অতীত দিনের ৭৮ আর.পি.এম রেকর্ডে গান শোনার মাদকতা – দিব্যেন্দু দে

যে কদিন আছি এই পৃথিবীতে যদি সম্ভব হয় শুধু ৭৮ rpm শুনব। কারন এ প্রজন্মই হোক আর আগামী প্রজন্মই হোক,  যে যায় বলুক ..আমার আত্মিক উপলব্ধি আমাকে সবসময়ই বলে ৭৮ এ শোনা গানই আসল গান। এই রেকর্ডে গান শোনায় যা আনন্দ তা পৃথিবীর অন্য কোনো মাধ্যমে মিলবে না এটা অনেকের মত আমিও বিশ্বাস করি ছোট থেকে বাড়ীতে আসা HMV এর গানের বই এ বনফুল, মৃণাল সেন, অপর্ণা সেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, নিমাই ভট্টাচার্য, প্রমথনাথ বিশী, শৈলজারঞ্জন মজুমদার প্রভৃতি অনেক বিশিষ্ট জনের স্মৃতিচারনমূলক লেখা পড়ে এসেছি..এবং এনাদের লেখা গুলো সেই ছোটবেলা থেকেই আমার মনের মধ্যে রেকর্ড সম্মন্ধে একটা অদম্য কৌতুহল সৃষ্টি করেছিল, কারণ তখন ও আমাদের বাড়ীতে কোনো রেকর্ড প্লেয়ার ছিল না। তবে সেই অদম্য কৌতূহলের তাড়নায় বা সংগ্রহের উন্মাদনায় তার অল্পদিন পর থেকেই রেকর্ড সংগ্রহে নেমে পড়ি এবং যা আজো অব্যাহত। দূর্ভাগ্য আমাদের এই প্রজন্মের তো বটেই আমাদের প্রজন্মেরও অনেকে ৭৮ কি বস্তু তাই জানে না। মজার অভিজ্ঞতা হয়েছে বেশ কয়েকবার..ওয়েলিংটন থেকে বেশ কিছু ৭৮ কিনে হাতে নিয়ে ফিরছি …একটি অতি আধুনিকা হাতে জলন্ত সিগারেট নিয়ে বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তার বান্ধবীকে বলছে , ” এই দেখ দেখ কি নিয়ে যাচ্ছে ছেলেটা ..গোল গোল কালো কালো ওগুলো কি? !! যাইহোক এদের দোষ কতটুকুই আর? হারানো অতীতের শব্দদলীল কে কেই বা মনে রাখে?  আর সত্যি আমরাই যখন গান শোনা শুরু করেছি তখনই ক্যাসেটের যুগই প্রায় শেষ। ৭৮ বা পিচ রেকর্ড এর কথা শুনেছিই অনেক পরে। দেখেছি প্রথম যখন ক্লাস ৮ বা ৯ এ পড়ি। তবে স্বপ্ন বা উন্মাদনা ছিল তো অবশ্যই যা আজো আছে বলেই মাঝে মাঝেই স্বল্পতম সামর্থ্য নিয়েও দূর্লভ সংগ্রহের নেশায় বেরিয়ে পড়ি।

যখন শুনি আমার সংগৃহীত রেকর্ড থেকে কৃষ্ণচন্দ্র দে তার অননুকরনীয় কন্ঠে গাইছেন,

হে বিশ্বনাথ জ্বালো ..
জ্বালো তব নয়ন বহ্নি জ্বালো …
জ্বলুক বহ্নি ললাট চন্দ্রে,
ঘুচুক তিমির কালো …
বিশ্বভরিয়া তব অপমান ..
জাগো হে রুদ্র জাগো ভগবান …
নখরে ছিড়িয়া চন্দ্র সূর্য্য ..
ঘুচাও তোমারও আলো”

মনে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ জাগে যা হয়ত ভাষায় প্রকাশ করা যায়না।

 

আবার যখন শুনি

মালতীর মালাখানি
রেখে গেলে অভিমানী …
আশার মুকুল সেথা
বিরহে ঝরিয়া যায় ..
মোর যত আশাফুল
পেল না তো আজো কূল..
দূর হতে শুধু দূরে
চলে যায় নিরাশায়
নয়নেরও যমুনায়” …
মন টাকে উদাস করে দেয় ..

বিশেষ করে যখন শুনি
তুমি চলে গেছ দূরে
তবু যে গো সুরে সুরে
সেদিনেরও গান খানি
বারে বারে মনে হয় ..
বারে বারে মনে হয়।
তোমারে স্মরিয়া লাগে
যে গো..লাগে যে গো মধুময়”…

তখন নিজেকে সম্পূর্ণ লাগে ..
না…হয়ত হারানো প্রিয়াকে মনে পড়ে না ..মনে পড়ে হারানো দিনগুলির কথা যা আমার জীবন থেকে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছে কিন্তু সেই দিনের স্মৃতির সুরভী আজো প্রানে জেগে আছে চিরজাগ্রত সজাগ প্রহরীর মতো সচল ভাবে।
মাঝে মাঝে সুকৃতি সেনের পরিচালনায় কংগ্রেস সাহিত্য সংঘের “অভ্যুদয়” নামাঙ্কিত রেকর্ডটির গানদুটি মনে এক আলাদা অনুভূতি দিয়ে যায়।

সুকৃতি সেন নিজে গেয়েছিলেন,

সারা ভারতের
মর্মের বনে বনে
কে দিল সহসা
এমন মিলন আনি?
স্বরাজের হাওয়া
লাগিল কি শুভহ্মণে…
ওঠে মর্মরি
নুতন যুগের বাণী ..”

অপর পিঠের গানটি আজো প্রাসঙ্গিক মনে হয় আর এটাই সবার কাছে আহ্বান।

সত্য চৌধুরী গেয়েছিলেন

জাগো হতচেতন ভারতবাসী…
জাগো ..
জাগো …
জাগো তন্দ্রাতে লাগি …
জাগো উল্লাসে জাগো।

মহাসংযমী আছেন জেগে
জাগো নির্ভয়ে জাগো
হতচেতন ভারতবাসী….”

অনেক কিছুই লিখে ফেললাম ভাবাবেগে। তবে যে কথা টা বলিনি এখনো বা যেটা সবসময় মানি সেটা হল ছোটবেলা থেকে যাদের আদর্শ করে এই পথে পথচলা শুরু করেছিলাম, স্বপ্ন দেখেছিলাম রেকর্ড সংগ্রহের, অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম সেই দুজন মহান মানুষের শুভেচ্ছা, ভালবাসা..আশীর্বাদ ও সান্নিধ্য পেয়ে আমার এ আমি ধন্য হয়েছি। তারা হলেন একজন বরণীয় বর্ষীয়ান রেকর্ড সংগ্রাহক ও গবেষক শ্রী সুশান্ত কুমার চট্টোপাধ্যায় ও আরেক জন ও বিস্ময়কর সংগ্রাহক ও সকল প্রকার ভারতীয় গানের তথ্যের কাণ্ডারি শ্রী সঞ্জয় সেনগুপ্ত।ওনাদের প্রনাম জানাই।


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment