অন্তরালে – স্বরূপ রায়

-স্যার, টিকিট প্লিজ!
-স্যার, টিকিট!
‘অ্যাঁ’ করে একটা শব্দ করে চোখ খুললেন অনিমেষবাবু। মিটমিট করে তাকিয়েই চোখের সামনে টিটি-কে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গিয়ে একটা বোকা বোকা ভাব করে বুকপকেট থেকে থেকে বার করে দিলেন টিকিট।
টিটি-সাহেব টিকিট হাতে নিয়ে কী সব বিড়বিড় করে সেকেন্ড পনের পর ফেরত দিলেন অনিমেষবাবুর হাতে। যাত্রীর মুখে বিনয়ী গদগদ ভাব। কাগজখানি হাতে পেয়ে একবার দুপিঠ উল্টেপাল্টে দেখে নিয়ে আবার যথাস্থানে চালান করে দিলেন তিনি। ট্রেনে খুব বেশী যাতায়াত করেন না অনিমেষবাবু। শুনেছিলেন ভুল ট্রেনে চড়ে বসলে বা কমদামী টিকিট কেটে রিসার্ভ কামরায় ঢুকে পড়লে নাকি মোটা জরিমানা দিতে হয়। সেই চিন্তাতে প্রথমে বেশ ভয় করছিল তাঁর। তবে গাড়িতে উঠেই অন্তত চারজন সহযাত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে সিটে বসে মাথা এলিয়ে দিয়েছিলেন ভদ্রলোক। তবু কিছুটা দুশ্চিন্তা মনের মধ্যে ছিল। এখন টিটি যখন টিকিট দেখে বিরূপ কিছু করেনি তখন সম্পূর্ণ ভয়মুক্ত হলেন। মুখে বেশ একটা সাবলীল, বিজয়ী হাসি। তারপর হঠাৎ হস্তযুগল মাথার উপর সম্প্রসারিত করে শরীর টানটান করে বিকৃত উচ্চারণে ‘মাধব মাধব’ বলতে বলতে একটা বড় হাই তুলে ক্ষান্ত হলেন।

একটু ঘুমিয়ে নিয়ে বেশ একটা গা-ঝাড়া, চনমনে ভাব এসেছিল ভদ্রলোকের। মুখোমুখি চেয়ারে বসে থাকা সহযাত্রীদের দিকে নজর পড়তেই দেখলেন তিনজনের মধ্যে দুজনের দৃষ্টিই তাঁর দিকে আকর্ষিত। তা সে তাঁর ওই বিরাট হাঁ করে হাই তোলার জন্যও হতে পারে, বা ঠোঁটের কোনে ওই দিগবিজয়ী হাসির জন্যও হতে পারে, অথবা রেলগাড়ির মৃদুমন্দ দোদুল্যতায় কিয়ৎপূর্বে তিনি যেরকম বিরক্তিকর দিবানিদ্রা দিচ্ছিলেন তার জন্যও হতে পারে। তবে তৃতীয়জনের তাঁর প্রতি কোনও আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তিনি জোড়া পায়ের মোজা খুলে জুতোর মধ্যে গুঁজে দিয়ে চেয়ারের উপর দিব্যি হাঁটু মুড়ে বসে খবরের কাগজ পড়ে চলেছেন। নিত্যযাত্রী নিশ্চয়; না হলে এতোখানি আত্মবিশ্বাস আসে না। অনিমেষবাবুর একটু ঈর্ষা বোধ হল। তিনি বাকি দুজনের দিকেই মনোনিবেশ করা শ্রেয় মনে করলেন। মানে মন তখনো নিবেশ করেছিলেন কিনা বলতে পারি না, তবে চোখ তো নিবেশ করেছিলেনই।
একদম ধারের জন বেশ কম বয়সি। চোখে চশমা, ফ্রেমলেস। বরং মাঝের ভদ্রলোক মাঝবয়সী, তার চোখে বাদামী ফ্রেমের চশমা পড়া, বুকে ক্লিপে আটকানো মোবাইল ঢিপ হয়ে আছে। চোখাচোখি হতেই বলে উঠলেন, আজ গরমটা একটু বেড়েছে মনে হচ্ছে! অনিমেষবাবু ঠোঁটে বাঙালি হাসি টেনে এনে হেঁ হেঁ করে সায় দিলেন।
সেই শুরু হল আলাপ। তারপর নানা বিষয় নিয়ে ওঁদের আলোচনা গেড়ে বসল। বর্ধমানের রাজা থেকে শুরু করে তারাপীঠের মহাশ্মশান, পুরীতে বাঁদরের উৎপাত, বেগুনের গুনাগুন ইত্যাদি জগাখিচুড়ি বিষয়ের উপর সেসব দার্শনিক মন্তব্য। মাঝে সেই পেপারওয়ালা ভদ্রলোকও কাগজ গুটিয়ে যোগ দিয়েছিলেন গল্পে। বেশ কিছুক্ষণ তুমুল গল্প চলার পর ট্রেন যখন হাওড়া ঢুকল তখন কামরা চঞ্চল হয়ে উঠল। অনিমেষবাবুর ধারেপাশের যাত্রীরা প্রায় সবই নেমে গেলেন। তাঁকে অবশ্য এখনো প্রায় দু-আড়াই ঘণ্টা বসতে হবে; গন্তব্য শক্তিনগর, জেলা দক্ষিন চব্বিশ-পরগনা। চেয়ারে মাথা হেলিয়ে একটু বিশ্রাম নেবার উদ্যোগ করলেন ভদ্রলোক।

অফিসের কাজেই অনিমেষবাবুর এই সফর। ওই একটা কনফারেন্স আছে, তাতে কম্পানির পক্ষ থেকে কিছু কাগজপত্র একজনের হাতে পৌঁছে দেবার কাজ। কী কাগজ, কী সমাচার, কিসের বিচার তার কিছু কিছু জানলেও বেশী কিছু তাঁর অবগত নয়। তাঁর কাজ শুধু ওই নির্দিষ্ট অফিসারকে খুঁজে বার করে তার হাতে কাগজগুলো তুলে দেওয়া, দুদিন তার সঙ্গে সঙ্গে থাকা এবং কনফারেন্স শেষে আরও কিছু ফেরত কাগজ বগলদাবা করে নিয়ে আসা। দিনের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে সেখানেই, তবে রাতের খাবার কোম্পানির খরচে এবং নিজের দায়িত্বে।
শক্তিনগর নাম শুনে অনিমেষবাবুর এক সহকর্মী বিপিন এক ভদ্রলোকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ফোনে। নাম দেবতোষ বসু। বয়সে হয়তো বিপিনের থেকে কিছু বড়ই হবেন সেই দুরাভাস আলাপিত ব্যাক্তি, কারন অনিমেষবাবু খেয়াল করেছেন উদ্দেশ্য আসল নামখানা উচ্চারণ করলেও ফোনে কিন্তু তাঁকে ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করে সে। তবে ওইটুকুই, নাম ছাড়া আর দেবতোষ বোস সম্পর্কে আর কিছুই জেনে আসেননি তিনি। ভদ্রলোক স্টেশনে থাকবেন কথা দিয়েছেন। আর দরকার হলে ফোনে তো যোগাযোগ করা যাবেই। আবার সেটা হয়তো বাঞ্ছনীয় হয়েও উঠতে পারে, কারন অনিমেষবাবুর চেহারা কিছু বিশেষ চোখে পড়ার মতো নয়- একেবারে সরকারী চেহারা বলা চলে! বয়স পঞ্চাশ-টঞ্চাস হবে, আজ পরনে ফর্মাল শার্ট, পাশ থেকে দেখলে যদিও মাথায় ছোট্ট টাকখানার অস্তিত্ব অনুমান করা যায়, তবে নিশ্চিত হতে হলে গড়ুড়াবলোকন দরকার, পেটে একটা সযত্নে লুক্কায়িত ভুঁড়ি, গায়ের রঙ তামাটে, গাল পরিস্কার তবে গোঁফ আছে, চশমা কিনেছেন তবে পড়ার প্রয়োজন না হলে পকেট থেকে সচরাচর বার করেন না (মনোভাব এমন যেন চশমা ত্রুটিমুক্ত দৃষ্টির জন্য নয়, বরং শুধুমাত্র পড়ার ক্ষেত্রেই ব্যবহার্য)। আর আছে তাঁর সেলফোন, যেটা ব্রাহ্মণ -চণ্ডাল সহচর্য বিচার না করেই মাঝে মাঝেই গায়েত্রি মন্ত্র উচ্চারন করে অনিমেষবাবুকে শশকের ন্যায় ব্যস্ত করে তোলে। আজ বিশেষ ক্ষেত্রে যাত্রীর সঙ্গে চলেছে একটি চামড়ার কালো ব্যাগ, লম্বা রাস্তা সেটি দোদুল্যমান বাঙ্কারে সদ্যজাত শিশুর মতো ঘুমিয়ে চলেছে।

গাড়ি শক্তিনগর ঢুকলো বিকেল চারটে বারো মিনিটে। স্টেশনে নেমে দেখতে না পেলে, ফোন করলে দশ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাবেন কথা দিয়েছিলেন দেবতোষ বসু। কথা মতো কাজ করলেন অনিমেষবাবু। ভদ্রলোক জানালেন শীঘ্রই আসছেন; পরনে থাকবে নীল রঙের স্ট্রাইপের জামা। অনিমেষবাবুকে দশ মিনিটও কাটাতে হল না। ঠিক সাত মিনিটের মাথায় এসে হাজির হলেন আগন্তুক। পরস্পরকে চিনতে কোনও অসুবিধা হল না দুজনের। কাছাকাছি আসতেই একজোড়া নমস্কার এদিক-ওদিক হয়ে গেল। দেবতোষবাবুর উচ্চতা মাঝারি, মাথায় কাঁচাপাকা চুল, লিভারের সমস্যায় ভোগেন মনে হয়, মুখেও সেরকম কাঁচাপাকা খোঁচাখোঁচা দাঁড়ি আর আঙ্গুলে রূপোয় বাঁধানো একটা রক্তপ্রবাল।
ভদ্রলোকই প্রথমে কথা শুরু করলেন। আজ্ঞে, আমার নাম দেবতোষ বসু। আমাকে এখানে সব দেবু বোস নামেই চেনে। তা পথে আসতে কোনও সমস্যা হয়নি তো দাদা?
অনিমেষবাবু বেশ খুশি হলেন দেবু বোসের এই উমেদারি সম্বোধনে। একটু দাদাগিরি করেই বললেন, না তেমন কিছুই হয়নি, তবে খানিকটা সময় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তো, সেই সময়টুকুর সুবিধা-অসুবিধা বলতে পারবো না!
দেবু বোস খুব একচোট হেসে নিয়ে বলল, চলুন দাদা, এগোনো যাক।
স্টেশনের বাইরে এসে অনিমেষবাবু দেবু বোসকে জোর করে নিয়ে গেলেন সামনের এক চায়ের দোকানে। হাজার হোক নিঃস্বার্থ সাহায্য করতে এতখানি পথ এসেছে, তাছাড়া বড় কথা হল ‘দাদা’ বলে ডেকেছে। চায়ে মুখ দিয়ে অনিমেষবাবু জানতে চাইলেন, সেখানে থাকার হোটেল কিছু আছে কি না।
ততক্ষণে দেবু বোস সুড়ুত করে গরম চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে ঠোঁট পুড়িয়ে ফেলেছে। দুবার চোখ পিটপিট করে নিয়ে সে বলল, শক্তিনগর জায়গাটা এখন শহুরে হলেও গ্রামের কিছুটা আঁচ রয়ে গেছে দাদা। এখানে থাকার হোটেল গোটা দুই আছে, তবে ফাইভ স্টারের সুবিধা তো আর পাবেন না! থাকা যায় নিতান্ত সাধারন মানুষ হিসাবে।

অনিমেষবাবু শ্রাগ করলেন। তাঁর চায়ের কাপে মাছি। হাতে উপযুক্ত মক্ষিকাবিতারন মুদ্রা।
-তবে দাদা আপনার কথা বিপিন আমাকে সবই জানিয়েছে। আপনার থাকার একটা ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি। আমি দাদা ব্যাচেলার মানুষ। একটা একতলা ঘরে সামান্য কিছু ভাড়া দিয়ে থাকি। রান্নার ঝামেলা রাখিনি, খাই হোটেলে। আমার পাশের রুমটা আপনার জন্য অগ্রিম বলে রেখেছি। হোটেলের থাকার খরচের কিছুটা নাহয় আমার বাড়িওয়ালাকেই দেবেন!
প্রস্তাব শুনে বেশ উৎফুল্ল হলেন অনিমেষবাবু। মেঘ না চাইতেই জল! কোথায় অলিগলিতে এখন হোটেল খুঁজে মরতে হত। বিপিন সত্যিই একটা কাজের কাজ করেছে!
দেবু বোস আরও বলল, আপনার থাকার কোনও অসুবিধা হবে না দাদা। অ্যাটাচড বাথরুম পায়খানা, ফ্যান, লাইট সবই আছে! শুধু দুবেলা খাবারটা হোটেল থকে আনিয়ে নিতে হবে, বা গিয়ে খেয়ে আসাও চলে। হোটেল দশ মিনিটের পায়ে হাঁটা পথ। আমার দাদা সবই গা-সওয়া হয়ে গেছে। আপনার হয়তো একটু অসুবিধা হবে।
অনিমেষবাবু চায়ের ফাঁকা পাত্রটা একটা আধখানা কাটা বালতির দিকে তাক করে ছুঁড়ে দিলেন। তাঁর ভাগ্য বেশ সাথ দিচ্ছে আজ। দেবু বোস করিতকর্মা লোক। অনিমেষবাবু একগাল হেসে বললেন, না না  দেবু বাবু, কোনও অসুবিধা হবে না। আপনার সাথে পরিচয় হল বলেই এযাত্রায় তরে গেলাম! চলুন একটা রিক্সা নিয়ে এগোই।

একটা হলুদ রঙের একতলা বাড়ির সামনে এসে রিক্সাটা থামল। দেবু বোস সেরকমই বিনয়ী সুরে বলল, এই দাদা এসে গেছি! এই হল বাড়ি! অনিমেষবাবু পাঁক বাঁচিয়ে নৌকা থেকে পাড়ে লাফ দেওয়ার কায়দায় রিক্সা থেকে নামলেন। ভাড়া বুঝে নিয়ে রিক্সাওয়ালা আবার প্যাডেলে পা দিল।
দিব্যি বাসস্থান! আর তাছাড়া থাকা তো মাত্র দুটি রাত! বারান্দা পেরিয়ে দুটো তালা বন্ধ ঘর। বাদিকের ঘরখানা খুলে দিয়ে দেবু বোস দেখিয়ে দিল, এই হল আপনার খাট দাদা। আর ওই দরজাটা চলে গেল বাথরুম। এইটুকুই ঘর। আপনি তো সাবান তেল সঙ্গে করে এনেছেন নিশ্চয়। তাহলে এইবেলা একটু ফ্রেস হয়ে নিন। পাশের রুমটাই আমার। কোনও দরকার হলে তলব দেবেন একবার!
যাবার মুখে পাখার সুইচটা টিপে দিয়ে কক্ষত্যাগ করল দেবতোষ বোস। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ডানদিকের ঘরটার তালা খোলার আওয়াজ শোনা গেল।
ফাঁকা ঘরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন অনিমেষবাবু। ঘড়িতে প্রায় সাড়ে পাঁচটা। প্রথমেই বাড়িতে একটা ফোন করে স্ত্রীকে নির্বিঘ্নে পৌঁছানোর সংবাদটা দিলেন তিনি। তারপর  সাবান গামছা বার করে বাথরুমের দিকে রওনা দিলেন।

অনিমেষবাবুর স্নানের সঙ্গে ইষ্টদেবতাকে প্রনামের একটা নিবিড় যোগাযোগ আছে। মানে উনি দিনের যে সময়েই স্নান করেন তখনই গামছায় একটি ছোট গুঁজে ইষ্টদেবতার উদ্দেশ্যে তিনবার গায়েত্রি মন্ত্র উচ্চারণপূর্বক প্রনাম নিবেদন করেন। এ তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস! আজও সেই প্রনাম শেষ করেছেন তখনই দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল দেবু বোস। আসলে দরজায় কুনুই দিয়ে আঘাত করতে চেয়েছিল সে, কিন্তু তাড়াহুড়োতে আগল দিতে ভুলে গেছিলেন অনিমেষ বাবু, তাই হাল্কা চাপ দিতেই আগন্তুক সোজা ঘরের মধ্যে এসে পড়েছে।
একটু হেঁ হেঁ করে সে বলল, আমার আবার দাদা চায়ের বাতিক। একার সংসার, তাই একটা ছোট স্টোভ কিনেছি। তাই আপনার জন্যও একটু করে নিয়ে এলাম। এই দেখুন সেদিন এক বন্ধু এসেছিল, হুড়োতাড়া করে ধুতে গিয়ে ডিশটা ভেঙে ফেললাম! তারপর যে আর একটা কিনে আনব সে খেয়াল আর নেই! তাই খালি কাপেই নিয়ে এলাম। কিছু মনে করবেন না দাদা।
অনিমেষবাবু ক্ষমাসুন্দর! বললেন, কি যে বলেন ভাই! ঘরে তো শুধু কাপেই চা খাই! তারপর দুজনে জাঁকিয়ে বসলেন। বোঝা গেল চায়ের সঙ্গে এখন আবার কিছু খোশগল্প চলবে!
শক্তিনগর নামটা কাল থেকে বড় শোনা শোনা লাগছে মশাই! কিছুতেই মনে করতে পারছি না।
দেবু বোস সুড়ুত করে এক চুমুক চা টেনে নিয়ে সেটাকে খুব শীঘ্র ম্যানেজ করে নিয়ে বললেন, দাদার খবরের কাগজ পড়ার অভ্যাস আছে নিশ্চয়।
হ্যাঁ তা আছে বইকি! সেটারই তো বড় অভাব অনুভব করছি। সকালে স্টেশনে কিনব ভেবে ভুলে গেছি। আজ আর পড়া হল না।
তবে দাদা নিশ্চয় খবরের কাগজেই পড়েছেন।
দেবতোষ বোসের গলা খাদে নেমে এসেছে। বাচনভঙ্গি এমন সুদৃঢ় যেন এই বর্ণনা ইতিপূর্বে সে অন্তত বিশ-বাইশ জনের কাছে পেশ করেছে।
মাস সাতেক আগের কথা দাদা। দুটো লাশ আবিষ্কার হয়েছিল শক্তিনগরে। তখনই নামটা পেপারে আসে।
অনিমেষবাবু সত্যিই পেপারে খবরখানা পড়েছিলেন বলে মনে করতে পারলেন কিনা জানিনা, তবে লাশ কথাটা শুনে বেশ আপ্লুত হলেন! বললেন, সেকি! লাশ! কী করে হল? খুন?
দেবু বোস অভিজ্ঞ ভঙ্গিতে জানাল, লাশগুলো নাকি শনাক্ত করা যায়নি! মুখে অ্যাসিড ঢেলে নাকি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। তবে এই অঞ্চলের কেউ নয়।
-গায়ের রক্ত সব চুষে নিয়েছিল। কোটর থেকে চোখ দুটো উপড়ে খেয়ে ফেলেছিল। আর পিঠের নীচের দিকে, ঠিক কোমরের উপরে এত্তখানি চেরা। সে বীভৎস মৃত্যু দাদা।
চোখ বড় বড় করে একপাক ঘুরিয়ে, হাতদুটোকে প্রায় ছয় ইঞ্চি ফাঁক করে দেবু বোস বুঝিয়ে দিল মৃতের পিঠে ঠিক কতোখানি আঘাত ছিল।
অনিমেষবাবু মন্ত্রপূত বাঘের মত নিস্পলক দৃষ্টিতে শুনছিলেন খুনের বর্ণনা। একটা ঢোক গিলে বললেন, এমন নৃশংসতা মানুষে করতে পারে!
-মানুষে না পারলেও দাদা অন্য কেউ তো পারে! ভাবুন দাদা, লাশের শরীরে রক্ত না থাকা, কোটরে চোখ না থাকা কীরকম ভূতুড়ে ব্যাপার!
ভূতের নাম শুনে অনিমেষবাবু কেমন যেন দমে গেলেন। বিষম খাওয়া গলায় আস্তে আস্তে বললেন, পুলিশ কেস হয়নি?
বরিষ্ঠ নাগরিকের মতো হতাশ গলায় দেবতোষ বোস বলল, কেন হবে না! পুলিশ এসে এক ঘণ্টার মধ্যে লাশ তুলে নিয়ে চলে গেল! ব্যাস! তারপর যে কী হয়েছে আমরা চুনোপুঁঠি মানুষ কী আর জানবো বলুন!

রোমহর্ষক কথোপকথনের মধ্যে দুজনেরই চায়ের কাপ অনেকক্ষণ অপেয় পড়ে ছিল। কথক কথা শেষ করে চায়ে মনোনিবেশে উদ্যত হল। ততক্ষণে গল্পের রেসে বিভোর হয়ে অনিমেষবাবুও অন্যমনস্কভাবে পেয়ালার দিকে হাত বাড়িয়েছেন।
দেবু বোস বেশ উৎসাহ ভরে অপেক্ষা করছিল শ্রোতার প্রতিক্রিয়া শোনার জন্য। কিন্তু অনিমেষবাবু বেশ উদ্বিগ্ন। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে সম্পূর্ণ অন্য স্রোতে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, খাবার হোটেলটা কতদূর? সারাদিনের দৌড়ঝাঁপে শরীরে একটা ঝিমুনি আসছে! চারটি খেয়ে শুতে পারলে বাঁচি!
দেবু বোস মনে হয় একটু নিরাশ হল। এতখানি উদাসিন্য বোধহয় সে আশা করেনি। তাও মুখে হাসি ফুটিয়ে জানাল, হোটেল সামনেই। পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। রাত যদিও বিশেষ হয়নি তবে খাবারটা ঘরে এনে নিলে মন্দ হয় না। পেয়ালা দুটো ধুয়ে নিয়ে, ঘরে তালা ঝুলিয়ে ওরা দুজন রওনা দিল নৈশ আহারের সন্ধানে।
-আমি শক্তিনগরে আসা থেকেই দাদা এই দীনুদার হোটেলেই খাই। বড় সাচ্চা দোকান! দামেও ঠিক, স্বাদেও সুস্বাদু!
হোটেলের সামনে এসে বলল দেবু বোস। অনিমেষবাবু দেখলেন বিরাট গদি আঁটা চেয়ারে উপবিষ্ট মালিক, দেবুর দীনুদা! কালো রঙ, মোটা গোঁফ, কপালে চওড়া ভুরু, চোখ দুটো প্রশান্ত। হোটেল মোটামুটি পরিষ্কারই বলা চলে। নীচের তলায় বসে খাওয়ার জায়গা, আর সিঁড়ি দিয়ে উঠে গিয়ে উপরে বোধহয় ঘরটর কিছু রয়েছে।
নিজের জন্য স্পেশাল মাছভাত নিলেন নব্যাগত। দাম সাঁইত্রিশ টাকা। বসে খেলে অবশ্য পঁয়ত্রিশ টাকা নেয়, পার্সেলে দুটাকা বেশী, বলল দেবতোষ। এসে থেকে সে নিজে কিছু অর্ডার দেয়নি, তার জন্য দীনুদা বিনা ফরমায়েশে রুটি আর ডিম প্যাক করে দিয়েছে। ডেলি কাস্টমারদের জন্য হোটেল মালিক মেসের মতো সপ্তাহে সাতদিন মেনু ঠিক করে রেখেছে। সব কিছুর পয়সা দিয়ে প্লাস্টিকবন্দি খাবার নিয়ে, অনিমেষবাবু দেবুর সঙ্গে ঘরের দিকে হাঁটা দিলেন।

আজ খুব সকালে বেরিয়ে গেছিলেন ভদ্রলোক। সেই অফিসারকে খুঁজে পেতেও কোনও সমস্যা হয়নি। দুপুরের খাওয়াদাওয়া, টিফিন সবই ওদের খরচে হয়েছে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকাল হয়ে গেল। বারান্দা পেরিয়ে ঘরে ঢোকার সময় দেখেছেন দেবু বোসের দরজায় তালা। কখন বেরিয়েছে কে জানে! স্নান করে নিজের খাটে শুয়েছিলেন অনিমেষবাবু। যেন কী-করি কী-করি একটা ভাব। কী মনে হল বাড়িতে একটা ফোন করলেন তিনি। স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে সকালে, কিন্তু তাও একবার কথা বলা যাক!
ফোনে কথা বলছেন, তারই মাঝে ঘরে এসেছে দেবতোষ বোস। বাইরে থেকে এসেই অনিমেষবাবুর ঘর খোলা দেখে সোজা খবর নিতে এসেছে। একটা খবর দিতেও এসেছে বোঝা গেল। আজ ওর এক বন্ধুর মেয়ের পঞ্চমবর্ষীয় জম্নদিন। রাতে সেখানে আজ সে খেতে যাবে, নিমন্ত্রন আছে। তাই আজ অনিমেষবাবুকে একাই যেতে হবে দীনুদার হোটেল। সে অনেক আমতা আমতা করে বলেছে, আমার আসতে যদি দেরি হয় দাদা, আপনি নিজেই খাবারটা একটু এনে নেবেন! অনিমেষবাবু আজ মনে করে একখানা আনন্দবাজার পত্রিকা কিনে এনেছেন। কাল খুব ফাঁকা লেগেছে পেপার পড়তে না পেরে। ব্যাগের সামনের খাপ থেকে সেটা বার করতে করতে, দেবু বোসের সঙ্কোচ দূর করতে বলেছেন, জন্মদিন তো খুব ভাল খবর! তিনি ওই দশটা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন, তার মধ্যে যদি দেবু আসে তো ভাল, না হলে তিনি একাই খেয়ে আসবেন। দেবু বোস খুশী হয়ে বিদায় নিয়েছে। আর অনিমেষবাবু বসেছেন তাঁর খবরের কাগজ নিয়ে!
বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে গেছে। আনন্দবাজারের সব আনন্দ-দুঃখ এক মনে গোগ্রাসে গিলছিলেন ভদ্রলোক। তাল কেটে যেতে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন ন’টা কুড়ি মিনিট। দেবু বোস এখনো ফিরতে পারেনি। ওদিকে মাঝে মাঝে কানে আসছে মৃদু মেঘের গর্জন! জোর বৃষ্টি না হলেও ছিটেফোঁটা হতেই পারে! দেবুর টর্চটা আগেই নিয়ে রেখেছিলেন। আর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না মনে করে ‘মাধব মাধব’ নাম করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন অনিমেষবাবু। পরে খেলেও চলবে কিন্তু খাবারটা এনে রাখা দরকার।
রাস্তায় আজ লোকজন নেই বললেই চলে। খারাপ আবহাওয়ার জন্য সবাই আগেই কাজ সেরে ঘর ঢুকেছে! এদিকে টিপটিপ করে বৃষ্টিও শুরু হয়েছে। নির্জন রাস্তায় অনিমেষবাবুর মনে পড়ল সেই চোখ উপড়ে ফেলা, রক্তশূন্য মৃতদেহের কথা! কী বীভৎস মৃত্যু! গা ছমছম করছিল ওঁর! কয়েকবার অস্ফুটে ‘মাধব মাধব’ বলতেও শোনা গেল মনে হয়! পায়ের গতি বেশ হনহনে।
সামান্য এগিয়ে যেতে একটা বাঁক ঘুরতেই হোটেলটা এসে গেল। বাইরে সোডিয়াম ল্যাম্পটা জ্বলছে। আজ তেমন খদ্দের কেউ নেই। অনিমেষবাবু দোকানে প্রবেশ করলেন। মালিক গদিতে বসে আছে। না খালি বসে নেই, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছে। বোঝা গেল, লোকটি শক্তিনগরে সদ্য আগত। আশ্রয়ের খোঁজ করছেন। চেনা খদ্দের দেখে সেই আশ্রয়প্রার্থীর সঙ্গে কথা স্থগিত করে প্রথমে অনিমেষবাবুর খাবারের অর্ডারটা নিয়ে ভিতরে চালান করে দিলেন। আগন্তুক ভদ্রলোকের দিকে নজর গেল তাঁর। ঝুলঝাড়া অবস্থা। দেবু বোস না থাকলে কাল তাঁর নিজের অবস্থাও হয়তো এরকমই হতো। তার উপর ইনি আবার এসেছেন এক প্রহর রাতে, সঙ্গে মেঘের এই বাজে অবস্থা। বড় প্যাঁচে পড়ে গেছেন! হাত তুলে অনুনয় করছিলেন রাতটুকু থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্যে। অনিমেষবাবু লক্ষ্য করলেন, ভদ্রলোকের ডান হাতে কড়ি আঙুলের পাশে ছোট্ট একটা বাড়তি আঙুল। হাতের তালে তালে সেটা আন্দোলিত হচ্ছে। তাঁর অবস্থা দেখে যে কারুর সহানুভূতির উদ্রেক হয়, কিন্তু হোটেল মালিক কেমন যেন কিছুতেই রাজী হয় না! হ্যাঁ মানছি তোমার খাবার হোটেল, থাকার ব্যবস্থা নেই, কিন্তু মানুষ বিপদে পড়েছে আর তোমার যখন একটা দোতলা ঘর রয়েছে তখন মানবিকতার খাতিরেই নাহয় একটু সাহায্য করলে দোষ কী বাপু! অনিমেষবাবুর খাবার চলে এসেছিল, তাও তিনি একটু দাঁড়িয়ে গেলেন। আগন্তুকের হয়ে একবার অনুরোধ করলেন দীনুদাকে। এতরাতে লোকটা যায় কোথা! তবে ততক্ষণে বড় বড় ফোঁটা বৃষ্টি এসে গেছে। যার কপালে যা আছে তাই হবে! মাধবের নাম জপে রাস্তায় নেমে লম্বা লম্বা পায়ে কার্যত ছুটতে শুরু করলেন তিনি।

সকাল হলে আগের দিনের মতোই বেরিয়েছিলেন অনিমেষবাবু। আজ ছিল কনফারেন্সের দ্বিতীয় তথা শেষ দিন। সকালে ভেবেছিলেন তাড়াতাড়ি কাজটা মিটে গেলে বিকালেই বেরিয়ে পড়বেন। কিন্তু দেবু বোসের বুদ্ধিতে সে পরিকল্পনা বাতিল করে দেন। অগত্যা একগাদা কগজের বোঝা নিয়ে আবার ভাড়াবাড়িতে ফিরে আসা। আজ দুপুরে লাঞ্চে মাটন ছিল। খাওয়ার পর থেকেই কেমন একটা অম্বলভাবে কষ্ট পাচ্ছেন ভদ্রলোক। স্নান সেরে প্রনাম করে একমুঠো জোয়ান মুখে দিয়ে খাটে বসে চিবোচ্ছিলেন, হঠাৎ কোথা থেকে বুনো ষাঁড়ের মতো ছুটতে ছুটতে ঘরে প্রবেশ করল দেবু বোস!
অতি উত্তেজনা বা হয়তো পরিশ্রমে তার শ্বাসপ্রশ্বাস এতই দ্রুত যে কোনও কথা বলতে পারছে না। গোটা কতেক ঢোক গিলে একটু সামলে নিয়ে বলল, শুনেছেন দাদা, আজ আবার লাশ পাওয়া গেছে! ওই একই ভাবে মরেছে! চোখ নেই, রক্ত নেই! রেললাইনের ধারে পাওয়া গেছে।
অনিমেষবাবুর মাথা ভোঁ ভোঁ করে উঠল। বললেন, সেকি! কখন পাওয়া গেল?
-এই তো কিছুক্ষণ আগে মনে হয় লোকজন দেখেছে। সবাই যাচ্ছে দেখতে। চলুন দেখে আসি।
অনিমেষবাবুর লাশ দেখতে যাওয়ার কোনও তাগিদ ছিল না। কিন্তু দেবু বোস যখন বলল, ‘দিনের বেলায় এত ভয় কী’, তখন একপ্রকার অপমানবোধেই তাঁকে যেতে হল।
মেলার মতো লোক জমেছে! পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ! খবরের কাগজ আর দূরদর্শনের লোক মনে হয় জনা পঞ্চাশ হবে! মৃতদেহের কাছে কেউ যেতে পারছে না, পুলিশ ঘিরে রেখেছে। চারিদিকে শুধু কালো কালো মাথা দেখা যাচ্ছে! কিন্তু দেবতোষ নাছোড়! অনেক ভিড় ঠেলে সে সামনে এগিয়ে চলেছে। অনিমেষবাবুও অগত্যা গুঁতো খেতে খেতে চলেছেন! কাছে যেতেই চোখের সামনে যেন একরাশ অন্ধকার নেমে এল তাঁর। সারা শরীর হিম হয়ে যেতে লাগল। খানিকটা ঠাণ্ডা রক্ত মাথার পিছন থেকে শিরদাঁড়া বেয়ে পায়ে নেমে গেল! চোখমুখ ফ্যাকাসে! কাঁপা কাঁপা গলায় দেবু বোসকে বললেন, একবার হোটেলে চলুন তো!
-শরীর খারাপ লাগছে দাদা?
কিছু উত্তর পাবার আগেই সে দেখল অনিমেষবাবু সকলকে গুঁতিয়ে পিছু ঘুরেছেন। কিছু না বুঝেই সেও পিছু নিল। যে ভিড়ে ঢুকতে তার প্রায় পনেরো মিনিট লেগেছিল, সেখান থেকে বেরোতে লাগল কয়েক সেকেন্ড!
সারা রাস্তা অনিমেষবাবু ছুটে চলেছেন! দীনুদার হোটেলের রাস্তা। আর তাঁর পিছনে দেবতোষ! কথা বলার কয়েকটা চেষ্টাও করেছে সে। কিন্তু উত্তর পায়নি।
হোটেলে ঢুকে মালিক-কাম-ক্যাসিয়ারকে কাঁপা অথচ জোর গলায় অনিমেষবাবু প্রশ্ন করলেন, কাল যে ভদ্রলোক আপনার হোটেলে ভাড়া ছিল সে কোথায়?
দেবু দুদিনের চেনা মানুষটার পরিবর্তিত আচরনে হতবাক!
দীনুদা চওড়া ভুরুজোড়া তুলে একবার কটমট করে তাকালেন প্রশ্নকর্তার দিকে। তারপর নরম স্বাভাবিক সুরে বললেন, কী পাগলের মতো বলছে দাদা! আমি ঘর ভাড়া দিই না! খাবার বিক্রি করি।
অনিমেষবাবু ক্ষেপে উঠলেন। দেবু বোস যারপরনাই হতবাক!
-ঠাট্টা রাখুন! আমি কাল রাতে খাবার নিতে এসে দেখেছি ওই ভদ্রলোক আপনার কাছে থাকতে চেয়েছিলেন এবং আপনি হয়তো আপনার উপরের ওই ঘরখানা দিয়েও ছিলেন! আজ সেই লোকই খুন হয়েছে! আমি লাশ নিজে দেখেছি, তার ডান হাতে পরিষ্কার ছটা আঙুল, ঠিক যেমন ছিল কালকের সেই লোকের! জামাকাপড়ও কালকের লোকের সাথে একদম এক। আমি কিন্তু পুলিশকে সব জানাব!
এতখানি লম্বা কথা একবারে বলে অনিমেষবাবু হাঁপাচ্ছিলেন। দেবতোষ কিংকর্তব্যবিমুঢ়!
দীনুদা মোলায়েম গলায় বললেন, আপনার মাথার দোষ আছে মশাই! আমার ঘর কোথায় যে লোককে থাকতে দেব। কে কোথায় খুন হয়েছে পুলিশকে গিয়ে বলুন। আমার উপর চড়ছেন কেন!
অনিমেষবাবু হতাশ গলায় বললেন, মানে!
হোটেল মালিক উপরের ঘরের দিকে নির্দেশ করে বললেন, চলুন! কোথায় ঘর দেখে আসবেন!

অনিমেষবাবুর ভয় যেন শেষ হয়ে গেছিল। দেবতোষ একটা চেয়ার টেনে আত্মসমর্পণ করেছে! হোটেলে খদ্দের কেউ নেই, শুধু দুটো কর্মচারী ছেলে।
উপরের ঘরে অনিমেষবাবুর হাত ধরে টেনে নির্জনে নিয়ে গিয়ে হোটেল মালিক ক্রুর কর্কশ গলায় বলল, আপনি মশায় ফালতু এর মধ্যে আসবেন না। বাইরে থেকে এসেছেন, থাকুন, ঘুরুন, যা খুশী করুন কেউ দেখতে যাচ্ছে না! কিন্তু…।
সামনের রাখা টেবিলটার উপর সজোরে একটা করাঘাত করে সে আবার বলল, শুনে রাখুন পুলিশ, ডাক্তার সবাই আমার হাতে ঘুষ খায়! এককথায় কোটর থেকে চোখগুলো খুলে নিয়ে, কিডনি দুটো শরীর থেকে আলাদা করে, মুখে অ্যাসিড ঢেলে বেওয়ারিশ লাশ বলে চালিয়ে দেব! পথের কাঁটাও দূর হবে, রোজকারও হবে!
কিছুক্ষণ সব চুপচাপ! ঘরের নিস্তব্ধ হওয়ায় যেন ওদের দুজনের হৃদপিণ্ডের দ্রুতগতি আন্দোলন তুলেছে! অনিমেষবাবু টলতে টলতে মাটিতে বসে পড়লেন।
-বাড়ি যান। কথাগুলো মনে রাখলে এযাত্রায় বেঁচে ফিরতে পারবেন!
হাত নেড়ে হুমকি দিয়ে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল দানবটা! অনিমেষবাবুর মুখ দিয়ে একটা শব্দও বার হল না। মানুষের অন্তরালে থাকা একটা রক্তচোষা দানব যেন তাঁর অস্থিমজ্জাগুলো চুষে খেয়ে গেল! সারা শরীরে অসীম ক্লান্তি! মাথাটা দুই হাঁটুর মাঝে ঝুলে পড়ল।

 

সমাপ্ত


FavoriteLoading Add to library
Up next
শিকাগো ও স্বামীজী – শান্তনু ভট্টাচার্য্য... স্বামীজীর শিকাগো ভাষণ সম্পর্কে রোঁমা রোলাঁ বলেছিলেন,- "  His speech was like a tongue of flame". অথচ এই " অগ্নিবর্ষণ" এর আগে এই  " cyclonic monk" যথেষ...
ভূতসঙ্গ – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়... অনেকদিন পরে বেড়াতে এসেছিলাম পানুর বাড়ি। সে আমার বন্ধু। এক সময় ক্যামেরাম্যান ছিল। বহু ছবিতে তার অসাধারণ চিত্রগ্রহণ আজ স্মৃতির অতলে। তা হোক, তবু বন্ধুত্...
মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ, অন্যভাবে... -   অনুজিত দাস  আমরা সবাই যখন মুর্শিদাবাদ তথা হাজার দুয়ারী ঘুরতে আসি এবং সময়াভাবে শুধুমাত্র গঙ্গার পূর্বের দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থানগুলি এবং নবনির্মিত...
ভয় – তমালী চক্রবর্ত্তী... হলঘর থেকে বেরিয়ে মেজাজটা খিঁচড়ে গেল বিতানের। এই বোরিং পেরেন্টস্-টিচার মিটিং এ সে কোনোদিনই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। কতবার নিপাকে বলেছে একা যেতে। অফিসের ...
সত্যজিতের চিড়িয়াখানা-প্রচুর আলোচনা ও সামান্য সমালো... একটা সিনেমা তৈরির পেছনে যে ইন্টারেস্টিং গল্পগুলো থাকে তা দিয়েই হয়তো আরেকটা সিনেমা বানানো হয়ে যেতে পারে। এরকম বহু ছবি আছে যা তৈরি হতে হাজারো বাধা এসেছি...
শেষ বসন্তে  থানা থেকে ডাক এসেছে ?উদ্বেগের সাথে আপোষ করাএখন শিখে গেছে মিতালী ,মনের মাঝে শঙ্কা কে ঘুম পাড়ানোর বৃথা প্রয়াস কখন যেন তাকেথানার সামনে এনে হাজির করেছে ,...
ঠিক আসে না – প্রিয়তোষ ব্যানার্জী... আমার কবিতা লেখা টা ঠিকমত আসে না ছন্দ,অমিত্রাক্ষর,গদ্য-ছন্দ.কিছুই জমাট বাধেনা। বিপ্লব,বিরহ.প্রেম,প্রতিবাদের কাব্য হয় না লেখা বুদ্ধিজীবী মহলে আমায় ...
ভালো থেকো বাবা - মুক্তধারা মুখার্জী   “কি ব্যাপার? হঠাৎ এখানে? এতদিন পর ?” “কেন বাবা আমি কি আসতে পারিনা ? তোমার কথা খুব মনে পড়ছিলো,তাই....” “থাক,থাক।মিথ্য...
শরীরকে সুস্থ রাখতে চ্যবনপ্রাশের ভূমিকা – অঙ্... এ কথা আজ সর্বজনবিদিত যে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা পদ্ধতির উৎস হল এই ভারতবর্ষ। এই চিকিৎসা পদ্ধতি বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, শুধু ভারতেই নয় অন্যান্...
মিথ আর প্রশ্ন - মৌমিতা মারিক (রাই)   আমি কোনোদিন ফরসা হতে চাইনি ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীর অ্যাড মেখে ঘুরতে চাইনি যতবার আমায় কালো বলেছো জিজ্ঞেস করেছি " বিদেশী...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment