আম বাগানে কে? – শ্রাবণী সরকার

মার মামারবাড়ি ওদলাবাড়ি। ডুয়ার্সের এক ছোট্ট চা বাগান ঘেরা মফস্বল টাউন। এখনও ভারী শান্ত। আমার মায়ের ছোটবেলায় সেটি ছিল আরো জনবিরল চুপচাপ একটি গ্রাম। মায়েদের বাড়ির দু’একটা বাড়ি পরেই ছিল ‘চক্রবর্তী ব্রাদার্স’-র বাড়ি। তাদের বাড়ির পিছনেই ছিল বিশাল এক আমবাগান। পাড়ার যত ছেলে-বুড়োর বাগানের আমের ওপর ছিল দারুণ লোভ। সময়ে অসময়ে তারা গিয়ে ওই বাগানে জুটত। আমচোরেদের হাত থেকে আম বাঁচাতে চক্রবর্তীরা শেষমেষ বহাল করেছিল এক নেপালি দারোয়ান। যিনি বাগান পাহারা দিতেন। তা আম চুরি একটু কমলেও আমার মা আর তার পাড়াবেড়ুনি সঙ্গীসাথীরা তক্কে তক্কে থাকত কখন পাহারাদার সাইলা দাজুর চোখ এড়িয়ে আমবাগানে ঢুকবে।

সেবার জষ্ঠি মাসের প্রথমদিক। বেশ আম পাকা, কাঁঠাল মজানো গরম পড়েছে। বাড়ির সামনে দাদুভায়ের কাঠের ডিপোতে রাখা শাল-সেগুনের লগ গুলো শুকিয়ে সিজন হচ্ছে। মায়েরা সকাল বিকাল ওখানেই গজল্লা করছে আর আমবাগানে আকাশ জোড়া ছায়া দেখে সাইলা দাজুর মণ্ডুপাত করছে। এমন একদিন বিকালে উঠলো কালবৈশাখী। আকাশ কালো করে ছেয়ে এল ক্ষ্যাপা হাতির মতো ছাইরঙা মেঘ। হাওয়ার মুখে উড়ে গেল কাঠ চেরাইয়ের হলদেপানা গুঁড়োগাঁড়া। গাছের ডালে লটকে থাকা ভো কাট্টা ঘড়ি, দিদিমায়ের শুকাতে দেওয়া ফুলছাপ রঙিন কাপড়ের টুকরো। মায়েদের আনন্দ আর ধরে না। আহা আমবাগানে না জানি কত কাঁচা পাকা আম ঝড়ে খসে পড়েছে। শুধু কুড়িয়ে আনার অপেক্ষায়।

তারপর নামল আকাশ ভাঙা বৃষ্টি। বড়দের হাঁকডাকে ঘরে উঠতে হল ছোটদের। সারারাত ঝড় জলের পর সকাল হল। মা আর তার সাথীরা আগেই ঠিক করে রেখেছিল, সকালের প্ল্যান। সেই মত আকাশ একটু ফর্সা হতে না হতেই সবাই টুকটুক করে বেরিয়ে পড়ল ঘর ছেড়ে।  একে একে জমা হল কাঠ ডিপোর ধারে। জনা পাঁচজন জমতেই আমবাগানের কাঠের বেড়া পার করে নিঃশব্দে সেঁধোলো গিয়ে আমবাগানের ভিতরে। ফুরফুরে ঠাণ্ডা হাওয়ায় সাইলা দাজু ঘুমিয়ে বেধহয় কাদা। টেরও পেল না।

মা, বেবি মাসি, বুলু মাসি টপাটপ আম কুড়াচ্ছে আর জামার কোঁচড়ে ভরছে। গাছের পাতা থেকে টুপটাপ জল ঝরছে। ভেজা আমে জামা ভিজে উঠছে। শীত শীতও করছে। মা নীচু হয়ে কুড়াতে ব্যস্ত। কুড়াতে কুড়াতে কখন যে বেশ গভীরে ঢুকে গেছে বাগানের। সঙ্গীদের থেকেও বেশ আড়াল হয়ে গেছে খেয়ালই নেই। আহা কি বড় বড় আম পাচ্ছি, মা আনন্দে ডগমগ। এমন সময় নীচু অবস্থাতেই মা দেখতে পেল এক জোড়া গামবুটো পড়া পা। এই যাঃ, নির্ঘাৎ সাইলা দাজু। মা গামবুটের পাশ থেকে পটাপট আম কুড়াচ্ছে আর বলছে, বেশি নিইনি গো দাজু। ওই এওটা কি দুওটা, গুস্সা না গরনুস লা। রাগ করো না গো দাদা। মা এসব বলত বলতেই আরো কটা আম ভরে ফেলেছে, কোঁচড় ভরে গেছে। মা সোজা হয়ে দাঁড়াল। দাজু বাস এত্তাই। ওম্মা, দাজু কোথায়! গামবুট পরা পা লম্বা হয়ে উঠে গেছে গাছ বরাবর। গাছের প্রায় মাথায় মাথায় কালো কোট পড়া এক বিশাল দেহ গলা অব্দি। তারপর আর কিছু নেই।

মা আর কিছু বলতে পারে না। বন্ধুরা যখন খুঁজে পায় মা তখনও অজ্ঞান। সেই থেকে মায়ের ফিটের ব্যামো। যা সবাইকে অবাক করেছিল ভয়ে।

____


FavoriteLoading Add to library

Up next

ভালো থেকো বাবা - মুক্তধারা মুখার্জী   “কি ব্যাপার? হঠাৎ এখানে? এতদিন পর ?” “কেন বাবা আমি কি আসতে পারিনা ? তোমার কথা খুব মনে পড়ছিলো,তাই....” “থাক,থাক।মিথ্য...
কৃষ্ণবিবরের ইতিকথা... আমাদের অনেকেরই দিন শুরু হয় ঘুম থেকে ওঠার পর সূর্য প্রণাম করে। আর আমাদের এই বসুন্ধরায় সকল প্রাণের লালন পালনের মূলেই কিন্তু রয়েছে সেই সূর্যের অফুরন্ত শক...
মহাকাশে কিং খান - রাজদীপ ভট্টাচার্য্য       এবার সম্পূর্ণ নতুন রূপে বড়ো পর্দায় শাহরুখ খান কে দেখতে পাওয়া যাবে, সম্প্রতি অর্ল্যান্ডো তে ফিল্ম জিরো র শুটিং শ...
অতীত দিনের ৭৮ আর.পি.এম রেকর্ডে গান শোনার মাদকতা &#... যে কদিন আছি এই পৃথিবীতে যদি সম্ভব হয় শুধু ৭৮ rpm শুনব। কারন এ প্রজন্মই হোক আর আগামী প্রজন্মই হোক,  যে যায় বলুক ..আমার আত্মিক উপলব্ধি আমাকে সবসময়ই বলে ...
তেইশ বছর – গার্গী লাহিড়ী... তোমার পুরোনো চিঠিগুলো জমিয়ে রেখেছি অলস দুপরে চিলেকোঠার ঘরে ভাঙা তোরঙ্গ থেকে অতি সন্তর্পনে সেগুলো বার করি , আঘ্রান নিই পচা মাছের মতো পুরোনো স্মৃ...
নষ্ট প্রেম – প্রিয়তোষ ব্যানার্জী... দু হাত দিয়ে মেখেছি তোমার লজ্জার আবীর গোপনে, নির্জনে,অন্দ্ধকারে ছুঁয়েছি শরীর - তোমার ঠোঁটের মধ্যে খুঁজেছি উত্তেজনা রক্তিম গালে পেতে চেয়েছি সুখ কামনা...
বাঙালীর দূর্গাপুজো – দীপ্তি মৈত্র... দুগ্গা পূজা ভারী মজা পড়াশুনা নাই ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখা দিন-রাত্তির ভাই। সংগে চলে “খানা-পিনা” বাহারে বাহার, মাতিয়ে রাখে কটা দিন কি মজাদার।    ছোট্ট ...
বোকা বউ ও একটা গয়নার বাক্স – পুলিশমানুষ শিবন... এই শেষ দশ দিন কল্যাণী কখনো ভুলবে না। কি থেকে কি হয়। ভাবলেও গা হাতপা ঠান্ডা হয়ে আসে। অরিন্দম আজ নার্সিংহোম থেকে ছাড়া পাবে। গত দশদিন যমে মানুষে টানাটান...
শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদে – রুমাশ্রী সাহা চৌধুরী... শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদ অনলে মোর অঙ্গ যায় জ্বলিয়া..কানে হেডফোন মনে বিরহযন্ত্রণা,চোখটা আজ বড় ছলছল করছে শ্রীরাধার। ট্রেনের জানলা দিয়ে মুখটা বাড়ায় বাইরে, সবাইক...
বটুক বুড়োর ব্যবসা – সৌম্যদীপ সৎপতি...   সব জায়গায় বিফল হয়ে বটুক বুড়ো শেষটাতে ভূত বিক্রির ব্যবসা শুরু করল অনেক চেষ্টাতে বটুক বুড়োর প্ল্যানটা বোঝা ব্যাপারটা নয় অতই সোজা এই ব্যবসায...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment