অপারেশন ব্লুস্টার – অঙ্কুর কৃষ্ণ চৌধুরী

মৃতসরের স্বর্ণমন্দির, শিখ ধর্মাবলম্বী তথা ভারতবাসীর পবিত্রভূমি। প্রতিদিন এখানে বহু ভক্তের আগমন হয়, আগমন হয় বহু পর্যটকের। এমন এক ধর্মীয় স্থান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল আজ থেকে ৩৪ বছর আগে। অপারেশন ব্লুস্টার চালানো হয় এই স্থানে। অপারেশন ব্লুস্টার কী এবং কেন? তার উত্তরের জন্য আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে খালিস্তান আন্দোলন এবং জার্নেল সিং ভিন্দ্রাওয়ালের দিকে।

খালিস্তান আন্দোলন হল এমন এক আন্দোলন যেখানে শিখ ধর্মাবলম্বীদের জন্য এক পৃথক রাষ্ট্রের দাবী করা হয়। বস্তুত, স্বাধীনতার আগে থেকেই শিখদের পৃথক রাষ্ট্রের দাবীর বীজ রোপিত হয়ে গিয়েছিল। ১৯৪০ সালে শিখ নেতা বীর সিং ভাট্টি শিখদের জড়ো করার কাজে নেমেছিলেন। কিন্তু শিখ রাষ্ট্রের দাবী মান্যতা পায়নি। পরে আশির দশকে জার্নেল সিং ভিন্দ্রাওয়ালের সৌজন্যে এই দাবী আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। যদিও অনেকে মনে করেন ভিন্দ্রাওয়ালে খালিস্তানের সমর্থনে কখনও মুখ খোলেননি, তার সমর্থকদের অনেকে সার্বভৌম খালিস্তানের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে থাকে।

জার্নেল সিং ভিন্দ্রাওয়ালে কারও দৃষ্টিতে একজন সন্ত ও যোদ্ধা, কারও দৃষ্টিতে উগ্রপন্থী। অপারেশন ব্লুস্টার এর নেতা কুলদীপ সিং ব্রার সোনিয়া দেওলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন – ভিন্দ্রাওয়ালে হয়তো আগে সন্ত ছিল কিন্তু পরে সে এক উগ্রপন্থী হয়ে যায়। ভিন্দ্রাওয়ালে আশির দশকে শিখ রাজনীতির এক বড়ো মুখ ছিল। রাজনীতিতে তাঁর উত্থান হয় কংগ্রেস(ই) – র ছত্রছায়ায়। ১৯৭৭ এ কংগ্রেস পাঞ্জাবে নির্বাচনে হেরে যায় আকালি দলের কাছে। এরপর সঞ্জয় গান্ধী আকালি দলকে হারানোর জন্য ভিন্দ্রাওয়ালেকে ব্যবহার করেন। যদিও পরবর্তীকালে সে কেন্দ্র বিরোধিতা করে। যাইহোক, ১৯৮০ সালে পাঞ্জাবে কংগ্রেস জয়ী হয়। এইসময় নির্বাচনে ভিন্দ্রাওয়ালে কংগ্রেস প্রার্থীদের হয়ে প্রচার করেছিল।

ভিন্দ্রাওয়ালের সহায়তায় কংগ্রেস জয়লাভ তো করে কিন্তু এরপর ভিন্দ্রাওয়ালে যেরকম কার্যকলাপ চালাতে থাকে তা তাকে সমালোচনার সামনে দাঁড় করায়। তার এক সমালোচক ছিলেন ‘পাঞ্জাব কেশরি’ পত্রিকার সম্পাদক লালা জগত নারায়ণ। ১৯৮২ সালের ৯ ই সেপ্টেম্বর তিনি কিছু দুষ্কৃতীর হতে প্রাণ হারান। আর এই হত্যার সন্দেহে ভিন্দ্রাওয়ালেকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বলা হয় তার বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এইসময় আবার খালিস্তান আন্দোলন শুরু হয়।
এরপর থেকে ধীরে ধীরে ভিন্দ্রাওয়ালের কাজকর্ম কেন্দ্র বিরোধী হতে শুরু করে। যেমন – ১৯৮২ তে এশিয়াড গেমস – এ বিক্ষোভ প্রদর্শনের হুমকি। এর জন্য পাঞ্জাব হরিয়ানা সীমান্ত সীল করে দেওয়া হয়। শিখদের উপর নজরদারি চালানো এবং অনেক শিখকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনা শিখদের এবং ভিন্দ্রাওয়ালেকে ক্ষুব্ধ করে।

পাঞ্জাবের অবস্থা তখন অগ্নিগর্ভ। হিন্দু শিখ সম্পর্কও খারাপ হতে শুরু করেছে। ১৯৮৩ তে উগ্রপন্থীরা বাস থেকে হিন্দু যাত্রীদের চিহ্নিত করে হত্যা করতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পাঞ্জাবে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করেন। সেই বছরই ১৫ ই ডিসেম্বর ভিন্দ্রাওয়ালে স্বর্ণমন্দিরের অকাল তখ্ত দখল করে নেয়। ( এই অকাল তখ্তের একটা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মাহাত্ম্য আছে শিখদের কাছে)। এই সময় শুধু পাঞ্জাব নয় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দু শিখ সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। যেমন হরিয়ানায় ৯ জন শিখকে হত্যা করা হয়, তিনটি গুরুদ্বার ভাঙা হয়।

ভিন্দ্রাওয়ালে ও তার অনুগামীরা চেয়েছিল হিন্দুদের পাঞ্জাব থেকে বিতাড়িত করতে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানের শিখদের পাঞ্জাবে নিয়ে আসতে। যা সরাসরি ইন্দিরা গান্ধীর কাছে এক চ্যালেঞ্জ ছিল। অর্থাৎ এখন কিছু করতেই হত।

১৯৮৪ এর ১লা জুন পঞ্জাবকে সেনাবাহিনীর অধীনে দেওয়া হয়। এবং ৩ রা জুন শুরু হয় অপারেশন ব্লুস্টার। ৮ই জুন পর্যন্ত এই অভিযান চলে। এই অভিযান চলাকালীন ভিন্দ্রাওয়ালে ও তার অনুগামীদের মৃত্যু তো হয়ই এছাড়া বহু সাধারণ মানুষেরও মৃত্যু হয় এবং বিধ্বস্ত হয় অকাল তখ্ত, যা শিখ মানসিকতায় এক বড় আঘাত ছিল। অপারেশন ব্লুস্টারে ইন্দিরা গান্ধীর জয় হয়। কিন্তু আজ এই প্রশ্ন ওঠে অপারেশন ব্লুস্টারের কী সত্যি প্রয়োজন ছিল? কেউ কেউ তৎকালীন পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে বলেন হ্যাঁ দরকার ছিল। আবার কারও মতে যদি ভিন্দ্রাওয়ালের উত্থানকে কেন্দ্র আগেই রোধ করতে উদ্যোগী হতো, তাহলে হয়তো এই অপারেশনের প্রয়োজন হতোনা। যাইহোক, অপারেশন ব্লুস্টারের চরম মূল্য দিতে হয় ইন্দিরা গান্ধীকে। কারণ, ১৯৮৪ সালের ৩১ শে অক্টোবর ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁর দুই শিখ দেহরক্ষী গুলি করে, এবং তাঁর মৃত্যু হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লি ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে শুরু হয় শিখ বিরোধী অভিযান। ‘খুন কা বদলা খুন’, সর্দার গদ্দার হ্যাঁ ‘- এইসব স্লোগান দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের শিখদের হত্যা করতে থাকে দাঙ্গাবাজরা। শিখদের ঘরবাড়ি, দোকান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, বহু শিখকে পুড়িয়ে মারা হয়। ১লা নভেম্বর থেকে ৩রা নভেম্বর পর্যন্ত চলে শিখ নিধন যজ্ঞ।  এই সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পুলিশ এফআইআর পর্যন্ত নেয়নি সেদিনগুলোয়। সেই ৩ দিনে প্রায় ৩০০০ শিখ প্রাণ হারায়, আহতও হয় প্রচুর। শুধু শিখ নয় সেইসময় আহত হয়েছিল আমাদের গনতন্ত্র। সরকারের ভূমিকাও মোটেই সন্তোষজনক ছিলোনা, বরং অনেকের মতে, সরকার এই হত্যাকাণ্ডে ইন্ধন দিয়েছিলো।

আজ সেই ঘটনার পর ৩৪ বছর কেটে গেছে কিন্তু অধিকাংশ হত্যাকারীদের শাস্তি হয়নি। অনেক পুলিশ যারা এই হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত তাদেরও কোনো বিচার হয়নি।

আজ আমরা অনেকেই এই কালো অধ্যায়টাকে মনে রাখিনি। কিন্তু যারা নিজের স্বজন হারিয়েছে তাদের পক্ষে কী ভুলে যাওয়া সম্ভব? তাও শেষে বলি এই ঘটনায় আমরা দেখি প্রতিশোধের আগুন বড় ভয়ানক বিষয়। তাই প্রতিশোধের ইচ্ছাকে দমন করা দরকার। ‘চোখের বদলে চোখ’ এটা সভ্য সমাজের নীতি হতে পারে না। প্রতিশোধ নয় সংশোধন হোক ন্যায়ের উদ্দেশ্য, ঘৃণা নয় ভালোবাসা হোক জাতির মূল মন্ত্র।

_____


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment