অসুখ – তমালী চক্রবর্ত্তী

“ডাক্তারবাবু হামার মরদ কে দয়া করে বাঁচিয়ে লিন।” – প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ল লছমী। গত রাত থেকে অসহ্য পেটের ব্যাথায় কাতরাচ্ছে বাবুলাল। আজ তাই লছমী বাবুলাল কে নিয়ে পাশের এক বেসরকারী নার্সিংহোমে চেক আপের জন্য নিয়ে এসেছে।
– আরে আরে ঠিক আছে। চিন্তার কিছু নেই। আগে তো দেখতে দাও যে কী হয়েছে?
কিছুক্ষণ বাবুলালের পেট ভাল করে পরীক্ষার পর ডাক্তার গম্ভীর ভাবে বলল,
– কবে থেকে হচ্ছে ব্যাথা?
বাবুলাল যন্ত্রনায় প্রায় নীল হয়ে গেছে। কথাও বলতে পারছে না ঠিকমতো। লছমী তড়িঘড়ি জবাব দিল,
– কাল রাত থেকে ডাক্তারবাবু।
– হুম্। আমার ঠিক ভাল লাগছে না ব্যাপার টা। কিছু টেষ্ট করতে হবে বুঝলে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করিয়ে নাও। টেষ্টের রিপোর্ট দেখে তবেই কিছু বলতে পারব।
– আপনি যা বলবেন তাই হবে সাব। হামরা দেহাতি আদমী আছি। কিছু বুঝি লাই। শুধু বাবুলাল কে আপনি যে করে হোক বাঁচিয়ে দিন।
প্রেসক্রিপসান প্যাড টা ডাক্তার টেনে নিলেন।
– ঠিক আছে। কেঁদো না। শোনো এই টেষ্টগুলো কালই করিয়ে নাও। সামনেই একটা ডায়াগনোসিস্ সেন্টার আছে। পারলে ওখানেই করিয়ে নাও। ওখানে ঠিকঠাক রিপোর্ট দেয়। আর খুব তাড়াতাড়ি রিপোর্ট টাও পাবে। মনে করলে অন্য জায়গাতেও টেষ্টগুলো করাতে পারো। তোমাদের ব্যাপার। আর কিছু মেডিসিন লিখে দিচ্ছি এগুলো সময় করে খাওয়ালে ব্যাথাটা কম থাকবে।
– আমি ঠিক ঠিক ওকে খাইয়ে দিব। আর উ সেন্টার থেকেই টেষ্ট করিয়ে লিব। আগে বাবুলালের পেরাণ, তারপর সব।
– ঠিক আছে। রিপোর্ট পেয়েই আমার সাথে দেখা করবে। দেরী করবে না।
– ঠিক আছে সাব। বহত সুক্রিয়া।
অসুস্হ বাবুলাল কে নিয়ে লছমী আস্তে আস্তে বেরিয়ে এল নার্সিংহোম থেকে।
———-

ঘন্টা দুই পর –
পেশেন্ট দেখা শেষ করে ডাক্তারবাবু নিজের স্মার্টফোন তুলে নিল। লিস্ট হাতড়ে একটা নাম্বারে কল করল।
– হ্যালো..
– মিত্র?
– হ্যাঁ বলুন ডাক্তারবাবু।
– শোনো কাল বাবুলাল বলে একজন যাবে। মনে হচ্ছে অ্যাপেন্ডিক্স। ব্লাড টেষ্ট টা মাস্ট।
– বুঝেছি স্যার কী করতে হবে।
– গুড। রিপোর্ট গুলো কিন্তু তাড়াতাড়ি চাই।
– ওসব আপনি ভাববেন না। ম্যানেজ হয়ে যাবে।
– সবই বুঝলাম। আমার কমিশনের ব্যাপার টা কিন্তু মাথায় রেখো।
– স্যার আজ পর্য্যন্ত ডাঃ রজত সেনের কমিশনে কী কোনো ঘাটতি হয়েছে? আমার ব্যবসার সিংহভাগ উন্নতি তো আপনার এই নার্সিংহোমের জন্যই সম্ভব হয়েছে।
হাসতে হাসতে ডাক্তার ফোন কেটে দিল।

——–

রিপোর্ট দেখে ডাক্তারবাবু গম্ভীর হয়ে গেলেন। লছমী মরিয়া হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
– বাবুলালের কী হইছে ডাক্তারবাবু?
– বাবুলাল কী খুব মদ খায়?
– হাঁ সাব।
– যেটা আন্দাজ করেছিলাম ঠিক সেটাই হয়েছে। বাবুলালের একটা কিডনি খারাপ হয়ে গেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপারেশন করতে হবে। দরকার হলে কালই। ফেলে রাখা যাবে না। না হলে…
– না না সাব। আপনি যা বোলবেন তাই হোবে টাকা পয়সা লিয়ে ভাববেন লা। বাবুলাল কে বাঁচান।
– ঠিক আছে। তা হলে কালই অপারেশন করব। তুমি আজ বিকেলেই ওকে ভর্তি করে দাও।
– জি সাব।
চোখের জল মুছে হাতজোড় করে নিঃশব্দে প্রণাম জানিয়ে লছমী বেরিয়ে গেল।
ডাক্তার আবার ফোন লাগাল।
– হ্যালো। পার্টি কে খবর দাও। কিডনি ম্যাচ করেছে। পেমেন্ট কাল সকালের মধ্যেই করতে হবে। না হলে….ঠিক আছে…কালই অপারেশন…ওকে।

———

বাবুলাল কে স্ট্রেচারে করে ও.টি. তে নিয়ে যাচ্ছে। লছমী প্রাণপনে ঠাকুর কে ডাকছে। ও.টি র লাল লাইট অন্ হল। লছমী ব্যাগ থেকে স্মার্টফোন বার করল।
– হ্যাঁ। তাড়াতাড়ি সবাই কে নিয়ে চলে আয়। ফাস্ট..

পরদিন সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় বোল্ডে হেডলাইন বেরোলো ” বিখ্যাত ডাক্তার রজত সেন গ্রেফতার”। লোকাল থানায় তড়িঘড়ি ঢুকল জার্নালিস্ট পৃথা রায়। পৃথা কে দেখে ইন্সপেক্টার দীপমাল্য বোসের মুখে হাসি ফুটল।
– আরে এসো এসো পৃথা। তুমি না থাকলে আজ কিছুই সম্ভব হত না।
– শুধু আমি? আপনিও তো পেটে ব্যাথার দারুণ অ্যাক্টিং করলেন বাবুলাল মশাই। আমার সাধ্য থাকলে আপনাকে অস্কার দিতাম।
ঝরনার মতো উচ্ছল পৃথা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।
– সে যাই হোক। সময়মতো তোমার টিম না পৌঁছলে আমার একটা কিডনি আজ আর থাকত না লছমীদেবী।
– আরে মশাই পুলিশদের এতো ভয় পেলে চলে? যাক গে…রজত বাবুর কী খবর?
– উত্তম মধ্যম পড়েছে কিছু। সব স্বীকার করে নিয়েছে। কেস ফাইল করেছি আমরা।
– বাহ!..গুড ওয়ার্ক।
– থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাম। আমাদের কাছে খবর ছিল। কিন্তু আপনি হেল্প না করলে..আই মিন..চেম্বারের ভিডিয়ো ফুটেজগুলো…যে গুলো আপনি গোপন ক্যামেরায় তুলেছেন..সে গুলো পাওয়াতে কেস টা আরো জোরালো হয়েছে। পাখি এখন খাঁচায়, সাজা হবেই হবে। তাছাড়া আপনার মেক আপের আইডিয়া টা বেশ কাজ করেছে। চিনে ফেললে বেশ মুশকিল হত।
– থ্যাঙ্ক ইউ দীপমাল্য। আপনাদের মতো পুলিশ আছে বলেই সাধারণ লোকেরা এখনও ভরসা পায়।
দুজনের চোখে- মুখেই কৃতজ্ঞতার হাসি।
– আজ সন্ধ্যে বেলায় কী করছেন স্যার?
– এই যে ডিউটি।
– একটু স্কিপ করে কী আমার সাথে এককাপ কফি খাওয়া যেতে পারে?
– শুধু কফি কেন ম্যাম? ডিনারও হতেই পারে।
দুজনেই বেশ বোঝে এই কয়েকদিন একসাথে কাজের সুবাদে একটা ভাল লাগা তৈরী হয়েছে দুজনের মধ্যেই।
চেয়ার থেকে উঠে পৃথা বলল,
– তা হলে রাত ৮ টায় আপনাকে পিক আপ করব।
– অ্যাজ ইউ উইস ম্যাম।

(সমাপ্ত)


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment