সিঁদুর কৌটো-  তুষার চক্রবর্তী

 

  দাদু আমার নাম রেখেছিল হিরন্ময়। স্কুলের স্যাররা এই নামেই আমাকে ডাকতো। এখন আর এই নামে আমাকে কেউ ডাকে না। মা, আমাকে হিরু বলে ডাকে। বাকি সবার কাছে আমি হিরো নামেই পরিচিত। বন্ধুরা প্রায়ই বলে,’তোর নামটা স্বার্থক।’ আমাকে নাকি হিন্দী ফিল্মের হিরোদের মতো দেখতে। কলেজের অনেক মেয়েকেই দেখেছি, আমাকে আড় চোখে তাকিয়ে দেখে। কেউ কেউ তো আবার যেচে এসে আমার সাথে পরিচয় করে। আমি যতটা সম্ভব, এসব এড়িয়ে চলি।

স্কুলে পড়ার সময় থেকেই আমি মিলন ব্যায়াম সমিতিতে নিয়মিত ব্যায়াম করতে যেতাম। মাস ছয়েক আগে বাবা মারা যেতে , তা বন্ধ হয়ে গেছে। বাবা হাওড়ার একটা জুটমিলে ফোর ম্যানের চাকরি করতো। হটাৎ একদিন রাত্রে হার্ট এটাকে মারা যান। হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। হটাৎ করে এভাবে বাবা চলে যেতে আমি যেন চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করেছিলাম। একদিকে বৃদ্ধ দাদু আর ঠাকুমা আর সঙ্গে আমি, মা আর ছোট বোন। ছোট বোন এবার মাধ্যমিক দেবে। বাবা মারা যেতে জুটমিল থেকে পাওয়া বাবার পি এফ, গ্রাচুইটির টাকা ব্যাঙ্কে ফিক্সড করা হয়েছে। মাসে মাসে হাজার দুয়েক টাকা সুদ আসে। কিন্তু ওই কটা সুদের টাকায় পাঁচ পাঁচটা মানুষের পেট চালানো যায় না। শুধু পেট চালানো হলে, তাও একটা কথা ছিল, সঙ্গে আছে আমার আর বোনের পড়াশোনার খরচ, দাদুর ওষুধ পথ্যর খরচ, আরও কত কি!

আত্মীয় স্বজনের পরামর্শে এদিক ওদিক অনেক চেষ্টা করলাম, যদি কোথাও একটা পার্ট টাইমের চাকরি পাওয়া যায়। পেলাম না। শেষে পাড়ার চায়ের দোকানের মন্টুদা একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিলো। কাজ মানে রোজ সকাল বেলা লোকের বাড়িতে বাড়িতে খবরের কাগজ পৌঁছে দেওয়া। ভোর সাড়ে চারটের সময় সাইকেল নিয়ে হাওড়া স্টেশন থেকে খবরের কাগজ গুলো নিতে হয়। ফিরে এসে নিজের পাড়ায়, আশেপাশের আট দশটা পাড়ায় লোকের বাড়িতে বাড়িতে কাগজ পৌঁছে দিই। কাজটা শুরু করতে মা কিছু না বললেও, বোন খুব দুঃখ পেয়েছিল। কিন্তু আমার কাছে এছাড়া আর কোনো রাস্তাও ছিল না।

সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই আমি অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। ভোর চারটের সময় ঘুম থেকে উঠে সাড়ে চারটের মধ্যে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে যেতাম। সাইকেলে লোকের বাড়ি বাড়ি কাগজ দিয়ে সকাল আটটা, সোয়া আটটা নাগাদ ঘরে ফিরতাম। চা খেয়ে বাজার যেতে হয়। মার দেওয়া লিস্ট মিলিয়ে শাক সবজির বাজার, সঙ্গে একটু মাছ নিয়ে ঘরে ফেরা। হাতে আর খুব বেশি সময় থাকতো না। স্নান সেরে, রান্না ঘরে বসে দুটো রুটি আর তরকারি খেয়ে বেরিয়ে পড়তাম সাইকেল নিয়ে কলেজের উদ্দেশ্যে। দশটা নাগাদ কলেজে পৌঁছে যেতাম। বিকেলে কলেজ থেকে ফিরে পাড়ার ক্লাবে বন্ধুদের সাথে একটু আড্ডা দিতাম। অন্যান্য বন্ধুদের মতো বেশিক্ষণ আমার পক্ষে আড্ডা দেওয়া সম্ভব হয় না, সন্ধ্যে সাতটা বাজলেই ঘরে ফিরে এসে একটু পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে হয়। ভোর চারটের সময় আমাকে উঠতে হয়, তাই রাত দশটার মধ্যেই আমি খেয়েদেয়ে নিজের ছোট ঘরটাতে শুয়ে পড়তাম।

এই ভাবেই বৈচিত্রহীন এক সাদা মাটা নিত্য রুটিনের মধ্যে দিয়েই আমার দিন গুলো কেটে যাচ্ছিল। লেখাপড়ায় আমি খুব ভালো না হলেও, একেবারে খারাপও ছিলাম না। মাধ্যমিকে ফার্স্ট ডিভিশন ছিল আর উচ্চমাধ্যমিকে একটুর জন্য ফার্স্ট ডিভিশন হাত ছাড়া হয়েছিল। স্কুলের স্যাররা বলেছিলো,’কমার্সে ফিফটি এইট পার্সেন্ট খুবই ভালো মার্কস। মন দিয়ে বি.কম টা করে সি.এ পড়ার কথা ভাবতে পারিস।’ সি.এ পড়ার আশা ছেড়ে দিয়েছি বাবা মারা যাওয়ার পর। ফার্স্ট ইয়ার থেকে সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার সময়ও ভালোই রেজাল্ট হয়েছে। তাও বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই চাকরির চেষ্টা করতে শুরু দিয়েছিলাম। ইতিমধ্যেই পাবলিক সার্ভিস কমিশন, স্টাফ সিলেকশন, ব্যাঙ্কের ক্লারিকাল ক্যাডারের পরীক্ষাগুলোতে বসতে শুরু করে দিয়েছি। রবিবার দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত চাকরির প্রস্তুতির বই পত্র নিয়ে ঘাটা ঘাঁটি করি।

সব ঠিক ঠাক গতানুগতিক চলছিল। এক মাসের প্রথম রবিবার সকালে একটা ঘটনা আমার সব কিছু ওলট পালট করে দিলো। মাসের প্রথম রবিবার বেলার দিকে লোকের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে গত মাসের কাগজের বিল দিয়ে আমি পয়সা আদায় করতাম। আমি অনেক বড় লোকের বাড়িতেও কাগজ দিতে যেতাম।এরকমই এক বড় লোকের বাড়ি ছিল মহীনাথ পোড়েল লেনে। আমার কাজ লোকের বাড়ির গেটে বা বাইরের দরজার হুরকোতে কাগজটা আটকে দিয়ে, কলিং বেলটা বাজিয়ে দেওয়া। অবশ্য বেল বাজিয়ে দিয়ে, আমি আর অপেক্ষা করতাম না। পরের বাড়ির দিকে রওনা দিতাম।

কিছুদিন হলো আমি খেয়াল করলাম, ওই বাড়িটার দরজাটা বন্ধ থাকে না। ওই বাড়ির একটি মেয়ে আমি ওই দরজায় পৌঁছনোর আগে থেকেই দাঁড়িয়ে থাকে। অনেক বাড়িতেই এরকম দেখেছি। অনেকেই কাগজের অপেক্ষায় থাকে। তবে এমন অল্প বয়েসি মেয়েকে আমি কোনো বাড়িতে কাগজের অপেক্ষায় থাকতে দেখিনি। আমি মেয়েটির হাতে কাগজটা দিলে, সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসতো। আমি একটু দূরে চলে গেলে, তবেই দরজাটা বন্ধ করে ভেতরে যেত। মাঝেমধ্যে এই ব্যাপারটায় অবাক হলেও, এ নিয়ে চিন্তা করার সময় আমার ছিল না।

আমি লোকের বাড়ি বাড়ি শুধু কাগজই দিতাম না, মাসের প্রথম রবিবার বেলার দিকে, একে একে সবার বাড়ি যেতাম।গত মাসের বিল বুঝিয়ে দিয়ে পয়সা নিতাম। শুধু তো কাগজ নয়, অনেকে বিভিন্ন ম্যাগাজিনও নিত। এরকমই একটি মাসের প্রথম রবিবার। বেলা তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। আমি ওই বড়লোকের বাড়িতে গিয়ে কলিং বেল বাজিয়ে অপেক্ষা করছি। একটু পরেই দরজা খুলে মেয়েটি আমার সামনে দাঁড়ালো। আমি হাতে লেখা কাগজের বিলটা তার হাতে দিলাম। সে বিলটার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে আমায় বললো,’আপনি দু মিনিট দাঁড়ান। আমি এনে দিচ্ছি আপনাকে।’ এই কথা বলে মেয়েটি ভেতরে গেলো। পরক্ষণেই ফিরে এলো। আমার হাতে টাকাটা দিলো, সঙ্গে ভাঁজ করা একটা ছোট সাদা কাগজ। হাতে দিয়ে বললো, ‘একটু সময় করে ওটা পড়ে নেবেন।’ আমি টাকাটা আমার ছোট কালেকশনের ব্যাগে রেখে, ভাঁজ করা কাগজটা আমার জামার বুক পকেটে রাখলাম। আমি মেয়েটির দিকে তাকাতে সে রোজের মতোই একটু হাসলো আর আমি পরের বাড়ির দিকে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিলাম।

বেলা সোয়া একটা বাজে। মন্টুদার চায়ের দোকানে বসে হিসাব করছি। যে যে বাড়ির টাকা এসে গেছে, তার একটা লিস্ট আর যাদের বাকি তাদের লিস্ট। বাকি যাদের, তাদের লিস্ট নিয়ে পরের রবিবার আবার বেলায় বেরোতে হবে। গত ছ মাস ধরে এরকমই করে আসছি। শেষে সেই দিনের যা কালেকশন তা মন্টুদাকে বুঝিয়ে দিতে হয়। মন্টুদাই সাব এজেন্ট। মাসের দশ তারিখে মন্টুদা, মেন এজেন্টের কাছে গিয়ে সব টাকা পয়সা জমা দিয়ে কমিশন সংগ্রহ করে নিয়ে আসে। আমার ডেলিভারি বাবদ যা কমিশন হতো, তার থেকে মন্টুদা দশ পার্সেন্ট নিজে রেখে বাকিটা আমাকে দিয়ে দিতো। আমার হাতে মাসে হাজার পাঁচেক টাকা আসতো। মন্টুদার কাছে আমার মতো আরো দু জন এরকম কাজ করতো। হিসাব পত্র বুঝিয়ে দিয়ে মাটির ভারে চা খাচ্ছিলাম। হটাৎ মনে পড়লো, কাগজটার কথা। জামার বুক পকেট থেকে বের করে কাগজটা মেলে ধরলাম চোখের সামনে। একটা ছোট্ট চিঠি:

 

প্রিয় হিরন্ময়,
আমি বনলতা। হাওড়া গার্লস কলেজে পড়ি। আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাই। কালকে আমাদের কলেজ গেটের বাইরে বেলা এগারোটা নাগাদ আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো। আশা করি তুমি নিশ্চই আসবে।
ইতি,
-বনলতা

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। একিরে বাবা! বলা নেই, কওয়া নেই, সোজা দেখা করতে হবে। আমার অবাক হওয়ার আরো কারণ, মেয়েটি আমার পাড়ার নয়, আমার কলেজেরও নয়, অথচ আমার নাম জানলো কি করে! আমি চিঠিটা যেরকম ভাঁজ করা ছিল, সেরকম ভাঁজ করে বুক পকেটে না রেখে, পার্সে রেখে দিলাম।
পরদিন সকালে, আমি যথারীতি কাগজ দিতে গিয়েছি। আমার হাত থেকে কাগজটা নিয়ে, একটু হেসে চাপা গলায় বললো,’আজ এগারোটার সময় দেখা হচ্ছে।’ এই কথা বলে সে ভেতরে চলে গেল।

                              

                 কলেজের সাইকেল স্ট্যান্ডে, সাইকেলটা রেখে, বাস ধরে হাওড়া গার্লস কলেজের গেটের সামনে ফ্লাই ওভারটার নীচে গিয়ে যখন দাঁড়ালাম, তখনও এগারোটা বাজতে মিনিট দশেক বাকি। আমি গেটের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছি। হটাৎ পেছন থেকে কেউ বললো, তুমি কখন এসেছো? ফিরে দেখি বনলতা। একটা কালো পাড়ের আকাশী পিওর সিল্কের শাড়ি, কালো ব্লাউজ, কপালে কালো টিপ। চোখে কাজল। চুলটা চুড়ো করে বাঁধা। এই প্রথম মেয়েটিকে এই রূপে দেখলাম। এতো দিন কাগজ দিতে গিয়ে ওকে চুরিদাড়েই দেখেছি। আর সাজার তো প্রশ্নও ছিল না। আমি বললাম,’মিনিট পাঁচেক হয়েছে বোধহয়।’ বনলতা হেসে বললো,’হাতে সময় নিয়ে এসেছো তো ?’ এই কথা যখন বলছিল, পাশ দিয়ে একটা ট্যাক্সি যাচ্ছিল। বনলতা হাত দেখিয়ে টাক্সিটাকে ডাকলো। টাক্সিটা এসে আমাদের পাশে দাঁড়ালো। আমরা দুজন পেছনের সিটে বসলাম। বনলতা ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বললো,’পার্ক স্ট্রিট।’

তার পর আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো,’খুব অবাক হচ্ছো ? তাই না ?’ একটু সময় নিয়ে আবার বললো,’তুমি আমাকে ভুলে গেলেও, আমি তোমাকে ভুলিনি।’ আমি বনলতার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে রইলাম। ভাবলাম, বনলতা আমাকে চেনে! তবে আমি কেন চিনতে পারছি না। অনেক মনে করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সেরকম কিছুই মনে করতে পারলাম না। বারবার আমি বনলতার মুখের দিকে তাকাচ্ছি। শেষে আমি বলেই ফেললাম,’কিছু মনে করো না! আমি কিন্তু তোমায় চিনতে পারছি না।’ বনলতা ইশারায় ড্রাইভারকে দেখিয়ে চুপ করতে বললো। বুঝলাম, বনলতা ড্রাইভারের সামনে কোনো আলোচনা করতে চাইছে না। এরপর গাড়িতে আর কোনো কথা হলো না।

পার্কস্ট্রিটে নামলাম। ট্যাক্সির ভাড়া আমি দিতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তার আগেই বনলতা ভাড়াটা মিটিয়ে দিলো। আমরা গিয়ে বসলাম একটা রেস্টুরেন্টে। বনলতা দুটো চায়ের অর্ডার দিয়ে, আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে বললো,’ কি ভাবছেন? কোনো খারাপ মেয়ের পাল্লায় পরে গেছেন?’ আমি বললাম,’না, ঠিক তা নয়। তবে ঠিক বুঝতে পারছি না। তুমি আমায় চেনো, অথচ আমি তোমায় চিনি না।’ বনলতা আবার হেসে ফেললো,’একটু বলি আমি, সব মনে পড়বে আর আমাকেও চিনতে পারবে।’

বনলতা এই কথা বলে আমার দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে রইলো। তারপর বলতে শুরু করলো,’তোমার নৈহাটী, হালি শহরের কথা মনে আছে? জুট মিলের কলোনির কোয়ার্টারের কথা?’ আমি টেবিলের ওপর চোখ রেখে বনলতার কথা শুনছিলাম। আমি চমকে উঠলাম। সোজা হয়ে বসে বনলতার দিকে তাকালাম। বনলতাও আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। আমার মুখ থেকে নিজের অজান্তেই চাপা স্বর বেরিয়ে এলো,’মুন্নি!’ বনলতা এবার ওর দুটো হাত দিয়ে আমার দুটো হাত ধরে বলে উঠলো,’হ্যাঁ, আমি তোমার সেই ছোটবেলার খেলার সাথী মুন্নি। চিনতে পারলে তাহলে?’ ইতিমধ্যে ওয়েটার দুটো চা টেবিলের ওপর রাখলো।

ওয়েটারকে দেখে বনলতা নিজের হাত দুটো আমার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে, রুমাল বার করে চোখ মুছলো। তারপর চায়ে একটা চুমুক দিয়ে আবার বলতে শুরু করলো,’জুটমিলে লক আউট হতেই বাবা আমেদাবাদে চাকরি নিয়ে চলে গেছিলো। তোমার বাবা তখনও জুটমিল খোলার আশায় অপেক্ষা করছিলেন। যেদিন আমরা হালি শহর ছেড়ে চলে যাই, সেদিন তোমাদের সাথে আমাদের দেখা হয়নি। তোমরা সেদিন কাঁচড়া পাড়ায় তোমার মামার বাড়িতে গিয়েছিলে। আমেদাবাদ যাওয়ার দিন আমি তোমার জন্য অনেক কেঁদেছিলাম। প্রায় দশ এগারো বছর পর বাবা আবার লিলুয়ার জুটমিলে চাকরি নিয়ে ফিরে আসে গত বছরই। আমাদের যে বাড়িটা তুমি দেখছো, ওটা একটা ভাঙ্গা চোরা পুরোনো বাড়ি ছিল। বাবা ওই পুরোনো বাড়িটা কিনে, মেরামত আর রিমডেলিং করিয়ে নিয়েছে। জান! আমি এসেই প্রথমে হালি শহর গিয়েছিলাম, তোমার খোঁজে। গিয়ে দেখি, ওখানে আর পুরোনো লোকেরা কেউই নেই, সব নতুন লোক। তোমাদের খবরও কেউ দিতে পারেনি।’

এতোটুকু বলে বনলতা চায়ে আর একটা চুমুক দিয়ে কাপটা প্লেট সমেত টেবিলে রাখলো। আমার খেয়াল পড়লো চায়ের দিকে। আমিও পর পর দুবার চায়ে চুমুক দিলাম। বনলতা আবার বলতে শুরু করলো,’তুমি আমাদের বাড়িতে কাগজ দিতে আসতে। যেদিন তোমাকে সামনে থেকে প্রথম দেখলাম, সেদিনকেই আমি তোমাকে চিনতে পেরেছিলাম। কি করে জান? তোমার ওই কপালের কাটা দাগটা দেখে। ওই কাটা দাগটা কিসের থেকে হয়েছিল, তা কি তোমার মনে আছে?’

আমি ফ্যাল ফ্যাল করে বনলতার দিকে তাকিয়ে আছি। আমার সবই মনে পড়তে শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু কিছু না বলে আমি বনলতার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমার যেন স্মৃতিগুলো বনলতার মুখে শুনতে ভালো লাগছিল। বনলতা বলতে থাকলো,’তখন আমি সবে স্কুলে ভর্তি হয়েছি, ক্লাস ওয়ানে পড়ি। তুমি ক্লাস টু তে পড়তে। তুমি আর আমি আমাদের বাড়িতে খেলছিলাম। আমি সিঁড়ি দিয়ে পরে যাচ্ছিলাম। তুমি আমাকে ধরে নিয়েছিলে। কিন্তু তোমার কপালটা গিয়ে লাগে সিঁড়ির রেলিঙ্গের কোনটাতে। পাঁচটা সেলাই হয়েছিল। তোমাকে প্রথমদিনেই চিনতে পারলেও, আমি কিছু বলিনি। আমি খুঁজছিলাম ছোট বেলার ফটোর এলবামটা। গত শুক্রবার দিন বাপির আলমারী থেকে পেলাম সেই এলবামটা।

বনলতা ওর কলেজের ব্যাগটা থেকে বার করলো, একটা ছোট পুরোনো এলবাম। এলবামটা খুলে, তার থেকে একটা ফটো বার করে রাখলো টেবিলের ওপর। ফটোটা দেখিয়ে বনলতা বললো,’এই ফটোটা বাপি, আলিপুর চিড়িয়াখানায় তুলেছিলো। আমাদের দুজনের একসাথে এই একটাই ফটো আছে। বাকি ফটো গুলোতে আমাদের সাথে অন্য কেউ না কেউ আছে। ভালো করে দেখো, কপালের দাগটা কত স্পষ্ট ছিল তখন।’ আমি টেবিলের ওপর ঝুঁকে ফটোটা দেখতে থাকি।

               আমি ফটোটা দেখতে দেখতেই বলতে শুরু করলাম,’তোমরা আমেদাবাদ চলে যাওয়ার তিন চার মাস পরেই আমরাও হালি শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। বাবা প্রথম এক বছর টিটাগড়ে কাগজ কলে চাকরি করেছিল। তারপর টিটাগড়ের চাকরিটা ছেড়ে সালকিয়ার জুটমিলে চাকরি নেয়। ব্যাঙ্কের লোন নিয়ে এই সিতানাথ বোস লেনের বাড়িটা কেনে। কিন্তু বাবা গত এপ্রিল মাসে….’ বনলতা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,’ থাক তোমাকে আর বলতে হবে না। তোমাদের সব খবরই আমার জানা হয়ে গেছে। সব জেনেছি বলেই, কাল সাহস করে তোমার হাতে ওই ছোট চিঠিটা দিতে পেরেছি।’

ইতিমধ্যে আমি মনে খুব উত্তেজিত আর উৎসাহী হয়ে পড়েছিলাম। বনলতাকে বললাম,’এখন এসব কথা থাক। তুমি আমার সাথে আমাদের বাড়ি চলো। তোমাকে দেখলে, মা খুব খুশি হবে। ছোটবেলায় তো মা, আমার চেয়ে তোমাকেই বেশি ভালোবাসতো।’ আমার এই কথা শুনে, বনলতা কেমন যেন একটা ম্লান হেসে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকার পর, কলেজের ব্যাগটা থেকে একটা কাগজের মোড়ক বার করলো। সুতো পেঁচিয়ে বাঁধা মোরকের কাগজটা হলদে হয়ে গেছে। পেঁচানো সুতোটা আস্তে আস্তে খুলে মোড়কটাও খুলে ফেললো। একটা রুপোর সিঁদুর কৌটো। বনলতা, কৌটোর ঢাকনটাও খুলে টেবিলের ওপর রেখে বললো,’এটা চিনতে পারছো?’

সিঁদুরের কৌটো, কৌটোর মধ্যে সিঁদুর দেখে আমি চমকে উঠলাম। আমার চোখের সামনে যেন ছোটবেলার সেই গ্রীষ্ম কালের দুপুরটা ভেসে উঠলো। আমি তখন ক্লাস টুতে পড়ি, বনলতা ক্লাস ওয়ানে। গরমের ছুটি। দুপুরবেলায় আমরা তখন খেলতাম। খেলার জায়গা ছিলো, আমাদের কোয়ার্টারের পেছনে ছোট বাগানটায়। ওই বাগানটায় একটা আমগাছ ছিল। ওই আম গাছের নিচেই আমাদের যত খেলা।

সেদিনকেও আমরা খেলছিলাম। আগের দিন রাত্রে বনলতাদের ঘরে, ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট টি ভি তে একটা হিন্দী সিনেমা দেখেছিলাম। ওই বয়েসে সেরকম কিছু বুঝতাম না, তবে বাড়ির বড়রা দেখছে, তাই আমি আর মুন্নি মানে বনলতা বড়দের পাশে বসে পড়তাম। সেই সিনেমাতে একটা সিন ছিলো, রাজেশ খান্না, মমতাজকে মন্দিরের সামনে সিঁদুর পরিয়ে বিয়ে করছে। ওই ছোট বয়েসে হয়তো ওটা খুব মনে ধরেছিল। আমি বনলতাকে বলেছিলাম,’কালকের সিনেমার মতো, আমিও তোকে বিয়ে করবো।’ বনলতা খিল খিল করে হেসে উঠেছিল। শেষে হাসি থামিয়ে বলেছিলো,’এমনি এমনি বিয়ে হয় নাকি। বিয়ে করতে হলে সিঁদুর পড়াতে হয়।’ আমি বলেছিলাম,’দাঁড়া, তাই হবে। আমি এক্ষুনি আসছি।’ এই কথা বলে, আমি ছুটে গেলাম মায়ের ঘরে। মা তখন দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর ঘুমোচ্ছিলো। পা টিপে টিপে মায়ের খাটের পাশে রাখা ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে রুপোর সিঁদুরের কৌটোটা নিয়ে, আবার এক দৌড়ে পেছনের বাগানের আম গাছ তলায়। বনলতার মাথায় তখন বয়েস কাট চুল ছিল। তাও কপালের ওপরটায়, সামনের দিকের চুল গুলো মাঝখানটা একটু ফাঁক করে সিঁদুর দিলাম। কপালে সিঁদুর পরিয়ে দিলাম। বনলতা আমার জামাটা ধরে আমাকে টানতে টানতে আম গাছকে মাঝখানে রেখে সাত পাঁক ঘুরলো। বনলতা, সিঁদুর কৌটোটা আর আমাকে ফেরত দেয়নি। পরের দিন মা স্নান করে উঠে সিঁদুর পড়তে গিয়ে সিঁদুর কৌটো খুঁজে না পেয়ে খুব চেঁচামিচি করেছিল। আমি যেন তখন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানি না।

এই সব চিন্তার মধ্যে আমি যখন ডুবে গেছি, তখন বনলতা, সিঁদুর কৌটোটা বন্ধ করে, মোড়কে রেখে সুতো দিয়ে বেঁধে ফেললো। তার পর কলেজের ব্যাগে রাখতে রাখতে আমাকে বললো,’আমি এই সিঁদুর পরেই তোমাদের বাড়িতে পা রাখবো। আমি সেই দিনের জন্য আরো অপেক্ষা করতে রাজি আছি।’ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে শেষে বললো,’কাল থেকে তুমি আমাদের বাড়িতে আর কাগজ দিতে আসবে না। আমি অন্য লোককে বলে দেবো। আর হ্যাঁ, মন দিয়ে পড়াশোনা করো। তাড়াতাড়ি কিছু একটা কাজ জোগারের ব্যবস্থা করো। আমাকে বেশি দিন অপেক্ষায় রেখো না। ও হ্যাঁ, যতদিন কোনো ভালো কাজ না পাচ্ছো, সোমবার, সোমবার আমার কলেজ গেটে চলে আসবে। আমি অপেক্ষা করবো।’এই কথা বলে বনলতা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। আমি চেয়ার থেকে উঠে বনলতাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বললাম,’আমার জীবনে তুমি বোধ হয় আশার আলো হয়ে ফিরে এলে। যেন বাঁচার ইচ্ছাটা তুমি জাগিয়ে দিলে।’

…….শেষ…….


FavoriteLoading Add to library

Up next

রহস্য গভীরে- প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়... দিগন্ত মুখার্জি বৈঠকখানায় বসে সিগারেট খেতে খেতে কাগজ পড়ছিলেন। তার সহকারী মৈনাক মিত্র চুপচাপ বসেছিলেন। এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠলো। দিগন্ত মৈনাকের দিকে ...
অন্য ভালোবাসা -   তুষার চক্রবর্তী     চিন্ময় প্রায় কুড়ি বছর পর রাত্রে খেয়ে দেয়ে মামাবাড়ির ছাদে বসেছে। গরমকালে রাত্রে খেয়ে দেয়ে এই ছাদে বসার অভ্যাসটা তার...
আত্মোপলব্ধি -দীপ্তি মৈত্র... সাহিত্যের রূপ দুটি,তথ্য ও সত্য। তথ্যের মধ্যে জ্ঞান থাকে, সত্যের মধ্যে বোধ। সাহিত্যের সত্য আর অন্তরের সত্য মিলে সৃষ্টি হয় নতুন সত্ত্বা- তার নাম আ...
পত্র – সমর্পণ মজুমদার... হে প্রিয় পরমাপন অভিন্নপ্রাণ মিত্র, বহুদিন তব সংবাদ বিনা চঞ্চল মোর চিত্ত। হেথা মোর দেহ স্বাস্থ্যযুক্ত, গৃহেতে বিরাজে শান্তি, তবু হে বন্ধু, দিবসে-রা...
অপদেবতা – শাশ্বতী সেনগুপ্ত... ঘটনাটা কয়েক বছর আগে ঘটেছিল এক মফস্বলে। সেখানে আমার পিসির বাড়ি। পরীক্ষার পর ছুটিতে আমরা যেতাম। অন্যান্য পিসিদের ছেলেমেয়েরাও আসত। দেদার জমে যেত মজা। জায়...
বাঙালীর দূর্গাপুজো – দীপ্তি মৈত্র... দুগ্গা পূজা ভারী মজা পড়াশুনা নাই ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখা দিন-রাত্তির ভাই। সংগে চলে “খানা-পিনা” বাহারে বাহার, মাতিয়ে রাখে কটা দিন কি মজাদার।    ছোট্ট ...
উড়ো খই -সৌম্য ভৌমিক   “বলো হরি হরি বোল,বলো হরি হরি বোল” ডাকটা শুনেআজকাল আর তেমন রিঅ্যাকশন হয় না শুভেন্দুর। শ্মশানের ধারে বাড়ি ভাড়া করার এই একটা মস্ত বিপ...
মন মিলান্তি(পর্ব-৪~শেষ পর্ব)... #মন_মিলান্তি_পর্ব_৪ #মুক্তধারা_মুখার্জী #চরিত্র_ঘটনা_কাল্পনিক,#মিল_খুঁজে_পেলে_লেখিকা_দায়ী_নন😊 বমিটা হওয়ার পর থেকেই শরীরটা কেমন করছিল যেন শ্রেয়সীর। ত...
দেশ ভালো আছে -সৌভিক মল্লিক... তবু কেমন যেন একটা অতৃপ্তি থেকে যায়। ক্ষুদ্র আনন্দ নিখোঁজের শোকে হয়তো। কখনো মাটি মাখিয়ে এ শরীরের স্বচ্ছতায় যদি ভালোবাসার দূর্গ স্থাপন করা যেতো! ...
কাল-পুরুষ ও পৃথিবী – রথীকান্ত সামন্ত... পূর্ণপৃথক দৃষ্টিকোণ, আর দেহ ছাড়ার তাড়ায় চোখের আয়নায় মুখ দেখতে ভুলে গেছি আমি যেটুকু আঁধার জোনাকি-আলোয় হারায় কাঁটা জেনেও সে পথেরই হই অনুগামী। বিরহ আ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment