ভয়ার্ত দুপুর – শাশ্বতী সেনগুপ্ত

জ কয়েক মাস হয়ে গেল বিজুরা উঠে এসেছে নাকতলার বাড়িটায়। বাড়িটা একতলা আর বেশ ফাঁকা মত। ওদের এই ভাড়া বাড়ি থেকে একটু দূরে মাত্র কয়েকটা বাড়ি রয়েছে। আসলে জলা এলাকা বলে অনেকেই এখনও এখানে বাসা বাঁধেনি। হয়ত দেখতে দেখতে কয়েক বছরের মধ্যে এই এলাকাটাও ঘিঞ্জি হয়ে উঠবে। বিজু এসব ভাবছিল। আজ রবিবার ওর অফিস ছুটি। বাড়িতে সে আর মা-বাবা। এখনও বিজুর বিয়ে হয়নি। তবে মা বাবা পাত্রী দেখার চেষ্টা করছেন। একটু আগে দুপুরের খাওয়া দাওয়া হয়ে গেছে। প্রায় প্রতি রবিবারই মাংস আনে বিজু। মাংস ছাড়া রবিবারটা তার ফাঁকা ফাঁকা মনে হয়ে। আজও পেট পুরে খেয়ে ওর ঘরে শুয়েছিল।

শ্রাবণ মাস, রবিবারের সকালটা মাটি করেছে। সেই যে ভোর থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে থামার বালাই নেই। বিজু ঘরে শুয়ে একটা বই পড়ছিল। আজ কিছুতেই যেন তার ঘুম আসতে চাইছে না। ওর ঘরের একটা জানলা আধখোলা করে রেখেছে। হাল্কা আলো বাইরে থেকে ঘরে পড়ছে। মাঝে মাঝে দমকা বাতাসে একটু আধটু বৃষ্টির ছাঁটও আসছে। আকাশ ঘনমেঘে ঢাকা। ইচ্ছা করে জনালাটা খুলে রেখেছে বিজু। ঠাণ্ডা হাওয়াটা ওর খুব ভালোলাগছে। একটা বই পড়ছিল সে। খানিকটা সময় পড়ার পর চোখ যেন বুজে এল। বেশ গাঢ় ঘুমে আছন্ন হল। বাইরে ক্রমাগত বৃষ্টির হুল্লোড় চলছেই।

ঘুমাতে ঘুমাতে হঠাৎ বিজু আঁ আঁ করে বিছানায় উঠে বসল। ঘরের চারিদিক তাকাল। না তো, কেউ নেই। তাহলে? ও জানলাটার কাছে এগিয়ে গেল। জানলাটা যেমন আধখোলা ছিল, তেমনই রয়েছে। তাহলে! ভেবে আবার বিছানায় বসল বিজু। ঘরটা প্রায়ান্ধকার হয়ে আছে। বিজু ভাবল, তবে কি ভুল দেখেছে? তার ঘুমের ঘোরেই মনে হয়েছিল, কে যেন জানলা দিয়ে প্রথমে উঁকি মারল, তারপর ঘরে ঢুকে এল। বীভৎস তার মুখটা। বিজু ভালো করে চোখ রগড়ে নিয়ে ঘরের আলোটা জ্বেলে আবার দেখল। না, কেউ নেই। তবে!

বাইরে বৃষ্টির দাপট ক্ষণে ক্ষণে বাড়ছে। পাশের ঘরে মা বাবা ঘুমিয়ে রয়েছে। বিজু মনের ভুল ভেবে বিছানায় শরীর এলিয়ে আড়মোড়া ভাঙলো। ঠিক তখনই একটা আবছা মূর্তি যেন জনালা দিয়ে ভিতরে ঢুকে জানলার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল। বিজু বিছানায় খাড়া হয়ে বসল। আবছা মুর্তিটা যেন ওর দিকেই চেয়ে আছে। এই দিনদুপুরে বিজুর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। কে? জড়ানো কন্ঠে বিজু জিজ্ঞ্যেস করল।

কোনও শব্দ নেই ঘরে। নিজেরই নিঃশ্বাসের শব্দ পাচ্ছে বিজু। সহসা মূর্তিটা যেন জনালা থেকে একটু সরে দাঁড়াল। বিজু আবার বলল, কে? কোনও উত্তর নেই। বাইরে সপাটে বৃষ্টি ঝরছে। জানলা দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস আসছে। বাতাসটা আগের চেয়ে বেশি ঠাণ্ডা মনে হল তার। বিজু বিছানা থেকে নেমে আলো জ্বালার কথা ভাবল। কিন্তু নামতে পারছে না। তার শরীর যেন মারাত্মক ভারি হয়ে গেছে। বিজু সম্মোহিতের মত জানলার দিকে চেয়ে রইল। তারপরই ভয়ে আঁতকে উঠল। কি দেখছে সে!

সে দেখতে পেল, একটা ঢ্যাঙা মত লোক ঘরের ভিতরই জানলার ধারটা খুঁড়ছে। দলা দলা মাটি উঠে আসছে সেখান থেকে। সহসা নজরে পড়ল, একটা কাপড় জড়ানো কি যেন রয়েছে লোকটার একটু পাশে। বিজু চিৎকার করতে গিয়ে দেখল, তার গলা দিয়ে স্বর বের হচ্ছে না। সে যেন পাথর হয়ে গেছে। লোকটা খানিকটা মাটি খুঁড়ে বেবাক দাঁড়াল ক্ষণিক মাত্র। তারপর পাশে রাখা কাপড় জড়ানো বস্তুটাকে নিয়ে এল। কাপড়টা খুলতেই বিজু ধপাস করে বিছানায় পড়ে গেল। তবে জ্ঞান হারাল না। কাপড়ের ভিতর থেকে একটা শিশুকে বার করল লোকটা, শিশুটি মৃত। তাকে ওই মাটিতে পুঁতে দিল ঢ্যাঙা লোকটা। তারপর ক্ষণিক মাত্র দাঁড়াল। লোকটার চোখ দিয়ে জল ঝরে পড়ছে। নিমেষ মাত্র, বিজু চিৎকার করে উঠল।

খানিক পরে পাশের ঘর থেকে ওর মা বাবা ছুটে এসে অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, কি হয়েছে বিজু? তুই এত ঘামছিস কেন? পাখা চলছে, বেশ ঠাণ্ডা ওয়েদার! বিজু মা বাবাকে বিস্তারিত বলতে পারল না। ধীরে ধীরে সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, না তো কিছু হয়নি, স্বপ্ন দেখছিলাম। ওর মা বাবা হেসে বললেন, বড়ই হয়েছিস অথচ ছোটই রয়ে গেলি। বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ওরা চলে যাবার পর বিজু জানলার কাছে গিয়ে দেখল, যেমন মেঝে তেমনই আছে। একটুও খোঁড়া নেই। তাহলে!
পরেরদিন অফিস কামাই করে বিজু খোঁজ চালাতেই জানতে পারল, বহু বছর আগে জলার মধ্যে এখানে যে মাঠটা ছিল সেটা শ্মশান ছিল। বিজুর আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না। তার মানে তার জানলার দিকটায় কোনও লোক তার শিশুকে মৃত্যুর পর পুঁতে দিয়েছিল। সেই আত্মা আজও শোক ভুলতে পারেনি, তাই আসা যাওয়া করে। দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। কয়েকদিন পরে বিজুরা বাড়িটা ছেড়ে দিল। বাড়িটা ফাঁকা পড়ে থাকত বলে ভাড়া দিয়েছিলেন এক ভদ্রলোক। তাকে বাড়ি ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বিজু বলল, এমন কাজ আর কোনওদিন করবেন না অর্থের লোভে। এ তো প্রাণ সংশয় হয়ে যেতে পারে যে কারোর। বিজুরা এখন ভালো আছে অন্য জায়গায় বাড়ি নিয়ে।

_____


FavoriteLoading Add to library

Up next

প্রেম আমার প্রেম- দেবাশিস ভট্টাচার্য...   ঘুম থেকে উঠেই পৃথার মনটা খুব ভালো হয়ে গেল। কাল রাত্তিরে হাওড়া থেকে ট্রেন এ ওঠার সময় অবধি মনটা খুব ভারী ছিল। বিজন এর সঙ্গে সেই স্কুল থেকে পরিচয়...
টিয়াপাখি – সৌম্য ভৌমিক... You will be rich within three months, when I am assuring you, it will happen surely. কথাটা ফুটপাথ থেকে ভেসে এলো, লাঞ্চ করতে বেরিয়েছি। একটু অবাকই হলাম...
আমার ঠাকুর - চন্দ্রাবলী ব্যানার্জী   দিদির ওয়ার্ক এডুকেশন খাতায় প্রথম দেখলাম সাদা দাড়ি ওয়ালা একটা লোকের ছবি, এক পাশে ছবি সাঁটা, অন্য দিকে এত্তসব লেখা ...
মানব বোমা – বিভূতি ভূষন বিশ্বাস... উগ্রপন্থী কার্যকলাপে সাহায্য করার জন্য আজ দুদিন হলো আমি লক আপে বন্দী আছি । নানান প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আমি হাঁপিয়ে উঠেছি । তবে এখনো আমার গায় হাত তো...
ধন্য জীবন – সরোজ কুমার চক্রবর্তী...   জীবন আমার ধন্য মাগো এমন দেশে এসে , গর্বে বলি ভারতবাসী আমি ভালোবেসে | বড় হলাম এই বাংলায় সুখে কাটাই দিন , ছোট বড় নেই ভেদাভেদ সবাই স্বাধীন...
ভূ-স্বর্গ ঘুরে আসুন... - বিভূতি ভূষন বিশ্বাস               ভ্রমন করতে কে না ভালোবাসে কিন্তু ভ্রমন করাই মানে যেমন আনন্দ করা তেমনই এটাও খেয়াল রাখা উচিত সেটি কোনমতেই যেন নিরান...
মহাকাশে কিং খান - রাজদীপ ভট্টাচার্য্য       এবার সম্পূর্ণ নতুন রূপে বড়ো পর্দায় শাহরুখ খান কে দেখতে পাওয়া যাবে, সম্প্রতি অর্ল্যান্ডো তে ফিল্ম জিরো র শুটিং শ...
আমি তোমায় ভালোবাসি – সুব্রত কুমার ঘোষ... কথাটা তোমায় বলবো ভেবেছিলাম তবুও আর বলা হয়ে ওঠেনি বক বক করা অজস্র শব্দ প্রলাপ হয়ে আছে তারা আর কথা হয়ে ওঠেনি। যে নদী সমুদ্র পায় না থেমে যায় মাঝপথে ...
মঞ্চ – হ য ব র ল স্কুলে নতুন টিচার এসেছেন সাংস্কৃতিক বিভাগের। প্রতি বছরের মত এবছরও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে একাদশ শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীরা। তার জন্যই আজ এই মিট...
অবিশ্বাস্য সেই রাত – শাশ্বতী সেনগুপ্ত... বাসে বসে বসেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেল। অমিত ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে ‘আর কতদূর’ জিজ্ঞাসা করতেই ড্রাইভার উত্তর দিল, ‘অর থোড়াসা’। অফিসের কাজ নিয়ে এ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment