অবশেষে খুঁজে পেলাম তোমাকে

-অর্পিতা সরকার

 

 আর যাই করিস ওই মেয়ের দিকে ভুলেও তাকাস না সৌম্য, একবার যদি তোর লাইফে ঢোকে তাহলে তোর কেরিয়ার ফিউজ হয়ে যাবে গুরু। শত হস্ত দূরে থাক ওই ডেঞ্জারাস সুন্দরীর থেকে। ওকে তুই কাঁটা গাছের ফুল ভাব রে। রিতেশ না বললেও জুঁইকে ভালো করেই চেনে সৌম্য। মেয়েটার সব ভালো কিন্তু এত ফাঁকিবাজ যে পড়াশোনার নামে জ্বর আসে। কেতকি আন্টি মানে জুঁইয়ের মা সেদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাকে যেন একটা বলছিলেন, মেয়েটাকে নিয়ে জ্বলে গেলাম দিদি। ওর মাধ্যমিকের আগে ওর বাবার হাই প্রেশার হয়ে গিয়েছিলো। দিনরাত ভাবতো, মেয়ে আমার ফেল করলে, লোক সমাজে মুখ দেখাবো কি করে! ওর উচ্চমাধ্যমিকের সময় তো ওই নাস্তিক মানুষ ভোর থেকে কালীমন্দিরের চাতালে ধর্ণা দিয়ে পড়েছিলো, মেয়ে যেন পাশটুকু করে মুখ রক্ষে করে। না হলে স্কুলে লজ্জায় ঢুকতে পারতো না ওর বাবা। লোকে বলতো, হেড মাস্টার মশাইয়ের মেয়ে কিনা ফেল করেছে! এখন দেখো.. দিনরাত স্কুটি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ওই নামেই কলেজে ভর্তি হয়েছে। আমি তো রোজ বলি, মেয়ের বিয়ে দিয়ে দাও, নাহলে শুধু প্রেশার কেনো তোমার হার্টের ভাল্ব ব্লক হতেও সময় লাগবে না। সৌম্যকে দেখেই কেতকি আন্টি আবার বললেন, আমাদের বিট্টুকে দেখো, দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। যখনই দেখি তখনই কাঁধে ব্যাগ নিয়ে পড়তে যাচ্ছে। প্রশংসায় কুপোকাত হয়না এমন মানুষ নেই বললেই চলে। সৌম্যও হেসে বলেছিলো, আন্টি আপনাদের  শরীর ভালো তো? স্যার ভালো আছেন?
কেতকি আন্টি আবার নাক টেনে একই সুরে বলেছিলেন, আর ভালো! তোদের স্যার তো ওই এক মেয়ের চিন্তা করে করেই দেহ রাখবেন রে।

জুঁইয়ের বাবা বিতান বসু হাই স্কুলের হেডমাস্টার মশাই, কেমিস্ট্রির শিক্ষক। এ অঞ্চলে ওনার বেশ নাম ডাক আছে।
এখন অবশ্য ওনাকে নিয়ে কম ওনার মেয়েকে নিয়ে আলোচনা বেশি হয়। সকলের মুখেই এক কথা, কি বাবার কি মেয়ে! মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে কোনো মতে পাশ করে কলেজে ঢুকেই এক্সট্রা পাখনা লাগিয়েছে জুঁই। দিনরাত যেন উড়ে বেড়াচ্ছে। মাস্টারমশাইকে দেখলে খারাপ লাগে। ওনার হাত দিয়ে কত ভালো ছেলে মেয়ে বেরোলো, আর নিজের মেয়েটাই একটা জলজ্যান্ত হনুমান হয়েছে।

সন্ধ্যে সন্ধ্যে হয়ে এসেছে, ফুটবল খেলার মাঠে সৌম্য, রিতেশ আর অয়ন বসেছিলো। সামনে দিয়ে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যাওয়া পার্পেল কালারের স্কুটিটা যে কার,   সেটা বুঝতে কারোর কোনো অসুবিধা হলো না। ওকে দেখেই বিশেষজ্ঞের মত রিতেশের বিখ্যাত উক্তি বেরিয়ে এলো। সৌম্য চোখটা সরিয়ে বললো, ভাবলি কি করে ওই বই বিমুখ মেয়েকে আমি আমার লাইফে ঢুকতে দেব! যদিও বলার সময় গতবছর সরস্বতী পুজোর দিন দেখা জুঁইয়ের হালকা গোলাপি ঢাকাই পরা মুখটা মনে পড়ে বুকের রক্ত একটু হলেও ছলকে উঠলো ওর।

অয়ন বরাবরই একটু চুপচাপ। কিন্তু ওর নেটওয়ার্ক খুব ভালো। তাই ও যেটা বলে তার সত্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্নই চলে না। অয়নই বললো, এত সুন্দরী অথচ এখনো কারও প্রেমে পড়েনি কিন্তু। এই তো সেদিন আমাদের পাড়ার ভলিবল প্লেয়ার সুমনদা জুঁইকে প্রোপোজ করেছিলো, তো মেয়ের কি রাগ! বলে কিনা, লেখাপড়ায় খারাপ ছেলেকে নাকি সে বিয়ে করতে পারবে না। রিতেশ বললো, যা বাবা…ও নিজেই তো ফেলুরাম। অয়ন বললো, তা বলতে পারবো না। তবে সুমনদা রাতে ক্লাবে এসে হাসছিলো আর বলছিল, তাই শুনলাম। যাক বাবা, লোকের কথা ভেবে লাভ নেই, ওদের এবার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফাইনাল ইয়ার। তাই এসব নিয়ে আলোচনা করার সময় নেই বললেই চলে। বরং গ্রূপ স্টাডি করলে কাজ দেবে। বিশেষ করে সৌম্য ব্যানার্জির ওপরে শুধু ওর বাবা-মা নয় গোটা কলোনির একটা আলাদা এক্সপেক্টেশন আছে। কারণ সৌম্যর প্রতিটা রেজাল্ট লোককে গর্ব করে বলার মতই। এমনকি জয়েন্টেও ও প্রথমের দিকেই র‍্যাঙ্ক করেছিল। তাই একচান্সএ ভালো ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেই চান্স পেয়ে গিয়েছিলো।

বাড়ি ঢুকতেই মা গম্ভীর গলায় বললো, বিট্টু এই কয়েকটা মাস একটু মন দিয়ে পড়াশোনাটা কর, বিকালের এই মাঠের আড্ডাটা না হয় কয়েকদিন বন্ধ থাক। আমার কলিগরা সকলেই বলেন, তোমার ছেলে তো ক্যাম্পাসিঙেই দারুণ কিছু পাবে। তোর কাছে তো বেশ কিছু ভালো কোম্পানির অফারও এসেছিলো ফোর্থ ইয়ারের প্রথমেই। মানসম্মান টুকু রাখিস। শেষে যেন বিতান বাবুর মত আমারও সম্মান নিয়ে টানাটানি না হয়। সৌম্যর মা একটা নামি গার্লস স্কুলের শিক্ষিকা। ছেলেকেও নিজের মনের মত করেই বড় করেছেন। সৌম্যও ছোট থেকে মায়ের আদর্শেই মানুষ হচ্ছে। বাবা তো বেশির ভাগ সময় কাজের সূত্রে বাইরেই থাকেন।  মাসে হয়তো একবার আসেন। ব্যাঙ্গালোর থেকে রেগুলার রাতে ফোন করেই বাবা প্রথম খোঁজ নেন, সৌম্যর পড়াশোনাটা কেমন চলছে। এত বায়না করেও মায়ের কাছ থেকে সাইকেলের বেশি কিছু আদায় করতে পারেনি সৌম্য। উচ্চমাধ্যমিকের পর একটা মোবাইল ফোন। ওদের কলেজে প্রায় বেশির ভাগ বন্ধুই বাইকে আসে। সৌম্য আজও বাসে চেপেই কলেজ যায়। টুকটাক যাওয়ার জন্য ওর সাইকেল আছে। মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয় ওর। ও তো মন দিয়েই পড়াশোনা করে, তবুও কেন যে মা এত শাসন করে কে জানে! রিতেশ, অয়ন পর্যন্ত ওর মাকে ভয় পায়!

দক্ষিনের জানালাটা খুলে পড়তে বসলো সৌম্য। হঠাৎই একটা চিরকুট এসে গায়ে পড়লো। খুলতেই দেখলো লেখা রয়েছে, “পড়ে পড়েই একদিন বুড়ো হবে তুমি। তারপর তোমার চুল পেকে যাবে, দাঁত পড়ে যাবে, তুমি লাঠি নিয়ে হাঁটবে, তখনো তুমি পড়েই যাবে। এত মোটা মাথা নিয়ে কি পড়ো বলতো? আমার তো পরীক্ষার আগে তিনদিন পড়লেই সব মুখস্ত হয়ে যায়।”
চিরকুট পড়া শেষ করে তাকাতেই দেখলো, স্কুটির ওপরে বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে কিছু একটা খাচ্ছে জুঁই। আর ওর দিকে তাকিয়ে হি হি করে হেসেই চলেছে।
ওর হাসিটা দেখেই রাগে পিত্তি জ্বলে গেল সৌম্যর। বেশ জোরেই চেঁচিয়ে বললো, পরীক্ষার আগে দুদিন পড়লে ওই থার্ড ডিভিশনই জুটবে।
ফেলুরাম কোথাকারের।
জুঁই জিভ ভেঙিয়ে স্কুটিতে স্টার্ট দিলো।
ওর ওই উড়ে যাওয়া দেখতে দেখতেই অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলো সৌম্য। হঠাৎই চোখের সামনে জানালাটা বন্ধ হতে দেখে চমকে উঠলো।
ধীর গলায় মা বললো, আমি এসি টা চালিয়ে দিচ্ছি।

পড়ার সময় অন্যমনস্ক হওয়ার দোষেই যে রাস্তার ধারে দক্ষিণের জানালাটা বন্ধ হয়ে গেল সেটুকু বুঝতে দেরি হলো না সৌম্যর। কোনো মতে পায়ের নিচে চিরকুটটা চালান করেছে সৌম্য। যদি একবার মায়ের হাতে ওটা পড়ে, তাহলে কাল সকালেই মা বিতান বাবুর বাড়িতে গিয়ে ওনাকে আর ওনার মেয়েকে অপমান করে আসবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত। মালিনী দেবী সবকিছুতে ছাড় দিলেও, ছেলের পড়াশোনা নিয়ে কোনো কম্প্রোমাইজ করবেন না।
মা চলে যেতেই চিঠিটা আরেকবার পড়লো সৌম্য। এখন আর রাগ হচ্ছে না জুঁইয়ের ওপর। বরং বেশ মজা লাগছিলো। ও তো নাহয় পড়াশোনা করতে করতে বুড়ো হয়ে যাবে বলে ভবিষ্যৎ বাণী করেছে মেয়েটা। কিন্তু একবারও ভাবে নি যে পড়াশোনা না করে করে ও কি খুকি থাকবে! ঠোঁটের কোণে আলগা হাসির রেখাটা ছুঁয়ে গেল সৌম্যকে। বাড়ির সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছটা সব ফুল ফুটিয়ে দিয়ে সালংকরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাঁচের জানালার ভিতর দিয়েও লাল রঙের আধিক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সৌম্যর চোখে। সেদিকে তাকিয়েই নিজেকে প্রশ্ন করলো সৌম্য, আচ্ছা ও কেন জুঁই এর চিঠিটা আড়াল করলো মায়ের কাছ থেকে! কেন জুঁইকে মা অপমান করুক সেটা চাইছে না ও! তবে কি….

রিতেশের সাবধান বাণী কানে বাজলো যেন, ওই মেয়ের দিকে ভুলেও তাকাস না সৌম্য, তোর ফিউচার ডুম হয়ে যাবে রে। মেয়েটা এমনিতে তো খারাপ নয়, কিন্তু কেন যে একটু ভালো করে পড়াশোনা করে না, আর সারাদিন কোথায় কোথায় ঘোরে কে জানে! স্যার তো একটু শাসন করতেও পারেন মেয়েকে। অবশ্য লোকে বলে, স্যার নাকি কোনোভাবেই ওই মেয়েকে পড়তে বসাতে পারেন না। ধুত্তোর, গোটা সন্ধ্যেটা যাবে ওই মেয়ের কথা ভেবে ভেবে। জোর করে নিজের পড়ার মন দিলো সৌম্য। তবুও কেন যে আজ বারবার জুঁইয়ের ওই নোজ রিং পরা মুখটা ভেসে উঠছে বইয়ের পাতায় সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছে না সৌম্য। চূড়ান্ত বিরক্ত হয়ে জুঁইয়ের মুখ ভেসে ওঠা বেইমান বইটাকে দূরে সরিয়ে রেখে অন্য বই খুলে বসলো ও। সেখানেও ওই বিছুটি মেয়ের হানাদারি শুরু হলো। রিতেশ ঠিকই বলেছিল, বিকেলে ঐ মেয়ের দিকে তাকানোটাই পাপ হয়ে গেছে সৌম্যর। তাছাড়া জুঁইকে তো আজ থেকে চেনে না সৌম্য, একই পাড়ার বাসিন্দা হিসাবে শুধু নয়, জুঁই এর বেশ কিছু দুষ্টুমির ভিক্টিম হয়েছিলো ও নিজে।

জুঁই সৌম্যর থেকে বছর চার পাঁচের ছোট হবে। তাই ক্লাস টেনে পড়ার সময় জুঁইকে ছোট মেয়ে বলে স্নেহ করেই একদিন বৃষ্টির মধ্যে টিউশন থেকে ফেরার পথে রাস্তায় নিজের সাইকেলে চাপিয়েছিলো সৌম্য। কিছুটা আসার পরই পিছন ফিরে দেখছিলো, কেরিয়ারে জুঁই নেই। সন্ধ্যেবেলা, বর্ষাকালে মেয়েটা কোথাও পড়ে গেলো ভেবেই ভিজে ভিজেও ওকে খুঁজতে শুরু করেছিল সৌম্য।
এমনিতেই ওর ঠান্ডা লাগার ধাত, ভিজে জামায় বেশীক্ষণ থাকলে অবধারিত জ্বর আসবে কাল। তবুও মেয়েটা রাস্তায় যেচে ওর সাইকেলে চাপতে চেয়েছিলো বলেই দায়িত্ব একটা থেকেই যায়। বৃষ্টিটা জোরে আসায় পুরো ভিজে গিয়েছিলো ও, তখনই খেয়াল করলো, নীলচে ফ্রক পরে একটা মেয়ে বেমালুম মুখার্জী কাকাদের বাগান থেকে বেলফুল তুলছে। তীব্র বৃষ্টিতে বোঝা যাচ্ছিলো না, তবুও কাছে গিয়ে বুঝলো ওটাই জুঁই। আপন মনে ভিজে ভিজে ফুল তুলছে। সৌম্য রেগে গিয়ে বলেছিল, তুমি যে আমার সাইকেলে চেপে বললে, তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে, তাহলে এখানে কি করছো? মেয়েটা ঠোঁট বেঁকিয়ে বললো, হাবলুরাম, ভালো করে সাইকেলটাও চালাতে পারে না। পিছনের মানুষটা যে লাফিয়ে নেমে পড়েছে সেটাও বোঝে না। বোকার মত খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে সৌম্য বলেছিল, নেমে পড়লে কেন?
জুঁই নিশ্চিন্ত মনে বলেছিল, এই যে এত ফুল দেখলাম বলে!

জুঁই এমনই বেআক্কেলে, বলেছিলো কেতকি আন্টি। ওরাও নাকি সন্ধ্যের থেকে মেয়েকে খুঁজে বেরোচ্ছিলো। পার্ক থেকে কখন যে মায়ের চোখে ধুলো দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলো কেউ টেরও পায়নি। জুঁই সেই ফাইভ-সিক্স থেকেই মারাত্মক চঞ্চল। আর যত কূট বুদ্ধি ওর মাথাতেই বাসা বাঁধে। সেদিন রাতেই সৌম্যর জ্বর এসেছিলো। মা বারবার জিজ্ঞেস করেছিল, সৌম্য বৃষ্টিতে ভিজেছিলো কিনা! সৌম্য জ্বরের ঘোরেও বলেনি, কার জন্য ও সেদিন ভিজেছিলো!!
মায়ের বকুনি চুপচাপ সহ্য করেছিলো। তবুও জুঁইয়ের নামটা সামনে আসতে দেয়নি!

আরেকবারের অভিজ্ঞতাও আছে সৌম্যর। ওই মেয়ের পাল্লায় পড়ে হিমশিম খাওয়ার কথাটা আজও মনে আছে ওর।
স্কুলের সরস্বতী পুজোয় দারুণ করে সেজে অঞ্জলী দিচ্ছিলো জুঁই। সৌম্য কানের পাশে গিয়ে বলেছিলো, ঠাকুরকে ডাকো যেন মাধ্যমিকটা অন্তত পাশ করিয়ে দেন।
আচমকা এক ঘর স্টুডেন্টের সামনে জুঁই বলেছিলো, হ্যাঁ ঠাকুরকে বলছিলাম, আমার হবু বরের যেন অনেক বিদ্যে হয়। আমার ছেলে-মেয়েদের তো সেই পড়াবে তাই তার শিক্ষাটা খুব জরুরি। মেয়েরা সবাই হি হি করে হেসে উঠেছিলো। দিদিমনির ছেলের বোকা বোকা মুখ দেখে মেয়েগুলোর হাসি থামতেই চায় না। কি কুক্ষণে যে মায়ের সাথে মায়ের স্কুলে পুজো দেখতে এসেছিল সেটা ভেবেই নিজের মাথায় চাটি মারতে ইচ্ছে করছিল। জুঁইয়ের শিক্ষায় শিক্ষিত দুটো মেয়ে বললো, হ্যাঁরে জুঁই মালিনী ম্যামের ছেলেই বুঝি তোর…
মিচকি হেসে জুঁই বলেছিল, তোরা যে কি করে সব বুঝে ফেলিস! সৌম্য এত পড়ে বলেই তো আমি আর পড়ি না। বাবা-মা দুজনে শিক্ষিত হয়ে কি হবে বল! যে কোনো একজন ছেলে-মেয়েদের পড়ালেই চলবে। কান দুটো লাল হয়ে গিয়েছিলো সৌম্যর। ছুটতে ছুটতে টিচার রুমে এসে মাকে বলেছিল, আমি এখুনি বাড়ি যাবো।

মা ছাড়াও অন্যান্য শিক্ষিকারাও জিজ্ঞেস করেছিলো, কেউ কি কিছু বলেছে সৌম্য? মেয়েরা কি খারাপ ব্যবহার করেছে তোমার সাথে?
জুঁই নামটা ঠোঁটের ডগা থেকে গলার মধ্যে দিয়ে গিলে নিয়ে বলেছিলো, মা আমি নিজের কলেজে যেতে চাই। সব ফ্রেন্ডসরা ওখানে আছে। মা একটু রাগী চোখে তাকিয়ে বলেছিল, সন্ধ্যের আগেই বাড়ি ফিরে এসো।
কোনো মেয়ে যে এভাবে ইনসাল্ট করতে পারে সেটা ধারণাই ছিল না সৌম্যর।

ওই ঘটনার পর থেকেই জুঁইকে দেখলেই সৌম্য একটু এড়িয়েই চলে। তবে খবর সবই কানে আসে। উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টের দিন মা যখন নিজের স্কুলের রেজাল্ট বলছিল, তখন ও
আলটপকা জিজ্ঞাসা করেই ফেলেছিলো, জুঁই পাস করেছে মা?
মা মিনিট দুয়েক তাকিয়ে থেকে গম্ভীর ভাবে বলেছিলো, হ্যাঁ আমাদের বিনোদিনী স্কুলের বদনাম ওই মেয়ে। কোনোমতে থার্ড ডিভিশনে পাশ করে আনন্দে সবাইকে চকলেট খাওয়াচ্ছিলো। দেখো আমার ব্যাগেও একটা চকলেট আছে। লজ্জা বলে এতটুকু কিছু নেই ওই মেয়ের। খারাপ লাগে বিতান বাবুর মত জ্ঞানী মানুষটার মুখ দেখে। মানুষটা লজ্জায় এতটুকু হয়ে গেছেন। ওসব কথা আর কানে ঢুকছিলো না সৌম্যর। ভিতরে ভিতরে খুব আনন্দ হচ্ছিলো ওর। যাক, আজ আর কদমতলার মাঠে কেউ বলতে পারবে না বিতান বাবুর মেয়েটা ফেল করেছে জানিস। সকাল থেকেই বেশ টেনশনে ছিল সৌম্য। চুপি চুপি মায়ের ব্যাগ থেকে চকলেটটা বের করে মুখে ঢুকিয়ে হেসে ছিল ও। যেন খুব কাছের কারোর সাকসেসের আনন্দ পেয়েছিল। যদিও সৌম্যর এমন হবার কারণটা তখনো ওর অজানাই রয়ে গিয়েছিলো। আসলে জুঁইয়ের নাম শুনলেই সবাই  নাক কুঁচকে বলতে শুরু করে, ওই মেয়ের মত নির্লজ্জ নাকি একটাও নেই এ চত্বরে, কাজ নেই কর্ম নেই চব্বিশ ঘন্টা টংটং করে ঘুরেই চলেছে, তাই জুঁইকে নিয়ে কারোর সাথেই কথা বলতে পারে না সৌম্য। এমনিতেই ওই ঠোঁট কাটা মেয়ের জন্য সৌম্যর কোনো বন্ধুরা ওকে সহ্য করতে পারে না। কদিন আগেই অয়নকে দেখে জুঁই নাকি বলেছে, আরে বিদ্যাসাগরের সেকেন্ড এডিশনের আর একজন কোথায়? অয়ন বলতে গিয়েছিলো, তুমি লেখাপড়ার ধারে কাছে যাও না বলে কি কেউ করবে না? জুঁই সঙ্গে সঙ্গে বলেছে, তোমার বন্ধু সব পড়ে নিচ্ছে বলেই আমি আর চাপ নিচ্ছি না। অয়ন এসে বলেছিলো, বুঝলি সৌম্য জুঁইয়ের মতিগতি কিন্তু ভালো নয় রে, তোর ওপর চাপ আছে।

সৌম্য লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলেছিলো, ধুর তোদের ভুল ধারণা। চাপ থাকলে কেউ সকলের সামনে অমন অপমান করতে পারে?
রিতেশ গম্ভীর চালে ওর মন্তব্য ছুঁড়ে ছিলো… আরে তুই পাত্তা দিস না বলেই বিরক্ত হয়ে ওসব করে! তবে বস, আগে থেকে বলেই দিচ্ছি, তোর মা কিন্তু ওই গান্ডু মেয়েকে কিছুতেই নিজের বৌমা বলে মানবে না। গবেট মেয়ে হবে কিনা আমাদের ব্রিলিয়ান্ট ইঞ্জিনিয়ার সৌম্য ব্যানার্জির বউ? তাছাড়া তোর মায়ের কথাটাও ভেবে দেখিস, মালিনী ম্যাম কি করে তার স্কুলের সব থেকে অগামার্কা মেয়েকে মেনে নেবেন বলতো!
রিতেশের কথা শুনে ভিতরে ভিতরে কেমন একটা রাগ হচ্ছিলো সৌম্যর। আচমকা বলে বসেছিলো, জুঁই গবেট তো তোর কি? অকারণ ওর নামে এসব বাজে কথা বলছিস কেন রে? জুঁই তোর কোনো ক্ষতি করেছে কি?
সৌম্যর এই হঠাৎ রাগ দেখেই রিতেশ মিচকি হেসে বলেছিলো, তুমি গুরু শেষ, বেশি করে পড়াশোনা করো, ছেলে মেয়েদের তোমাকেই পড়াতে হবে কিনা!

সৌম্য পালিয়ে বেঁচে ছিলো সেদিন।
আর মাত্র এক সপ্তাহই বাকি আছে সৌম্যর ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষার।
দিনরাত এক করে খেটে চলেছে ও। এটা ওর কাছে একটা চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া এই রেজাল্টের ওপর ওর ভবিষ্যৎ ও নির্ভর করছে। সেদিনও সন্ধ্যেবেলা একটা এরোপ্লেন চিঠি উড়ে এসে পড়লো ওর গায়ে। দূরে যথারীতি জুঁই দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আজ আর হাসি নেই মুখে, বরং একটু যেন বিষণ্ণ।
চিঠিটা খুলতেই দেখলো, প্রথমেই লিখেছে …সামনেই তোমার এক্সাম, আমি জানি তুমি দারুন পরীক্ষা দেবে। আমি জানি তুমি সাকসেসফুল হবেই। আর বোধহয় বেশি দিন তোমার ওপরে অত্যাচার করবো না।
চিঠি থেকে চোখ তুলে দেখলো, জুঁই আর নেই। রাস্তাটা ফাঁকা।

মনে মনে একটু হাসলো সৌম্য। যাক মেয়েটা অবশেষে শান্ত হয়েছে। পরিষ্কার লিখেছে, সে নাকি আর সৌম্যকে অত্যাচার করবে না। হয়তো লেখা পড়ায় মন বসেছে জুঁইয়ের। নিজের জগতে ডুবে ছিল সৌম্য বেশ কয়েক সপ্তাহ।
আপাতত কিছুটা নিশ্চিন্ত। এক্সাম শেষ। এখন জবের জন্য অপেক্ষা।
ওদের বন্ধুদের সন্ধ্যের আড্ডাটা আবার বেশ জমে উঠেছে ফুটবল খেলার মাঠে।
সেদিনও ঝালমুড়ি খেতে খেতে কথা হচ্ছিলো, ওরা নিশ্চয়ই ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানিতে জব পাবে, একে অপরের থেকে দূরে চলে যাবে। রিতেশ হয়তো ব্যাঙ্গালোর চলে গেল… কারণ রিতেশ ক্যাম্পাসিংএ ব্যাঙ্গালোরের একটা কোম্পানির কাছ থেকে অফার পেয়েছিল।
ইস, এই আড্ডাটা মিস করবে।

সৌম্য ঘনঘন জুঁইদের বাড়ির রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিল। এই সময় তো মেয়েটা স্কুটি চালিয়ে কোনো একটা টিউশন থেকে ফেরে। বন্ধুরা বলে টিউশন বলিস না ,বল গপ্পো করে ফেরে জুঁই।
সৌম্যর অবাধ্য চোখ দুটো বন্ধুদের উপস্থিতিকে অগ্রাহ্য করেই বারবার চলে যাচ্ছিল জুঁই এর বাড়ি ফেরার রাস্তার দিকে। সেই পরীক্ষা শেষ হবার পর থেকে মেয়েটাকেও আর দেখেনি সৌম্য। তাছাড়া ওর ওই দুষ্টুমিভরা চিঠি গুলোও মিস করছিলো ও।
মেয়েটা বড্ড ঠোঁট কাটা, ক্যাটক্যাট করে শুনিয়ে দেয় ঠিকই তবে ওর বড় বড় চোখ দুটোতে যে সারল্য খেলা করে সেটাই ওকে আকর্ষণীয়া করে তুলেছে সৌম্যর কাছে। অয়ন বললো, ওদিকে তাকিয়ে আর চাপ নিওনা বস, জুঁইকে বোধহয় দেখতে এসেছিলো। বিতান স্যার বিধান দিয়েছে, ও যদি পার্ট ওয়ানে পাশ না করতে পারে, তাহলে মানে মানে শাঁখা সিঁদুর পরিয়ে শ্বশুরবাড়ি বিদেয় করবে! রিতেশ সঙ্গে সঙ্গে ফোরন কাটলো, আহারে কার কপাল যে পুড়বে তা স্বয়ং ঈশ্বরই জানেন।

যা বাবা! জুঁইয়ের বয়েস কত! মাত্র উনিশ …এই বয়েসে কেউ বিয়ে দেয়? স্যারের মতন শিক্ষিত মানুষ এটা কি করে করতে পারেন?
আরে কেতকি আন্টি বলছিলেন,  ওই মেয়েকে বিদেয় না করলে নাকি বিতান স্যার ওর চিন্তায় চিন্তায় হার্টের রোগ বাঁধিয়ে ফেলবেন।
তাই আরেকবার ফেল দেখবার আগেই মানে মানে কারোর ঘাড়ে চাপিয়ে দেবেন আরকি!
সৌম্য বললো, আরেকবার ফেল মানে টা কি! জুঁই কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো ক্লাসে ফেল করেনি। পাশটুকু অন্তত করেছে…
অয়ন হেসে বললো, সৌম্য ওই ভাবে পাশ করাকে পাশ বলে না, বোর্ডের দয়া বলে রে।

বাড়ি ফিরে মনমরা হয়ে বসে ছিল সৌম্য। মেয়েটা যতই দস্যি হোক তাই বলে এত কম বয়সে বিয়ে হয়ে যাবে ভেবেই কেমন একটা কষ্ট হচ্ছিলো। তাছাড়া আজ অবধি কেউ যেটা জানে না, সেটা হলো জুঁইয়ের ওই গুন্ডামিগুলোও বড্ড ভালো লাগে সৌম্যর। কালী পুজোর রাতে যখন চকলেট বোমের আওয়াজে কলোনি চমকে ওঠে, তখনও পথ চলতি লোক বলে ওঠে, উফ! মাস্টার মশাইয়ের মেয়েটা যে কি ডাকাত।
জুঁইয়ের ওই দিনরাত ছেলেদের মত পোশাক পরে সবেতে নাক গলানোর স্বভাবটাই যেন বেশি টানে ওকে। সেই মেয়েটাকে এত তাড়াতাড়ি শাড়ি পরে, লোকের ঘরে রান্না করতে দেখলে সত্যিই কষ্ট হবে সৌম্যর। রাতে ছটফট করতে করতেই ঘুমটা ভেঙে যাচ্ছিলো সৌম্যর। যদিও আজ ওর ঘুমটা খুব দরকার। কারণ আগামী কাল ওর একটা ইম্পর্টেন্ট ইন্টারভিউ আছে, সকাল দশটায় মধ্যেই পৌঁছাতে হবে ওকে। ভোর রাতে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল সৌম্য। স্বপ্নের মধ্যে জুঁই এলো লাল ঢাকাই শাড়ি পরে, একটু দূর থেকে হাত নেড়ে বললো, চললাম সৌম্য…. আর তোমাকে জ্বালাবো না।
ধড়ফড় করে উঠেই দেখলো, মা মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। ইশারায় বললো, ঘড়ি দেখ।

তাই তো আটটা বেজে গেছে। মা রেডি হচ্ছিলো স্কুলে যাবার জন্য, বাবা সকাল সকাল বেস্ট অফ লাক জানালো ফোনে। মা নিজের রেডি হওয়ার ফাঁকে ফাঁকেই সৌম্যর ব্রেকফাস্ট রেডি করতে করতে বললো, তুই বরং আজ গাড়িতে করে চলে যা, আমি না হয় শ্যামল কাকুকে বলে দিচ্ছি। শ্যামল কাকু বহুদিনের পরিচিত ড্রাইভার।
কিন্তু শ্যামল কাকুকে ফোন করেও পাওয়া গেলো না। সৌম্য বললো, জাস্ট রিল্যাক্স মা, আমি ট্যাক্সি ধরে নেবো মোড়ের মাথা থেকে।

রাস্তায় বেরোতেই বিপদের গন্ধ এসে নাকে লাগলো।
কোনো এক ট্যাক্সি চালকের গায়ে হাত দিয়েছিল প্যাসেঞ্জার, তাই রাস্তা অবরোধ করে রেখেছে সমস্ত ট্যাক্সি চালকরা। নিত্য যাত্রীদের চূড়ান্ত হয়রান অবস্থা। কিন্তু সৌম্যর হাতে মাত্র ঘন্টা খানেক সময়, তার মধ্যে ওই অফিসে পৌঁছাতে না পারলে আজকের ইন্টারভিউটা মিস হয়ে যাবে। পিছনে বাসের লম্বা লাইন, অটো চালকরা বসে তাস খেলছিলো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে আজ কোথাও নড়বার ইচ্ছে নেই তাদের।
মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক অসহায়ের মত তাকাচ্ছিল সৌম্য। ঠিক সেই সময় কেউ কানের কাছে এসে বললো, এসো, কোথায় যাবে চলো পৌঁছে দিই।

ডেনিম জিন্সের ওপরে ক্রীম কালারের টপ, পায়ে স্নিকার, চোখে সানগ্লাস ….
প্রথমে একটু হকচকিয়ে গিয়েছিল সৌম্য। তারপর বুঝলো, মেয়েটা আর কেউ নয়, বিখ্যাত জুঁই বসু।
সৌম্য বললো, রাস্তায় জ্যাম দেখছো না? এরমধ্যে স্কুটিও চলবে না। জুঁই ফিচেল হেসে বললো, চিন্তা নেই । মালিনী ম্যামের গুড বয়কে আমি কিডন্যাপ করে নিয়ে যাবো না। উফ, এই মেয়েটা কি কোনো কথাই সোজা করে বলতে পারে না?
জুঁই কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো, দেখো গুরু তোমার সামনে যখন সব রাস্তা বন্ধ, তুমি যখন ফিরে যাবে ভাবছো তখন যদি একটা কচ্ছপও তোমাকে দ্রুত পৌঁছে দেবে বলে, তাহলে তোমাকে হেল্প নিতেই হবে।

সৌম্য বললো, জ্ঞানের ঘর তো রীতিমত টনটনে। আর কথা না বাড়িয়ে নিজেকে ওই বিচ্চুর স্কুটিতে সমর্পণ করলো সৌম্য। মেয়েটা লোকের বাড়ির গলি দিয়ে, কারোর বাগানের গেট খুলিয়ে, কোনোভাবে পেরোলো এলাকার জ্যামটা। তারপর তো সৌম্য বুঝতেই পারছিল না ও রয়াল এনফিল্ডে বসে আছে নাকি টমটমি স্কুটিতে। কারণ এই মুহূর্তে জুঁই যে স্পিডে আশেপাশের গাছপালাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে, এই স্পিড স্কুটিতে ওঠে বলে সৌম্যর জানা ছিল না। পাক্কা পনেরো মিনিট আগেই সৌম্যকে ইন্টারভিউ অফিসের সামনে নামিয়ে দিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছলো জুঁই।
সৌম্য থ্যাংকস জানিয়ে ছুটছিলো লিফটের দিকে।

পিছন থেকে ওর হাতটা ধরে টানলো জুঁই।
হাতে একটা ছোট্ট চিরুনি নিয়ে বললো, চুলটা ঠিক করে দিই প্লিজ। এমন এলোমেলো চুলে কেউ ইন্টারভিউ দিতে যায়!
সত্যিই বড্ড ঘেঁটে গিয়েছিলো সৌম্যর চুলগুলো, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির আয়নায় দেখতে পেলো ও।
জুঁই আলতো করে ছোঁয়ালো চিরুনিটা। সৌম্যর গোটা শরীরটা সেকেন্ডের জন্য অবশ লাগছিলো যেন। অদ্ভুত একটা ভালোলাগায় ভরে যাচ্ছিলো মন। এমন উড়ণচন্ডী মেয়েও এত কেয়ারিং হতে পারে!! চুল ঠিক করতে করতেই সৌম্য বললো, আজ বিকেলে একটু দেখা করা সম্ভব তোমার সাথে?
ঘাড় নেড়ে জুঁই বললো, কোথায় জানিও, চলে যাবো।

কোনোমতে জুঁইয়ের ফোন নম্বরটা নিয়েই ছুটলো সৌম্য। পিছন থেকে তখনও জুঁইয়ের বেস্ট অফ লাক ভেসে আসছিলো।
পকেট থেকে ফোন বের করতেই দেখলো অন্তত গোটা কুড়ি মিসকল হয়ে গেছে মায়ের। মাকে একটা কল করে জানিয়ে দিলো, ও সেন্টারে পৌঁছেছে। পরে কল করে সব বলবে।
ইন্টারভিউয়ের রেজাল্ট বেরোনোর আগেই সৌম্য বুঝতে পারছিল, জবটা ওর হবে।
সেন্টার থেকে বেরিয়েই ফার্স্ট ফোনটা করলো জুঁইকে। বার দুয়েক বাজার পরে বিরক্ত গলায় বলল, হ্যালো…
সৌম্যর গলা পেয়েই উচ্ছসিত হয়ে বলল, বলো কেমন হলো! অবশ্য আমি জানতাম তুমি পারবেই। স্বয়ং বিদ্যাসাগর মারা গিয়ে বলে তুমি জন্মেছো…জুঁইয়ের কথার ঝাঁপি বন্ধ হবে বলে মনে হলো না সৌম্যর। তাই একটু চেঁচিয়েই বললো, ভালো হয়েছে, বিকেলে মায়াকানন পার্কের সামনে থেকো।

জুঁই ওকে স্কুটি করে পৌঁছে দিয়েছে শুনেই মায়ের মুখের শিরাগুলো কঠিন হলো। সেটা লক্ষ্য করেও সৌম্য বললো, আজ জুঁই না থাকলে যে কি হতো! মা একটু বিরক্ত হয়েই বললো, ওকে একটা থ্যাংকস জানিয়ে দিও।
সৌম্যর তখন দৃষ্টিপথে একটাই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি চলছে, ওর হাত টেনে ধরে চিরুনি নিয়ে জুঁই বলছে, চুলটা ঠিক করে দিই প্লিজ।
যা খামখেয়ালি মেয়ে, বিকেলে আসবে তো…
ভেবে ভেবেই বাকি সময়টা কাটিয়ে দিলো সৌম্য। সাড়ে পাঁচটার একটু আগেই পার্কের সামনে পৌঁছে গেল ও।
চারিদিকে খুঁজেও পার্পেল স্কুটির দর্শন পেলো না। প্রতিটা মুহূর্তকে এক একটা ঘন্টা মনে হচ্ছিলো ওর।
মিনিট পনেরো অপেক্ষার পর মহারানীর দেখা পাওয়া গেলো। এসেই বললো, আমি কি দেরি করে ফেললাম?
সৌম্য বললো, না আমিই আগে এসেছি।

সব থেকে বিরল দৃশ্যের দর্শক হলো আজ সৌম্য। জুঁইও লজ্জা পেল। চোখ দুটো নামিয়ে নিয়ে বললো, বলো কি বলবে?
আশে পাশের লোকের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে সৌম্য বললো, হঠাৎ বিতান স্যার তোমার বিয়ে দিতে চাইছেন কেন? মানে এত কম বয়সে…
কথা শেষ হবার আগেই একরাশ অভিমান ঝরা গলায় জুঁই বললো, ফেলুরাম মেয়ে, তাই বাবার প্রেস্টিজ ডাউন হয় বুঝলে ? আমি যদি পার্ট ওয়ানে পাশ করি তাহলে আমাকে আরও দুটো বছর গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হবে, নাহলে এ বছরই সানাই বাজবে বাড়িতে। বলার সময় চোখদুটো একটু ছলছল করে উঠলো জুঁইয়ের। বললো, বাবার যখন ইচ্ছে আমাকে পর করেই দেবে তখন তাই করুক।
সৌম্য দ্রুতগামী গাড়িগুলোর দিকে চোখ রেখে বললো, কিন্ত তুমি পাশ করলে আমরা আরও দুটো বছর সময় বেশি পাবো। আমারও এস্টাব্লিশ হবার জন্য দু বছর এখনো চাই জুঁই।

জুঁইয়ের মুখে এখন ডুব সূর্যের লালচে আভা।
সৌম্য রিপিট করলো কথাটা, আমাকে আরও দুটো বছর তুমি দেবে না জুঁই?
কিন্তু মালিনী ম্যাম কি…
মাকে রাজি করানোর দায়িত্বটা আমার ওপরে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করো। দুটো বছর পরে যদি তোমার বাড়ির সানাইটা বাজে, আর বর বেশে যদি আমাকে দেখো তাহলে কি তোমার খুব অসুবিধা হবে জুঁই?
বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে জুঁই বললো, তোমাকে দুটো বছর আমি দিলাম।

রাতে খাওয়ার টেবিলেই মায়ের সম্মুখীন হলো সৌম্য। খুব সাবধানে বললো, মা আমি জুঁইকে ভালোবাসি। আকাশ থেকে পড়লেও বোধহয় এতটা চমকে উঠতো না মালিনী দেবী। তার বিট্টু , তারই ছায়ায় বড় হওয়া বিট্টু কিনা তারই চোখের দিকে তাকিয়ে ওই বখে যাওয়া মেয়েটাকে ভালোবাসার কথা জানাচ্ছে! এর থেকে আশ্চর্যের আর কি বা হতে পারে!
তবুও চমকের ধাক্কাটা সামলে নিয়ে মালিনী দেবী বললেন, লজ্জা করবে না, নিজের স্ত্রী গ্রাজুয়েট নয় এটা লোককে বলতে পারবে? তুমি জানো না বিতান বাবু সব আশা জলাঞ্জলি দিয়ে ওই মেয়ের জন্য ছেলে দেখছেন, ও মেয়ে কলেজের গন্ডি পেরোতে পারবে না বলেই আমারও বিশ্বাস।
সৌম্য দৃঢ় স্বরে বললো, আসলে কি জানো মা, তোমরা  শিক্ষক শিক্ষিকারা ভালো ছেলে-মেয়েদেরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে অভ্যস্ত। তারা তোমাদের স্কুলের নাম উজ্জ্বল করবে এই আশায় তাদের জন্যই তোমরা সব টুকু এনার্জি খরচ করো, আর মিডিওকারদের তোমরা ‘তোর দ্বারা কিছু হবে না’ বলে বলে তাকে আরও পিছিয়ে দাও। বিতান বাবুও তাই করেছেন বাবা হিসাবে, আর তুমিও একই ট্রিটমেন্ট করেছো শিক্ষিকা হিসাবে। তাই জুঁইয়ের মনে বদ্ধপরিকর ধারণা জন্মে গেছে ও পারবে না। একবার যদি মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে, তুই নিশ্চয়ই পারবি, দেখতে ও স্টার না পেলেও ফাস্ট ডিভিশন ঠিক পেতো।

মাকে চমকে দিয়েই সেদিন ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল সৌম্য। ছেলের বলে যাওয়া কথার অনুরণন চলছিল মালিনী দেবীর মনে। বিট্টু কি ঠিকই বলছে…সত্যিই তো জুঁইকে ক্লাসে দাঁড় করিয়ে সকলের সামনে অপমান ছাড়া তো আর কিছু করেননি কোনোদিন। জুঁই পড়া পারেনি বলে বকেছেন, কিন্তু কি করে পারবে তার উপায় তো কখনো খোঁজেন নি।  এবার বোধহয় মিডিওকার ছাত্র ছাত্রীদের জন্য আরেকটু ভাবা উচিত মালিনী দেবীর। মাঝে মাঝে ছোটরাও না বুঝেই দারুণ সত্যিগুলো তুলে ধরে। ছেলের কাছেও আজ নতুন করে শিখলেন উনি।

সৌম্য রোজ জুঁইকে ফোন করেই জিজ্ঞেস করে, মনে রেখো তোমার পরীক্ষা আর মাত্র একমাস। আর মাত্র পনেরো দিন…মাত্র সাতদিন…
দিনরাত টং টং করে ঘুরে বেড়ানো মেয়েটা এখন চুপচাপ বই এর পাতায় নিজের ভালোবাসাকে খুঁজে পেয়েছে। কালো কালো অক্ষরগুলো ওকে হাতছানি দিয়ে বলছে, জুঁই পাশ করতে পারলেই তোকে সবাই ভালো বলবে…সৌম্যর স্বপ্ন পূরণ হবে। সৌম্যকে বন্ধুরা আর বলবে না, জুঁইয়ের দিকে তাকাস না।
কলেজের রেজাল্ট আউটের দিন সৌম্যও জুঁইয়ের কলেজের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটা শুধু জুঁইয়ের চ্যালেঞ্জ নয়, এটা ওদের যৌথ লড়াই। একে একে জুঁইয়ের সব বন্ধুরা বেরিয়ে আসছে। জুঁইয়ের দেখা নেই, টেনশনে হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিলো সৌম্যর।
জুঁই তো বলেছিল, পরীক্ষা ভালোই দিয়েছে ও। অয়ন শুনে বলেছিল, ওরে সৌম্য ও মেয়ে তিনটে প্রশ্নের উত্তর লিখলেই ভাববে দারুণ পরীক্ষা দিয়েছি।
ভয়ে ভয়ে কলেজের গেটের দিকে তাকাচ্ছিল সৌম্য।

জুঁইয়ের মাথা নীচু করে হাঁটার ভঙ্গিমা আর চোখে জল দেখেই যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে সৌম্যর।
হেরে গেল সৌম্য। মায়ের সামনে, বিতান স্যারের সামনে চূড়ান্ত পরাজয় হলো ওর।
কানের কাছে এসে জুঁই বললো, নাও তোমাকে দিলাম আরও চারটে বছর!!
সৌম্য প্রায় চিৎকার করে উঠলো, পাশ করেছো জুঁই?
ঘাড়টা ধীরে ধীরে নাড়িয়ে জুঁই বললো, পাশ নয়, ভালো রেজাল্ট হয়েছে আমার। প্রফেসররাও বোধহয় চমকে গেছেন। তাই ওনাদের সাথে কথা বলতে গিয়েই একটু দেরি হলো।

সৌম্য বললো, চলো জুঁই …তোমার হবু শাশুড়িমাকে প্রনাম করে আসবে। জুঁই ঘাড় নেড়ে বললো, এখন না দুবছর পরে কলেজের গন্ডি পেরিয়ে তারপর যাবো।
সৌম্য বললো, দু বছর চেয়েছিলাম চার বছর কেন দিলে বুঝতে পারলাম না।
জুঁই আলতো হেসে বললো, ভাবছি গ্রাজুয়েশনের পর মাস্টার্সটাও করে নেবো। তাহলে আর কেউ বলতে পারবে না, সৌম্য ব্যানার্জি একটা অশিক্ষিত মেয়েকে বিয়ে করেছে।
সৌম্য হাসতে হাসতে বললো, দেখেছো জুঁই শুধু আমি নয় তুমিও পারো, তুমিও পারবে।
দূর থেকেই গানটা ভেসে এলো ওদের দুজনের কানেই…..আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে …
দেখতে আমি পাইনি, তোমায় দেখতে আমি পাইনি…

(সমাপ্ত)


FavoriteLoading Add to library
Up next
খতরনাক খেল – সৌম্যদীপ সৎপতি... খেলার কথা শুনবি যদি, বলছি যা দে মন তাতে, দেখেছিলুম খেল একখান হ্যালোইনের সন্ধ্যাতে। সেদিন রাতে ভূতুম পাড়ার "মামদো ইলেভেন্স" দলে "স্কন্ধকাটা ক্লাব"কে...
রক্তাত্ব – সৌভিক মল্লিক... একটা লম্বা ঘর এই পৃথিবী, ছাদের গায়ে ভালোবেসে আঁকড়ে ধরে আছে ফাটল। ফাটলে চুইয়ে চুইয়ে রাস্তা বানিয়ে নেয় রক্ত, সেই রক্তে সভ্যতা আর গণতন্ত্রের বাদল। ...
রিইউনিয়ন - প্রদীপ্ত দে  কিছু কিছু ঘটনা সব মানুষের জীবনেই মনে হয় ঘটে যাতে তাঁর স্বাভাবিক ছন্দে চলা জীবনটার তাল কেটে যায় । আমি তখন কর্মসূত্রে মুর্শিদাবাদে থাকি...
Vinci Da Movie Review ভিঞ্চিদা পরিচালক - সৃজিৎ মুখোপাধ্যায়       সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় যে থ্রিলার ছবি তৈরী করতে সিদ্ধহস্ত তা তিনি আবার প্রমাণ করলেন `ভিঞ্চিদা' বানিয়ে। এর আগে...
মুখরোচক এগডাল বানানোর সহজ কৌশল – মালা নাথ...     সুকুমারবাবুর অমর সৃষ্টি 'অবাক জলপান' নামক নাটকের বেশ কয়েকটি সংলাপে স্রষ্টা তাঁর আপন অন্তরের সমগ্র মাধুরীকে একত্রিত করে এবং তাঁর ট্রেডমার্ক ব...
বলিউডে ফের নরেন্দ্র মোদীর স্বচ্ছ ভারত অভিযান... - সায়নী দাস বলিউডে ফের নরেন্দ্র মোদীর স্বচ্ছ ভারত অভিযান। এই অভিযানকে সমাজের প্রত্যেকটি স্তরে পৌছে দিতে বলিউডে ফের আসতে চলেছে নতুন এক সিনেমা। অক্ষয় ...
হ্মুধাগ্নি – প্রীতম সাহা... সেবারের মনমাতানো শারদোৎসবে, নয় বছরের ছেলেটা বোঝেনি কিছু-- বোঝাইনি কেউ তাকে, হাঁ করে সে গিলেছে শুধু মণ্ডপাবৃত,বারাঙ্গনার জীবন চিত্রায়ন। তখন,সত্য আ...
স্মার্টফোনের দুনিয়া কাঁপাতে আসছে Xiaomi A2... - অভিষেক চৌধুরী   বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মোবাইল দুনিয়ায় বিপ্লব ঘটাতে আসতে চলেছে xiaomi A2। ভারতের বাজারে Xiaomi- র জনপ্রিয়তা নিয়ে নতুন কর...
মোহ – বিভূতি ভূষণ বিশ্বাস...  আমরা দুই বাঙ্গালী বন্ধু আমেদাবাদ ষ্টেশন দিয়ে ঘুরে ঘুরে প্লাটফর্ম ও ট্রেনের লোকজন দেখে বেড়াচ্ছি । আমাদের বয়স কত আর হবে এই উনিশ কুড়ি, সালটা ছিল ১৯৯১ । ...
বাজারে বিপত্তি -গার্গী লাহিড়ী রবিবারের সকাল বেলা চায়ের কাপ নিয়ে সবেমাত্র আয়েশ করে বসেছি । ভাবছি মুখপুস্তিকায় চোখ রাখবো নাকি খবরের কাগজে ? এমন সময় বিনা মেঘে বজ্রপা...
Admin navoratna

Author: Admin navoratna

Happy to write

Comments

Please Login to comment