অপদেবতা – শাশ্বতী সেনগুপ্ত

টনাটা কয়েক বছর আগে ঘটেছিল এক মফস্বলে। সেখানে আমার পিসির বাড়ি। পরীক্ষার পর ছুটিতে আমরা যেতাম। অন্যান্য পিসিদের ছেলেমেয়েরাও আসত। দেদার জমে যেত মজা। জায়গা মফস্বল হলেও বেশ গভীর গ্রামের মতই। চারিদিকে অসংখ্য গাছপালা। দিগন্ত ছুঁয়ে থাকা জঙ্গল আর বেশ কয়েকটা বড় বড় পুকুর। তার আয়তন দেখার মতই। পিসির বাড়ির দোতলার বারান্দায় দাঁড়ালে একটু দূরে একটা পুকুর ছিল। বিশাল আয়তনের। পুকুরের ধারে ধারে প্রচুর গাছ ছিল। দিনেরবেলা যেমন তেমন, রাতে বারান্দায় একা দাঁড়ালে বেশ ভয় করত পুকুরটার দিকে তাকালে। তার পাড়টা ঘন গাছপালায় ঢেকে থাকার জন্য ভীষণ রহস্যময় ছিল। তার ভিতরেই জোনাকি জ্বলত। তাতে আরো ঘন হত রহস্য রাতে।

একদিন রাতে আমি আর পিসির মেয়ে রমা দুজনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে গল্প করছিলাম। তার একটু আগেই আমাদের খাওয়া হয়ে গেছে। কার্তিক মাস, গ্রাম ঘেঁষা বলেই হয়ত রাত হলে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগত। দুজনে আনমনে গল্প করে যাচ্ছিলাম। মাঝে মাঝে আমরা হাসছিলামও মজা পেয়ে। এভাবে অনেকক্ষণ কেটে গিয়েছিল। হঠাৎ রমা হেসে উঠতেই মনে হল, আরো কেউ যেন হেসে উঠলো। প্রথমটা ঠিক বুঝতে পারিনি দুজনে। পরে সেটা বুঝতে পারতেই দুজনের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। আমি ফিসফিস করে রমাকে বললাম, এবার ঘরে ঢুকে যাই চল, দাঁড়ানো ঠিক হবে না। আশপাশটাও কেমন নিঃস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। এমন সময় আমি বললাম,  পুকুরপাড়ে ওটা কি বলত? অনেকক্ষণ ধরেই দেখছি, তুই ভালো করে দেখত।

রমা দেখে বলল, একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। আমিও আবার চোখ মুছে তাকাতেই চমকে উঠলাম, কেউ যেন পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। পুরুষ নয়, একজন মহিলা। এই অন্ধকারে দেখা না যাবারই কথা। কিন্তু স্পষ্ট ভাবেই দুজনে দেখতে পাচ্ছি একজন মহিলা আমাদের দিকে চেয়েই দাঁড়িয়ে আছে। এত রাতে এই ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় কি করছেন ওই মহিলা ওখানে! দুজনের বিস্ময়ের সীমা রইল না। তার সঙ্গেই কেমন যেন ভয়ে শরীর অসাড় হয়ে আসতে লাগল। আমি ঠেলা মারলাম রমা কে। রমার মুখে কোনও কথা নেই। আবার ঠেলা মেরে বললাম, এই রমা, ঘরে চল। রমা ওইদিকে হাঁ করে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোনও কথাই বলছে না। তার চোখে অস্বাভাবিক দৃষ্টি, শরীর ভীষণ শক্ত হয়ে আছে। আমি ভয় পেয়ে চিৎকার করতেই ঘর থেকে পিসি, পিসে ও অন্য ভাইবোনরা ছুটে এসে বলল, কি হয়েছে তোদের?
আমি বললাম, রমা কথা বলছে না, ওর শরীর শক্ত হয়ে আছে। সবাই মিলে চেষ্টা করেও রমাকে কথা বলাতে না পেরে সবাই ধরে ঘরে নিয়ে এল। তারপর মুখে চোখে জল ছেটাতে সে স্বাভাবিক হল। সবাই জিজ্ঞ্যেস করল কি হয়েছিল? রমা বলতে লাগল কিছুই তো হয়নি! আমি ঘটনাটা বলতেই চমকে উঠলো পিসি আর পিসে। একটু থেমে তারা বলল, সর্বনাশ, মন্দিরা দেখা দিয়েছিল। সচরাচর দেখা যায় না। খুব কম সময়ই কেউ কেউ ওকে দেখেছে। যারাই দেখেছে তাদেরই এমন হয়েছে।

আমি বললাম, ঘটনাটা কি পিসি? পিসি বলল, এই গ্রামেরই মেয়ে মন্দিরা। পারিবারিক অশান্তির জেরে ওই পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। সেই সময়টাও ছিল কার্তিক মাস। সেবারে ঘন ঠাণ্ডা পড়ে গিয়েছিল। একদিন ভর সন্ধ্যাবেলায় ও পুকুটায় ঝাঁপ মারে। সারা রাত খোঁজাখুঁজির পর ভোরে ওর দেহ ভেসে থাকতে দেখেছিল কয়েকজন গ্রামবাসী। সেই থেকে কেউ ওই পুকুরটা ব্যবহার করে না। এমন কি পুকুরটার দু’ধার পরিস্কার করার সাহসও পায় না। একবার পঞ্চায়েত থেকে চেষ্টা করতে ফল হয়েছিল খারাপ। আর এসব ব্যাপার রমা জানত। ওকে হয়ত ওই অপদেবতা এভাবেই আকর্ষণ করে টেনে নিয়ে যেত। এভাবে গ্রামের একজনকে টেনেছিল। কোনও ভাবে সে বেঁচে গিয়েছিল। আজ রমা বেঁচে গেল তোর জন্য। আমি কোনও কথা বললাম না। ভাবলাম, আমিই তো প্রথম দেখতে পেয়েছিলাম। তাহলে আমার কিছু হল না কেন? উত্তর খোঁজার আর সাহস পাইনি।

_____


FavoriteLoading Add to library

Up next

দুঃখ দিতে চেয়েছো – বৈশাখী চক্কোত্তি... "তুমি অনেক যত্ন করে আমায় দুঃখ দিতে চেয়েছো", আমার মনোভূমিতে একটি একটি, কাঁটা তারের বেড়া পুঁতেছো ।। যন্ত্রনায় ছটফট করেছি আমি, স্বপ্নের ডানা দুমড়ে মুচড়...
মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ, অন্যভাবে... -   অনুজিত দাস  আমরা সবাই যখন মুর্শিদাবাদ তথা হাজার দুয়ারী ঘুরতে আসি এবং সময়াভাবে শুধুমাত্র গঙ্গার পূর্বের দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থানগুলি এবং নবনির্মিত...
একটি বিয়ের গপ্প – অভিনব বসু... নায়িকার গল্প দিয়ে শুরু করি। কোলকাতারই মেয়ে, এলাহাবাদের এক ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে, ছেলে না বলে লোক বলাই ভালো; বছর ৩৭-৩৮ বয়স, তায় দোজবর। যদিও মেয়ের স...
শরীরকে সুস্থ রাখতে চ্যবনপ্রাশের ভূমিকা – অঙ্... এ কথা আজ সর্বজনবিদিত যে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা পদ্ধতির উৎস হল এই ভারতবর্ষ। এই চিকিৎসা পদ্ধতি বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, শুধু ভারতেই নয় অন্যান্...
মুখরোচক এগডাল বানানোর সহজ কৌশল – মালা নাথ...     সুকুমারবাবুর অমর সৃষ্টি 'অবাক জলপান' নামক নাটকের বেশ কয়েকটি সংলাপে স্রষ্টা তাঁর আপন অন্তরের সমগ্র মাধুরীকে একত্রিত করে এবং তাঁর ট্রেডমার্ক ব...
হারানো সুর – সুস্মিতা দত্তরায়... চোখের জল বাঁধ ভাঙলো ইরার। চোখ ছাপিয়ে দুই গাল বেয়ে নেমে এলো অশ্রুধারা। দুই হাতে তা মুছে আবার ফিরে তাকাল ওই দোতলা বাড়ীটার দিকে। তারপর ধীর পায়ে উঠোনটা পে...
মোহিনীর আতঙ্ক – শাশ্বতী সেনগুপ্ত...    জঙ্গলে পিকনিক? কথাটা শুনেই না করে দিয়েছিল রাজ। জঙ্গল এমনিতেই ভয়ঙ্কর। তার ওপর আবার এক রাত থাকা। মুখের কথা নাকি? কোনও দরকার নেই ভাই, পরিস্কার কথাটা ফ...
ভালোবাসি অন্ধকারকে – রুমা কোলে... তোমার চাহিদা দিনের , আমার রাতটুকুই প্রিয় । তুমি ভালোবাসো আলো , আর আমি ! রাতের কালো । হ্যাঁ ,  কালো , অন্ধকার , কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার , যেখানে নিজ...
জীবনের সূর্যোদয় – দেবস্মিতা মন্ডল... অশোকবাবুর রোজ প্রাতঃভ্রমণ যাওয়াটা   বড্ড বাজে অভ‍্যাস। নাহ্ প্রাতঃভ্রমণ টা কোনো বদ অভ‍্যাস নয় তবে ঝড় বৃষ্টি কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করাটা বোধহয় সবসময়...
স্বাস্থ্যগঠনে যোগব্যায়ামের ভূমিকা – কৌশিক প্... 'যোগ' শব্দটির অর্থ হলো মিলন বা সংযোগ,অনেকক্ষেত্রে 'যোগ' শব্দটি আবার নিয়ন্ত্রণ অর্থেও ব্যবহৃত হয় আর 'ব্যায়াম' শব্দটির অর্থ হলো স্বাস্থ্যরক্ষা বা বলবৃ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment