অবিশ্বাস্য সেই রাত – শাশ্বতী সেনগুপ্ত

বাসে বসে বসেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেল। অমিত ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে ‘আর কতদূর’ জিজ্ঞাসা করতেই ড্রাইভার উত্তর দিল, ‘অর থোড়াসা’। অফিসের কাজ নিয়ে এই পাহাড়ি এলাকায় এসেছে অমিত। কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী সে। একটা অডিটের কাজে দু’তিনদিনের জন্য আসতে হয়েছে। সরকারি বাসে উঠেছে যাতে অন্তত ঠিকঠাক পৌঁছায়।
অবশেষে মালিগড়িতে (পাহাড়ি জায়গার নাম)  যখন নামল তখন সন্ধ্যে গড়িয়ে গেছে। ড্রাইভারই পোস্ট অফিসের সামনে একটা হোটেলের হদিশ দিল। অন্ধকার রাস্তাঘাট, ঠাণ্ডাও নেহাত কম নয়। কোনো নদী বা ঝর্ণার শব্দ কানে এল তার। কিন্তু অন্ধকারে কিছুই বোঝার উপায় নেই। যাইহোক পোস্ট অফিসের পাশে সেই হোটেল খুঁজতে বেশি বেগ পেতে হল না অমিতকে। চার-পাঁচটা অল্প বয়সী ছেলে রিসেপশনে বসে গল্প গুজব করছিল। অমিত ঢুকে ঘরের কথা বলতেই তারা রাজি হয়ে গেল।

রাতে ডিনার মিলবে কিনা জানতে চাওয়ায়, হিন্দিতে একটা ছেলে বলল, ওদের কুক নেই। তবে অমিতের অসুবিধা হবে না। ওদের মধ্যে একটি ছেলে রুটি তরকা বানিয়েছে, অমিত ইচ্ছা করলে খেতে পারেন। দাম কত জানতে চাওয়ায় ছেলেটি বলল, পয়সা লাগবে না। অমিত ঘরে গিয়ে ফ্রেস হয়ে একটু বিশ্রাম নিতে নিতে চোখ লেগে গেল। হঠাৎ দরজায় টোকা। ভিতর থেকেই অমিত সাড়া দিতে, ওপাশ থেকে একজন বলে উঠলো, ‘স্যর আসুন, ডিনার রেডি।’
অমিত বিলম্ব না করেই স্লিপারটা পায়ে দিয়ে নেমে এল নিচে। রিসেপশনের পাশেই ডাইনিং হল। ছেলেরা ওর জন্যই অপেক্ষা করছিল। অমিতকে দেখে একটি ছেলে হিন্দিতে বলল, ‘দাদা, আসুন। এখানে বসুন।’ ওদের আন্তরিকতা অমিতের খুব ভালো লাগলো। ওরা খেতে খেতে নানা রকম আলোচনা করছে। অমিত যতটুকু বুঝল ওরা কোথাও যাবার কথা বলছে। হঠাৎ অমিতের কানে এল অদ্ভুৎ একটা কথা। অমিত মুখ তুলে ওদের দিকে তাকাল। একটা ছেলে বলল, ‘হ্যাঁ দাদা, এটা সত্যি। আমার বাবা-কাকা দেখেছে। বানানো গল্প নয়।  আর সেটা দেখতেই আমরা পরশু যাচ্ছি।’ অমিত একটু মুচকি হেসে বলল, ‘কিছু মনে করো না ভাই, এই সব রুপকথায় শোনা যায়। বাস্তবে নেই গো।’ অমিতকে থামিয়ে ছেলেটি বলে উঠলো, ‘হতে পারে, পরীক্ষা করেই দেখা যাক। আমার বাবা নিজের চোখে ন’মুখিয়া তালে পরীদের দেখেছে। প্রত্যেক পূর্ণিমা রাতেই তাদের দেখা যায় ওখানে। অনেকবার যাবার চেষ্টা করেও পারিনি। এবার বন্ধুরা মিলে যাচ্ছি।’
ওদের আত্মবিশ্বাস দেখে অমিতের ভালো লাগল। বলল, ‘থাকবে কোথায়?’ ওরা বলল, ‘কেন দাদা, তাঁবু নিয়ে যাচ্ছি তো।’ ‘ওহ, গ্রেট’ বলল অমিত।
‘আপনিও ভিড়ে যান আমাদের সঙ্গে, পরী দেখা হোক বা না হোক একটা অ্যাডভেঞ্চার তো হবে।’ ওদের দলের একটা ছেলে একথা বলল। দেখছি বলে অমিত নিজের ঘরে চলে এল।

পরদিন সকালে সরাসরি অফিসে গেল। কাজ মোটামুটি সেদিনই শেষ হয়ে গেল। এদিন আবার সকাল থেকে ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে, ঠাণ্ডাও বেশ। দিনেরবেলা অফিসের ক্যান্টিনেই খেয়েছে। বিকালে যখন হোটেলে ফিরল তখন দেখল, বেগুনি ভাজা হচ্ছে, চা-ও রেডি। এই ঠাণ্ডায় ওদের সঙ্গে চা বেগুনি অমৃতের মতো লাগল অমিতের। এবার অমিত সেই প্রথম ছেলেটিকে তার নাম জিজ্ঞেস করল। ছেলেটি জানালো, তার নাম সানি। আর এটা তাদেরই হোটেল। বাকি ছেলেরা সব আশেপাশেই থাকে, ওর বন্ধু-বান্ধব। সানি আবার অমিতকে বলল, কাল সকালেই বের হচ্ছি দাদা।
অমিত রাতে ঘরে এসে অনেক চিন্তা ভাবনা করে ভাবল, গেলে মন্দ হয় না। একটু অন্যরকম একটা ট্রিপ হবে। সানিকে ঘর থেকে বেরিয়ে ডেকে জেনে নিল, ওই ন’মুখিয়া তাল কত দূর। সানি বলল, ‘এই গ্রাম থেকে ২৫ কিমি দূরে। তাই ওরা সকালে ব্রেকফার্স্ট করে সারাদিনের খাবার প্যাক করে নিয়ে যাবে। তার বন্ধুরা যাবে, ওরাই তাঁবু নেবে।’ সব শুনে অমিতের ভালো  লাগলো। পরী দেখা সত্যি যায় কিনা কে জানে! তবে ন’মুখিয়া তালের সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে এটা ঠিক। তার ওপর কাল পূর্ণিমার রাত।
ভোরবেলা উঠে জামাকাপড় প্যাক করে রেখে, অল্প গরমজামা নিয়ে ব্রেকফার্স্ট টেবিলে গেল অমিত। সবাই রেডি। সানি বলল, হেঁটে মার্কেট অব্দি যাবো। ওখানেই গাড়ি ও বাকি বন্ধুরা আছে। তাই হল। একটা টাটা সুমো এল মার্কেটে যেতেই। ওতে উঠে রওনা দিল ন’মুখিয়া তালের উদ্দেশ্যে। গাড়ি যত এগোয় প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশ দেখে অমিত অভিভূত হতে লাগল। ঝকঝক করছে আকাশ। পাহাড় গুলোয় ধূসর রঙে রঙে বড় কার দেখা দিচ্ছে। ফুরফুর করে বইছে ঠাণ্ডা বাতাস। গাড়ির সামনে ড্রাইভারের পাশে বসেছে অমিত। সবুজে ছেয়ে আছে যেন পুরানো রাস্তা। অদ্ভুৎ একটা মিঠে গন্ধ আসছে নাকে। মনে হচ্ছে বুনো কোনো ফুলের গন্ধ। গাড়িটা বাঁক নিতেই সামনে এল বিশালাকার ঝর্ণা। কি জল, অঝরে ঝরছে। মন চাইল ছবি তুলতে। কিন্তু ছেলেরা যদি হাসাহাসি করে, তাই কোনো কথা বলল না অমিত। গাড়িতে সত্তর দশকের হিন্দি হিটস্‌ চলছে।

একটানা চালিয়ে গাড়ি এসে নামলো একটা ঝকঝকে জলাধারের পাশে। সত্যি, এত সুন্দর ঝিল হয়! আবার কেউ মেনটেনও করে না। ঝকঝকে নীল জল। আসলে আকাশের প্রতিচ্ছিটাও তো পড়েছে। সারা রাস্তায় প্রচুর গাছ থাকলেও এখানে কম। গোটা ঝিলটাই এক নজরে দেখা যায়। ছেলেরা গাড়ি থেকে নেমে তাঁবুগুলো খাটিয়ে নিল। খুব হাওয়া, ঠাণ্ডা লাগছে বেশ। অমিতের মন চাইছে না তাঁবুতে ঢুকতে।
সানি বলল, সন্ধ্যের আগে দুজন লোকাল ছেলে লাঠি, হ্যাজাগ নিয়ে আসবে। এখানে নাকি মাঝে মাঝে লেপার্ডরাও জল খেতে আসে। তাই এই আত্মরক্ষার সামগ্রীগুলো আনানো। সত্যি সত্যিই সন্ধ্যের আগে দুটি ছেলে এল। এদের হাতে লাঠি, ছাতা, মোমবাতি, হ্যাজাগ সবই আছে। খাওয়া দাওয়াটা একটু তাড়াতাড়িই হল। এখানে একটাই শর্ত, নীরবতা। ক্যাম্প ফায়ার করা, হৈ চৈ করা একদম বন্ধ। রাত গভীর হলে ওই আলোটুকুও নিভে যাবে। তখন প্রতীক্ষা আর প্রতীক্ষা।
চারটে তাঁবু ফেলা হয়েছে। মাঝের একটা তাঁবুতে অমিত ঢুকে একটু গড়টাগড়ি দিচ্ছে। বাইরে কেউই নেই। সবাই তাঁবুতে। ওদিকে সানির অন্য দুই বন্ধু রাজ আর প্রিয়ম বসে আছে। রাজ মোবাইলে গান শুনছে। প্রিয়ম শুয়ে রয়েছে। লোকাল ছেলে দুটোর মধ্যে একজন এসে রাজকে বলল, মোবাইলের আলো নিভিয়ে দিতে।

খুব হাওয়া, তাঁবু যেন উড়ে যাওয়ার জোগাড়। রাত হয়েছে যথেষ্ট। অমিত ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ কে যেন জোরে ঝাঁকিয়ে দিল। সম্বিত ফিরে তাকিয়ে দেখে সানি। চুপ করে বেরিয়ে আসতে ঈশারা করে সে অমিতকে। অমিত ওদের পিছন পিছন বেরিয়ে দেখে সবাই ঝিল পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঝিলের ঠিক ওপারে কাদের যেন হাসির আওয়াজ। লোম খাঁড়া হয়ে ওঠে অমিতের। চোখ ঘষে, চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখছে, গোটা ছয়েক মহিলা ওপাশে জলকেলি করছে। তাদের গায়ের রঙ দুধের মতো সাদা। বিরাট চুল। গয়নাগাটিতে সজ্জিত সারা অঙ্গ। ওরা খুব হাসছে, একজন আরেকজনকে জলে ঠেলে ফেলে দিচ্ছে। চক্ষুস্থির সকলের। হঠাৎ ওই পাহাড়ি লোকাল ছেলে দুটো ওদের সামনে ছাতা দুটো মেলে ধরল। ফিসফিস করে হিন্দিতে বলল, ‘এপাশ থেকে উঁকি মেরে দেখুন’। ওরা যদি আপনাদের দেখতে পায় কেলেঙ্কারি হবে।
সবাই যেন নিথর হয়ে গেছে। চারিদিকের আকাশ বাতাস একদম মুখরিত হয়ে উঠেছে। সানি অমিতের হাতটা চেপে ধরে আছে। অমিত বুঝতে পারছে তার পা পাথর হয়ে গেছে। চোখের পলক পড়ছে না। মন বলছে, সত্যি দেখছে সে! এরাই তাহলে পরী? রূপকথায় যাদের পড়েছে, তারা আজ সামনে। কিন্তু সত্যি পরীদের ক্ষমতা আছে মানুষকে নীরব করে দেওয়ার। রূপ সৌন্দর্য ছাড়াও এদের মুগ্ধতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ আজ এরাই।
হঠাৎ সব অন্ধকার, আবার চাঁদের আলো ঝিলে পড়েছে। পরীদের দ্যুতি শেষ, তারা নেই। চলে গেছে। কিন্তু তারা চলে গেলেও ওরা সবাই ভোর হওয়া পর্যন্ত ওখানে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। সম্বিত এল সূর্যের প্রথম কিরণের ছোঁয়ায়।

_____


FavoriteLoading Add to library
Up next
মাছওয়ালী – পলাশ মজুমদার... ' ওই মাছটা কত করে দিচ্ছিস? ' - কোনটা, দেশী না বিলাসপুর? ' দেশী ' - দেশী একশো আশি, বিলাসপুর কুড়ি, পোনা দেড়শো। ' আর কাতলাটা? ' - ওটা তুই নিতে পারবি...
অপরাহ্নের আলো - অদিতি ঘোষ   আজ সকাল সকাল স্নান সেরে ঠাকুরঘরে ঢুকেছেন যূথী।কৈশোর থেকেই দোল-পূর্ণিমার এই দিনটায় মধুর এক আবেশে ভরে থাকে যূথীর মন।ঠাকুরদার প্...
মাস্টারপিস – শ্বেতা মল্লিক... অ্যালার্ম টা বাজতেই বাস্তবের মাটিতে ফিরে এলাম। একবার কলম ধরলে আর ছাড়া যায় না,এমন কথাটাই প্রযোজ্য লেখক দের জন্য। আরও যদি পছন্দসই লেখার মাধ্যমে পাঠকদ...
নষ্ট প্রেম – প্রিয়তোষ ব্যানার্জী... দু হাত দিয়ে মেখেছি তোমার লজ্জার আবীর গোপনে, নির্জনে,অন্দ্ধকারে ছুঁয়েছি শরীর - তোমার ঠোঁটের মধ্যে খুঁজেছি উত্তেজনা রক্তিম গালে পেতে চেয়েছি সুখ কামনা...
পরন্তবেলার সূর্য - বিদিশা মন্ডল   আমি কোথায়, কি হয়েছে আমার?"- দূর্ঘটনায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিবু জ্ঞান ফিরে পাবার পর যন্ত্রণায় কাতর হয়ে প্রশ্নগুলো করলো। নার্...
মুখরোচক দইয়ের চপ বানিয়ে ফেলুন সহজেই – মালা ... কথায় আছে 'যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে,' | তবে আমাদের অর্থাৎ গৃহিণীদের কাছে এই প্রবাদবাক্যটি হয়তো তেমনভাবে খাটে না মূলত আমাদের সন্তান এবং পতিদেবতার সৌজন্যে ...
ঠিক আসে না – প্রিয়তোষ ব্যানার্জী... আমার কবিতা লেখা টা ঠিকমত আসে না ছন্দ,অমিত্রাক্ষর,গদ্য-ছন্দ.কিছুই জমাট বাধেনা। বিপ্লব,বিরহ.প্রেম,প্রতিবাদের কাব্য হয় না লেখা বুদ্ধিজীবী মহলে আমায় ...
ধর্ম - কৌশিক চক্রবর্ত্তী   মান ও হুঁশ যুক্ত প্রাণীকে যে মানুষ বলে বিবেচনা করা হয় এব্যাপারে সকলেই একমত বলে আমার ধারণা। কিন্তু আমার লেখার বিষয় এট...
শিকাগো ও স্বামীজী – শান্তনু ভট্টাচার্য্য... স্বামীজীর শিকাগো ভাষণ সম্পর্কে রোঁমা রোলাঁ বলেছিলেন,- "  His speech was like a tongue of flame". অথচ এই " অগ্নিবর্ষণ" এর আগে এই  " cyclonic monk" যথেষ...
ছুটি – পরিতোষ মাহাতো... বৈশাখের ভ্যাপসা গরমে পিঠে সভ্যতার বোঝা বাবার অব্যবহৃত সাইকেল আর ঝোলা ব্যাগটার সঙ্গে বন্ধুত্ব সারা সপ্তাহের অবিরত  ছুটে চলা লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment