ওদের তো মন আছে, শরীর আছে – তুষার চক্রবর্তী

(১)

সৌনক আটটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে নিজের হাতে চা বানিয়ে নিয়ে, এসে বসেছে তার আট তলার ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে। সঙ্গে গত সোম থেকে আজ রবিবারের খবরের কাগজ। চা টা শেষ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে হাতে তুলে নেবে গত সোমবারের খবরের কাগজ। একে একে সে পড়বে সাত দিনের কাগজ। অবশ্য সব খবর পড়ে না, বেছে বেছে পড়ে। তাও রবিবার এই সাত দিনের কাগজ পড়তে তার বেলা সাড়ে দশটা বেজে যায়। আসলে রোজ তার পক্ষে খবরের কাগজ পড়া সম্ভব হয় না। রাত্রে টি ভি দেখারও প্রশ্ন নেই। সেই সকাল সাড়ে আটটায় স্নান করে চা খেয়ে বেরিয়ে যায় আর ফেরে রাত নটায়। জল খাবার আর লাঞ্চ ফ্যাক্টরির ক্যান্টিনে। রাতের ডিনার প্যাকেট আসে রাত দশটায় স্থানীয় হোটেল থেকে। ডিনার প্যাকেট আসার আগে সৌনক জামা, প্যান্ট ছেড়ে স্নান করে নেয়। রাত্রে হোটেলের খাওয়ার খেয়ে আধ ঘন্টা, কখনও কখনও এক ঘন্টাও মোবাইলে কথা বলে হৃসভের সাথে। অবশ্য রবিবার বেলা এগারোটা থেকে রাত পর্যন্ত ভালো কাটে হৃসভের ফ্ল্যাটে। বেলার দিকে স্নান করে সৌনক চলে যায় হৃসভের ফ্ল্যাটে। হৃসভের নিজের হাতের রান্না দুপুরে আর রাত্রে জোটে সৌনকের। হৃসভ রোজ নিজের হাতেই রান্না করে। ওর পক্ষে সম্ভব। ও সৌনকের মত ফ্যাক্টরিতে আট ঘন্টার চাকরি করে না। আর ওর অফিসও সৌনকের মতো কোলাঘাটে নয়। ওর ডিউটি দশটা থেকে পাঁচটার, তাও আবার পার্ক স্ট্রিটে। অফিস পৌঁছতে আধ ঘন্টা লাগে মেট্রো ধরলে।

ছ তারিখের কাগজটা শেষ করে সৌনক একটা সিগারেট ধরিয়ে হাতে নিল সাত তারিখের কাগজটা। প্রথম পৃষ্টা চোখের সামনে মেলে ধরতেই সে অবাক হয়ে গেল বড় বড় হেড লাইনটা পড়ে,”সমকামিতা আর ভারতে অপরাধ নয়”। সৌনক সিগারেটে একটা লম্বা টান মেরে পড়তে লাগল খবরটা। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই তার পড়া শেষ হয়ে গেল। নিজের মনেই বলে উঠল,’হৃসভ কি পড়েছে খবরটা?’ বারমুডার পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে হৃসভকে ফোন করল। হৃসভ ফোনে “হ্যাঁ বল”, বলতেই সৌনক বলে উঠল,’ গত ছ তারিখ সুপ্রিম কোর্টের ভারডিক্টটা শুনেছিস?’ ওপাশ থেকে হৃসভ বলল,’ কার কাছে শুনব? তাছাড়া তোর মত আমি খবরের কাগজ পড়িনা। আর গত একসপ্তাহ হলো আমি সোশ্যাল মিডিয়াও ফলো করিনি।’ সৌনক বলল,’ না পড়লেও, তোর ঘরে খবরের কাগজ তো আসে। গত সাত তারিখের প্রথম পেজটা একবার পড়ে দেখ। তারপর কথা হবে।’ সৌনক এই কথা বলে মোবাইল ফোনটা কেটে দিয়ে পকেটে রেখে আবার খবরটা পড়তে শুরু করল।

আর একবার খবরটা পড়ে, কাগজটা পাশে রেখে সে একটা সিগারেট ধরাল। একে একে তার মনে পড়তে লাগল তার ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠা পর্যন্ত সব ঘটনা গুলো। সেই স্কুল, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হোস্টেল লাইফ, হৃসভের সাথে মেলামেশা শুরু করা, বাড়ি ছেড়ে চলে আসা, সব কিছু।
সৌনক যখন ক্লাস এইটে পড়ে, তখনই সে বুঝে গিয়েছিল যে সে তার আর পাঁচটা বন্ধুর থেকে আলাদা। সে যেন ঠিক ছেলে হলেও, ছেলে নয়। তার এই অনুভূতিটা খুব প্রকট হলো সে যখন ক্লাস নাইনে উঠে বিষ্ণুপদ স্যারের বাড়িতে অংকের কোচিং ক্লাসে যেত। কোচিং ক্লাসে ছেলে মেয়ে মিলিয়ে প্রায় বার, তের জন ছাত্র, ছাত্রী ছিল। ছাত্রী ছিল পাঁচ জন। কোচিংয়ের পর হেঁটে বাড়ি ফেরার সময় সৌনকের বন্ধুরা যখন সেই পাঁচটা মেয়ের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ত, তার তখন নিজেকে খুব একা লাগত, নিজেকে যেন দলছুট মনে হতো। কিন্তু সে মনে মনে ছেলেদের বিশেষ করে অনির্বান বা তমালের হাত ধরে হাঁটতে চাইত। একবার দুবার সে তা চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু ওরা সৌনকের থেকে হাত ছাড়িয়ে নিত। একবার তো তমাল রেগে গিয়ে তাকে বলেছিল,’ কি রে? তুই এত মেয়েলি কেন?’ তারপর ফিস ফিস করে বলেছিল,’ হাতই যদি ধরতে হয়, তো জানা গিয়ে রঞ্জনা বা মিতালির হাত ধরে হাঁট না।’ তমালের সেই কথা শুনে সৌনক কেমন যেন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। তারপর থেকে সে যেন প্রকৃতই একা হয়ে গিয়েছিল।
উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময় তার মানসিক অবস্থার আরও অনেক পরিবর্তন হলো। সে ভিড় বাসে বা ট্রেনে তার সমবয়সী বা তার চেয়ে বয়েসে বড় পুরুষদের গা ঘেষে দাঁড়াতে লাগল। তার ইচ্ছে হতো পাশের ছেলেটির সাথে আরও ঘনিষ্ট ভাবে দাঁড়াতে। তার ইচ্ছে হতো পাশের ছেলেটির পাছায়, ঘাড়ে হাত রাখতে। মাঝে মধ্যে নিজের ইচ্ছেটাকে বাস্তব রূপও দিয়ে ফেলত।

একদিন ঘটল সেই ঘটনাটা। বাসে তার সামনে দাঁড়ানো ছেলেটির কাঁধে হাত দিয়েছিল সৌনক। মিনিট পাঁচেক পর ছেলেটি হটাৎ তার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল,’ হোমো না কি? এত মহা ঝামেলায় পড়া গেল।’ ছেলেটির কথায় বাসের বেশির ভাগ লোক ওই ভিড়ের মধ্যেই সৌনকের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসতে লাগল। কেউ কেউ এমন মন্তব্য করল যা শুনে সৌনকের মনে হচ্ছিল ভিড় ঠেলে দরজার কাছে গিয়ে রাস্তায় ঝাঁপ দিয়ে নিজেকে ওই লজ্জার হাত থেকে বাঁচায়। কিন্তু সৌনক তা করতে পারে নি। আরও দশ মিনিট বাসের লোকেদের হাসাহাসি আর টিটকিরি তাকে শুনতে হয়েছিল। শেষে স্টপেজ আসতেই সৌনক বাস থেকে নেমে গিয়েছিল। সেদিন রাতে বিছানায় শুয়ে সৌনক ঘুমোতে পারে নি। সারা রাত সে কেঁদেছিল। বার বার তার আত্মহত্যার কথাও মনে এসেছিল।

জয়েন্ট এন্ট্রান্স পাস করে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হওয়ার পর, প্রথম দিকেই তার জীবনে নেমে এসেছিল ভয়ানক সমস্যা। হোস্টেলে তার রুম মেট টিকত না। শুধু তাই নয় তার সমস্যাটা তার ব্যাচের প্রায় সবাই জেনে গেল। এমনকি সিনিয়াররাও তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। বেশ কিছুদিন সৌনক হোস্টেল ছেড়ে কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে ঘর ভাড়া নিয়ে ছিল। শেষে একদিন সৌনকের সাথে দেখা হলো ওর ব্যাচেরই হৃসভের। হৃসভ প্রথম থেকেই হোস্টেলে থাকে নি, সে কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতো। সেই হৃসভের কথায়, সৌনক নিজের ভাড়া করা ঘর ছেড়ে হৃসভের ঘরে থাকতে শুরু করেছিল।
হৃসভের সাথে থাকতে গিয়ে প্রথম রাত্রেই সৌনক বুঝেছিল হৃসভের অবস্থাও তার মতোই। কলেজের শেষ দিন পর্যন্ত সৌনককে ঠাট্টা, ইয়ার্কি, টিটকিরি সহ্য করতে হলেও সে ভালোই ছিল হৃসভের সাথে। কয়েকদিনের মধ্যেই সৌনকের সাথে হৃসভের সম্পর্কটা হয়ে গেল অনেকটা প্রেমিক, প্রেমিকার মতো। হতাশার মধ্যেও সে যেন জীবনটাকে ভালোবাসতে শুরু করেছিল।
সৌনকের জীবনে আবার সমস্যা দেখা দিল চাকরি পাওয়ার বছর খানেকের মধ্যেই ।

সৌনক ছিল বাবার এক মাত্র ছেলে। ছোট বোন প্রিয়া থাকলেও, কোনও ভাই বা দাদা ছিল না। সৌনক চাকরি পাওয়ার ঠিক পরই বোন প্রিয়ার বিয়ে হয়েছিল। ফলে বাড়িটা একদম খালি খালি লাগত সৌনকের মায়ের। তিনি সৌনকের বিয়ের জন্য চেষ্টা শুরু করে দিল। শুধু চেষ্টা নয় তিনি সৌনকের জন্য একটি মেয়েকে পছন্দ করে বসলেন। সৌনক বুঝল বিয়ে করে মেয়েটির জীবন নষ্ট করার কোনও মানে হয় না। বিয়ে ভাঙবেই। বাধ্য হয়ে একদিন সে তার বাবাকে তার সব সমস্যার কথা খুলে বলল। সৌনকের বাবা প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ ছিলেন। তিনি সৌনকের অবস্থা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি সৌনককে বললেন,’ আমি তোর অবস্থা বুঝি। কিন্তু তোর ব্যাপারটা প্রতিবেশী বা আত্মীয় স্বজনের মধ্যে জানা জানি হলে তোর সমস্যাটা দ্বিগুন হয়ে যাবে। তাই আমার মনে হয় তুই বিদেশে বিশেষ করে উন্নত দেশ গুলোতে চাকরি খোঁজার চেষ্টা কর। এই দেশে থাকলে তোকে অনেক কষ্ট পেতে হবে। আর হ্যাঁ, তোর মায়ের পছন্দের মেয়েটিকে বিয়ে করা ঠিক হবে না। তোর কথা আমি মেনে নিলাম। আমি তোর মাকে বুঝিয়ে বলব।’

কিন্তু সৌনকের মা, শিক্ষিত হলেও, তিনি ব্যাপারটাকে মেনে নিতে পারেন নি। পরদিন থেকেই তিনি সৌনকের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। বাড়িতে দম বন্ধ করা একটা পরিবেশ থেকে বাঁচতে সে চলে যায় হৃসভের ফ্ল্যাটে। হৃসভের ভাড়া নেওয়া শ্যমবাজারের ফ্ল্যাটে সৌনকের নিয়মিত যাতায়াত হৃসভ চাকরি পাওয়ার পর থেকেই ছিল। হৃসভের ওই এগারোতলার ফ্ল্যাটেই সৌনক বেশ ছিল। কিন্তু গোলমাল বেঁধে গেল। তাদের দুজনের সম্পর্কের বিষয়টা ওই ফ্ল্যাট বিল্ডিংয়ের লোকেদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। কি করে তা পৌঁছে গিয়েছিল তা সৌনকরা জানতে পারে নি। একদিন রাত্রে ওই ফ্ল্যাট বিল্ডিংয়ের লোকজনরা হৃসভের ফ্ল্যাটে চড়াও হয়ে তাদের দুজনকে খুব মারধর করল। খবর পেয়ে ফ্ল্যাটের মালিক হৃসভকে ফ্ল্যাট খালি করতে বললেন।

ওরকম হটাৎ করে ফ্ল্যাট খালি করতে বলায় হৃসভ আর সৌনক, দুজনেই খুব বিপদে পড়েছিল। কিন্তু সমস্যার সমাধান হলো হৃসভের বুদ্ধিতেই। সে সৌনককে নিয়ে থাকতে চলে গেল তার দেশের বাড়ি নলপুরে। যাতায়াতের একটু কষ্ট দুজনেরই হচ্ছিল। তাও ওরা দুজনেই খুশিতে ছিল। হৃসভের দেশের বাড়িতে বিধবা মা আর ছোট ভাই ছাড়া কেউ ছিল না। হৃসভের মাও তখন হৃসভের বিয়ে দিতে চায়। রোজ অফিস থেকে ফিরলেই তার মায়ের সেই একই কথা। এমনকি তিনি সৌনকেও বলতেন,’ বাবা! তোমারও মা, বাবাকে বলো তোমার বিয়ের জন্য।’ ওরা দুজনেই জানত যে ওনাকে বুঝিয়ে লাভ নেই। তাই বছর খানেক পর সৌনক আর হৃসভ দুজনেই ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে কলকাতার আলাদা আলাদা অঞ্চলে ফ্ল্যাট কিনে নিয়েছিল। সৌনক হৃসভকে তার বাবার কথা বলেছিল। সে যে বিদেশে চাকরি করতে চায়, সে কথাও বলেছিল। কিন্তু হৃসভ রাজি হতে পারে নি। সে বলত বৃদ্ধা বিধবা মাকে ফেলে সে বিদেশ যেতে চায় না। তার ভাই চাষবাস দেখাশোনা করে। ওর আর একটু বয়েস হলে, ওকে বিয়ে দিয়ে তবেই সে বিদেশে যাওয়ার কথা ভাববে। হটাৎ সৌনকের খেয়াল পড়ল তার গায়ে বেশ চড়া রোধ লাগছে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে সময় দেখে লাফিয়ে উঠল। এগারোটা বেজে গেল। সে তাড়াতাড়ি স্নান করতে বাথরুমে ঢুকে পড়ল।

(২)

সৌনক যখন ডোর বেলটা বাজিয়েছিল, হৃসভ বোধ হয় তখন রান্না ঘরে মাংস কষছিল। সে হাত না ধুয়েই রান্না ঘর থেকে এসে ড্রইং রুমের দরজা খুলে সৌনককে ভেতরে আসতে দিল। তারপর দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে হঠাৎই সৌনককে জড়িয়ে ধরল। হৃসভ, সৌনককে চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগল। মুহূর্তে সৌনকের মনের মধ্যেও ভালোলাগা ছড়িয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর হৃসভ, সৌনকের ঘাড়ে মুখ ঘষতে ঘষতে ফিস ফিস করে বলল,’ আমাদের দিন বোধ হয় এসে গেছে। আর কাউকে ভয় পেতে হবে না। আবার আমরা এক সাথে থাকব, আমরা বিয়ে করব।’ সৌনক বুঝল, হৃসভ তার কথায় ইতিমধ্যেই সাত তারিখের কাগজটা পড়ে ফেলেছে। হৃসভ জেনে গেছে যে সুপ্রিম কোর্ট সমকামিতাকে শুধু বৈধতার সিলমোহরই দিয়েছে তা নয়, সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে আইন তৈরি করতে যাতে দুজন সমকামি পুরুষ বা দুজন সমকামি নারী একে অপরকে বিয়ে করতে পারে, এক ছাদের তলায় কোনও বাধা ছাড়াই থাকতে পারে। হঠাৎই হৃসভ, সৌনককে ছেড়ে দিয়ে রান্না ঘরের দিকে এগোতে এগোতে বলল,’ আয়, রান্না ঘরে আয়।’

সৌনক হৃসভের রান্না ঘরে একটা প্ল্যাস্টিকের স্টুলের ওপর বসে আছে আর হৃসভ ডেচকিতে মাংস রান্না করতে করতে বলতে লাগল,’ তোকে বলিনি, তবে আমি তোর কথা মেনে ইউ এস কনস্ট্রাকশন ফার্মটাতে আমাদের দুজনের এপলিকেশনই মেল করেছিলাম। ভেবেছিলাম ভাইও এখন খুব শিগগির বিয়ে করতে চাইছে না যখন, তখন আমার তোর কথাই মেনে নেওয়া ভালো। সেই কথা ভেবেই আমি মেল দুটো পাঠিয়েছিলাম। পরশু অফিসে লাঞ্চে দেখলাম ওরা অফার পাঠিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে তোর মেলবক্স খুলে দেখলাম, তোকেও ওরা অফার পাঠিয়েছে। কিন্তু কেন জানি না, মনে হচ্ছিল, আমি বোধ হয় তাড়াতাড়ি করছি। তাই সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। বুঝলাম তুইও মেলটা দেখেও কিছু বলছিস না, যখন, তখন আর তোকে বলে লাভ কি! আর দ্যাখ, এখন তো আমাদের দেশ ছেড়ে যাওয়ার কোনও প্রয়োজনই নেই।’ সৌনক বলল,’ না রে, গত পনের দিনে আমি মেলবক্স খুলিই নি। চাকরি করি ফ্যাক্টরিতে, তোর মত অফিসে নয়। মেলবক্স চেক করার সুযোগ, সময় কোথায়? তবে তোর কথা ঠিক। আমাদের দেশ ছেড়ে যাওয়ার বোধ হয় আর প্রয়োজন নেই।

দুপুর আড়াইটা। সৌনক আর হৃসভ দুজনে ডাইনিং টেবিলে বসে খাচ্ছে। খেতে খেতেই সৌনক বলল,’ এখন নিশ্চই তোর, তোদের পাড়ার ওই সুন্দর পার্কটাতে সন্ধ্যে বেলা বসতে আপত্তি নেই? চল না, আজকে দুজনে ওই পার্কটাতে গিয়ে একটু বসি। কেন জানি না, ওই পার্কটাতে বসতে আমার খুব ইচ্ছে করে।’ হৃসভ বলল,’ হুঁ, বসা যায়। সুপ্রিম কোর্টের ভারডিক্টটা কাগজে পড়ার পর বা টি ভি র নিউজে শোনার পর, মানুষের আমাদের সম্পর্কে ধ্যান ধারণা নিশ্চই বদলে গেছে। তারা নিশ্চই আর আমাদের আগের মতো চোখে দেখবে না। তারা আজ বুঝছে যে আমরা কোনও অপরাধ করছি না। তাই চল, আজ ওখানে গিয়েই সন্ধ্যেটা কাটাব। কত আর ঘরের মধ্যে বন্দি থাকা যায়?’

সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা। হৃসভদের পাড়ার পার্কটা তখন পুরোপুরি খালি বললেই হয়। পার্কের দেওয়ালের পিলার গুলোর মাথায় একটা করে নিয়ন লাইট জ্বলছে। সেই আলোর রোশনি পার্কের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছচ্ছে না। ফলে পার্কের ভেতরের বিস্তৃত অঞ্চলটায় বেশ আধ-অন্ধকার। ওরা ঘাসের ওপর গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে আছে। একটু দূরে পাশাপাশি দুটো সিমেন্টের বেঞ্চে তখনও আট দশজন মধ্য বয়স্ক লোক নিজেদের মধ্যে গল্প করে চলেছে। সৌনক আর হৃসভের কানে তাদের কথা বার্তার টুকরো টুকরো শব্দ ভেসে আসছে। ওরা বুঝতে পারছে ওই লোক গুলোর আলোচনার বিষয় আগামী সাধারণ নির্বাচন।

হৃসভ তখন সৌনকের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে আবেগে, অনাস্বাদিত ভালোলাগার আবেশে নিমজ্জিত। সৌনকও আর নিজের মধ্যে নেই। হটাৎ তাদের কানে এলো চিৎকার চেঁচামেচি,’ মার শালা দুটোকে। নোংরামি করার আর জায়গা পায়নি? শালা দুটোকে আজ কেলিয়ে বৃন্দাবন দেখিয়ে দিতে হবে।’ সৌনক আর হৃসভ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই সিমেন্টের বেঞ্চে বসা আট, দশ জন লোক তাদের দিকে ধেয়ে এল।

লোক গুলো সৌনক আর হৃসভকে এলো পাথাড়ি মারতে শুরু করল। ওদের মধ্যে দুজন বয়স্ক লোক ছিল। তারা লাঠি হাতে একটু দূরে দাঁড়িয়েছিল। হটাৎ যারা সৌনক আর হৃসভকে মারছিল, তাদের দুজন, ওই দুই বয়স্ক লোকের হাত থেকে লাঠি নিয়ে ওদের দুজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কতক্ষন ধরে ওরা সৌনককে আর হৃসভকে মেরেছিল, তা আর ওদের দুজনের খেয়াল ছিল না। ওদের দুজনেরই মাথা ফেটে গিয়েছিল, জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল।
সৌনকের যখন জ্ঞান ফিরল, সে বুঝল যে সে কোনও এক হসপিটালের বেডে শুয়ে আছে। পাশের বেডে তখনও হৃসভ অচৈতন্য। সৌনকের জ্ঞান ফিরতেই সিস্টার ডাক্তারকে ডেকে আনল। ডাক্তারের পেছনে পেছনে পুলিশ। ডাক্তার সৌনককে জিজ্ঞেস করলেন,’ কেমন আছেন?’ সৌনক চেষ্টা করেও গলা দিয়ে আওয়াজ বার করতে পারল না। শুধু অনেক চেষ্টায় ম্লান হেসে ঘাড়টাকে নাড়ানোর চেষ্টা করল। তারপর ডাক্তার নিজের তিনটে আঙ্গুল সৌনকের চোখের সামনে ধরে বললেন,’ কটা আঙ্গুল দেখছেন?’ সৌনক অনেক চেষ্টা করে ক্ষীণ স্বরে বলল,’ তিন।’ ডাক্তার পুলিশের দিকে তাকিয়ে বলল,’ আপনার এখনই কথা বলা ঠিক হবে না। ওনাকে একটু বিশ্রাম করতে দিন। আর একজনের জ্ঞান ফিরতে দিন।’ এই কথা বলে ডাক্তার সিস্টারকে আলাদা ডেকে ফিস ফিস করে কি সব নির্দেশ দিয়ে চলে গেলেন।

সৌনক আর হৃসভ আজ হসপিটাল থেকে ছাড়া পাবে। এক মাস হসপিটালে ছিল। কেউ দেখতে আসে নি। শুধু এসেছিল হৃসভের ছোট ভাই। তাকে হসপিটাল থেকেই খবর দেওয়া হয়েছিল হৃসভের কথায়। সে রোজ নিয়ম করে বিকেলে ওদের দেখতে আসত। সৌনক আর হৃসভ, নার্সের মুখে শুনেছিল যে ওই লোক গুলো যখন চিৎকার করতে করতে ওদের দুজনকে মারছিল, ঠিক তখন ওই পার্কের পাশের চায়ের দোকানদার আর তার খদ্দেররা ছুটে এসে সৌনক আর হৃসভকে উদ্ধার করে। ওরা ভেবেছিল যে ছেলে দুটো বোধ হয় মরে গেছে। তাই তারা পুলিশ ডাকে। পুলিশই সৌনক আর হৃসভকে হসপিটালে নিয়ে এসেছিল।

বিকেল সাড়ে তিনটে। একটু পরেই হৃসভের ভাই গাড়ি নিয়ে আসবে। পাশাপাশি বেডের ওপর জানলার দিকে মুখ করে, একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছে সৌনক আর হৃসভ। কারও মুখে কোনও কথা নেই। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সৌনক বলল,’ তোর বাড়িতে কতদিন আর থাকা যাবে? তোর ভাইও তো সব জেনে গেছে। তবে তোর ভাইয়ের চোখে, মুখে কোনো রকম বিদ্রুপ যদিও দেখিনি। তুই জানিস, তোর এবং আমার অফিসে ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেছে, ফলে সেখানেও কি শান্তিতে চাকরি আমরা করতে পারব?’ হৃসভ ম্লান হেসে বলল,’ তুই ঠিক বলেছিস। চাকরি তো আর এই শহরে করা সম্ভব নয়। বাড়িতেও বেশিদিন আর থাকা ঠিক নয়। পাসপোর্ট আমাদের দুজনেরই আছে। তাই ওই ইউ এস কনস্ট্রাকশন কোম্পানির অফারটা আমাদের একসেপ্ট করা ছাড়া আর রাস্তা নেই।’ সৌনক আর হৃসভকে চমকে দিয়ে পেছন থেকে কেউ বলে উঠল,’সঠিক সিদ্ধান্ত, আমি আগেই বলেছিলাম। যতই আইন পাস হোক। আমাদের দেশের মানুষ এখনও একশো বছর পিছিয়ে আছে। এদেশের মানুষ তোমাদের এখনও বুঝতে চেষ্টা করে নি, যে তোমরাও মানুষ। এক বিশেষ ধরনের মানুষ জন্ম থেকেই। তোমাদের মধ্যেও ভালোবাসা আছে, আছে শরীরের চাহিদা। কিন্তু তারা এসব বোঝে না আর কবে বুঝবে জানি না! তোমরা চলে যাও ওই দেশটায়, যেখানে তোমরা স্বাধীন ভাবে বিবাহিত হিসাবে বেঁচে থাকবে।’ সৌনক আর হৃসভ ঘুরে তাকিয়ে দেখে তাদের বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছে সৌনকের বাবা আর হৃসভের ভাই। সৌনকের বাবা আবার বললেন,’ হ্যাঁ, তোমাদের জন্মভূমি তোমাদের কোনদিন, অন্তত তোমাদের এ জন্মে মেনে নেবে না। তোমরা যাও। ভালোভাবে বেঁচে থাক। আমার আশীর্ব্বাদ রইল।’ সৌনক আর হৃসভ দুজনেই বেড থেকে নেমে সৌনকের বাবাকে প্রণাম করতে গেল। সৌনকের বাবা, তাদের দুজনকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। হৃসভের ভাই ফ্যাল, ফ্যাল করে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখেও জল।

….সমাপ্ত….


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment