লাল নীল স্বপ্ন- মুক্তধারা মুখার্জী

 

দূর। দূর। কি হবে রোজ ছাই পাশ সরকারি চাকরীর পরীক্ষা দিয়ে? খালি গাদা গুচ্ছের টাকা জলাঞ্জলি। চাকরীর পরীক্ষার ফর্ম তুলতেই পকেট ফাঁকা। সাধারণ গ্র‍্যাজুয়েট আমি। মেধাতেও চিরকাল সাধারণ। সারাদিন বই খুলে বসে থাকলেও পুরোটা মনেই রাখতে পারিনা। পরীক্ষা হলে বসলেও সব গুলিয়ে তালগোল পেকে যায়। কম্পিটিটিভ পরীক্ষাগুলোর একটাতে লেগেও গিয়েছিল। কিন্তু ভাইভা তে গিয়ে আটকে গেলাম। ওই যে পকেট খালি। তাই ঘুষটা দিতে পারলাম না। তারপর থেকে আর একটাতেও লাগাতে পারিনি। এদিকে কস্তুরীর ওপর বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য চাপ আসছে। কিন্তু কস্তুরীর বাবা মা সরকারী চাকুরে ছাড়া বিয়েই দেবে না। আর কস্তুরীর অন্য জায়গায় বিয়ে হলে, মাইরি বলছি মরেই যাবো।

আজও সেই প্রথম দিনটার কথা মনে পড়ে। কস্তুরীকে প্রথম দেখি কলেজের রবীন্দ্রজয়ন্তীতে। অদ্ভুত এক স্নিগ্ধতা ছিল ওর মধ্যে। পুরো স্টেজের মাঝে একা বসে তানপুরাটা নিয়ে যখন গান ধরলো বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে গিয়েছিলাম যেন। যতক্ষণ ওর গান চলছিল মনে হচ্ছিল যেন সুরলোকে পৌঁছে গেছি। চারিপাশে কিসের যেন মায়াজাল। আচমকা হাততালিতে ঘোর কাটে। দেখি, গান শেষ। কস্তুরী নমস্কার করে স্টেজ থেকে নেমে যাচ্ছে। সেই শুরু। সারাদিন মনের ভিতর যেন তানপুরাটা বেজেই চলতো। কলেজে গেলেই আমার চোখ ওকেই খুঁজতো। ফিজিক্স অনার্স ছিল ওর আর আমি সাধারণ পাস এ পড়ি, অনার্স জোটেনি। ওর পাশে নিজেকে বড়ই মূল্যহীন মনে হতো—ঠিক যেন অচল পয়সা। আসলে অনার্স এর সব ছেলেমেয়েরাই আমাদের তেমন পাত্তা দেয় না। কাজেই দূর থেকে দেখেই মনকে সান্ত্বনা দিতাম। একদিন ক্যান্টিনে আড্ডা মারছি। দেখি হঠাৎ কস্তুরী আমার দিকেই হেঁটে আসছে। মনের ভিতর ভূমিকম্প শুরু হলো। বুঝে গেল নাকি আমি ওকে ঝাড়ি মারি? ওরে বাপরে! প্রেস্টিজ ধুলোয় মিশে গেলো বলে!

—শুনলাম, তোমার বাবার কলেজ স্ট্রীটে বইয়ের দোকান আছে। আমাকে একটু এই বই দুটো এনে দিতে পারবে? আমি ভালো চিনি না তাই বলছিলাম আর কি।

কিছুক্ষণ হাঁ হয়েছিলাম। সম্বিৎ ফিরতেই ‘হেঁ হেঁ’ টাইপের বোকা হাসি দিয়ে বলে দিলাম,

“কালই এনে দেবো। কোনো ব্যাপার না”।

মিষ্টি করে হেসে “ধন্যবাদ” বলে কস্তুরী চলে গেলো। চলে যেতেই বন্ধুরা সব এই মারে কি সেই মারে! সুমিত বললো,

“এই যে সেদিন আমি একটা বই এনে দিতে বললাম তুই বললি নিজে গিয়ে দেখে নে। আর অমনি মেয়ে দেখে ভোলবদল। তুই শালা হেববি….”

কানে কিছু ঢুকছে না এমনিতেই আর। ওদের গালিগালাজ এর বদলে কস্তুরীর মিষ্টি রিনরিনে গলাটা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। আনন্দের চোটে পরের ক্লাস মিস হয়ে গেলো। পরেরদিনই বইটা এনে দিয়েছিলাম। শুরু হলো পরিচয়, বন্ধুত্ব। রোজ ওকে কলেজের পর বাসে তুলে দিয়ে তারপর আমি বাসে উঠতাম। যতক্ষণ না ওর বাস আসতো আমি দাঁড়িয়ে থাকতাম, ওর সাথে গল্প করতাম। নিজের না জানি কত বাস ছাড়তাম। আর ওকে বলতাম এটাতে যাবো না, কি ভিড়! এত ভিড়ে আমি পারি না। কোনোটা আমার বাড়ি যায়না বলতাম। ঐটুকু সময়ই তো পেতাম যখন ওকে প্রাণ ভরে দেখতাম, ওর কথা শুনতাম। ওকে মনের কথা বলার সাহস কোনোদিনই ছিল না। কিন্তু কস্তুরী ঠিক বুঝে ফেলেছিল। আমি বুঝলাম যেদিন ও রাস্তা পেরোতে গিয়ে আমার হাতটা পরম ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরলো। হৃদপিন্ডটা লাফ দিয়ে গলার কাছে চলে এলো যেন। মুখটা মনে হয় রক্তশূন্য হয়ে গিয়েছিল। আমার দিকে তাকিয়ে ও বললো,

“আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ—সুরের বাঁধনে”

ব্যস! আর কোনোদিন মুখ ফুটে কেউই কিছু বলিনি। কোথায় যেন দুজনের মনের তার জুড়ে গিয়েছিল। দেখতে দেখতে কলেজের দিন শেষ হয়ে এলো। আর শুরু হলো বেকারত্বের দিন। খালি দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়াচ্ছি আর একটা অজানা ভয় চেপে বসছে। কস্তুরী মুখে কিছু বলে না, আমাকে খুব উৎসাহ দেয় প্রতিবার। কিন্তু আমি জানি বাড়িতে ওকে চাপ দিচ্ছে বিয়ে করে নেওয়ার জন্য। পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে প্রায়ই। ওর বন্ধু রিঙ্কি আমার পাড়াতেই থাকে। রিঙ্কি সব বলেছে আমায়। জানি আগের সপ্তাহে একজন দেখে গেছে, তাদের পছন্দ জানিয়েও গেছে। এরপর হয়তো কস্তুরীর ঘ্রাণ বিষময় হয়ে উঠবে আমার কাছে। তবু আজ শেষ দেখা করেই আসি। শেষ বারের মত খুব কাছ থেকে অনুভব করে আসি ওর প্রতিটা শ্বাস প্রশ্বাস।

— আজকের পরীক্ষা টা কেমন দিলি তনয়?
— একই রকম। আর দেবো না ঠিক করেছি।
— সেকি কেন?
— কি লাভ পয়সা নষ্ট করে? সব ভিতর ভিতর ঠিক করাই থাকে। এসব শুধু প্রহসন মাত্র।
— কিন্তু অনেকেই পাচ্ছে তো ওভাবে। তুই আরেকটু পড় ভালো করে।
— আর কিভাবে পড়বো বলতো? আর যদি সুযোগও পাই সেই তো ভাইভা তে আটকে যাবো।
— তা কেন? সবাই তো আর খারাপ নয়। এত লোক যে চাকরী পাচ্ছে সবাই তো আর ঘুষ দিয়ে নয়।
— দেখ যে ব্যাপারটা জানিসনা সেটা নিয়ে জ্ঞান দিতে আসিস না প্লিজ।

তাকিয়ে দেখি কস্তুরীর চোখে জল। খারাপ লাগে। সত্যিই তো, ওর কি দোষ। ওই বা কতদিন বাড়িতে ঠেকিয়ে রাখবে। আমিই অপদার্থ!

— তুই আমাকে ভুলে যা কস্তুরী। আমি তোর যোগ্য কোনোদিনই তো ছিলাম না। সরকারি চাকরি জোটানোর ক্ষমতা আমার নেই। বাবার ব্যবসাটাই দেখবো ভাবছি। দোকানে বসবো। বাবার বয়স হয়েছে। আর পেরে ওঠেন না। তোর বাড়ী থেকে কোনোদিনই আমাকে মেনে নেবে না। তাই তুই ভুলে যাস আমাকে। বিয়ে করে নিস।

বলে উঠে দাঁড়ালাম। চলে যেতে উদ্যত হতেই প্রথম দিনের মত হাত টা শক্ত করে ধরে কস্তুরী বলে উঠলো,

— ভুলে যাবো বলে তো এই হাত ধরিনি আমি। আমার মনের সুতোয় তনয় নামের গিঁট বেঁধে ফেলেছি যে। এই দেখ, আমি একটা নার্সিং হোমে রিসেপশনিস্টের জব পেয়েছি। আর ভাবছি একটা গানের স্কুল খুলবো। সপ্তাহে একদিন বাড়িতে গান শেখাবো।এটা বলবো বলেই তোকে ডেকেছিলাম। তোর ব্যবসা আর আমার চাকরী,গানের স্কুল —দুজনে মিলে আমাদের স্বপ্নের লাল নীল সংসার সাজাতে পারবো না? কি বলিস! তোর বাড়িতে একবার কথা বলবি? আমি বাড়িতে বলে দিয়েছি সব। বাবা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তোর বাড়িতে রাজি থাকলে আমি কালই চলে আসতে পারি। খুব খারাপ বউ হবো না কিন্তু আমি,বিশ্বাস কর”।

ঈশান কোণের মেঘ সরে গিয়ে রোদ উঠছে। তানপুরা টা কোথায় যেন আবার সুর বেঁধেছে…

“আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে, দেখতে আমি পাইনি,তোমায় দেখতে আমি পাইনি”।

(সমাপ্ত)


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment