একটি বিয়ের গপ্প – অভিনব বসু

নায়িকার গল্প দিয়ে শুরু করি। কোলকাতারই মেয়ে, এলাহাবাদের এক ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে, ছেলে না বলে লোক বলাই ভালো; বছর ৩৭-৩৮ বয়স, তায় দোজবর। যদিও মেয়ের সেরকম কোন আপত্তি ছিল না, থাকলেও কেই বা শুনত! সেই লোকটি তো বিয়ের সব খরচ খরচা বহন করছেনই, গায় গহনা পর্যন্ত তিনিই দিচ্ছেন। সেই সময় বামুন ঘরের মেয়ের বিয়ে দেবার ঝক্কি যদি জানতেন। বিয়ের তারিখ ঠিক হয়েছে ২০শে জানুয়ারি, ১৯৩৮; আশীর্বাদ ও হয়ে গেছে। এদিকে হবু বর বাবাজীর কি শখ চড়ল, তিনি হবু বৌকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যাবেন। সেই সময়, হবু বর বৌ একসাথে সিনেমা দেখতে যাবে, সেটাও আবার শ্বশুর বাড়ির সম্মতি নিয়ে, ভদ্রলোকের সাহস খানা ভাবুন একবার। হু হু বাওয়া, ট্যাঁকের জোর থাকলে কি না হয়, তারপর সে বিয়ের খরচাই তো বাবাজীবন দিচ্ছেন, সম্মতি মিলে গেল।

সিনেমা দেখতে চললেন দুজনে; শান্তারামের ছবি, “দুনিয়া না মানে”। গল্পের বিষয় বস্তু বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা নিয়ে। বিয়ের পর সেই ছবির হিরো ভদ্রলোকের তো তিতি বিরক্তি অবস্থা মশাই, না পারে গিলতে, না উগলাতে। শান্তারাম তাঁর ছবিতে সর্বদাই সমাজ সংস্কার মুলক বার্তা রাখতে চান, এখানে কি বার্তা রাখতে চেয়েছিলেন জানা নেই, তবে বর বাবাজী বার্তাহীন হয়ে পরেছিলেন। সেই রাত্রেই বাবাজীবন সবার চোখের আড়ালে একটি চিঠি আর সেই মেয়ের জন্য কিছু গহনা রেখে ফুড়ুৎ।

বাড়ির লোকের সকালে মাথায় হাত, সেদিন জানুয়ারির তেরো তারিখ, আর মাত্র সাত দিন বাকী। বাড়ির থেকে লোক পাঠান হল, যেখান থেকে পার, যাকে পার ধরে নিয়ে এস, ২০ তারিখেই মেয়ের বিয়ে হবে। পয়সা নাহয় নেই, তাই বলে বনেদীয়ানা তো আছে।

লোক চারিদিকে ছড়িয়ে পরেছে বর খুঁজতে। এরকমই এক বর খোরতা (সমাসঃ বর খোঁজার কর্তা, আজে বাজে সমাস) হাঁপিয়ে এক চায়ের দোকানে চায়ে চুমুক আর সিগারেটে সুখটান দেবেন কি দেবেন না দেখেন সামনে দিয়ে তারই এক চেনা ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে চলেছে। ধরুন লোকটির নাম রমেশ, আর আমাদের খোরতার নাম সুরেশ। তো সুরেশ ডাক দিল,

–   রমেশ।

–   আরে সুরেশ।

–   ফাইভ স্টার নেই দোকানে, চা খাবি?

–   হ্যাঁ খাওয়া, তোর কাউন্টার টা দিস, বড্ড ঝামেলা চলছে।

–   নে, ধর। তোর আবার কিসের ঝামেলা?

–   আর বলিস না, আমাদের এক বন্ধুর ছেলে বিয়ে ঠিক ২০ তারিখ, কিন্তু কে যা শালা কাঠি করেছে! মেয়ের বাড়ি চিঠি গেছে, ছেলে চরিত্রহীন। আরে, ফ্লাশ খেলা কি চরিত্রহীনতা?

–   সে কি? ছেলে কি বামুন, কায়েত না বদ্যি?

–   বামুন।

–   বারেন্দ্র?

–   হ্যাঁ, কেন হাতে পাত্রী আছে নাকি?

–   আরে পাত্রী আছে মানে, আমি তো তার জন্যই পাত্র খুঁজতে, সে বেটিরও বিয়ে ভেঙ্গেছে।

এই ভাবেই হল দুই বাড়ির বিয়ের প্রাথমিক কথাবার্তা, পাত্রপক্ষ নাক উঁচু বনেদী বড়লোক, বিয়েতে কিছুই নেবে না, পাত্রীপক্ষ তো হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। দুই পক্ষের ছেলেমেয়ে দেখাদেখি হল, নাকের বদলে নরুন নয় এ বুড়োর বদলে ছোকরা জামাই পেয়ে হবু শ্বশুর তাইরে নাইরে করে নেচেছিলেন কিনা জানা যায়নি, তবে “বাবা জামুই তুমি এয়েচ” যে বলেননি সে নিশ্চিত।

           যথা সময়ে লগ্ন মেনে বিয়েটি তো হল, কিন্তু ওই ছোকরা বরের মনে রয়ে গেল একটু খচ-খচ। তার বৌ কিনা এসেছে এ বাড়িতে আগের ঠিক হওয়া বরের দেওয়া গয়না পরে, মানে ধাঁধার চেয়েও জটিল। ছোকরা বর তাকে অনেক বোঝাল, দেখ বাপু, পরের দেওয়া জিনিসপত্র নিজের কাছে রাখা ঠিক নয়, আমায় দাও, আমি পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করছি,মেয়েটিও ভাবল ঠিক কথা। হাতে গয়না পেয়েই ছোকরা সেগুলি বিক্রি করে আগে তার ফ্লাশের ধার আগে শোধ করল।

         সেদিনের সেই নব্য বধূর নাম কমলা এবং মহান ছোকরা বর বাবাজীর নাম শ্রী বিকাশ রায়।

            বিকাশ রায় ছবিতে ভিলেনের পার্ট করলে কি হবে, জীবনে বেশ রোম্যান্টিক মানুষ ছিলেন, আর সুচিত্রা সেনের প্রতি দুর্বলতা নিয়ে কমলা দেবী তো কপট রাগও দেখাতেন মাঝে মাঝে। একবার তো বলেই দিলেন সুচিত্রা সেনের দুর্বলতার কারণে নাতির নাম রাখা হয়েছে তার নামের সাথে মিল করে। বিকাশ রায়ের মুখ দিয়ে তো কথা আর বেরোয় না, “বল কি, নাতির নাম দিয়েছি সুমিত্র- মানে সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়ের উপর আমার দুর্বলতা”।

তিনি বললেন, “থামো, সুচিত্রার ভাই সুমিত্র, ওসব নামের মিলের জন্য”।

বিকাশবাবুর বাবা বিয়ের ছবি দেখে বলেছিলেন যে, “প্যাগোডা মাথায় দিয়ে বসে আছে যেন একটা বাঁদর। বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা ঝোলালাম, কিছুমাত্র বুদ্ধি শুদ্ধি যদি থাকে যত্ন করে রাখবে”।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করি, পরবর্তী জীবনে বিকাশ বাবুর সহ শিল্পী কালী সরকার, এই বিয়ের গল্প শুনে আবিষ্কার করলেন যে, ওই পাত্রী পক্ষের বাবা তাঁর বিশেষ বন্ধু এবং ওই চিঠি দেখে তিনিই বিশেষ চাপা চাপি করেছিলেন বিয়ে ভেঙ্গে দেবার জন্য, যা রটে তার কিছুতো ঘটে এসব বলে; তারপরই একটু দেঁতো হেসে বলেছিলেন, “সে ভালোই হয়েছে, তোর কৌটো করে খাবার নিয়ে আসা আর সন্ধ্যা হতে না হতে বাড়ি ফিরে যাবার তাড়া দেখেই বোঝা যায়, বেশ সুখেই আছিস”।

সত্যি বাবার কথা রেখেছিলেন বিকাশ বাবু, এভাবেই হাসি ঠাট্টায় কাটিয়ে দিয়েছেন তাঁদের সারা জীবন।

(ঘটনাগুলি সত্য, কিন্তু বিভিন্ন ঘটনার নাট্য রূপ ও সংলাপ লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব সৃষ্টি এবং মুল ঘটনার সাথে সুত্রধর ছাড়া এদের আর কোন যোগাযোগ ও যোগ্যতা নেই।)


FavoriteLoading Add to library
Up next
অবশেষে খুঁজে পেলাম তোমাকে... -অর্পিতা সরকার    আর যাই করিস ওই মেয়ের দিকে ভুলেও তাকাস না সৌম্য, একবার যদি তোর লাইফে ঢোকে তাহলে তোর কেরিয়ার ফিউজ হয়ে যাবে গুরু। শত হস্ত দূরে থাক ওই...
গল্পকার ভোলা- প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়...   কি মুশকিল, ভোলা পড়েছে সমস্যায়। জীবনে কোনওদিন তার মা-বাবা তাকে পায়ে বেড়ি দিতে পারেনি। যখন যেখানে মন চেয়েছে সে চলে গেছে। ভবঘুরে মানুষ ভোলা। সংসা...
মহালয়া – মুভি রিভিউ... মহালয়াপরিচালক - সৌমিক সেন বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হল মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে মহিষাসুরমর্দিনী শোনা। ১৯৩১ সাল থেকে শুরু হয...
নেতাজী-একটি আগুন – প্রসেনজিৎ মূখার্জী... ছোটবেলায় ছোট্ট মনে আসতো ভেসে শুধুই স্বাধীনতার￰￰ মানেটা কি? সকলকে কেবলই তা শুধোই একটু বড়ো হলে পরে মায়ের কোলে শুয়ে একটি ছবিই আসতো ভেসে বইয়ের পাতায় চ...
শিব শম্ভু ত্রিপুরারি – শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়... আমি দক্ষিণ কলকাতার ছেলে | তাই প্রতিবার যাওয়া হয় না দক্ষিণ কলকাতার পুজোয় | কিন্তু অনেকবারই গেছি ছোট থেকে | বাগবাজারের সাবেক ঠাকুর দেখার আকর্ষণ তো থাকেই...
অমানুষ, এক অমর উত্তম গাথা-... - অস্থির কবি (কল্লোল চক্রবর্ত্তী) (উত্তম পর্ব ২) উত্তম কুমারের প্রায় শেষ দিকের অভিনয় জীবনের এক মাস্টার স্ট্রোক হল - "অমানুষ"। এই ছবির পর তিনি বম্বেত...
অন্ত্যমিল – মধুপর্ণা ঘোষ... অধিকাংশ সময় ছন্দহীন বাক্যগুলো ভীষণরকম ছন্নছাড়া; অন্ত্যমিলের খোঁজ যেটুকু বা ছিল সেটুকুও আজ আতিশয্য! তবুও হঠাৎই মিলে যায় শেষ শব্দগুলো - যেমন হঠা...
ভুলেও থাকবেন না স্যার – শাশ্বতী সেনগুপ্ত... বাসটা গিয়ে যখন গুমটিতে থামলো, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে। শীতের সন্ধ্যে তাই লোকজন ও তেমন নেই,  বিমল বাস থেকে নেমে বুঝতে পারছে না কোন দিকে যাবে। ড্রাইভ...
মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ, অন্যভাবে... -   অনুজিত দাস  আমরা সবাই যখন মুর্শিদাবাদ তথা হাজার দুয়ারী ঘুরতে আসি এবং সময়াভাবে শুধুমাত্র গঙ্গার পূর্বের দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থানগুলি এবং নবনির্মিত...
মুখরোচক দইয়ের চপ বানিয়ে ফেলুন সহজেই – মালা ... কথায় আছে 'যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে,' | তবে আমাদের অর্থাৎ গৃহিণীদের কাছে এই প্রবাদবাক্যটি হয়তো তেমনভাবে খাটে না মূলত আমাদের সন্তান এবং পতিদেবতার সৌজন্যে ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment