আতঙ্কের সেই কালো রাত – সরোজ কুমার চক্রবর্তী

    আমরা তিন থেকে চারজন সবাই অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী | সবার বয়স প্রায় সত্তরের ঊর্ধ্বে | আমরা যেখানে থাকি জায়গাটা হলো দমদম স্টেশনের কাছাকাছি | এখানে আমাদের পরিচিত একজন চোখের ডাক্তারর চেম্বার আছে | যেখানে আমরা তিন থেকে চারজন সপ্তাহে প্রায় তিনদিন রাত নটার পর যাই এবং সবার সুখ দুঃখের কথা শেয়ার করি | ডাঃ চৌধুরী এমনি খুব সহজসরল মানুষ সেও তার অনেক কথা আমাদেরকে বলেন এবং আমরাও তাকে আমাদের বন্ধুই মনে করি | ভদ্রলোকের কোন মান অহংকার নেই ডাক্তার বলে | হঠাৎ একদিন ডাক্তারবাবু মজার ছলে আমাদের বললেন —
— “একটা ব্যাপার হয়েছে আপনারা শুনেছেন ?
আমি বললাম, — “না তো ডাক্তারবাবু ! কেনো কী হয়েছে ?”
— “আরে আমাদের দাসবাবু আছে না ? তার সাথে একটা ঘটনা ঘটেছিল | তা এক ভৌতিক ঘটনা,শুনবেন আপনারা ?”

                 তা এই দাসবাবুর বয়স প্রায় আশি ছুঁইছুঁই,সাদামাটা মানুষ | ওপার বাংলার লোক | আমাদেরই আড্ডার একজন সঙ্গী |
ডাক্তারবাবুর কথা শেষ হতে না হতেই দাসবাবু স্বয়ং চেম্বারে এসে হাজির হলেন |
— “আরে মশাই আপনি তো একশো বছর বাঁচবেন,আপনার কথাই হচ্ছিলো |”–
আমাদের মধ্যে একজন বলে উঠলো,দাসবাবুর কথা দাসবাবু নিজেই বললে ভালো হবে | এই মনে করে বললেন —
“তাহলে দাসবাবু,আপনার সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা এনাদেরকেও বলুন |”

          এদিকে শ্রাবণের প্রবল বৃষ্টি যেনো আকাশ ভেঙে পরছে | আমাদের কারোরই বাড়ি যাবার কোন তাড়া নেই | গল্পটা আজ ভালোই জমবে,
দাসবাবু বলা শুরু করলেন, — আমি একসময় এক প্রাইভেট কোম্পানিতে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে চাকরি করতাম | চাকরি ছেড়ে দিয়েছি প্রায় বছর দশক হয়ে গেছে | হঠাৎ একদিন ওই কোম্পানির মালিকের ছেলে বললো —
“আমাদের কোম্পানিতে বিগত অনেকদিন ধরেই ইলেকট্রিক লাইনে একটা ফল্ট চলছে | অনেক ইলেকট্রিশিয়ানকে ডাকার পরও কিছু ঠিক করা যায়নি | আপনি অনেক পুরোনো অভিজ্ঞ ইলেকট্রিশিয়ান | আপনি যদি এসে একটু দেখে জান |”
আমি বললাম —
“কোথায় যেতে হবে,ঠিকানাটা যদি বলেন |”
— “বহরমপুর স্টেশনে আসলে কোম্পানির লোকেরা আপনাকে এসে নিয়ে যাবে আপনি আগামীকালই আসুন,সব ব্যবস্থা করা থাকবে |”

           পরদিন দমদম জং থেকে দুপুর ২টোর লালগোলা প্যাসেঞ্জারে বহরমপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম | ট্রেন যখন পলাশী ছাড়িয়ে বহরমপুরে ঢুকছে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে | ট্রেন কিছুটা লেটেও চলছিল | যথাসময়ে স্টেশনে নামলাম,কোম্পানির লোকেরা আমায় চেনামাত্র সৌজন্য বিনিময় করলো এবং আমায় একটি হোটেলে নিয়ে গেলেন আর সেখানে থাকা খাওয়ারও বন্দোবস্ত করে দিলেন | এবং যাবার আগে বলে গেলেন — “আপনি কাল সকাল ন’টায় তৈরী থাকবেন,আপনাকে আমরা স্পটে নিয়ে যাবো |”

              ক্লান্ত শরীরে স্নান খাওয়াদাওয়া সেরে শুতে শুতে প্রায় ১২টা বেজে গেলো | হোটেলের ঘরের আলোটা খুব একটা জোরালো নয় | আলোটা নিভিয়ে ইষ্টদেবতার নাম করে বিছানায় ঘুমিয়ে পরলাম | তারপরই ঘটলো সেই ঘটনা |
জানিনা তখন রাত কটা হঠাৎ আমার ঘুমের মধ্যে কোন মানুষের হাঁটাচলার শব্দ শুনতে পাচ্ছি | চোখ খুলতেই দেখি একটা ছায়ামূর্তি আমার দিকে এগিয়ে আসছে | আতঙ্কে আঁতকে উঠলাম | সেই মূর্তি জোর করে আমার গলা চেপে ধরার চেষ্টা করলো | আর আমি প্রাণপণে ছাড়াবার চেষ্টা করলাম কিন্তু তার শক্তির সঙ্গে আমি পেরে উঠলাম না | তারপর আমি জানিনা আমার সঙ্গে কী হয়েছিল,আমি জ্ঞান হারালাম |
পরে শুনেছি সকাল হোটেলের কর্মচারীরা আমার ঘরের দরজায় অনেক ডাকাডাকির পরও আমায় কোন সাড়া না পেয়ে তারা আমার জানলার কাঁচ ভেঙে ঘরে ঢুকে আমায় দেখে ভয়ে আঁতকে ওঠে | আমি অচৈতন্য অবস্থায় মেঝেতে পরেছিলাম,সারা গায়ে নখের আঁচড়ের দাগ | আর রক্তাক্ত সেই শরীরের হাত পা বেঁকে গিয়েছিল | তারা ভেবেছিল আমি বোধহয় আর বেচে নেই | সেই অবস্থায় আমায় তারা উদ্ধার করে এবং ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসে হোটেলের ম্যনেজার | ততক্ষণে আমার চোখেমুখে জলের ঝাপটা দেওয়ায় আমি জ্ঞান ফিরে পাই কিন্তু কথা বলার ক্ষমতা ছিল না | এদিকে কোম্পানির লোকেরাও যথাসময়ে এসেছিল আমায় নিয়ে যাবার জন্য | তারাও আমার এই অবস্থা দেখে হতবাক হয়ে যায়  | ডাক্তার আমার প্রাথমিক চিকিৎসা করার পর বললেন বাড়ির লোককে খবর দেবার জন্য যাতে কলকাতায় আমায় ফেরৎ নিয়ে যায় |

               ম্যনেজার কলকাতায় আমার ছেলেকে ফোন করে সব ঘটনা বুঝিয়ে বললেন এবং তৎক্ষণাৎ তাকে বহরমপুরে আসার জন্য বললেন | সেদিন সন্ধ্যাবেলা আমার ছেলে হোটেলে এসে উপস্থিত হয় | সেও আমার এই অবস্থায় বিচলিত হয়ে পরে | যে কাজের জন্যে আমি বহরমপুর গিয়েছিলাম সেটা আর করা হলো না | এদিকে কোম্পানির লোকেরা এবং হোটেলের কর্মচারীরা তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করে আমায় ছেলের সঙ্গে বহরমপুর থেকে ট্রেনে তুলে দিলেন দমদমের উদ্দেশ্যে | প্রায় মাঝরাতে দমদমে নামলাম এবং ছেলের সাথে কোনমতে বাড়ি পৌঁছালাম |

                                 পরদিন সকালে আমার ছেলে আমাদের ফ্যামিলি ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে এলো | তিনি এসে আমার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বললেন অর্থোপেডিক দেখাতে হবে | হাড়ে চোট লেগেছে | তারপর কিছুদিন অর্থোপেডিক ট্রিটমেন্ট করানোর পরও আমার সারা শরীরের ব্যথা কমে যাওয়া তো দূরের কথা,আমার শরীরের আরও অবনতি হতে থাকলো | এসব দেখে আমার পুরোনো পরিচিতিরা পরামর্শ দিলো এ ডাক্তারের কাজ নয় | কোন ওঝা দেখালে সব ঠিক হয়ে যাবে | এটাই তাদের বিশ্বাস | আমিও ভাবলাম বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর |

                    অনেক খোঁজখবর করার পর বারাসাতে এক বয়স্ক অভিজ্ঞ মুসলিম ওঝার খোঁজ পাওয়া গেলো | দুদিন পর আমার পরিজনেরা আমায় সেই ওঝার বাড়িতে নিয়ে গেলো,সেই ওঝা আমায় দেখামাত্রই বুঝে গেলেন আমার সাথে ঠিক কী হয়েছিল | তিনি যা বললেন সেই ঘটনা শুনে সবাই আঁতকে ওঠে এবং বলা বাহুল্য আমি সেই রাতে যে ছায়ামূর্তি আমার উপর প্রকট হতে দেখেছিলাম তা এখনও আমার পিছু ছাড়েনি | যার ফলে আমার শরীরের এতো অবনতি | ওঝা তার যাবতীয় ঝাড়-ফুঁক,মাদুলি ইত্যাদি আমার উপর প্রয়োগ করলেন | যার ফলে সাময়িকভাবে আমি সুস্থ হলাম |

                 এদিকে আমার ছেলে কাউকে কিছু না জানিয়ে বহরমপুরের সেই হোটেলে যায় এবং ম্যনেজারকে সব কথা জিজ্ঞেস করায় সে বলে —
“আমি তো হোটেলে নতুন এসেছি আপনি যা জানতে চাইছেন তা আমাদের হোটেলের এক পুরোনো রান্নার লোক আছে সেই আপনাকে সবটা বলতে পারবে |”
ম্যনেজার তাকে ডেকে পাঠালেন এবং সেই রান্নার লোকটি বললেন —
“বেশ কয়েকবছর আগে হোটেলের সেই ঘরে ৩০-৩৫ বছরের একটি ছেলের সিলিং ফ্যানে ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়েছিল | পুলিশি তদন্তে তার আত্মহত্যার কারণ জানা যায়নি | সেই ঘটনার পর ওই ঘরে আপনার বাবার সঙ্গে এমন ঘটনা এই প্রথমবারই ঘটে | হয়তো সেই ছেলেটির অতৃপ্ত আত্মাই আপনার বাবার উপর ভর করেছিল |
সবকিছু জানার পর আমার ছেলে বাড়ি ফিরে সেইসব ঘটনা সবিস্তারে আমাদের বললো বাড়ির সকলে সেসব শুনে ভয়ভীত হয়ে ওঠে এটা ভেবে নিশ্চিত হয় যে সবকিছু ভালোয় ভালোয় মিটে গেলো |”

   সবকথা দাসবাবু বলা শেষ করলেন এবং আমরা লক্ষ্য করছিলাম ঘটনাটি বলার সময় দাসবাবুর চোখেমুখে অতীতের সেই আতঙ্কের ছাপ এখনও স্পষ্ট | বর্তমানে তার শরীরের সমস্ত ক্ষত সেরে গেলেও অন্ধকার সেই রাতের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা তার মনে বিভীষিকার চিরস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে |
এতক্ষণে বৃষ্টি একটু ধরেছে রাতও প্রায় সাড়ে এগারোটা | আমরা যে যার বাড়ির পথে পা বাড়ালাম | ডাক্তার চৌধুরীও তার চেম্বারে তালা লাগালেন |

_____


FavoriteLoading Add to library

Up next

অমাবস্যার রাত – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়...      আমার দাদু বরুণদেব মুখোপাধ্যয়ের জীবনে এমন ঘটনা লক্ষ্য করেছিলেন মৃত্যু পাঁচ বছর আগে থেকেই। অমাবস্যার রাতেই এই ঘটনা একমাত্র ঘটতো। দাদুকে বহু ডাক্তার...
বিচার – শুভদীপ্ত চক্রবর্তী... মন্দিরের চাতালে ছোট্ট একর‌ত্তি দেহটি পড়ে আছে, শরীরে একটুকরো সুতোও নেই... রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত — নিস্পাপ খোলা দুটি চোখ ঈশ্বরকেই যেন খুঁজছে ! মিটিং...
মৃত্যুহীন ভালোবাসা... - ডঃ মৌসুমি খাঁ ভালোবাসার মৃত্যু নেই সে চিরন্তন বয়ে চলেছে হৃদয় জুড়ে - মনের এক ফল্গু নদীর চোরাস্রোতের মতো, কখনও উদ্দাম উচ্ছল জলধারা ভাসিয়ে নিয়ে য...
দত্তক – সায়ন্তনী ধর চক্রবর্তী... ।।১।। এতদিনের প্রচেষ্টায় আজ ফাইনালি C.F.O. হতে পারলো সুদিপ্ত, এই পোস্টটা পাওয়ার জন্য প্রচুর খেটেছিল ও। খবরটা পেয়েই অফিস থেকে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ল দী...
স্বাধীনতা - কৌশিক চক্রবর্ত্তী   আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অসংখ্য কাঙ্খিত নৈমিত্তিক চাহিদার মধ্যে স্বাধীনতা অগ্রগণ্য বলেই আমার ধারণা। কিন্তু স্বাধীনতার সংজ্ঞাটি মনে...
প্রেমের গল্প -"একি বাবা তুমি খালি হাতে বসে রইলে যে?মিষ্টি গুলো তো তোমাদের জন্যেই আনা..দিদি বলুন না ছেলেকে,নিজেরই ঘর ভাবো বাবা...খাও খাও..মেয়ে তৈরী হচ্ছে,এক্ষুনি আস...
খতরনাক খেল – সৌম্যদীপ সৎপতি... খেলার কথা শুনবি যদি, বলছি যা দে মন তাতে, দেখেছিলুম খেল একখান হ্যালোইনের সন্ধ্যাতে। সেদিন রাতে ভূতুম পাড়ার "মামদো ইলেভেন্স" দলে "স্কন্ধকাটা ক্লাব"কে...
কর্মযোগী প্রফুল্লচন্দ্র... - সমর্পণ মজুমদার     ২রা আগস্ট ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে জন্ম হয়েছিল এমন একজন মনীষীর, যিনি বাংলার নবজাগরণের একজন উল্লেখযোগ্য পথিকৃৎ। যাঁর সম্বন্ধে ব...
তোমাকে দিলাম -সৌম্য ভৌমিক... তোমাকে দিলাম হরফ আর শিলালিপি, আমার হৃদয় নিংড়ানো স্বরলিপি । তোমাকে দিলাম ঝুলন সাজানো বাড়ী, তোমার জন্য কাঙাল হতেই পারি। তোমাকে দিলাম সর্ষে ক্ষেতের হ...
মেট্রো ঘটনার কয়েক মিনিট পরে... - অর্পণ দাস(অন্তিম)   উজ্জ্বল বাবু মুখে কীসব বিড় বিড় করতে করতে মেট্রো স্টেশন দিয়ে বেরোলেন। সিঁথিরমোড়গামী অটোর লাইনে দাঁড়িয়েও নিজের বাহাদুরি ন...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment