স্বাধীনতার ৭০- গার্গী লাহিড়ী

 

  উফ আজ বড্ড দেরী হয়ে গেল অদিতির । আবার বৃষ্টিটাও খুব জোরে এল। কেন যে মরতে স্যারের কথায় এখানে এলো ? কাল ১৫ ই অগাস্ট পতাকা উত্তোলন হবে খুব ধুমধাম করে তাই স্টেজ  ডেকোরেশন করতে হবে।স্যার এত করে বললেন আসতেই হলো। ধুর বাবা ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে তো কি হয়েছে ? ওতো প্রতি বছরই আসে। তার জন্য এত খাটনি ! সেই বিকেল থেকে রাত হয়ে গেল। আজ সাগ্নিক এর সাথে চ্যাট করাও হলো না। বাবা গো কাল আবার সকালে আসতে হবে , ন্যাশনাল অ্যানথম গাইতে হবে তার উপর আবার স্যারের দেশপ্রেমের ভাষণ !!! মাগো !! ভাবলেই বিরক্তি লাগছে। অদিতির এখানে আসার কোনো ইচ্ছেই ছিল না মা বাবা এমন জোর করল , বলল তোকে যেতেই হবে স্যারের  গুড  বুক এ তোর নাম থাকবে তাহলে। ওনার সাজেশন হুবহু ছাপা থাকে এক্সাম পেপার এ সেটা জানিস তো ? তুই যদি গিয়ে ডেকোরেশন এর কাজটা করে দিস খুশী হয়ে স্যার তোকে এক্সট্রা  ক্লাস ও করাতে পারে। অদিতিও আর না করেনি মুখটা ব্যাজার হলেও চলে এসেছে।

ইস অনেক রাত হয়ে গেল ! বাড়ি ফিরতে কত দেরী হয়ে যাবে !

অদিতিকে উদ্বিগ্ন দেখে স্যার  বলে ওঠেন

-অদিতি তুমি চিন্তা কোরো না আমি তোমাকে বাড়িতে ড্রপ করে দেব। বাড়িতে একটা ফোন করে দাও চিন্তা করতে বারণ করো।

উফ আবার সেই স্যারের ভাষণ শুনতে হবে গাড়িতে ? দেশপ্রেমের ভূত তো স্যারের ঘাড়ে চেপে বসে আছে! যেমন করে হোক বাড়ি ফিরবে কিন্ত স্যারের সাথে ? একদম না।

হালকা হেসে অদিতি বলে

– না স্যার আপনাকে কষ্ট করতে হবে না আমি ঠিক চলে যাব। এই তো একটু গেলেই তো মেইন রোড ঠিক একটা কিছু পেয়ে যাব। আপনি আজ এত খাটাখাটনী করেছেন আপনি রেস্ট নিন আমি বরং বাড়ি পৌঁছে আপনাকে জানিয়ে দেব। তাহলে তুমি আর দেরী কোরো না এখনই বেরিয়ে যাও। ছাতা আছে তো সাথে?

– হ্যাঁ স্যার ছাতা আছে , আসছি তাহলে।

অদিতি বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামে , হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে , ধুর বাবা রিক্সা গুলো আবার কোথায় গেল? হেঁটেই যেতে হবে , হাতে ছাতা কাঁধে ব্যাগ বিরক্তিকর ! রাস্তায় লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে। কিছু দোকান খোলা আছে বটে , বন্ধ দোকানের সামনে শেডের তলায় কিছু লোক বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে দাঁড়িয়েও আছে। অদিতি দাঁড়াতে পারবে না , রাত হয়েছে বাড়ি ফেরার তাড়া আছে।

তুমূল বৃষ্টিতে গলিপথটুকু হেঁটে বড় রাস্তায় এল সে। একটা বাস অটো কিছুই নেই! গোলপার্কের এই মুখটায় কেন যে অটো খালি পাওয়া যায় না? জিন্স টপ সব প্রায় ভিজে গেছে বাস এ সে উঠবে না। অগত্যা দাঁড়িয়ে অটোর অপেক্ষায়। ট্যাক্সি ধরব? খালি ট্যাক্সি পাওয়া টাও তো ঝামেলা! না বাবা থাক, কত কিছুই তো শোনা যায়! একটা অটো আসছে না? হ্যাঁ তাই তো! ঠাকুর যেন খালি হয়। অদিতি হাত দেখায়, গড়িয়া যাবে?

অটো দাঁড়িয়ে পড়ে।প্লাস্টিকের চাদর সরিয়ে অদিতি উঠতে গিয়ে দেখে অটো তে কোনো যাত্রী নেই। একটু থমকে দাঁড়ায় সে কোথায় যেন পড়েছিল রাতে খালি অটোতে চাপবেন না।

– দিদি তাড়াতাড়ি উঠে আসুন যা বৃষ্টি ? আমার বাড়ি যাবার তাড়া আছে

বাড়ি যাওয়ার তাড়া তো আদিতিরও আছে। হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলবে ?  আগে উঠে পড়ি তো পরে দেখা যাবে। অদিতি অটোর কোনার সিটে বসে ফোনটা বার করে। ইস বাড়ি থেকে কতগুলো মিসড কল , সাগ্নিক আর রিতিকার মিসড কল ও আছে। অটো ড্রাইভারকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জরিপ করে সে। অন্য রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে না তো ? বরং সাগ্নিকের সাথে ফোনে কথা বলি। ইস এনগেজড ! কার সাথে কথা বলছে? ধুর বাবা একী! দাঁড়ালো কেন অটো ? সতর্ক হয় অদিতি।

– দাদা বাঘাযতীন যাবো বলেই তিনটি ছেলে অটোতে উঠে পড়ে।অদিতি কে চোখ বুলিয়ে মেপে নেয় তারা, হেসে ওঠে। অদিতি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে সিঁটিয়ে যায় সিটের কোনায়। ছেলেগুলো বোতলের পানীয় খেতে খেতে উচ্চস্বরে কথা বলতে থাকে।

– দাদাভাইরা একটু আস্তে কথা বলুন। রাস্তার অবস্থা দেখছেন তো!!

– আরে চাচা কাল ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে মানে বোঝো ? স্বাধীনতা দিবস। যেমন খুশী চলার স্বাধীনতা, যা ইচ্ছে করার স্বাধীনতা। আজ একটু ফুর্তি করব না? তুমি চালাচ্ছো  চালাও না।

– এই বৃষ্টিতে অটোতে তুমি ফুটফুটে মামনি নিয়ে যাচ্ছ তোমার মনে খুশীর জোয়ার আর আমরা একটু ফুর্তি মারতে পারব না?

বলেই সবাই হেসে ওঠে।

অদিতি ভয়ে আরো সিঁটিয়ে যায়। ফোন করার কথাও ভুলে যায় নাঃ স্যারের কথা মানলেই ভাল হত। চাপদাড়ি ওলা অটো ড্রাইভার নির্লিপ্তভাবে অটো চালিয়ে যাচ্ছে। ছেলেগুলোর অকথ্য ভাষা কান গরম করে দিচ্ছে। মাঝে মাঝেই ঠিক করে বসার ছলে অদ্ভুত ভাবে নড়া চড়া করছে। অদিতির ভীষন অস্বস্তি হচ্ছে, ভগবান তাড়াতাড়ি বাঘাযতীন চলে আসুক।

– দাদাভাই যাদবপুর চলে এসেছে। এবার নামুন।

– মানে? আমরা তো বাঘাযতীন যাব, তোমাকে বলেছি তো!

– আসলে দাদাভাই অটোটা প্রবলেম করছে, মনেহয় জল ঢুকে গেছে, স্টার্ট নিচ্ছে না। আপনারা এখান থেকে অটো পেয়ে যাবেন। কিছু মনে করবেন না।

– এই চল রে নাম। কত হয়েছে তোমার?

– কি হল মামনি তুমি বসে আছো কেন? নেমে পড় এ গাড়ি আর যাবে না। আমাদের সাথে চল আমরা তোমায় বাড়ি পৌঁছে দেব। চলে এসো চলে এসো ।

– না দাদাভাই ও নামবে না। ও আমার মেয়ে, আমার সাথেই বাড়ি যাবে।

– হ্যাঁ! বল কী গো? জিন্স পড়া মামনি তোমার মেয়ে?

– কেন আমার মেয়ে হতে পারে না?

– এই চল চল অটোয়ালার মেয়েকে ছেড়ে দে। তুমি যাও মামনি বাপির সাথে বাড়ি যাও।

ছেলেগুলো বৃষ্টির মধ্যে হারিয়ে গেল। অদিতির ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। হঠাৎ অটো ড্রাইভার কে এত ভালো লাগল অদিতির চোখে জল  চলে এল।

– দিদি কিছু মনে করবেন না আমাকে ওরকম বলতে হল বলে। চিন্তা করবেন না আমার অটো ঠিক আছে আমি আপনাকে গড়িয়া ছেড়ে দেব। আর কোনো প্যাসেঞ্জার নেবো না। অদিতি কি বলবে ভেবে পায় না। গলাটা বুজে আসে।

– দিদি এর নাম যদি স্বাধীনতা হয় তাহলে এই স্বাধীনতা নেতাজিও চাননি আমিও চাই না। আমার নাম আব্দুল, আমি রমেন, রাজ্জাক, রবিনদর, রব, রুস্তম এদের আলাদা করতে পারি না। আমার অটোর পিছনে “দেশ মেরি মা হ্যায়” বা ” মেরা ভারত মহান” এসব কিছু লেখা নেই। আমার ছেলে মেয়ের নাম লেখা আছে , সালমা আর সাজ্জাদ। এখন সবাই নিজের বাবা মাকেই বাড়ি থেকে বার করে দিচ্ছে দেশ তো অনেক বড় ব্যাপার।

আমি বেশী লেখাপড়া করিনি । দেশ কাকে বলে আমি জানি না , স্বাধীনতার মানেও আমি জানি না। শুধু এইটুকু বুঝি অনেক বড় কিছু করতে গেলে আগে মনটাকে বড় করতে হয়। স্বাধীন চিন্তা ভাবনা তখনই আমরা করতে পারব যখন মন আমাদের পরিষ্কার থাকবে। আমরা যদি একে অপরকে শ্রদ্ধা সম্মান না করতে পারি তাহলে দেশ কে ভালোবাসবো কি করে ? দেশে কত রাজ্য কত ভাষা কত মানুষ এত কিছু আমি জানি না দিদি দেশপ্রেম বোঝাতে আমি বর্ডার এও যেতে পারব না শুধু জানি সময়ে অসময়ে আমার পাশের মানুষগুলোর হাত ধরে সাথে চলাই আমার কাছে স্বাধীনতা। মানুষ না মানুষ নির্বিশেষে উজাড় করে ভালোবাসাই আমার কাছে দেশপ্রেম। ভারতের পতাকা হাতে নিয়ে আমি যতটা না গর্ববোধ করি তার থেকে অনেক বেশী করে মনের মধ্যে একটা নিবিড় ভালোবাসা অনুভব করি। আমার দেশ আমার পরিবার।

– অনেক কিছু বলে ফেললাম দিদি কিছু মনে করবেন না। এই যে আপনার গড়িয়া চলে এসেছে। বৃষ্টিটাও বেশ কিছুটা ধরেছে। নিশ্চিন্তে বাড়ি যান দিদি।

অদিতি নেমে বাড়ির পথ ধরে। আজ অদিতি স্বাধীনতার এক অভূতপূর্ব অর্থ খুঁজে পেয়েছে। সামান্য এক অটো ড্রাইভার এর ক্ষণিকের মেয়ে হয়ে সে বুঝতে পেরেছে প্রকৃত দেশপ্রেম কী ?

বিরক্তিকর সেই অনুভূতি মন থেকে বিদায় নিয়েছে , সে জায়গায় এসেছে এক নিবিড় প্রশান্তি। সত্যিই আমার দেশ আমার পরিবার। সবার সাথে মিলে মিশে সুখে দুঃখে হাতে হাত রেখে চলার নাম ই দেশপ্রেম।

না কাল স্যারের ওখানে জাতীয় সংগীত গাইবে সে সম্পূর্ণ দরদ দিয়ে। পতাকা উত্তোলন করে দেশের প্রতি ভালোবাসায় নিজের হৃদয় পূর্ন করে তুলবে সে। কুর্নিশ তোমায় আব্দুল আব্বু।

_____


FavoriteLoading Add to library
Up next
গতি – শ্বেতা আইচ 'তার মানে আমার আর কোন প্রয়োজন নেই, তাই তো?' 'উফফ! আমি কি একবারও সে কথা বলেছি?' 'মুখে বলোনি,তবে বলে দিলে বোধহয় ভালো করতে।' গত ৩ মাস ধরে সম্পর্কটা ...
দৃষ্টি চকিত চোখের মধ্যে চোখ রেখে দেখি পাপড়ি মেলছে রোদের কুসুম ; যেখানে বর্গ ইঞ্চিতে সাঁতার কাটে চোরা ঘূর্ণী , মায়ার চন্দন লেপে দেয় নবমীর ললাটে , বুকের ভিতর দগ...
সুরসাধক ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য্যকে শ্রদ্ধার্ঘ্য -দিব্য... "একটি নাম নামেই গান সে গান শুধু ধনঞ্জয়। একটি মান দেদীপ্যমান। সে মান মানি ধনঞ্জয়। একটি প্রাণ আকাশ প্রাণ। সে প্রাণ জানি ধনঞ্জয়।" শ্রদ্ধাঞ্জলি........
সত্যি ডাকাতির গল্প – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়... একটা সত্যি ডাকাতির ঘটনা বলছি। তখন আমি মামারবাড়িতে থাকি, বেশ ছোট। মামারবাড়ি বাঘাটী নামে এক গ্রামে। গ্রামটা হুগলি জেলার ডানকুনি ছাড়িয়ে মশাট শিয়াখালার লা...
স্বর্ণযুগের ছড়া – প্রথম পর্ব।... গুপ্তযুগকে সুবর্ণযুগ বলা হত ইতিহাসেতেমনি এক সোনার যুগছিল এই বাংলাদেশেসাদাকালো সেসব ছবিরঙীন তার পোস্টারলবিকার্ড আর বুকলেটেআছে সে বিপুল সম্ভারউত্তম সুচি...
কাল বৈশাখী দারুন এক ঝঞ্ঝা এসে উড়িয়ে দিল এক নিমেষে, সব কিছু কি? ছিন্ন হল সব সংস্কার, সব পুরানো চিন্তার বাঁধন, সেকি কাল বৈশাখী? নতুন এক অংকুরের সৃষ্টি করে, যখন বিন...
ভালোবাসি অন্ধকারকে – রুমা কোলে... তোমার চাহিদা দিনের , আমার রাতটুকুই প্রিয় । তুমি ভালোবাসো আলো , আর আমি ! রাতের কালো । হ্যাঁ ,  কালো , অন্ধকার , কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার , যেখানে নিজ...
ক্ষত - বর্ষা বেরা প্রাপ্তি নীরবতা, ট্রিগারে জীবন্ত দহন l উন্মাদ জ্বলন্ত প্রেম, গাইছে সাতকাহন ll নিকোটিনে হয়েছি বিভোর, কেটেছে শতরাত্রি l দিবানিশি ভেব...
চল দাওকি – দেবাশিস_ভট্টাচার্য... মন খারাপ করা এক বিকেলে রুশা দাঁড়িয়ে ছিল দাওকি ফরেস্ট বাংলোর সামনের লনে। অস্তগামী সূর্যের লাল আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে দূরের পাহাড়গুলোর অন্দ...
অবশেষে খুঁজে পেলাম তোমাকে... -অর্পিতা সরকার    আর যাই করিস ওই মেয়ের দিকে ভুলেও তাকাস না সৌম্য, একবার যদি তোর লাইফে ঢোকে তাহলে তোর কেরিয়ার ফিউজ হয়ে যাবে গুরু। শত হস্ত দূরে থাক ওই...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment