় আমার। তখন পরিবারসুদ্ধ সিনেমা হলে যাবার চল ছিল। সেই সুবাদেও দু তিনবার শত্রু দেখেছিলাম। এযাবৎ মোট সাত কি আটবার শত্রু দেখেছি। অসাধারন ছবি। একটা সময় পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে সমস্ত পুলিশের কাছে আবেদন করা হয়েছিল শত্রু ছবিটি দেখবার জন্য। রঞ্জিত মল্লিক পুলিশ অফিসার ‘শুভঙ্কর সান্যাল’ এর ভূমিকায় অসাধারন অভিনয় করেন। একদম অ্যাংরি ইয়াং ম্যান। কিন্তু একদম বাংলা স্টাইলের বা বলা যায় একদমই নিজস্ব স্টাইলের। বহু নায়কের রাগী চাউনি দেখেছি কিন্তু শত্রুর রঞ্জিত মল্লিকের মতো এত নায়কোচিত রাগী চাউনি আমি বাংলা ছবিতে আর আগে বা পরে কখনোই দেখিনি। পুলিশ জগতের দূর্নীতি নিয়ে এত সাহসী ছবি আগে হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। যেটা নজর কাড়ে ছবিতে সেটা হল সংলাপ। কিন্তু অন্যদের মুখে তা যতটা পানসে লাগে, রঞ্জিত মল্লিকের মুখে তা ততটাই মুচমুচে লাগে। কারণ কি ! চলচ্চিত্র দেবতাই জানেন। সব কিছুর ব্যাখ্যা তো আর বুদ্ধিতে হয় না। আর্টের জগতে, ক্রিয়েশনের জগতে কিছু কিছু ঘটনা এমন ঘটে বৈকি যার কার্যকারন উদ্ধার করা মুশকিলের কাজ, সহজ হল মনপ্রাণ ভরে তাকে উপভোগ করা। শত্রু নিয়ে আলাদা ভাবে যদি কখনো লিখি তাহলে সেখানে যাঁরা  যাঁরা অভিনয় করেছিলেন, মনোজ মিত্র, বিকাশ রায়, মহুয়া, প্রসেনজিৎ, মাস্টার তাপু, শকুন্তলা বড়ুয়া এবং এই সিনেমার ডার্ক হর্স অর্থাৎ অনুপকুমারের অভিনয় নিয়ে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ  করবো।

রঞ্জিত মল্লিক বহু পরিচালকের ছবিতেই অভিনয় করেছেন। কিন্তু অঞ্জন চৌধুরীর মত বুদ্ধিদীপ্তভাবে তাঁকে ধারাবাহিকভাবে আজ পর্যন্ত কেউ ব্যবহার করতে পারেনি। শত্রুর পর ‘ছোট বউ’, ‘গুরুদক্ষিণা’, ‘মঙ্গলদীপ’, ‘হীরক জয়ন্তী’, ‘মহাজন’, ‘আব্বাজান’, ‘নাচ নাগিনী’, ‘ইন্দ্রজিৎ’, ‘চৌধুরী পরিবার’, ‘সংঘর্ষ’, ‘লোফার’, ‘শ্রীমান ভুতনাথ’, ‘মুখ্যমন্ত্রী’, ‘পূজা’, ‘রাখি পুর্নিমা’, ‘মায়া মমতা’, ‘মেজোবউ’, ‘বাঙালীবাবু’ ইত্যাদি ছবিতে শুধু তাঁর অভিনয় দেখার জন্য আর তাঁর মুখে ডায়লগ শোনার জন্য ছবিগুলো দেখতাম। এসব ছবি দেখতে অনেকের ইগোতে লাগে বলে শুনেছি। কিন্তু আমি মফস্বলের কাঁঠালের বিচি ভাজা খাওয়া বঙ্গসন্তান। সবার সাথে বসে দেখা যায় এরকম যে কোন সিনেমা দেখতে আমার কোন কালেই কোন আপত্তি ছিল না যদিও এখন হয়তো ব্যস্ততা বা চাপের কারণে একদমই পেরে উঠি না। এমনকি উত্তমকুমারের ছবিও আমি দেখার সময় আর পাই না। কারণ যা করি যেটুকু করি সিরিয়াসলি করি। এডিটিং টেবিলে এতটাই সময় যায় যে অন্য কিছুর অবকাশ হয়ই না। কিন্তু অঞ্জনবাবুর ছবিতে এমন কিছু কিছু জিনিস আমি পাই যা কখনো কোথাও ই পাইনি। আপনি দেখতে নাও পারেন ঋতুদা কিন্তু সব ধরনের ছবি দেখতেন। বিশ্বাস না হলে ‘ঘোষ অ্যান্ড কোম্পানী’ নামে ঋতুপর্ণ ঘোষের যে কটা এপিসোড আছে দেখবেন। পেয়ে যাবেন। এমনকি সত্যজিৎ রায় ও তথাকথিত কম মেরিটের বাংলা ছবি দেখতেন। হারাধন ব্যানার্জির ছেলে কৌশিক ব্যানার্জী দাদাগিরিতে এসে একটা দারুণ কথা বলেছিলেন। তখন সবে রিলিজ হয়েছে বাংলার ইতিহাসের অন্যতম হিট সিনেমা – ‘বেদের মেয়ে জোসনা’। সত্যজিতের বাড়িতে গেছেন কৌশিক। মানিকবাবু তাঁকে বললেন – তোমার ছবি তো দারুণ চলছে। কি সাবজেক্ট গো ছবির। কৌশিক বাবু বিষয়টিকে উড়িয়ে দিয়ে বলেন – তেমন কিছু না দাদা, সাপ টাপ নিয়ে, রাজা টাজা নিয়ে, পাতি একটা গল্প। মাণিকবাবু তাঁকে বলেন – না, এভাবে কখনই বলবে না। সিনেমাটায় নিশ্চই ভাল কিছু আছে যার জন্য মানুষ এভাবে হামলে পড়ে দেখছে।

অঞ্জনবাবুর ছবি নিয়ে কলকাতায় একটা বিতর্ক নব্বইয়ের দশকে খুব হত। সেটা হল উনি গ্রামের মানুষের জন্য ছবি বানাচ্ছেন। গ্রামের ছবি শহরের ছবি নামে একটা বিভাজন ও সেই সময় সূচনা হয়। ঠিক যেমনটা এক সময় আর্ট ফিল্ম কমার্শিয়াল ফিল্মের মধ্যে হয়েছিল। ব্যাক্তিগতভাবে আমি এই ধরনের ভাগাভাগির একদম বিপক্ষে। আমিনিয়া তে গিয়ে চাইনিজ তো আমরা সবাই খাই তাই বলে ঠাকুমা যখন তালের বড়া দেয় তখন – ডিসগাস্টিং বলে কি আমরা সেটা  ডাস্টবিনে ফেলে দিই। সেটা যেমন এক ধরনের খাদ্য এটাও তো আরেক ধরনের খাদ্য। ওটা পেটের। এটা মনের। অবেলা যদি সর্বভূকের মত সব গিলতে পারি এবেলা এত নাক সিঁটকানি কিসের ?  আমরা সাধারণেরা নাক সিঁটকলেও অনেক বড় বড় আর্টিস্ট অঞ্জনবাবুর সাথে কাজ করতে কখনোই আপত্তি করেননি। এমনকি উত্তমকুমার বেঁচে থাকলে হব ইতিহাসের পরে আরো কত ইতিহাস যে অঞ্জন চৌধুরীর সাথে গড়তেন কে জানে। ওরকম একটা সংলাপ রচয়িতা পেলে উত্তমকুমার সহজে উড়িয়ে দিতেন না এ আমার ধারনা। বহু ছোটখাটো লোককেও তো উনি ফেরাননি। অঞ্জন চৌধুরী তো একটা ব্র‍্যান্ডনেম। উৎপল দত্ত, কালী ব্যানার্জী, মীনাক্ষী গোস্বামী, দিলীপ রায়, প্রসেনজিত, মহুয়া, অনুপকুমার, হারাধন ব্যানার্জী, ভিক্টর ব্যানার্জী, সাবিত্রী চ্যাটার্জী, সংঘমিত্রা চ্যাটার্জী, চিন্ময় রায়, রবি ঘোষ, শকুন্তলা বড়ুয়া এই সব বড় বড় নামগুলো তাঁর সাথে কাজ করেছে। এঁদের নাম বিশেষ করে এই কারণে করলাম, যে এঁরা সব্বাই কোন না কোন সময়ে উত্তমকুমারের সহশিল্পী ছিলেন। কাজেই উত্তমকুমার ও যে এরকম একজন গুনী ব্যাক্তিকে দুচ্ছাই করতেন না তা বলাই বাহুল্য কিন্তু আমরা করি। অঞ্জনবাবু কিছু কাজের জন্য সমালোচিত হন। ওনার মেয়ে চুমকি ও রীনা কে পর পর ছবিতে উনি সুযোগ দিয়েছিলেন এটা নিয়ে অনেকে কথা বলে। কিন্তু এটাও ঠিক তাঁরা  দুজনেই অপরূপা সুন্দরী না হলেও অভিনয়টা কিন্তু ভালই উৎরে দিয়েছেন। নিজের বউমা কেও নায়িকা বানিয়ে ছবি করেন অঞ্জনবাবু। শেষ দিকের ছবিগুলোতে কিশোরকন্ঠী  গৌতম ঘোষকে দিয়ে একের পর এক ছবিতে গান গাওয়ান যে গানগুলোর একটাও আজ আর কারো মনে নেই। তবুও ছবিগুলো হিট করত। কারন কিচ্ছু না – সংলাপ আর যার মুখে সেই ব্যাক্তিটির নাম – রঞ্জিত মল্লিক। রঞ্জিত মল্লিককে অনেকে তোতলা বলে। অনেকে বলে তার উচ্চারণ শুদ্ধ নয়। কিন্তু যদি সত্যি তাই হত মৃণাল সেনের মত মার্কামারা আর্টফিল্ম পরিচালক তাঁকে লঞ্চ করতেন! সত্যজিৎ রায়ের মত পারফেকশানিস্ট ডিরেক্টর শাখা প্রশাখায় তাঁকে নিতেন!

যাইহোক, এই জুটির সব ছবিই আমার খুব প্রিয় আর তার মধ্যে সব চেয়ে প্রিয় ছবির নাম হল – ‘নবাব’। ছোট থেকেই অ্যাকশন ছবি আমার ভীষণ প্রিয়। কিন্তু অ্যাকশন যে শুধু শক্তি দিয়ে হয় না, ডায়লগেও যে অ্যাকশন সিনেমা হতে পারে তা প্রথম এই সিনেমাটায় দেখেছিলাম। সব কিছুই ভাল লেগেছিল এই ছবির। শুনেছি শানুদাকে এই ছবিতে অঞ্জন চৌধুরী প্রথম ব্রেক দেন টাইটেল সং গাওয়ার জন্য। মিউজিক ডিরেক্টর ছিলেন আর ডি বর্মন। আর ডি বর্মন শানু জুটি মানে শুধু ১৯৪২ – এ লাভ স্টোরি নয়। নবাব ও এই জুটির একটি ছবি এটা অনেকেই হয়ত জানেন না। যাহোক, এই ছবিতে রঞ্জিত মল্লিক ছাড়াও অনুপ কুমার, সন্ধ্যা রায় ও দিলীপ রায় খুব ভাল অভিনয় করেছিলেন। ছবিটি দারুণ  হিট করেছিল। রবীনহুড টাইপ চরিত্রে রঞ্জিত মল্লিকের সিন বাই সিন মারকাটারি অভিনয় কখনো ভুলিনি আর ভুলবও না। যদিও অফিসিয়ালি  নবাবের ডিরেক্টর কিন্তু অঞ্জনবাবু ছিলেন না, ছিলেন হরনাথ চক্রবর্তী। কিন্তু ছবির চিত্রনাট্য, সংলাপ সবই অঞ্জনবাবুরই ছিল। অঞ্জনবাবু তাঁর অ্যাসিস্টেন্টদের অনেককেই ফিল্ম পরিচালনায় আনেন – বাবলু সমাদ্দার, নারায়ন রায়, হরনাথ চক্রবর্ত্তী। যার মধ্যে হরদাই সব থেকে বেশী নাম করেছিলেন। উনি ও অঞ্জন চৌধুরীর স্ক্রিপ্টে রঞ্জিত মল্লিককে নিয়ে কাজ করেছিলেন। ছবিগুলো হিট ও হয়েছিল। কিন্তু খুব দু:খের বিষয় হল যে এই এত সফল রসায়নের একটা জুটি যার প্রতিশব্দ ছিল বক্স অফিস, তা পরবর্তীকালে ভুল বোঝাবুঝিতে ভেঙে যায়। রঞ্জিত মল্লিক হরনাথবাবু এবং কিছু অন্য ডিরেক্টরদের সাথে কাজ করেছিলেন কিছু কিন্তু আর সেভাবে দাগই কাটতে পারেননি কারন সেগুলোতে বাঙালীয়ানার বদলে ছিল সাউথিয়ানা । অঞ্জন চৌধুরীও অন্যদের নিয়ে চেষ্টা করেন কিন্তু ছবিগুলো জমেনি কারন ঐ সংলাপ দর্শক অন্য কারো মুখে শুনতে অভ্যস্ত ছিল না। ওনার মৃত্যুর পর এই জুটির ফিরে আসার সমস্ত সম্ভাবনাই শেষ হয়ে যায়। রঞ্জিত মল্লিক ও অভিনয় জগত থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যান।


ADMIN

Author: ADMIN

1
Comments

Please Login to comment
1 Comment authors
Anirban Chottopadhyay Recent comment authors
newest oldest most voted
Anirban Chottopadhyay
Member

Khub sundor tothyo… Bangla chhobi nie apni etota porasuna korechen ba korchen jene valo laglo. Amra ki cinema jogoter khuti naati kotha nie bondhutto ke egie nie jete pari? Jodi… Read more »