লাল গাড়ির রহস্য – অরুণাভ দত্ত

টোগ্রাফি বিট্টুর প্যাশন | সুযোগ পেলেই সে ক্যামেরা নিয়ে এদিক ওদিক বেরিয়ে পরে  | আজ রাতের খাওয়া শেষ হওয়ার পরেই সে তার নতুন কেনা ডিএসএলআর টা নিয়ে ছাতে চলে গেলো | একটু আগেই একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে | এখন আকাশে মেঘ সরে গিয়ে চাঁদের হাসিমুখ দেখা যাচ্ছে | সেই আফছা আলোয় চারিদিকে এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করেছে | দূরে স্ট্রিট লাইটের আলোয় গাছের বৃষ্টিভেজা পাতাগুলো চিক-চিক করছে | অদ্ভুত একটা ভালোলাগা বিট্টুকে পেয়ে বসে | সে ধীরে ধীরে ক্যামেরার লেন্সে চোখ রাখে | এবার সে ছাতের চারিদিকে ঘুরে ঘুরে চারপাশের শান্ত পরিবেশটাকে ক্যামেরাবন্দী করতে থাকে | পর পর কয়েকটা ক্লিক করার পর সে খুশি মনে নীচে নেমে এলো |

                          বিট্টু এবার বোর্ড এক্সাম দেবে পড়ার খুব চাপ , তবুও বইগুলো সরিয়ে রেখে ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে সে বিছানার উপর উঠে বসলো | ছবিগুলো ভালো করে দেখবার জন্যে ডিসপ্লে তে চোখ রাখলো , চারিদিকের নির্জন পরিবেশকে সে ভালোভাবেই ক্যামেরাবন্দী করতে পেরেছে | একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো তার মুখে |

                     কিন্তু ছবিগুলো ভালো করে লক্ষ্য করতে গিয়ে একটি জিনিস দেখে সে চমকে উঠলো | যদিও ছবিগুলি ছাতের বিভিন্ন দিক থেকে তোলা হয়েছে তথাপি প্রতিটি ছবিতেই একটা লাল রঙের গাড়ি অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে | সে চমকে উঠলো ,এবং ভাবতে লাগলো সবগুলো ছবিতেই লাল গাড়ি এলো কোথা থেকে ! ওর স্পষ্ট মনে আছে ও যখন ছবি তুলছিল তখন আশেপাশে কোথাও কোন গাড়ি ছিল না তাহলে ছবিতে গাড়ি এলই বা কোথা থেকে!

                  পরেরদিন সকাল হতেই বিট্টুর মন আগের দিনের ছবিটার কথা একেবারে মুছে গেলো | সামনেই মক টেস্ট ,সারাদিন পড়াশুনো বন্ধুদের সাথে গ্রুপ ডিসকাশন এইসব নানারকম ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে বিট্টুর দিনগুলো কাটতে   লাগলো | কিন্তু এর মধ্যে একদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো দিনদশেক বাদে সে একদিন ইংরাজী টিউশন পড়ে বাড়ি ফিরছিল ,সেদিন সন্ধ্যা থেকেই আকাশের মুখ ভার ছিল | ক্লাস থেকে বেরোনোর পরই টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হলো | এখান থেকে বাড়ি ফেরার জন্যে ওকে দুবার অটো চেঞ্জ করতে হয় | একটু পরেই অবশ্য একটা অটো পেয়ে গেলো সে | খালপাড় এসে যাওয়ায় সে অটো থেকে নেমে পরলে ততক্ষণে বৃষ্টিটাও জাঁকিয়ে পরতে শুরু করেছে | রাস্তায় কেবল অটোই নয় কোন মানুষজনেরও দেখা নাই |

                             এদিকে ঘড়িতে প্রায় আটটা বাজে ,বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে দৌড়িয়ে ও একটা বাড়ির ঝুলন্ত বারান্দার নীচে আশ্রয় নিলো |ফিরতে দেরী হবে জেনে বাড়িতে ফোন করে দিলো সে | কুড়িমিনিট কেটে গেছে বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণ নেই,কোন যানবাহনও দেখা যাচ্ছে না | আর কোন উপায় না পেয়ে বিট্টু বাকি পথটুকু হেঁটে যাবে বলে মনস্থির করলো | এইসময় আকাশে দেখা গেলো বিদ্যুতের ঝলকানি | সেই আলোতে ও দেখতে পেলো তার থেকে মাত্র হাত পাঁচেক দূরেই দাঁড়িয়ে আছে সেই লালগাড়িটা | যখন সে এসেছিল তখন তো এখানে কোন গাড়ি ছিল না | মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বিট্টু ধীরে ধীরে পায়ে এগিয়ে গেলো গাড়িটার দিকে,অনেক পুরোনো গাড়িটা | মোবাইলের টর্চ জ্বেলে ও গাড়িটাকে ভালো করে দেখতে লাগলো | গাড়ির পিছন দিক দিয়ে কৌতূহলের বসেই গাড়ির নাম্বার প্লেটের একটি ছবি তুললো | এবার সে  ঘুরে গাড়িটার সামনের দিকে চলে এলো ড্রাইভারের সিটে একটা কাঁচ ভাঙ্গা ছিল সেখানে গিয়ে গাড়ির ভিতর টর্চের আলো ফেললো |তারপর একটা অস্ফুট চিৎকার করে জ্ঞান হারিয়ে বিট্টু ওখানেই লুটিয়ে পরলো |

            কিছুক্ষণ পর আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকালো বিট্টু | প্রথমে সে কোথায় আছে ,কী হয়েছে কিছুই মনে করতে পারলো না,সারাশরীর জবজবে ভিজে মাথাটা ঝিমঝিম করছে ,আস্তে আস্তে উঠে বসলো সে ,খানিকক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো তারপর আস্তে আস্তে তার সবকিছু মনে পড়ে গেলো | তাড়াতাড়ি করে ব্যাগট্যাগ গুটিয়ে নিয়ে বড়ো রাস্তায় এসে দাঁড়ালো কিন্তু মোবাইলটা যে কোথায় ছিটকে পরে গেছে সে আর খুঁজে পেলো না | তখন বৃষ্টি থেমে গেছে ভাগ্যক্রমে একটা ফাঁকা অটো পেয়ে গেলো | বাড়ি ফিরে মায়ের একগাদা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হলো তাকে | যাইহোক গা,হাত পা মুছে একটু কিছু খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পরলো সে | জ্বর জ্বর লাগছে মাথাটা ভার হয়ে আছে | জোর করে চোখ বন্ধ থাকলো কিন্তু ঘুমের মধ্যেও সেই বিভৎস দৃশ্যটা কিছুতেই ভুলতে পারলো না | গাড়িটার ভিতরে হাতপা বাঁধা অবস্থায় পরে আছে একটা লোক ,তার গলার নলিটা কাটা কিন্তু লোকটি অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছে ওর দিকে | ধড়মড় করে উঠে বসলো বিট্টু সারাশরীর ঘামে ভিজে গেছে | ঢকঢক করে একগ্লাস জল খেয়ে আবার শুয়ে পরলো সে | কিন্তু বাকি রাতটা তার আর ঘুম এলো না |

             পরেরদিন বাবা লোকনাথের পুজো উপলক্ষে মামারবাড়িতে তাদের নিমন্ত্রণ ছিল | বাবা ও মা গেলেও পড়াশুনো করার জন্যে বিট্টু বাড়িতেই থেকে গেলো কিন্তু পড়তে পারলে তো !

                       চোখের সামনে বারবার ওই লোকটার মুখটাই ভেসে উঠতে লাগলো ওর | লোকটা যেন ওকে কিছু বলতে চাইছে | রাত ৯টা বাজে মা বাবা তখনও ফেরেননি ,চোখটা জ্বালা করছিল বিট্টুর তাই বইখাতা সরিয়ে রেখে আলো নিভিয়ে শুয়ে পরলো বিট্টু | একটু পরেই চোখটা লেগে এলো এমনসময় সে অনুভব করলো ঘরের মধ্যে ও ছাড়াও আরেকজন কেউ রয়েছে  | ওর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে ওকেই লক্ষ্য করছে ,বিট্টু কে কে বলে উঠে বসতে চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না | তখন একটা গমগমে স্বর কথা বলে উঠলো – “ভয় পেয়ো না বিট্টু,আমি তোমাকে কয়েকটা কথা বলতে চাই ,চোখ মেলে তাকালো বিট্টু কিন্তু অন্ধকারে কাউকে দেখতে পেলো না |

                                  অন্ধকারে আস্তে আস্তে চোখটা সয়ে যেতে বিট্টু দেখলো তার মাথার কাছে একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে | সে নড়াচড়া বন্ধ করে এক অদৃশ্য আচ্ছন্নতায় শুয়ে রইলো | ছায়ামূর্তিটা তখন কিছু বলে যাচ্ছিল,বিট্টু শুনতে পেলো সে বলছে “আমি হলাম একজন আন্ডার কপ এজেন্ট ,আমার কাছে একটা পেনড্রাইভ আছে যেটির সাহায্যে মাফিয়া চক্রের একটা বড়ো রকেটকে ধরা সম্ভব হবে | কিন্তু দুষ্কৃতিকারীরা তা জানতে পেরে আমাকে আক্রমণ করে,আমি সুযোগ বুঝে ওটাকে একটা ঝোপের মধ্যে ফেলে দিই কিন্তু ওরা আমাকে মেরে ফেলে ,আমি চাই তুমি সেটা উদ্ধার করে পুলিশের হাতে তুলে দাও |” মূর্তিটা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু এমন সময়ে মা বাবারা ফিরে এলেন | তাদের গলার আওয়াজ পেয়ে ছায়ামূর্তিটা মিলিয়ে গেলো | মা ঘরে ঢুকে আলো জ্বালিয়ে দিলেন | তারপর বিট্টুর গায়ে,মাথায় হাত বুলিয়ে দুএকটা কথা বলে চলে গেলেন | কিন্তু সারারাত বিট্টুর আর ঘুম এলো না | পরেরদিন বিট্টুর দিদিভাই এসে হাজির | গল্প শুনে সারাটাদিন কেটে গেলো |

মোবাইলটা হারিয়ে যাওয়াতে বিট্টুর খুব অসুবিধে হচ্ছিলো | বিকেলবেলা সেই কথাই দিদিভাইকে বলতে গিয়ে কথায় কথায় সেসব ঘটনাও দিদিভাইকেও বলে ফেললো | দিদিভাই খুব সাহসী সে বললো – “চল আজ রাতেই আমরা ওখানে যাবো |” প্রথমে কিছুটা ইতস্তত বোধ করলেও শেষপর্যন্ত বিট্টু রাজী হয়ে গেলো | সবাই ঘুমিয়ে পরলে ওরা দুজন বেরিয়ে পরলো | নির্জন রাস্তা ধরে সামনের দিকে এগিয়ে চললো ওরা ,কিন্তু খুঁজবে কোথায় ? কিছুই বুঝতে পারছিল পারছিল না ,হঠাৎ দেখে সেই ছায়ামূর্তিটা ওদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে | ওদের ইশারা করে মূর্তিটা এগিয়ে চললো | এক জায়গায় পৌঁছে ওরা আর মূর্তিটাকে দেখতে পেলো না | কিন্তু বিট্টু বুঝতে পেরেছে এটাই সেই জায়গা যেখানে সে গাড়িটাকে দেখতে পেয়েছিল | হঠাৎ দিদিভাই বললো – “দেখ তো এই ঝোপের মধ্যে ওটা কী পরে আছে ?” বিট্টু গিয়ে দেখলো ওটা একটা পেন ড্রাইভ তবে কী ওটাই সেই পেনড্রাইভ ,তবে কী এটাই সেটা | যাইহোক ওরা ওটা তুলে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো এবং মা বাবা কিছু টের পাবার আগেই যেযার ঘরে গিয়ে শুয়ে পরলো |

             পরেরদিন ওরা স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে গিয়ে সব ঘটনা জানালো | অফিসার তো প্রথমে ওদের কথা হেসেই উড়িয়ে দিলেন | পরে পেনড্রাইভটা চালিয়ে দেখে বললেন “এটা তো মিঃ সুরজিত সিনহার কেস মনে হচ্ছে,ঠিক আছে আমরা ইনকোয়ারি করে দেখছি |

           পরেরদিন সকালে প্রতিটি নিউজ চ্যানেলে দেশের একটা বড়ো মাফিয়া চক্রের গ্রেফতারের কাহিনী সম্প্রচারিত হতে লাগলো | আর তাতে বারবার উঠে আসছিল বিট্টুর নাম | সবাই অবাক হয়ে টিভির সামনে বসে আছে ,বিট্টুই কেবল একা একা বারান্দায় বসে আছে | মোবাইলটার জন্যে আজ তার খুব মনখারাপ করছে | এমন সময় একজন অচেনা ব্যক্তি এসে ওর হাতে একটা প্যাকেট দিলো,ও অবাক হয়ে প্যাকেটটা খুলে দেখলো তার মধ্যে রয়েছে ওর সেই হারানো মোবাইলটা | ও চমকে উঠে লোকটির মুখের দিকে তাকালো | লোকটির মুখটা যেন আস্তে আস্তে সুরজিত সিনহার মতন হয়ে যাচ্ছে | বিট্টুর বিস্ময় এর কাটার আগেই মিঃ সিনহা মুচকি হেসে হাত নেড়ে অদূরে দণ্ডায়মান সেই লালগাড়িটাতে উঠে বসে মুহূর্তের মধ্যে যেনো হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন ||

   –সমাপ্ত–


FavoriteLoading Add to library

Up next

স্ফুলিঙ্গ –  কৌশিক প্রামাণিক...   আজ যেন সব হারিয়ে যেতে চাইছে ক্ষণিকের মিথ্যাগুলোর জন্যে, তবু তো আমি আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলাম সেই পুরোনো তোমাকে | এই সেদিনকারই তো কথা যেদিন আমায...
ধর্ম মানে আজ ‘লুট লে’ – ঈস্পিতা ... আমরা সাতিশয় ধার্মিক জাতি। কোনও সন্দেহ নেই। ধর্মের একটা দিকই শুধু নেই, সে হলো গে' মানব-ধর্ম। ধর্ম আমাদের প্রেমিক করেছে। মানব প্রেমী নয়। ক্ষমতা প্...
কাল বৈশাখী দারুন এক ঝঞ্ঝা এসে উড়িয়ে দিল এক নিমেষে, সব কিছু কি? ছিন্ন হল সব সংস্কার, সব পুরানো চিন্তার বাঁধন, সেকি কাল বৈশাখী? নতুন এক অংকুরের সৃষ্টি করে, যখন বিন...
মজুমদারবাবু - প্রিয়া সরকার    সে অনেককাল আগের কথা,তা বিশ পঁচিশ বছর আগের তো বটেই।আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি,হাফ ইয়ার্লি আর অ্যানুয়্যাল সাকুল্যে দুটি পরীক্ষা...
শেষ থেকে শুরু -পায়েল সেন    সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। তাই সুজয় চললো তার ঘরের সমস্ত জানলা বন্ধ করতে। ভিজে গিয়েছিল প্রায়। ঘর অন্ধকার করে এসে একমনে বসেছিলো ...
বল্টুর মামার বাড়িতে বাঘ রহস্য -রুমা কোলে( বেনাম... { ১ }           " বল্টু " খুব ডানপিটে, সাহসী আর মেধাবী একটি ছেলে । ভালো নাম " সুবোধ মল্লিক "। কলকাতা শহরের সরকারি একটি স্কুলে পাঠরত । আর মা ভালোবেস...
মৃত্যুদিনের দূত - শুভদীপ পাপলু (সেন)    রূপম; রূপম, আমি কথা দিলাম, একসাথে হাঁটবো রূপম, তোর লাশের দোহাই; সবকটা কে মারবো। রূপম, তুই, সবচেয়ে কম মার্কস পেতিস,...
সঙ্গী – অনিন্দিতা পাল (অর্না)... ভূমির মনটা খারাপ। সারাদিন মোবাইল ঘাটায় ওর মা ওকে বকেছে। কিচ্ছু ভাল লাগছে না ওর। বন্ধু অর্নাকেও অনেকবার ফোন করল সেও ফোনটা ধরছে না। কলেজে কিছু কাজ আছ...
মুখরোচক এগডাল বানানোর সহজ কৌশল – মালা নাথ...     সুকুমারবাবুর অমর সৃষ্টি 'অবাক জলপান' নামক নাটকের বেশ কয়েকটি সংলাপে স্রষ্টা তাঁর আপন অন্তরের সমগ্র মাধুরীকে একত্রিত করে এবং তাঁর ট্রেডমার্ক ব...
সাঁকো – নিলয় গোস্বামী... গাছের শিরায় চুপিচুপি রঙ জমা রাখো সারাটা ভাবনা জুড়েই কাঠুরে  আবেশ যেখানে জীবন অবিশ্বাসে নীল রাঙা সাঁকো সঞ্চয় শেষে একা পথ হাঁটে যে দরবেশ। ছায়াদে...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment