সবই উল্টো

– সৌম্যদীপ সৎপতি

 

(এক)

ড়মড় করে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম।
চারদিক অন্ধকার, মাথার উপরে ফ্যানটাও বন্ধ, লোডশেডিং।বুঝতে পারলাম ঘামে সারা শরীর ভিজে গেছে।কিন্তু এই মাঝরাতে এমন আচমকা ঘুমটা ভাঙার কারণ কী?
প্রশ্নটার জবাব পেলাম পরক্ষণেই।
খাটের উপরে ঠিক আমার পাশ থেকেই কে যেন হঠাৎ বলে উঠল, “আরে মোশাই, কুম্ভ্ করণ্ আছেন নাকি আপনি? কব সে ডেকে যাচ্ছি, নো রিপ্লাই! ঘর মে আগর ডাকু ঘুসবে তো মালুম হচ্ছে ফির ভি আপনার নিদ টুটবে না! “

চমকে টমকে আধঘুমন্ত অবস্থায় তিন লাফে খাট থেকে সরে গিয়ে কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, “কে কে ? ”
“সে খোবোরে আপনার কী কাম মোশাই?” পাশ থেকে সেই মগনলালি কণ্ঠ ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, “এতনা দুর থেকে এলাম আপনার প্রোফিটের বাত করতে, আর ঢাই ঘন্টা চিল্লানেকে বাদ আঁখ খুলে আপনি এখন হাঙ্গামা করছেন? ”
যাক, ভূত-টুত হতে পারে, চোর-ডাকাত নয়। তারপর আবার ঘাড় মটকাবার কথা তো তুলছেই না, উপরন্তু লাভের কথা বলছে! একটু সাহস পেয়ে গলা খাঁখরে বললাম, “বলুন।”

“নওরতন বলে একটা ই-ম্যাগাজিন আছে, সিখেনে আপনি একটা কাহানি লিখতে চান, লেকিন লেখা আপনার মাথা থেকে  বেরোবে না।ওতো দিমাগ আপনার নেই।রাইট? ”
এবার একটু রেগেই গেলাম।সত্যিই, ‘নবরত্ন’ ম্যাগাজিনে অনেক দিন থেকেই একটা লেখা দিতে চাইছিলাম, অথচ কোনও একটা জুতসই প্লট মাথায় আসছিল না।কিন্তু সেটা এমন রূঢ় ভাবে না বললেও চলত।

একটু রাগত স্বরেই বললাম, “তাতে আপনার কী? ফালতু ভনিতা না করে যা বলতে এসেছেন বলে ফেলুন না।”
আমার কথাটা গ্রাহ্যে না এনে একই সুরে বলে চলল সেই মগনলালি কণ্ঠ, “উও বেপারেই আপনার সাথে থোড়া ডিসকাস কোরতে এসেছি।হামি আপনাকে একটা কাহানির প্লট দিতে পারি।”

আর একবার চমকে উঠলাম।এ তো মেঘ না চাইতেই জল! মাঝরাতে ভূতে বাড়ি বয়ে এসে গল্পের প্লট দিয়ে যাচ্ছে! বললাম, “ভূতের গল্প? ”
“সে শুননে কে বাদ বুঝে যাবেন”, মগনলালি কণ্ঠ আবার বলল, “ইতনা বলতে পারি যে ইয়ে কাহানি হামার নিজের জিন্দেগির কাহানি।”
উৎসাহে নেচে উঠে বললাম, “দেরি কেন? শুরু করুন! “

“ওতো একসাইটেড হোবার কুছু নেই”, শান্ত গলায় বললেন উনি, “উও স্টোরি শুনানেকে পহেলে হামার কিছু কন্ডিশন আছে।”
“কী শর্ত? ” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
“ইয়ে কাহানি হামার নিজের জিন্দেগির কাহানি, ঔর ইসমে কুছ পলিটিক্যাল ইসু ভি আছে।ইস লিয়ে ইয়ে কাহানির সারে ইনসান ঔর জাগাকে নাম আপ কো চেঞ্জ কোরে লিখতে হোবে।এর কারণ আপনি বাদ মে সমঝে যাবেন।”
আমি বললাম, “আচ্ছা বেশ।”
“বেশ বোললেই তো হোবে না”, আবার ঝাঁঝিয়ে উঠলেন তিনি, “কী নাম দেবেন পহেলে উও ঠিক করুন।”
একটুও না ভেবে বলে উঠলাম, “আচ্ছা, গল্পে আপনার নাম দেব মগনলাল! ”
একটু চুপ থেকে উনি খুশি খুশি গলায় বললেন, “বহোত খুব, ইবার স্টার্ট করি! “

(দুই)

মগনলাল টলমলে পায়ে হেঁটে চলেছেন। মদটা একটু বেশিই খাওয়া হয়ে গেছে, নেশাটা হয়েছে জোর।তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছাতে হবে, অনেক রাত হয়েছে।
এর আগে কোনও দিনই মদ স্পর্শ করেননি মগনলাল।আজ খেয়েছেন কষ্টটা সহ্য করতে না পেরে সেটা লাঘবের উদ্দেশ্যে।আজ একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা কুরে কুরে খাচ্ছে তাঁকে।
কাল ভোটের ফল ঘোষণা।আজ পার্টি অফিসে বসে যে আলোচনা হল, আর কয়েকদিন ধরে টিভি-সংবাদপত্রে ভোটের ফলাফলের যে ভবিষ্যতবাণী চলছে, তাতে স্পষ্ট যে এবারেও বিরোধী “বি” দল ক্ষমতায় আসতে পারবে না।সেই “বি” দল, যে দলের জন্য জান দিতেও পিছু পা নন তিনি।

রাজনীতির জগতে পা দেবার পর থেকেই এই “বি” দলের একনিষ্ঠ সেবক মগনলাল।প্রত্যেকবার ভোট আসে, প্রত্যেকবার আশা করে থাকেন তিনি, এইবারে শাসক “এ” দলকে হারিয়ে “বি” দল ক্ষমতায় আসবে, আর প্রত্যেক বার ফলাফল হয় সেই একই, “বি” দলের হার হয় বিশাল মার্জিনে।
তবে এবারে সবাই একটু বেশি আশা করেছিল।সেটা অবশ্য “বি” দলের নতুন নেতা রামকিষণজির দৌলতেই।
তাঁর জনপ্রিয়তায় ভর করেই ভোটের বৈতরণী পার হবার আশা ছিল সবার।কিন্তু তা হল কই?

“আরে মগনলালজি না! ”
পিছন থেকে আওয়াজটা শুনতে পেয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন মগনলাল।সামনে একটা কুড়ি একুশ বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে হাসি মুখে।
ছেলেটাকে চেনা চেনা ঠেকছে, তবু ঠিক মনে পড়ছে না তাঁর।
“চিনতে পারছেন না? ” ছেলেটা আবার একটু হেসে বলল, “আরে আমি কানহাইয়া! ”
“আরে কানহাইয়া! ” চিনতে পেরে উচ্ছ্বসিত হয়ে মগনলাল বললেন, “কতদিন পরে দেখা! “

বছর দুই আগে অবধি কানহাইয়া ছিল মগননলালের মতোই “বি” দলের একজন একনিষ্ঠ কর্মী।দলের প্রয়োজনে যেকোনো মুহূর্তেই সে হাজির হত যেকোনো জায়গায়।কিন্তু —–
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ায় আতঙ্কে মগনলালের সারা শরীর হিম হয়ে গেল। আজ থেকে বছর দুই আগে কানহাইয়া তো স্নান করতে গিয়ে নদীতে ডুবে মারা গেছে! তার মৃতদেহটা যে মগনলালের চোখের সামনে ভাসছে এখনও!
তিনি কাঁপা গলায় বললেন, “কিন্তু তুই যে মরে গেছিস!”
“তাতে কী হয়েছে? ” কানহাইয়া যেন একটু আশ্চর্য হয়ে বলল, “মরে গিয়েছি বলে কি আমার সাথে কথা বলা যাবে না? ”
তারপর যেন অবস্থাটা একটু বুঝে নিয়ে বললে, “তাছাড়া মরে গিয়ে তো ভালোই আছি! স্কুলে একটা কাজ জুটিয়ে ফেলেছি, তাছাড়া পলিটিক্সটাও করছি মন দিয়ে।”

এবার আশ্চর্য হবার পালা মগনলালের।বললেন, “পলিটিক্স করছিস মানে?কোথায় পলিটিক্স করছিস? ”
“সে কি, বৈতরণীর এপারেই শুধু রাজনীতি আছে নাকি? শুনুন তবে, আপনাদের পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে, তার সবই আমাদের জগতেও আছে। বাড়ি ঘর লোকজন সব। শুধু নিয়মটাই যা উল্টো।”
“নিয়ম উল্টো মানে? ” মগনলাল হতভম্ব।
“মানে সবই উল্টো আরকি।এই যেমন ধরুন আপনাদের স্কুল হয় সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটে, আর আমাদের স্কুলের সময় রাত দশটা থেকে ভোর চারটে।আপনাদের স্কুলে হয় মিড-ডে-মিল, আমাদের স্কুলে হয় মিড-নাইট-মিল।”

“বলিস কী রে! আচ্ছা, ওখানেও কি রাজনীতিতে “এ” দল আর “বি” দল আছে? ”
“বিলক্ষণ! শুধু পজিশনটাই যা উলটো।”
“পজিশন উলটো মানে? ” এখনও ব্যাপারটা মাথায় ঢোকে না মগনলালের।
“মানে আমাদের ওখানে “বি” দল হল শাসক দল, আর “এ” দল বিরোধী।”

এবার মগনলাল মাথা ধরে বসে পড়লেন।এ যে তাঁর স্বপ্ন! এই জগতে থেকে “বি” দলকে ক্ষমতায় দেখা হবে কি কোনও দিন? তিনি কোনও মতে বললেন, “আচ্ছা, প্রতিবার ভোটে ওখানে রেজাল্ট কী হয় রে? ”
“এখানে যা হয় তার ঠিক উলটো”, কানহাইয়া বুঝিয়ে দেয়, “মানে “এ” দল প্রতিবারে আপ্রাণ চেষ্টা করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছে হারে বিশাল মার্জিনে, ক্ষমতায় থাকি আমরাই।”
মগনলাল আর আশ্চর্য হলেন না।তাঁর মাথায় এখন অন্য ভাবনার উদয় হয়েছে।বললেন, “হ্যাঁ রে, আমি যদি এখন তোদের দুনিয়ায় যাই, তবে “বি” দলকে ক্ষমতায় দেখতে পাব? “

“কেন পাবেন না? ” কথাটা বলেই গম্ভীর হয়ে গেল কানহাইয়া।অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বলল, “আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি মগনলালজি।এতে আমি কিছুই বলতে পারব না। জীবনটাতো আপনার, বাড়ি যান, ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিন।তবে শেষ পর্যন্ত যদি আত্মহত্যার সিদ্ধান্তই নেন, তবে কাল সকালে আপনার বাড়ির সামনে আমি দাঁড়িয়ে থাকব, মানুষের দৃষ্টির অগোচরে।”
কানহাইয়া অদৃশ্য হয়ে গেল।

সকালে চোখ খুললেন মগনলাল।তাঁর দেহটা সিলিং থেকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে।জিভটা একটু বেরিয়ে পড়ে মুখটা বিকৃত করে তুলেছে।একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন মগনলাল। তারপর নিজের ঝুলন্ত দেহটার পাশ দিয়ে ভেসে বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে।
বাইরে অপেক্ষা করছিল কানহাইয়া।মগনলালকে দেখে সে কিছু না বলে চলতে আরম্ভ করল।তার পিছু পিছু চললেন মগনলাল।

মগনলাল চুপ করে গেলেন।
আমি এক মনে গল্প শুনছিলাম।বললাম, “তারপর? সেখানে গিয়ে কী দেখলেন? ”
মগনলাল একটু চুপ করে থেকে হাল্কা হেসে বললেন, “ওহি তো সব সে বড়া ট্রাডেজী ছিল ইয়ে কাহানী মে।”
“মানে? ” আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, ” ‘বি’ দল সেখানে ক্ষমতায় ছিল না? ”
“ছিলো”, মগনলাল বললেন, “জানেন ভাই, আমার জিন্দেগীর স্বপ্না ছিলো “বি” দল কো অ্যাজ দা রুলিং  দেখা।সেটা পুরন হোয়েছিল, লেকিন সির্ফ দো ঘন্টে কে লিয়ে।”

“কেন? ”
“উও দিন ইনসানের দুনিয়াতে ভোটের রেজাল্ট আউট হোলো।ইস বার সবকা হিসাব বদলে গেলো, বর্ষো কে বাদ আচানক “বি” পার্টি ভোটে জিতলো, রামকিষণজির লিডারশিপ কামাল কোরলো।লেকিন—-

“লেকিন উসকে সাথ মুর্দার দুনিয়া মে ভি রেজাল্ট আউট হোলো।রেজাল্ট হোলো জিন্দা দুনিয়ার ওপোজিট, “এ” পার্টি ভোটে জিতলো বর্ষো কে বাদ।”
“মানে? ” আমি চোখ বড় বড় করে বললাম, “আবার আপনারা রয়ে গেলেন ওপোজিশনে? ”
মগনলাল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “সোবই লাক ভাই।আচ্ছা, সুবহা হোনেওয়ালি হ্যায়, হামি আসি ইখন।”
একটা ঠান্ডা হাওয়া ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, আর পরমুহূর্তেই বাইরে থেকে ভোরের প্রথম কাক ডেকে উঠল।

(সমাপ্ত)


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment