অলৌকিক – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়

নিঃঝুম গ্রাম, গরমের ঘন দুপুর। বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে তবু তাপ কমার নাম নেই। কমবেই বা কি করে? সারা দিনের প্রখর রোদের তাপ খেয়ে প্রকৃতি আগুন হয়ে আছে। এই তাপ যখন কমবে তখন মাঝরাত পেরিয়ে আবার সকালের দিকে এগোবে ঘড়ির কাঁটা। আর সকাল হলেই আবার রোদ আর তাপ। বিষহরি গ্রাম। চারিদিকে মাঠ। এই মাঠ জুড়ে কৃষকরা ফসল ফলায়। এখনও ফসল হয়ে আছে। কিন্তু বৃষ্টির অভাবে জ্বলে যাচ্ছে। মাঠে শ্যালো চলে। পাতালের গভীর থেকে জল তুলে এ জমি, ও জমিতে দেওয়া হয়। মাটির আল বেয়ে জল ছোটে হু হু করে। কিন্তু তাতেও সমস্যা। ইদানিং মাটির নিচের জলস্তর নেমে গেছে। এক নাগাড়ে জল ওঠাতে পারে না শ্যালোর মেসিনও। এই মাঠের ধারে ধারে ছোট ছোট গ্রাম। নিজস্ব খেয়ালে দিন কাটায়। গ্রামের বাসিন্দাদের কোনও আড়ম্বর নেই। একেবারে সরল, সোজাসাপটা জীবনধারণ। যা পায় তাই খেয়ে দিন গুজরান করে দেয়।  মাঠের চাষের শেষে গ্রামীণ মাচায় বসে জমে ওঠে আড্ডা। ভারি বিষয় নিয়ে আলোচনা কেয়ার করে না ওরা। সাধারণ আলোচনা হয়। সেই সন্ধ্যায় কোনও কোনও সময় গ্রামীণ বাউল নিজের মনের নন্দে গেয়ে ওঠে চড়া সুরে গান—‘মন নিয়ে যে খেলা করে/ কোথায় সে রসিকজন? মাচায় বসা মানুষগুলো মোহিত হয়ে হাঁটুতে তাল মারে, মাথা নাড়ায়। বাউল গেয়ে চলে গান। সন্ধ্যা দীপ হাতে লাজুক বধূ অজান্তেই ঘোমটা আরো খানিকটা টেনে দেয়। বাউল গেয়ে ওঠে ‘মন নিয়ে সে দেয় না সাড়া/আমি সারাজীবন দিশেহারা…..’। তবে এই ঘটনা যখন ঘটল তখন দুপুর বিকালের দিকে এগোচ্ছে। ডুবে যাওয়ার আগে রক্তচক্ষু নিয়ে প্রকৃতিকে যেন শাসিয়ে যাচ্ছে সূর্য আগামীকালের জন্য।

গ্রামের শেষ প্রান্তে মিঠুকে দেখা যাচ্ছে। মাঠের ঠিক কোলের ওপর থাকা কুল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে সে হাঁ করে তাকিয়ে আছে কুল গাছটার দিকে। কি দেখছে কে জানে! আপাতত তার ধারে কাছে কেউ নেই। বিকালের পাখিরা সঙ্গীর সঙ্গে জোট বেঁধে কুলায় ফেরার তোড়জোড় করছে। মাঠের শেষ প্রান্তে আলোর মধ্যে বিশ্রামের এক অনাবিল আকুতি। মিঠু ঈশারায় বলল, যাব? বোধহয় কোনও ঈঙ্গিত পেল। আরেকটু এগিয়ে গেল কুল গাছটার কাছে। কাঁটার জন, উঠতে পারছে না। কাঁটা না থাকলে হয়ত উঠত গাছে। মিঠুর বয়স বেশি নয়। ক্লাস এইটে পড়ে। একেবারে সাধারণ গ্রাম্য মেয়ে। শরীর জোড়া গ্রাম্য মাধুর্য। এগিয়ে গেল গাছটার খুব কাছে। তারপর দেখতে পেল একটা আবছা মূর্তি তাকে স্পর্শ করছে। নারী না পুরুষ তা বোঝা যাচ্ছে না। শুধু শরীর জুড়ে একটা অনুভূতির স্রোত ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। কয়েক সেকেণ্ড। মিঠু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বেশ খানিকক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়াবার পর দৌড় লাগাল। এক অদ্ভুৎ শক্তি তাকে যেন ভর করেছে। মাঠের কোল দিয়ে মেঠো রাস্তা ধরে দৌড়ে সে গ্রামের ভিতরে ঢুকছে। পরিচিত মানুষ দেখে বলছে, কি হয়েছে, কি হয়েছে মিঠু? মহিলারা চিৎকার করছে ও মিঠু, ওভাবে দৌড়াচ্ছিস কেন? মিঠুর মা খবর পেয়ে মেয়ের পিছনে দৌড় লাগালো। মিঠু গ্রামের ভিতর দিয়ে দৌড়ে একটা মাটির বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করল, কোথায় সাবু? একি, এ তো মিঠুর গলা নয়। কেমন যেন কাঁপা কাঁপা একটু বয়সের কন্ঠস্বর। সবাই মাটির বাড়ির দাওয়ার নিচে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। মিঠুর মা-ও।

এই বাড়িতে বিছানায় শয্যাশায়ী সাবু বলে ছোট্ট মেয়েটি। মিঠু সটান ঘরে ঢুকে গিয়ে মেয়েটিকে কলে তুলে নিল। সবাই বাক্‌রুদ্ধ। মিঠু মেয়েটিকে নিয়ে উপরে ছুড়ছে আবার লুফছে। আবার ছুড়ছে আবার লুফছে। তারপর কোলে জড়িয়ে হাসছে। মেয়েটা কি পাগল হল! ওপাশে দাঁড়ানো মিঠুর মা এক প্রতিবেশীর কাঁধে মাথা দিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।
মিঠু মেয়েটিকে আবার ছুড়ছে আর লুফছে। ওই সাবু বহুদিন নির্জীব হয়ে বিছানায় শয্যাসায়ী। বহু ডাক্তার বদ্যি কিছুই করতে পারেনি। রোগও ধরতে পারেনি। মেয়েটা ক্রমশ ক্ষীণ থেকে ক্ষীনতম হয়ে যাচ্ছিল। সহসা উপস্তিত এক দঙ্গল মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। সাবু খিলখিল করে হাসছে। আর মিঠু ওকে নিয়ে লোফালুফি খেলছে। মিঠুর এই দুঃসাহস সবাইকে অবাক করলেও তারা ভীত হয়ে পড়েছে। মিঠুর মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার কাজ করছে। যেমন তার দৃষ্টি, দূরে কোথাও যেন পড়ে আছে। তার ঈশারা কার সঙ্গে? ওকে কে চালিত করছে? মাঝে মাঝে কার সঙ্গে বিড়বিড় করছে মিঠু! এসব ভাবনা থেকে এক ধরণের ভয় প্রতিবেশীদের মনে জেগে উঠেছে। আর আশ্চর্য ভাবে সাবু অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছে। প্রতিবেশীরা বুঝতে পারছেন, এ শক্তি মিঠুর নয়। তাহলে কার?
এমন সময় সেই অদ্ভুৎ কন্ঠে মিঠু কথা বলে উঠলো। সাবুর মাকে ডেকে বলল, রোজ সকালে গিয়ে ধুপ জ্বেলে প্রণাম জানবি মাঠের প্রান্তের ওই কুল গাছটায়। তারপরই হা হা করে হেসে মিঠু দৌড় লাগাল। হাওয়ার বেগে দৌড়। মিঠু ছুটছে সেই কুল গাছ লক্ষ্য করে। বিকাল ছেড়ে জাচ্ছে প্রকৃতিকে। প্রচণ্ড গরমে চারিদিক উত্তপ্ত হয়ে আছে। মিঠুর পিছনে ছুটছে তার মা, প্রতিবেশীরা। মিঠু কুল গাছটার কাছে জেতেই ধপাস করে পড়ে গেল। তার মা দৌড়ে গিয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরল। প্রতিবেশীরা মাঠের নিচের একটি ডোবা থেকে আঁচলা করে জল এনে মিঠুর মাথায়, মুখে দিতে লাগল। ক্ষাণিকক্ষণ পড়ে মিঠু সুস্থ হবে বলল, আমার কি হয়েছিল?

কেউ কোনও কথা বলল না প্রথমে। তারপর বলল, তেমন কিছু হয়নি মা। একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছিলিস গরমে। মায়ের সঙ্গে বাড়ি চল। মিঠু একেবারে স্বাভাবিক হয়ে গেছে বাড়ি ফিরে এসে। ক’দিন স্বাভাবিক ভাবেই কেটে যায় তার। কিন্তু শনিবারের বারবেলা আসতেই মিঠু যেমন কেমন ছটফট করে ওটে। তক্কে তক্কে ছিল ওর মা-বাবা, প্রতিবেশীরা। ঠিক মুহূর্তেই খবর দেওয়া হল বলে রাখা সেই গুণিনকে। তিনি মিঠুকে ধরে রাখলেন জোর করে। খানিকক্ষণ কেটে যাবার পর মিঠুর ছটফটানি কেটে গেল।
মিঠুর মাথায় হাত বোলালেন গুণিন। তারপর বললেন, শনিবারের বারবেলাব মিঠুর ওপর যিনি ভর করেছিলেন তিনি শুভ আত্মা। সাবুর ভালো হয়েছে। আরো অনেকের ভালো হত। কিন্তু ক্রমে মেয়েটির মুশকিল হত। মিঠুর সমস্ত ভালো নিয়ে আর তার ভালো দিয়ে এসব কাণ্ড হত। এসব থামিয়ে দেওয়া যাবে একটি শর্তে। সব্বাই বলে উঠলো কি শর্ত?
গুণিন বললেন, কুলতলায় নয়, আপনাদের এই গ্রামের মাঝখানে প্রতিষ্ঠা করতে হবে একটা কিছু। যেখানে ওই শুভ আত্মার উদ্দেশ্যে নিয়মিত চলবে পূজাপাট। যদি সব গ্রামবাসী রাজি তাকেন, তাহলে আমিই ব্যবস্থা করে দেব সব।

কেটে গেছে কয়েক মাস। এখন বিষহরি গাঁয়ে যে মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছে সেখানে প্রতিদিন মানুষের যাতায়াত। মিঠুই প্রথম সেই মন্দিরের ইট গেঁথে ছিল। মিঠুর খুব বড় ঘরে বিয়ে হয়ে গেছে। গ্রামটিতে শান্তির বাতাবরণ রয়েছে এখনও।

___


FavoriteLoading Add to library

Up next

মুখরোচক এগডাল বানানোর সহজ কৌশল – মালা নাথ...     সুকুমারবাবুর অমর সৃষ্টি 'অবাক জলপান' নামক নাটকের বেশ কয়েকটি সংলাপে স্রষ্টা তাঁর আপন অন্তরের সমগ্র মাধুরীকে একত্রিত করে এবং তাঁর ট্রেডমার্ক ব...
ফেসবুক এনভি ফেসবুকে লগ ইন করতেই হোম পেজ জুড়ে মীরা চৌধুরী আর তার পরিবারের এক ঝাঁক ছবি দেখে স্ক্রল বারটা একটু থামায় পৃথা। ফেসবুকের নীল সাদা পেজটি যেন আজ পুরোটাই মীর...
নায়কোত্তম অরিন্দম – অস্থির কবি... "নায়ক" এমন একটা সিনেমা যা সত্যজিৎ বাবু ও উত্তমকুমারের জীবনে একটা মাইলস্টোন। অনেকে ভাবেন সত্যজিৎ রায়ের জীবনে কম, উত্তমের জীবনে বেশী। এটা সম্পূর্ণ ভুল। ...
নিজের সঙ্গে দেখা - দেবাশিস ভট্টাচার্য   আজ বিয়ের পঁচিশ বছর সম্পূর্ণ হলো।আমি অনিন্দিতা বসু।  ব্যাংক এর ডেপুটি ম্যানেজার সায়ক বসুর স্ত্রী। নবনীতা বসুর মা। এই এখ...
কি যাদু মা ডাকতে - অদিতি ঘোষ      প্লীজ, স্টপ ইট্। এই ধানাই পানাই ভাল লাগেনা আমার। প্রত‍্যেকদিন সেই একই আলোচনা। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে কথাকটা উগলে দিয়ে,পার্শটা...
অন্ধকারের চোরাবালি... অনৈচ্ছিক সঙ্গমে প্রতিপক্ষের উল্লাস থামাতেঅস্ফুটে বেড়িয়ে আসা শিৎকারকেযখন গলা টিপে খুন করেছিলাম তলপেটের নিচে,তখন অসহায় লিঙ্গ নাভিপদ্মের যন্ত্রণা বাড়...
মনপাখি – রাজেশ সামন্ত... 'মনপাখি' চল নারে আজ অনেকদূর যাই , সবুজ ঘেরা ভালোবাসার নিশান যেথায় পাই | মেঘকে আজ ভেলা করে আকাশে দেবো পাড়ি , শঙ্খচিলেরা উড়বে যেথায় দলবেঁধে সারি সারি...
১৬-১-১৯-১৯-২৩-১৫-১৮-৪ - মনীষা বসু     ।। ১।। এয়ার পকেটে পড়ে প্লেনে জোর ঝাঁকুনি লাগতেই ল্যাপটপ থেকে চোখ ওঠালেন সূর্য। মানুষ যেমন ঘুম থেকে উঠে চারিদিকে তাকিয়ে বুঝতে চায়, সে...
ফাঁস - সিদ্ধার্থ নীল   জুতো জোড়ার ডানপায়েরটি ডান ও বাঁপায়েরটি বাঁয়ে ক্ষয়ে এসে একটু হেলে থাকছে। বহুদিনের অত্যাচার, রোদ বৃষ্টি সয়ে সয়ে আজ এই অবস্থা।...
কনফেশন – তমালী চক্রবর্ত্তী...  থানায় ঝড়ের বেগে ঢুকল এক অল্প বয়সী ছেলে। অফিসার কে বলল স্যার আমি কিছু বলতে চাই। অফিসার তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে জলের গ্লাস টা এগিয়ে দিল। একবারে জল শেষ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment