ইগো

‘আমি তো বলছি আই ডোন্ট ওয়ান্ট এনি কমিটমেন্ট নাও।’
‘তাহলে আর কবে পারবি তুই? কেন বুঝছিস না অনল? বাড়ি থেকে অলরেডি ছেলে দেখা স্টার্ট করে দিয়েছে।’
‘তো আমি কি করবো?’
‘মানে? এখানে সত্যি তোর কিচ্ছু করার নেই?’
‘দেখ জিয়া, তুই জানিস আমার কন্ডিশন। টুকটাক আঁকার টিউশনি করে কি সংসার চালানো যায়?’
‘তোকে তো কতবার বলেছি, বাপির কোম্পানির হয়ে ব্যানার গুলো বানিয়ে দে, একটা এসট্যাবলিসমেন্ট তো হবে।’
বেঞ্চ থেকে উঠে পড়লো অনল। রাগে চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে।
‘তোকে অনেকবার বলেছি, আমি কারোর দয়ার পাত্র হয়ে থাকতে পারব না। বারবার এক কথা বলে কি পাস বলতো?
‘আমি কিছু পাই না রে। তোকে পাইয়ে দিতে চাই। আর তাতেই আমার শান্তি। কিন্তু আফসোস, তুই বুঝবি না। অনেক হয়েছে, বাট আর নয়।’
কোনোদিকে না তাকিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেল জিয়া। প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে, বুকটা এবার ফেটেই যাবে। অনল ওকে কোনোদিন বুঝতে চাইলো না।

 

জিয়া আর অনলের রিলেশনশিপ পাঁচ বছরের। তখন দুজনেই ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছে। সাবজেক্ট আলাদা হলে কি হবে,কলেজ আসা যাওয়ার রুট টা একই ছিল। জিয়াকে বাসে বসার জায়গা করে দিতে দিতে বন্ধুত্বের শুরু। অনেক মিল দুজনের। পছন্দের রং হোক বা পছন্দের গান, দুজনে একসাথে হলে সারা বাসের লোক যেন হা করে থাকতো। অফ পিরিয়ডে চুটিয়ে আড্ডা দেওয়া, সারা কলকাতা ঘুরে বেড়ানো, রেস্টুরেন্ট এড়িয়ে স্ট্রিট ফুডে পেট পূজো সারা, হোল নাইট পায়ে হেঁটে ঠাকুর দেখা, ধর্মতলার ফুট থেকে মার্কেটিং করা এসবের মধ্যে দিয়ে সম্পর্কটা বন্ধুত্বের গন্ডি পেরিয়ে ভালোবাসার মোড়ে পৌঁছে গেছিল। অনলের মা বাবা অনেক ছোটবেলায় মারা যায়, মামাবাড়ীতে মানুষ। যার ফলে ওর উপর অদ্ভুত একটা মায়া জন্মে গেছিল জিয়ার। জিয়াদের বাড়ি আসা যাওয়াও হত অনলের। ওর মা বাবা একপ্রকার মেনেই নিয়েছিল কিন্তু অনল সবটা সহজ ভাবে মেনে নিতে পারেনি। সেটা প্রথম বার জিয়া বুঝতে পেরেছিল ওদের ফ্যামিলি গেট টুগেদারের সময়।
‘ভবিষ্যতের প্ল্যানিং কিছু করেছ অনল?’, ছাদের এক পাশে দাঁড়িয়ে জিয়ার বাবা প্রশ্নটা করলেন।
‘পেন্টিং টা নিয়েই তো এগোবো।’
‘জানি, কিন্তু কি করতে চাও? আই মিন জব অর এনিথিং এল্স?’
‘ভাবিনি এখনো সেভাবে।’
‘একটা কথা বলি? তুমি তো আমাদের ছেলের মতো। আমি বলি কি, আমার কোম্পানি জয়েন করে নাও। ব্যানারের পার্টটা তুমিই সামলিও। আমার তো বয়স হচ্ছে, একা আর কত সামলাবো? তোমাকেই তো দেখতে হবে তাই না?’
‘এক্সকিউজ মিঃ!’, জিয়ার বাবার হাতটা একপ্রকার সরিয়ে দিয়ে নীচে চলে গেল অনল। সেখান থেকে সোজা রাস্তায়। জিয়াকে না জানিয়েই ওর বাড়ি থেকে চলে গেছিল সেদিন। মেনে নিতে পারেনি কারোর দয়ার পাত্র হয়ে থাকাটা। তারপর থেকে প্রায়ই ওর আর জিয়ার মধ্যে খুঁটিনাটি বিষয়ে ঝগড়া শুরু হয়। জিয়া যখনই অনলকে সেটেলমেন্ট, ফিউচার নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করে, অনলের হাবভাব পুরোপুরি পাল্টে যায়। ও নিজেও বুঝতে পারে না ওর কেন এমন হয়? জিয়া ওর ভালো চায়, সেটা অনল বোঝে কিন্তু ঐ মুহুর্তে মারাত্মক রিঅ্যাক্ট করে ফেলে। এভাবেই জোড়াতালি দিয়ে চলছিল সম্পর্ক টা কিন্তু আজ একেবারে কিনারায় এসে পৌঁছালো।
পার্ক থেকে ফেরার পর আর কথা হয়নি দু’জনের। অনল কয়েকবার ফোন করেছিল কিন্তু জিয়া ধরেনি। অগত্যা জিয়ার ল্যান্ডলাইনের নম্বরটা ডায়েল করল, কিছুক্ষণ বাজার পর জিয়ার মা ধরলেন।
‘কে বলছেন?’
‘কাকিমা আমি অনল। জিয়াকে একটু ডেকে দেবেন?’
‘জিয়া এখন ব্যস্ত, ডাকা যাবে না। আর দ্বিতীয় দিন তুমি ওকে বিরক্ত করবে না। ‘
কিছু বলার আগেই অনল বুঝল ফোনটা ডিসকানেক্ট হয়ে গেছে।

দেখতে দেখতে দু’মাস কেটে গেছে। অনল এখন একটা মেসে থাকে। মামা মামী সব দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে দিয়েছে। চাকরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অনল কিন্তু কিছুতেই জোগাড় করতে পারছে না। টিউশনি ও কমে গেছে, এক একটা দিন চালানো কষ্টকর হয়ে উঠছে। শরীর ভাঙছে, আর মন? সে তো এখনও জিয়ার কাছেই গচ্ছিত আছে। জিয়ার সাথে আর দেখা হয়নি। অনেক চেষ্টা করেছিল যোগাযোগ করার কিন্তু কোনোভাবে পৌঁছতে পারেনি জিয়া অবধি। তবে খবরটা পেয়েছিল জিয়ার এক ফ্রেন্ডের থেকে। জিয়ার বিয়ে হয়ে গেছে। আড়ম্বরহীন ভাবেই হয়েছে কারণ জিয়া চাইনি ওর বিয়েটা ধুমধাম করে হোক। কেউ না বুঝুক অনল অন্তত জানে এর কারণটা।

ফাইনালি নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে অনল আজ একটা ইন্টারভিউতে অ্যাপিয়ার করতে চলেছে। পেপারে অ্যাড বেরিয়েছিল, একটা ব্যানার কোম্পানি নিউ ট্যালেন্ট দের হায়ার করছে। জীবনে অনেক টা দেরি করে ফেলেছে অনল, তাই আর না ভেবে পরদিন মানে সোমবারেই হাজির হলো কোম্পানির অ্যাড্রেস ধরে। খুব বেশি ভিড় ছিল না, কারণ এখন লাঞ্চ আওয়ার। অগত্যা অনলকে রিসেপশনে অপেক্ষা করতে হল। পাশে আর একজন ক্যান্ডিডেটের সাথে কথোপকথনের মাধ্যমে জানতে পারল কোম্পানি টা নতুন,মাস ছয়েক হল ওপেন হয়েছে। মালিক একজন বাঙালি, দীপেশ বাগচী। দু এক কথা হতে হতে লাঞ্চ ব্রেক শেষ হলো। পাশের ছেলেটির কল এলো। অনল চুপচাপ বসে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে এমন সময় একটা ঝটকা লাগলো। মেইন গেট দিয়ে একজন ভদ্রমহিলা বেরিয়ে যাচ্ছেন। চুলটা মুখের উপর পড়ায় ভালোভাবে বুঝতে পারলো না অনল কিন্তু ওর মনে হল ও জিয়াকে দেখল। পিছু নেওয়ার আগেই ওর কল চলে এলো।
এমডির রুমটা বেশ ওয়েল ডেকরেটেড। খুব সুন্দর সুন্দর পেন্টিং এ দেওয়াল সাজানো, টেবিলে ফুলদানিতে জারবেরা রাখা। সবটাই কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে অনলের, সব মিলে যাচ্ছে জিয়ার পছন্দের সাথে।
‘মিঃ অনল?’
‘ই-ইয়েস স্যার!’, থতমত খেয়ে উত্তর দিলো অনল।
‘স্যাল উই স্টার্ট? সো ফার্স্ট…’
কথা শেষ হলো না মিঃ বাগচীর। ঘরে কেউ ঢুকেছে, অনল পিছন ঘুরতেই তিনি দরজার কাছেই আটকে গেলেন।
‘কি হলো জিয়া? ফিরে এলে যে! কিছু ভুলে গেছ নাকি?’
জিয়া একদৃষ্টে অনলকে দেখছে। অনলের দৃষ্টি আটকে গেছে। জিয়াকে সিঁদুর পরে দেখার ইচ্ছা ওরও যে প্রবল ছিল। আজ দেখল, কিন্তু সিঁদুরে নামটা অন্য কারোর লেখা। উঠে দাঁড়ালো অনল।
‘সরি, বাট আই থিঙ্ক আই অ্যাম নট স্যুটেবল ফর দিজ জব।’
দীপেশ কিছু বলার আগেই তীরের গতিতে বেরিয়ে গেল অনল। একবার মনে হলো জিয়া ওকে ডাকছে, থামতে বলছে। কিন্তু অনল যেন এ জগতেই নেই। জবলেস লাইফ, স্ট্রাগল, এসট্যাবলিসমেন্ট এসবের কোন অস্তিত্ব নেই ওর জীবনে। শুধু একটা জিনিসই ওকে গ্রাস করেছে, ইগো। যা ওকে আজীবনকাল হয়ত কুড়ে কুড়ে খাবে। এর হাত থেকে কি কোন নিস্তার নেই?


FavoriteLoading Add to library
    Up next
    মুখরোচক দইয়ের চপ বানিয়ে ফেলুন সহজেই – মালা ... কথায় আছে 'যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে,' | তবে আমাদের অর্থাৎ গৃহিণীদের কাছে এই প্রবাদবাক্যটি হয়তো তেমনভাবে খাটে না মূলত আমাদের সন্তান এবং পতিদেবতার সৌজন্যে ...
    নিয়মিত জীবন-যাপন - সমর্পণ মজুমদার   জীবনে অনেক কিছুই করতে ইচ্ছে হয় আমাদের। যা দেখেই আমরা অনুপ্রাণিত হই, সেটাই করতে ইচ্ছে করে। সেটা যে কোনো নির্দিষ্ট একটা বিষ...
    মায়ের টানে – সমর্পণ মজুমদার... বাড়ি যাবার সকালের ট্রেনটা ধরতে গেলে আমায় সাড়ে চারটে থেকে পৌনে পাঁচটার মধ্যে বাস ধরতে হয়। দারুন একটা রোমাঞ্চ হয়। তার উপর এখন আমি পুজোয় বাড়ি যাচ্...
    মুক্তির গন্ধ – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়...  কত রকম না আশ্চর্যের ঘটনা ঘটে। কোনও কোনও সময় মনে হয়, এগুলো কি সত্যি নাকি নিছক মনের ভুল সব। কে জানে। কিন্তু ঘটনাটা অস্বীকারও করা যায় না। সময়টা বসন্তকাল...
    মন মিলান্তি(পর্ব-৪~শেষ পর্ব)... #মন_মিলান্তি_পর্ব_৪ #মুক্তধারা_মুখার্জী #চরিত্র_ঘটনা_কাল্পনিক,#মিল_খুঁজে_পেলে_লেখিকা_দায়ী_নন😊 বমিটা হওয়ার পর থেকেই শরীরটা কেমন করছিল যেন শ্রেয়সীর। ত...
    রূপকথার বালিকার কল্পনায় – সৌমিক মান্না... একদিন আমি খেলার ছলে হারিয়ে গেলাম মেঘের দলে, হঠাৎ এক মেঘের ছায়া পড়লো আমার চোখের জলে তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে প্রশ্ন করলাম কৌতূহলে "বলো তো মেঘবালক,সোনার ...
    দেশগাথা – সমর্পণ মজুমদার...     এই সেই দেশ, ভূমিতে যাঁহার সকল জাতির ধূলি- সুনিপুণভাবে মিশিয়াছে মহা মিলনের রব তুলি। এই সেই দেশ ঐক‍্য যাঁহার আজনম মহাব্রত, সে ব্রত...
    বাজারে বিপত্তি -গার্গী লাহিড়ী রবিবারের সকাল বেলা চায়ের কাপ নিয়ে সবেমাত্র আয়েশ করে বসেছি । ভাবছি মুখপুস্তিকায় চোখ রাখবো নাকি খবরের কাগজে ? এমন সময় বিনা মেঘে বজ্রপা...
    স্বপ্নশিশু – সুরজিৎ সী... আজও তোমাকে দেখি রক্তলেখা- প্রাচীরে প্রাচীরে মধ্যবিত্তের দেওয়ালে ইলেক্ট্রিক খুঁটিতে চায়ের দোকানে দৈনিক আনন্দবাজারের পাতায় পাতায়। গাছের বাকলে, শ...
    একটি ছেলে - দীপ চক্রবর্তী ছোট্ট একটি ছেলে ক্রিকেট খেলবে বলে হাতে ব্যাট নিয়ে অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে, কোনও একটি দূরের মাঠে... শচীন হ‌ওয়ার স্বপ্ন তার যে চোখে মুখে,...
    Sweta Mallick

    Author: Sweta Mallick

    2
    Comments

    Please Login to comment
    2 Comment authors
    Sweta MallickOindrila Dutta Recent comment authors
    newest oldest most voted
    Oindrila Dutta
    Member

    অসাধারণ ভাল লাগল গল্পটি।