আষাঢ়ে ভূত – শাশ্বতী সেনগুপ্ত

 আকাশ এখন অনেক বদলে গেছে। বেশি সময়-টময় নেয় না আর। প্রথমেই দুহাতে এক রাশ কালো মেঘ টেনে আনে। তারপর নিজের বুকটাকে ঘন কালো মেঘে ছেয়ে দেয়। ঝটাঝট কয়েকটা বাজ ছুঁড়ে দেয়। কড় কড় কড়াৎ। শঙ্কিত করে দেয় মানুষকে। তারপরই বৃষ্টিকে বাঁধন হারা করে দেয়। এভাবেই এক অঁজ গাঁয়ে ঘনিয়ে আসে আষাঢ় সন্ধ্যা। কে যেন আনমনে গেয়ে চলে রবি ঠাকুরের গান —‘আষাঢ় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল….।’ গাঁ-টার নাম মোহিনীপুর। একেবারে অঁজ গাঁ। চারিদিকে বিস্তর গাছপালা দিয়ে সাজানো। মাঝে মাঝে অসংখ্য পুকুর। দিগন্তকে ভালোবেসে ছুঁয়ে থাকে বনানির সারি। সেখানে যখন ঝর ঝরিয়ে বৃষ্টি ধারা পড়ে তা দেখার মতো। এ সব চিত্রই তো বহু দামে শহরের বিলাসী শিল্পালয়ে শোভা পায় দেওয়াল জুড়ে। দর্শকরা আহা করে ওঠেন, প্রদর্শনীতে গিয়ে ছবি দেখেন, কেনেন। মোহিনীপুরে এখন বৃষ্টি হচ্ছে। মারাত্মক বৃষ্টি। ক্ষণে ক্ষণে গাছপালারা স্নান করে নবীন হয়ে উঠছে। মাটি আর বৃষ্টির আলাপণ চলছে বহুদিন পর। এখন আষাঢ় কিনা তাই। এই গ্রামেই ধীরে ধীরে ঘনিয়ে ওঠে আষাঢ় সন্ধ্যা। মাঠঘাট নীরব হয়ে পড়ে। রাস্তাঘাটে লোকজনের চলাচল কমে যায়। গাছপালা দিয়ে ঘেরা ঘরবাড়িগুলো ঘন অন্ধকারে শরীর লুকায়। আর বৃষ্টি বেড়ে ওঠে, ঘনঘন বাজ পড়ে। কালো মেঘ ছেয়ে রাখে সম্পূর্ণ গ্রামটাকে।

      কাদাজলে একাকার গ্রামে এই বৃষ্টির মাঝখানে সাইকেল চাপা যায় না। কাদায় আটকে যায় চাকা। ডেলা ডেলা কাদা চাকায় ঘুরতে ঘুরতে মাটগার্ডে আটকে সাইকেলকে অচল করে দেয়। হরিচরণ এই গ্রামের মানুষ। এসব কাদাজল আর দৃশ্যপট তার ছোটবেলা থেকে দেখা, চেনা। তাই সাইকেল থেকে নেমে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। গ্রামের শেষ প্রান্তে তার বাড়ি। এখন হাট থেকে ফিরছে। হাটে না গেলে তার হতো না। ক্ষেতে বিস্তর কুমড়ো করেছিল। সেগুলোকে পাইকারি বিক্রি না করলে পচে যেত ঘরে থেকে। তাছাড়া কিছু টাকা-পয়সারও প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। তাই সাইকেলে বেঁধে নিয়ে গেছিল। পাইকারি দামে সব কটাই বিক্রি করে দিয়েছে। এখন ট্যাঁকে টাকা গুঁজে বাড়ি ফিরছিল। কি করে জানবে হঠাৎ করে আষাঢ় আজ এই অবেলা থেকেই তার রূপ সাজিয়ে বসবে? অতঃপর পোল পেরিয়ে গ্রামের রাস্তায় ঢুকতে সাইকেল তার ঘাড়ে চেপে বসার উপক্রম। তবে এখনও সেটা হয়নি। আপাতত সে সাইকেলটাকে টেনে নিয়ে চলেছে। ইচ্ছা আছে বাড়ির কাছে পুকুরে নামিয়ে কাদা ধুয়ে নিয়ে বাড়িতে তুলবে। অন্ধকার রাস্তা, বৃষ্টির বেগ আর গাছপালার সঙ্গে বৃষ্টি ধারার কথাবার্তা তার মনে একটু একটু ভয় ধরাচ্ছিল। এখনও অনেকটা পথ গেলে তবেই বাড়ি। রাস্তায় একটা লোকজনও নেই। তাকে পের হতে হবে জামরুলতলাটা। এই কথাটা ভাবনায় আসতেই পিলে চমকে গেল হরিচরণের। সে দ্রুত সাইকেলটা টানতে চেষ্টা করল। কিন্তু মাটগার্ডে কাদা আটকে যাচ্ছেতাই অবস্থা। টানলেও এগোতে আর চাইছে না। রাম নাম জপ করতে শুরু করল হরিচরণ।

তার মনে পড়ল তার নামের আগে হরি আছে। কিন্তু এসবে এখন কাজ হয় না। আসলে সময়টা বড্ড বদলে গেছে যে। সে মনে সাহস এনে সাইকেল টানতে লাগল।
জামরুলতলাটার বদনাম আজ থেকে নয়, দীর্ঘদিন আগে থেকেই। মাঝারি আকারের গাছটায় এত ডালপালা আর পাতা যে ঘন থেকে ঘনতর করে রেখেছে গাছটাকে। ইয়া বড় বড় জামরুল হয়। দেখার মতো বটে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার জামরুলগুলো কেউ খেতে পারে না। যেই ডাগর হয় ওমনি গাছ থেকে নিচে পড়ে থাকে আধ খাওয়া অবস্থায়। প্রথম প্রথম পাড়ার লোকেরা এটা গাছের এক ধরণের রোগ বলেছিল। কৃষিবিদ এনে দেখিয়ে ওষুধ স্প্রে করা হয়েছিল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। উলটে যে এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাকে জামরুলগাছের তলায় মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছিল। শোনা যায়, মাঝরাতে কে যেন তার ঘাড় ধরে জামরুলতলায় নিয়ে গিয়ে বিস্তর জামরুল খাইয়ে মেরে রেখেছিল। সেই থেকে ব্যাপক বদনাম রয়ে গেছে জামরুলগাছটার এবং জামরুলতলাটার। এই জায়গাটাই তাকে পের হতে হবে। তবে সাইকেলটা রয়েছে এই যা ভরসা। কারণ সাইকেলে লোহা রয়েছে, যাকে ভূতেরা ভয় পায় বলে প্রাচীনকাল থেকে শুনে আসছে সে। হরিচরণ সেই ভরসায় সাইকেলটাকে জোরে জোরে টেনে এগোতে লাগল।

বৃষ্টি ঝরেই চলেছে, আকাশে ঘন কালো মেঘ জমে রয়েছে। আর মাঝে মাঝে দাপট দেখাচ্ছে ভীষণ গর্জন তুলে। যাতে আরো পিলে চমকে যাচ্ছে হরিচরণের। সে এগোতে লাগল। ঘন অন্ধকার একা বসে পাতার ওপর পড়া বৃষ্টির গান শুনছে। কোথায় যেন গ্যাঙর গ্যাং গ্যাঙর গ্যাং কর্কশ স্বরে ব্যাঙ বাবাজি ঘরোয়া আসর জমাতে চাইছে। বৃষ্টিতে তাদের তো মহা আহ্লাদ হয়। ক্রমে এগিয়ে আসছে জামরুলতলাটা। হরিচরণ মনে মনে নাম জপ করছে।
কাদায় মারাত্মক চাকা জ্যাম হয়ে গেছে সাইকেলটার। সেটাকে টানা ক্রমে দুর্বিসহ হয়ে উঠছে তার কাছে। কিন্তু ছাড়লে চালবে না। জোর করে সে টানতে লাগল। এমন সময় কে যেন ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে উঠলো, সাইকেলটা তো রেখে যেতে পারিস বুদ্ধু কোথাকার। এমন ভয় পেল হরিচরণ যে চিৎকার করে বলে উঠলো, কে, কে কথা বলছো? সব চুপচাপ। শুধু বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ। চারিদিক ভালো করে তাকাল হরিচরণ। নাহ, কাউকেই দেখতে পেল না। অগত্যা আবার চেষ্টা করল সাইকেলটা টানতে। কিন্তু পারল না। মনে হচ্ছে কে যেন সাইকেলটা টেনে ধরে আছে। হরিচরণ ভাবল, আর যাই হোক ভূতে সাইকেল ছোঁবে না। কারণ লোহা রয়েছে। তাহলে? সে বার দুই সর্বশক্তি দিয়ে টানতে গিয়েও পারল না। আবার কে যেন বলল, রেখে যা, ভালো হবে। হরিচরণ চমকে চারিদিক তাকিয়েও কাউকে দেখতে পেল না। কিন্তু সাইকেলটা ফেলে দিল। ভাবল, ভালোই হয়েছে, ছুটে পালাবে এবার। সে দৌড়াত শুরু করল। খানিকটা দৌড়াতে চমকে থেমে গেল এক জায়গায়। তারপরই প্রায় কেঁদে ফেললো। কি করে সে জামরুলতলায় এসে পড়ল! সে তো এদিকে আসার কথা নয়। দৌড়ে ছিল তো অন্য দিকে! এমন সময় কে যেন বলল, বুদ্ধু কোথাকার। ঘটে বুদ্ধিই নেই দেখছি। আরে বাবা, যেদিকেই দৌড়াবি ঠিক এসে পড়বি জামরুলতলাতেই। এই আষাঢ়ের বৃষ্টির রাতে এটাই তো আমার খেলা। হরিচরণ কেঁদে ফেলে বলল, কে গা তুমি? আমায় এমন ভয় দেখাচ্ছো?
হি হি করে কে যেন হেসে বলল, যাক, তুই তাহলে ভয় পেয়েছিস! আজকাল দিনকালটাই বড় খারাপ রে। কেউ ভয় পেতে চায় না। আধুনিক মগজ এমন হয়ে গেল কেন কে জানে। ওই দেখ  না জামরুলগাছটা, চেয়ে দেখ নারে একটু। হরিচরণ ঘন বৃষ্টি আর অন্ধকারে জামরুলগাছটার দিকে হাঁ করে তাকাল। তারপরই চমকে উঠলো। থোকা থোকা জামরুল ঝুলছে গাছটার ডালে ডালে। এ সময় কি জামরুল হয়! অঁজ গাঁয়ের ছেলে হয়েও বেমালুম ভুলে গেল হরিচরণ। আর তখনই কে যেন বলল, কিছু না করলে তো কিছু করার আইন নেই আমাদের জগতে। ও খোকা শুনছিস? হরি চমকে উঠলো। কে তার ডাক নাম ধরে ডাকল! চারিদিক তাকাল। কেউ কোথাও নেই তো? আবার একবার দৌড়াতে চেষ্টা করল হরি। কিন্তু পারল না। কে যেন তার পা দুটো এখানের মাটির সঙ্গে গিঁতে দিয়েছে।

আবার কন্ঠটা শুনল সে মানে হরি। কে যেন বলছে, বহুদিন হয়ে গেল এই জামরুলতলাটায় কেউ আসে না আর। ভয় পায়। কাউকে বাগে পেয়ে আনতেও পারিনি কারণ সেই পরিবেশ পাওয়া যায়নি। আজ ঘন আষাঢ়ের রাতে তোকে পেলাম রে। তাই লোভ সামলাতে পারলাম না। দীর্ঘদিন জামরুলতলাটা ভয়হীন থাকলে আমরা যাই কোথা বল। আমাদের অস্তিত্ব বজায় থাকবে কি? হরি কথাগুলো শুনে হাউহাউ করে কেঁদে উঠলো। তারপরই হঠাৎ থেমে গেল। চারিদিকে তাকাল। কেউ কোথাও নেই। বৃষ্টির বেগ আরো বেড়েছে। ও জামরুলগাছটার ওপর দিকে তাকাল। থোকা থোকা জামরুল ঝুলছে। অবাক হল হরি। আষাঢ় মাসে তো জামরুল হয় না! তাহলে? কিন্তু তার ভাবনায় কে যেন বাদ সাধলো। সে হাঁ করে আবার তাকাল জামরুলগাছটার দিকে। খাবার ইচ্ছা জাগলো তার। পাড়বে কি করে! এদিক ওদিক তাকাতেই কয়েকটা ইট দেখতে পেয়ে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিল। এক রাশ জামরুল তার পায়ের কাছে পড়ল। সে হাতে তুলে নিতেই বুঝতে পারল, কে যেন তার গলা টিপে ধরছে, তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। ভাবনাটা আবার এল, মস্ত ভুল তার। আষাঢ় মাসে জামরুল তো হয় না! ভাবনাটা শেষ হতেই শুনতে পেল হি হি হাসি। তারপর আর কিছু মনে নেই। এখন সে জামরুলগাছের মগডালে বসে বাদলা বাতাস খাচ্ছে। এমন সময় দেখতে পেল একটা কালো ঢ্যাঙা ছায়াকে। ঠিক তার মত দেখতে। সে বলল, আমি চললুম, এবার থেকে জামরুলগাছের দায়িত্ব তোর। বদনাম বজায় রাখতে হবে তোকে। হি হি হাসিতে ভেসে গেল দুর্যোগ ঘন আষাঢ়ের রাত।একা জামরুলগাছে বসে পা দোলাতে দোলাতে হরিচরণ ভাবল, এই দায়িত্ব সে নেবে না। নতুন কাউকে জোগাড় করতেই হবে। সে ঝপাং করে লাফিয়ে নামল মাটিতে জামরুলগাছ থেকে। তার মধ্যেই পেরিয়ে গেছে কত শত বছর।
আজও আষাঢ়। সে ভাবেই বৃষ্টি পড়ছে। একজন গ্রামবাসী অন্ধকার পথ দিয়ে এই দুর্যোগের রাতে ওই ওদিকে চলে যাচ্ছে। হরি ভাবল, ওকে পথ ভুলিয়ে এই জামরুলতলায় নিয়ে আসতেই হবে। তারপরই হি হি করে হেসে উঠলো। ঠিক যেমন আগের ভূতটা তাকে এনেছিল।
কে জানে একেই বলে বোধহয় আষাঢ়ে গল্প।

____


FavoriteLoading Add to library
Up next
বিজলী বাতি – গার্গী লাহিড়ী... আশির পঁচাশি রামবাবু গুপ্তা লেনে ভাড়া করা ছোট ঘরে মায়ের সাথে থাকে দুই বোনে , নামের বাহার লিলি ও রূপালী মায়ের নাম কুমারী বিজলী | অবাক হচ্ছো  ? মা ...
রিভিউ – এক যে ছিল রাজা – অন্বয় গুপ্ত... ২০১১ সালে সুভাষ ঘাইয়ের প্রযোজনায় ঋতুপর্ণ ঘোষ ' নৌকাডুবি ' সিনেমাটা বানিয়েছিলেন। আমরা তখন স্কুলে পড়ি। তদ্দিনে সৃজিত মার্কেটে চলে এসেছেন। সেই সিনেমায় ট...
নতুন ঘরের খোঁজে একে চন্দ্র, দুই-এ পক্ষ... সংখ‍্যার সাথে আমাদের প্রথম পরিচয় শৈশবে প্রায় সবারই এভাবে হয়েছে। আর এই মজার ছন্দে নয়-এ আসে "নবগ্রহ"। হিন্দু শাস্ত্রমতে নবগ্রহ...
নরক থেকে স্বর্গ – বিভূতি ভূষন বিশ্বাস... চায়ের দোকানে গল্পগুজব করতে করতে হঠাৎ অমল বাবু কথা প্রসঙ্গে বলেই ফেললেন "আরে বিশ্বাস বাবু আপনি তো এ যুগের কর্ন ।"কথাটা শুনেই আমার মনে কেমন বিদ্যুৎ ...
তবু ভালোবাসি – সায়ন্তনি ধর... ।। ১।। -“হ্যালো মা, আমি সুমি বলছি। আমরা পৌঁছে গেছি, তুমি চিন্তা কর না, রনি সবসময় আমার সাথেই আছে” মা কে কথা গুলও বলে ফোনটা রেখে আবার রনজয় কে ফোন করল স...
সামলে রাখো জোছনাকে …..... "---সামলে রাখো জোছনাকে" "ও চাঁদ, সামলে রাখো জোছনাকে ", ওই জোছনা তোমার কেন আবার, আমায় পিছন থেকে ডাকে।। জোছনার ফাঁদে পা দিলেই যাবো সর্বনাশের ফাঁকে, ঝ...
শাসন - সরোজ কুমার চক্রবর্ত্তী   ড্যাডি বলে প্রফেসার মম্  বলে ডাক্তার দাদু , দিদা বলে ভাই হতে হবে অফিসার l বই আর খাতা নিয়ে কাটে সারাক্ষণ, ভাল...
একটা রাত – মুক্তধারা মুখার্জী...  উফফ! আজকে একটু বেশীই রাত হয়ে গেলো। এখন তো কোনো ট্যাক্সিও পাবো না। আর মেইন রাস্তার মোড় অব্দি না গেলে ওলাগুলোও আজকাল ঠিকঠাক পাওয়া যায় না। নাঃ! হাঁটতেই ...
ভালো থেকো বাবা - মুক্তধারা মুখার্জী   “কি ব্যাপার? হঠাৎ এখানে? এতদিন পর ?” “কেন বাবা আমি কি আসতে পারিনা ? তোমার কথা খুব মনে পড়ছিলো,তাই....” “থাক,থাক।মিথ্য...
পণ্যগ্রাফি -কৌশিক প্রামাণিক বোনটি তো আমার সেদিনই কেঁদেছিল যেদিন ও প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছিল, লোভী চোখের দৃষ্টিগুলোতে চিন্হিত হলো সে মেয়ে তখন জন্মেই তাকে শুনত...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment