অমাবস্যার রাত – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়

     আমার দাদু বরুণদেব মুখোপাধ্যয়ের জীবনে এমন ঘটনা লক্ষ্য করেছিলেন মৃত্যু পাঁচ বছর আগে থেকেই। অমাবস্যার রাতেই এই ঘটনা একমাত্র ঘটতো। দাদুকে বহু ডাক্তার দেখানো হয়েছিল, বহু কাণ্ড করা হয়েছিল তবু অমাবস্যার রাত এলেই দাদু এই কাণ্ড করতেন। এক ডাক্তার বলেছিলেন, এটা একটা মানসিক রোগ। আমরা দাদুকে বড় সাইক্রিয়াস্টিস দেখিয়েছিলাম। কেউ ভালো করতে পারেননি। অথচ আশ্চর্য অমাবস্যা ছাড়া দাদু একদম ঠিক থাকতেন। তবে বকবকানি চলতই। কিন্তু পাগলের মত ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটোছুটিটা অমাবস্যার রাতেই হত। এ ঘটনার ব্যাখ্যা আজও আমরা পাইনি, ওইসব ডাক্তাররা যারা দাদুকে দেখেছিলেন, চিকিৎসা করেছিলেন তারাও এর ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। জাস্ট ঘটনাটা ঘটে গেছে। আমাদের সকলেরই আউট অফ কন্ট্রোল।

কথাগুলো প্রায় এক নিঃশ্বাসে বলে থামল দীপন। সে আমার বন্ধু। কোনও কোনও বোরবারে আমাদের বাড়িতে আসে। আসলেই ভৌতিক গল্প। তবে দীপন বানানো কিছু বলে না। সরকারি কাজে তাকে সারা বছরই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হয়। নানারকম অভিজ্ঞতা আছে তার সেগুলোই শেয়ার করে। সান্ধ্য আড্ডা। টেবিলে চায়ের গরম কাপ, সেখান থেকে ধোঁয়া উড়ছে। আছে একটা বড় প্লেটে গরম গরম সিঙ্গারা। কারণ দীপন সিঙ্গারা খেতে খুব ভালোবাসে। আমার স্ত্রী ঘরে তা বানায়। দারুণ টেস্টফুল কিন্তু ক্ষতিকারক নয়। মাসটা এ রকমই নভেম্বর। শীত আর বৃষ্টির জগাখিচুরি মাস হয়ে আছে সেবার। দীপন গরম সিঙ্গারায় কামড় বসিয়ে বলল, শুরু করি? ঘরে আমি, স্ত্রী আর আমার পাশের ফ্ল্যাটের দুই প্রিয় বন্ধু। দীপন শুরু করল।

পাঁচ বছর দাদু এই রকম করেছিলেন। আজ অমাবস্যার সন্ধ্যা। দীপন বলল, তোর ঘরে বসে আছি। এমনই এক অমাবস্যার রাত মামারবাড়িতে। আমি মামারবাড়িতে বড় হয়েছি। লেখাপড়া শিখেছি। ওখান থেকেই পরীক্ষা দিয়ে চাকরিও পেয়েছি। তুই সবই তো জানিস। তারপর চলে আসা। প্রথম ঘটনাটা ঘটল এক অমাবস্যায়। দাদু সামান্য অসুস্থ ছিলেন। এমন কিছুই নয়, সর্দি আর জ্বর ছিল গায়ে। গভীর রাত। আমরা সবাই ঘুমাচ্ছি। দাদু সারসার ঘরের একটি বড় ঘরে থাকেন। হঠাৎ একটা চিৎকার, দাঁড়া, দাঁড়া, আমি যাব। কতক্ষণ এমন চিৎকার চলছিল আমরা কেউ জানি না। প্রথম ঘুম ভাঙে বড়মামার, তারপর মেজমামার, তারপর ছোটমামার তারপর আমার। বড়মামা চিৎকার করলেন, তোরা ওঠ, বাবা দৌড়ে বাইরের রকে বের হয়ে যাচ্ছে। আমরা উঠে পড়েছি তখন। দৌড় লাগালাম সবাই দাদুর পিছনে।  দাদু ৭৫।  কিন্তু আমরা পারছি না। ঘর থেকে বেরিয়েই লম্বা বিশাল আয়তনের রক। দাদু দৌড়াছেন আর বলছেন, এক মিনিট, এক মিনিট, আমি যাচ্ছি তোদের কাছে। আমরা দাদুর পিছনে দৌড়াচ্ছি। হাতে আমাদের টর্চ।

কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না। দাদু তা’হলে কাকে বলছেন! দাদুকে আমরা ধরতে পারলাম না। ভ্যাগিস দাদু নিজেই অজ্ঞানমত হয়ে রকের একধারে বসে পড়লেন। আমরা সবাই হাজির হয়ে, ঘরে এনে জলটল দিতে দাদু ফিট হলেন। আমরা বললাম, কার পিছনে ছুটছিলে? তোমার নয় শরীর খারাপ। আগে খেয়াল করিনি কেউ। পরে দাদুর গায়ে হাত দিতেই বুঝতে পারলাম জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। দাদু সুস্থ গলায় বললেন, জিতু, সিতু আর নিতুর পিছনে। ওরা আমায় ডাকছে, আমার সঙ্গে খেলা করবে বলছে। আমরা হাঁ করে দাদুর মুখের দিকে তাকালাম। জিতু ছোড়দাদু বহুদিন আগেই মারা গেছেন দুর্ঘটনায়। সিতু দাদুর বন্ধু কয়েক বছর আগে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। নিতু মেজদাদু তিনিও মারা গেছেন। আমরা সবাই সবার মুখের দিকে তাকালাম। বড়মামা বললেন, লক্ষণ ভালো নয়। ডাক্তার ডাকতে হবে। সারারাত আমরা দাদুর পাশে রইলাম। সকালে ডাক্তার এলেন, দাদু সুস্থ। হার্টবিট ঠিক আছে, প্রেসার নর্মাল, গায়ে জ্বরের বিন্দুমাত্র নেই। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে বলতে হো হো করে হাসছেন আর বলছেন, ছেলেগুলোর মাথায় পোকা আছে। ওদের ভয়, বাবার বুঝি কিছু হল। নাতিটাও তাল মেলায় ওদের সঙ্গে বলেই আমার দিকে আঙুল তুললেন, বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছে, হু….। কেউ কিছু বুঝলাম না হাঁ করে সবাই দাদুর দিকে তাকালাম। ডাক্তারবাবু জাস্ট একটা ভিটামিন লিখে দিয়ে চলে গেলেন।

আরো একটা সিঙ্গারায় কামড় দিয়ে দীপন চায়েও চুমুক দিল। তারপর বলতে শুরু করল। সারাদিন কোন ঝামেলা নেই। ক্রমে অন্ধকার ঘনাল। গ্রামের পরিবেশ যেমন হয় তেমনিই হয়ে উঠতে লাগলো। সব ঠিক আছে। দাদু রাতে সামান্য আহার করেন । তাই করলেন। ক্রমে রাত বাড়তে লাগল। অমাবস্যা কেটে গেছে। কিন্তু রাত গভীর হতেই দাদু দালানে পায়চারী শুরু করলেন। আমরা সকলে যে যার ঘরে সতর্ক আছি, শোবার ঘরের দরজাও খোলা আছে সবার। হঠাৎ শুনতে পেলাম, দাদু হো হো করে হাসছেন। আর বলছেন, সিতু তোর মনে আছে? সেই ফুটবল ম্যাচের কথা। উফ, কি সাংঘাতিক। তুই তো হ্যাটট্রিক করেছিলিস? হা হা হা। ও জিতু এসে গেছিস? তুই তো দীনু ময়রার দোকানে ৫০০ রসগোল্লার অর্ডার দিয়েছিলি, মনে আছে তোর? আরে নিতু মাই ডিয়ার ব্রাদার হাউ ইউ? এদিকে আয়, এদিকে আয়। বেশ মোটা হয়ে গেছিস! ছিপ ফেলার নেশাটা আছে না চুলোয় দিয়েছিস। উফ, কত জায়গায় না যেতিস আর ইয়া বড় বড় রুই-কাতলা ধরে আনতিস। জানিস দীপনটা আমাদের নাতি রে, ব্যাটা মাছ খায় না। বলে মাছে গন্ধ লাগে। হা হা হা। ডিসগাস্টিং। বোকা কোথাকার। আমরা সবাই যে যার ঘরে নিঃশ্বাস বন্ধ করে পড়ে আছি। বড়মামা খুব সাহসী ছিলেন, তিনিই প্রথম গলায় আওয়াজ তুলে টর্চ নিয়ে দালানে বেরিয়ে পড়লেন, বাবা, বাবা! কার সঙ্গে কথা বলছো? দাদু পায়চারী করতে করতে বললেন, তোরা আর মানুষ হলি না । বড়রা কথা বলছে আর বেরিয়ে এলি। নিমেষ মাত্র। তারপরই দাদু চেয়ারে বসে পড়লেন। বললেন, জল দে, তেষ্টা পেয়েছে। দাদু জল খেলেন। একেবারে স্বাভাবিক। ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। আমরা দালানে। বড়মামা বললেন, ব্যাপার ভালো নয়। মেজমামা বললেন, বাবার মাথাটা ঠিক আছে তো? বড়মামা বললেন, একেবারে ওকে আছে। ছোটমামা বললেন, তা’হলে এটা কি? দীপন বলল, আমি চুপচাপ। বড়মামা বললেন, কিছু একট প্রবলেম হচ্ছে। কাল ডাক্তার ডাকতে হবে।

কোনও ডাক্তারই দাদুকে ঠিক করতে পারেননি। পাঁচ বছর ধরে এই অসহ্য যন্ত্রণা দাদু সহ্য করেছেন কি জানি না। আমরা সকলে সহ্য করেছি। আবার সিঙ্গারায় কামড় বসালো দীপন। আমার স্ত্রী বলল, মাইক্রোওভেন একটু গরম করে দিই? দীপন বলল, দরকার নেই হাল্কা গরম আছে, চলবে। তুমি তো খুব ভালো বানাও, টেস্টই আলাদা।

আবার শুরু করল সে, লাস্ট অমাবস্যা দাদুর জীবনে। সেদিন রাতে এক অদ্ভুৎ কাণ্ড। তখন রাত প্রায় দেড়টা। কত বছর ধরে আমরা কেউ-ই ভালো করে ঘুমাতে পারিনি। ওই গভীর রাতে সবাইয়ের চোখেই হয়ত ঘুমের আমেজ এসেছিল। হঠাৎ দাদু গল্প বলতে শুরু করলেন আর মাঝে মাঝেই হাসছেন। ঘুম ভেঙে গিয়ে আমরা সবাই চুপচাপ পড়ে আছি বিছানায়। এমন সময় দাদুর হাসির সঙ্গে আরো তিনটি ভিন্ন গলার হাসি শুনতে পেলাম আমরা। অবিকল সেই গলা। আমরা কেউ-ই ভুলিনি নিতু, জিতু আর সিতু দাদুর হাসির ঢঙ। বহু বছর পেরিয়ে গেলেও। আমরা কেউ আর ঘরে শুয়ে থাকতে পারলাম না। প্রায় কোনও এক মিরাক্কেলেই বোধহয় একসঙ্গে তিনমামা ও আমি দালানে বেরিয়ে এলাম। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আমাদের দালানের মাঝখানে চারটি চেয়ার। অথচ দালানে একটাই চেয়ার থাকে। একটা দাদু বসে আছেন। তিনটেতে কারা! আমাদের সকলের হাড় হিম হয়ে গেল। তিনজনকেই আমরা চিনি। তাঁদের অবয়ব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। দিব্যি ওরা চেয়ারে মস্তি নিয়ে বসে আছে। আমাদের আগমণের বার্তা দাদু না পেলেও ওই তিন অতিথি পেয়ে গেছিলেন। নিমেষে তারা হাওয়া। বড়মামা তখনই টর্চ জ্বেলে ফেললো। চেয়ার নেই, তিনজনও নেই। দাদু একা চেয়ারে বসে আছেন। বড়মামা গিয়ে বললেন, বাবা, ও বাবা…টাচ  করলেন দাদুর শরীর। এলিয়ে পড়ল চেয়ারে। তিনমামা ঝুঁকে পড়লেন। দাদু মারা গেলেন সেই রাতেই।

গল্পটা শেষ করে সেই যে চলে গেছিল দীর্ঘ বছর আর দীপন আসেনি। আমাদের সকলেরই বয়স বেড়েছে। চাকরি থেকেও অবসর নিয়েছি। নানা রোগ বাসা বেঁধেছে শরীরে। একদিন স্ত্রী বলল, কতদিন দীপনদা আসেননি। একবার তো খোঁজ নিতে পার। আমি বললাম, বেশ, ফোনটোন নয়। ওর বাড়ি যাবো আমি। এখন তো অফুরন্ত সময়। একদিন দুপুরের দিকে ওর বাড়ি চলে গেলাম। দীপন খুব খুশি যেতে। খাওয়া-দাওয়া না করিয়ে ছাড়লো না। তবে ওর শরীর ভেঙে গেছে। একটু আধটু কথাও বেসামাল। ওর দুই ছেলে, দুই মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। ওর ছেলেরা বলল, বাবাকে এখন এ রকম দেখছেন। কিন্তু দীর্ঘ চার বছর ধরে আমরা নাজেহাল। আমি বললাম, কেন? ওরা বলল, অমাবস্যার রাত এলেই বাবা বদলে যায়। তারপরও প্রতি বছর চলে নানা রকম কথা। রাতদুপুরে। আমি স্থির থাকতে না পেরে দীপনের দাদুর ঘটনাগুলো বলে গেলাম কিছু। ওরা বলল, হুবহু এ রকমই। আমি ফিরে এসে স্ত্রীকে বললাম। দীপন ওর দাদুর সঙ্গে কথা বলে।  অমাবস্যা এলে বদলে যায়। স্ত্রী বলল চুপ করো, আমার ভয় লাগছে।আর শুনব না।

_____


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment