পাতু দি গ্রেট – প্রিয়াঙ্কা চ্যাটার্জী

 সুর করে দুলে দুলে পড়ে চলেছে শ্রীমান পাতু ওরফে প্রতুল। সন্ধ্যাবেলায় পড়তে না বসলে শান্তি জেঠুর লাঠির হাত থেকে তাকে কেউ রক্ষে করতে পারবে না। পাতুর জেঠুর নাম শান্তি হলে কি হবে শান্তির বিপরীত শব্দই ওনার জন্য প্রযোজ্য।প্রচণ্ড রাশভারি মানুষ পাতুর জেঠু শান্তিপ্রিয় মুখুজ্জে,নিয়মানুবর্তিতায় বাধা তার জীবন।তিনি পছন্দ করেন বাড়ির বাকি সদস্যগণ নিদ্বির্ধায় তার আদেশ মান্য করে চলবে।
কুসুমপুরের বিদ্যালয়ের তিনি হেডমাস্টার মশাই।তাই শুধু বিদ্যালয় নয় ঘরের লোকজন তার শাসনের চোটে সন্ত্রস্ত।তার একমাত্র পুত্র অতুল অত্যন্ত শান্তস্বভাবের আর কন্যা মালতিও বাবাকে যথেষ্ট মান্য করে।কিন্তু সর্বকনিষ্ঠ এই বেয়াড়া পাতুকে তিনি কিছুতেই বাগে আনতে পারছেন না।তার উপরে শান্তিপ্রিয় বাবুর স্ত্রী ও মা এর প্রশ্রয়ে পাতু বেশী বিচ্ছু হয়েছে। শান্তিপ্রিয়র ভাই সুপ্রিয় আর্মিতে থাকার জন্য তার স্ত্রী গীতা ও পুত্র প্রতুল ওরফে পাতু তার দাদার অভিভাবকত্বেই আছে এই বছর চারেক। চিরতার রস খাবার মত মুখ করে হ্যারিকেনের সামনে বসে একইই সুরে পড়ার সময় পাতুর কানের পাশ দিয়ে তীর বেগে সোঁওও করে  একখানি ঢিল এসে দেওয়ালে আঘাত করে ।
কৌতুহল বশত ঢিলে মোড়া কাগজ খানি খুলতেই দেখা গেল লেখা আছে “কেমন জব্দ”।পাতুর হাতটা নিশপিশ করছিল,রাইকে পেলে সে এমন সাজা দেবে আর কখখনো বদমাইশি করবে না।রাই তার জেঠুর বন্ধুর মেয়ে।পাতু ,রাই,ভোলা আর মাধূর একটা ছোট্ট দল আছে।দলপতি অবশ্যই পাতু। তাদের ভালো ভালো কাজের জন্য পাড়ার লোকেরা অতিষ্ঠ।পাড়ার মাধব জেঠুর বাড়ির পেয়ারাগাছের ডাঁসা পেয়ারাগুলো দেখে লোভ সামলাতে পারে নি।তাই গতকাল দুপুরবেলায় টিফিনটাইমে সে, ভোলা ,রাই আর মাধু মিলে চুপিচুপি স্কুল থেকে বেরিয়ে কটা পেয়ারা পেড়েছিল মাত্র।কিন্তু মাধব জেঠুর ভৃত্য কান্ত তাদের দেখে ফেলে লাঠি নিয়ে তাড়া করে।পেয়ারাগুলো সমান ভাগ হলেও সে রাই এর থেকে একটা ছোঁ করে মেরে নিয়েছিল।
কান্তকাকা রাই এর বাড়িতে যখন নালিশ করল রাই কেঁদে কেটে বলল পাতুর প্ররোচনায় নাকি ও করেছে,ও নাকি চুপটি করে দাঁড়িয়ে ছিল কিছু করে নি।কাল কান্তকাকা নালিশ করার পর জেঠুও গম্ভীর মুখে পাতুর দিকে তাকিয়ে ছিলেন ,তারপর গুরু গম্ভীর স্বরে বললেন এদিকে আয়।পাতু মুখখানি শুকনো করে এগোচ্ছিল।পাতুর জেঠু সজোরে পাতুর কানখানা মুলে কান ধরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার আদেশ জারি করেন।নেহাত ঠাকুমা ছিল তাই পাতু ঘন্টাখানেকের মধ্যে রেহাই পায়।তা শ্রীমান পাতুও কি আর ছেড়ে দেবার পাত্র নাকি ,হাজার হোক সে দলের নেতা,তাই একটু শিক্ষা তো রাইকে পেতেই হবে। বেশী কিছুই করে নি সে, সুযোগ বুঝে রাই এর সাধের পুতুলটার হাত একটু মুচড়ে দিয়েছে আর চুলগুলো কেটে দিয়েছে। এটা আর কি এমন দোষ??
লঘুপাপে শান্তিবাবুও গুরুদন্ড দিলেন আর সাথে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। বলেছেন বিকেলের খেলা বন্ধ।এই খেলতে গিয়েই নাকি তার ভাইপো গোল্লায় যাচ্ছে।এর থেকে কানমলা চপেটাঘাত ঢের ভালো ছিল পাতুর কাছে।পড়তে পড়তে পাতুর দুইচোখে জল চলে আসছিল,এত কঠোর হৃদয়ের ব্যক্তি কেউ হতে পারে???কি নিষ্ঠুর মানুষ।
 চতুর্থ শ্রেণীর আমাদের শ্রীমান পাতু একটু বেশী চঞ্চল।তার মা গীতা তটস্থ হয়ে থাকেন,প্রত্যেকদিন কেউ না কেউ  আসে তার ছেলের নামে এত অভিযোগ নিয়ে।সর্ব কনিষ্ঠ সদস্য হবার জন্য ঠাকুমার একটু বেশী আদরের।জেঠিমাও তাকে চোখে হারায়।দাদা অতুল মাঝে মাঝে একটু ধমক দেন,কিন্তু দিদি মালতি খুউউউব ভালোবাসে।
জেঠুর কাছে শাস্তি পেলেই পাতুর বাবার কথা মনে পড়ে খুব।বাবা তাকে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসে।তার সব দোষ সব পাজিগিরি বাবা হাসিমুখে মেনে নিতেন।একবার বাবার সাধের হাতঘড়িটা সে সাবানজলে ধুয়ে পরিষ্কার করেছিল,ঘড়িটা ভালোই পরিষ্কার হলেও আসল কাজ সময়টাই আর দেখা যেত না।পাতুর বাবা খুব হেসেছিলেন,তারপরে ছেলেকে বুঝিয়ে ছিলেন।আরেকবার সুপ্রিয়র প্রাইজ পাওয়া কলমটা  পাতুই কি করে যেন ভেঙে ফেলেছিল।
কিন্তু সেদিন ও সুপ্রিয় বকেনি পাতুকে।গীতা প্রায় বলে তোমার জন্য ছেলেটা  এত দুঃসাহসী,এত বিচ্ছু।এত আশকারা দিও না।কিন্তু কে শোনে কার কথা।ছেলেকে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হবার শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন।অবশ্য পাতুও সে শিক্ষা মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছিল,কুসুমপুরের যে কোনো বাগানের আম পেয়ারা লেবু পাতুর চোখ এড়ায় না।এমন সজাগ দৃষ্টি কজনের আর থাকে??গীতা দেবী প্রায় নীরবে চোখের জল ফেলেন,ছেলের নালিশ শুনতে শুনতে তিনি ক্লান্ত। প্রায় তিনি মানত রাখেন যাতে ছেলের মতি ফেরে।তা ছেলের মতি ফেরে কিন্তু অন্যদিকে।নিত্যনতুন ফন্দি শুধু শ্রীমান পাতুর মাথাতেই আসে।
এইদিকে সকালেই ও পাড়ার হরি জেঠু হাজির।গীতা ভাবছিল সকাল সকাল আবার বোধ হয় তার গুনধর পুত্র কিছু করেছে ।তা জেঠু হাঁক দিলেন ,বৌমা একটু চা কর,শান্তি কই তারে দেখছিনে যে।আজ্ঞে দাদা আমি বড়দাকে ডেকে দিচ্ছি বলেই ঘোমটা টনে গীতা ঘরে ঢুকলো।শান্তিপ্রিয় আসতেই হরিবাবু বললেন কিছু খবর শুনছিস নাকি??শান্তিপ্রিয় কৌতুহলী হয়ে বললেন কি বলেন দাদা?? আশেপাশের গ্রামগুলি থেকে কদিন ধরেই মেয়ে চুরি হচ্ছে।শান্তিপ্রিয় গম্ভীর মুখে বললেন এ তো খুব বড় সমস্যা  হরিদা,তা পুলিশ কি বলছে শুনেছ কিছু??? সব গ্রামের ঘরে তল্লাশি করছে,কিন্তু কিছুই তো পাইনি শুনছি,স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে মুখ বেঁকিয়ে উত্তর দিলেন হরি বাবু।আসলে কি বলত দেশটা উচ্ছন্নে গেছে রে বলে হরিবাবু দীর্ঘশ্বাস ছাডলেন।শান্তিপ্রিয় বাবু কুশলাদি জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বললে  আমার বড় পুত্র বিজয়তো  জানিস একটু বোকা তাই লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে এখন ঐ নেতার কথায় কিসব ব্যবসা করছে।আর ছোট তো শহরেই আছে,আমরা যাই।উঠিরে শান্তি, বলে, হরিবাবু বাড়ির দিকে গেলেন।
এদিকে অপমানের জ্বালা শ্রীমান পাতু ভুলতে পারছে না তাই প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার কথাই ভেবে চলেছে।পরের দিন নিরীহ মুখ করে ইস্কুলে যেতে দেখে তার শান্তি জেঠু ভাবলেন,যাক্ ছেলের শিক্ষা হয়েছে।ইস্কুলে রাই পাতুকে দেখে মুচকি হেসে চলে যায়।পাতু নিরীহ মুখ করেই থাকে। কয়েকদিন নির্বিঘ্নেই কেটে যায়।সবাই ভাবে এবারে ছেলেটার মতি ফিরল।কিন্তু এক সপ্তাহ বাদেই অংক ক্লাসের ভয়ংকর রাগী মাস্টার যখন  বই খাতা বের করতে বলে রাই দেখে তার অংক বই খাতা নেই।অংকের স্যার কান ধরে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেই ক্ষান্ত হন না বাবাকে চিঠিও পাঠান।কিন্তু রাই অংকের বই খাতা এনেছিল,তার স্পষ্ট মনে আছে।কিন্তু গেল কোথায় সেগুলো??বেচারা রাই এর চোখে জল চলে এল যত না কান ধরে দাঁড়ানোর জন্য তার থেকেও বেশী তার বাবাকে চিঠি পাঠানোর জন্য।
রাই এর বাবা লেখাপড়ায় গাফিলতি মোটে বরদাস্ত করেন না।ছুটি থাকায় বাবা ঘরেই আছে তারপরে।ইস্কুল ছুটির পর বাড়ি গিয়ে বাবার হাতে চিঠি দেবার  পরেই যথারীতি বেশ ভালো মতই আদর যত্ন হল রাই এর। বিকেলে খেলার মাঠে গিয়ে আড়চোখে দেখে পাতু ,রাই উদাস হয়ে নদীর ধারে গাছের তলায় বসে আছে।নদীর ধারের এই অংশটা পাতুর খুব প্রিয়।এই নদীর ধার দিয়ে যেতে যেতেই পড়ে আমবাগান।তারপরেই একটা ভাঙা পোড়ো বাড়ি।এর পাশেই আছে আরেকটা বড় বাগান সমেত বাড়ি ,এটাই হরি জেঠুর বাড়ি। যদিও পাতুর আনন্দ হবার কথা তবুও কেন জানি না পাতুর মনটাও খারাপ হয়ে গেল,যাই হোক বন্ধুতো।আসলে ইস্কুলে সেইই টিফিনের সময় সন্তর্পণে রাই এর ব্যাগ থেকে অংকের বই খাতা বার করে  ইস্কুলের বন্ধ রুমটায় রেখে দিয়েছিল।আর ইস্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় রাইদের বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে বারান্দায় ওর বইখাতা রেখে চলে আসে।
এইসবতো পাতুর বাঁ হাতের খেলা।খেলা সেরে বাড়ি ফিরে হাত মুখ ধুয়ে পাতু লক্ষ্মী ছেলে হয়ে তার বরাদ্দ দুধ খেয়ে নিয়ে সবে পড়তে বসেছে এই সময় রাই এর মা ও বাবা হন্তদন্ত হয়ে তাদের বাড়ি ঢোকে।রাই এর মা কান্নাকাটি করছিলেন ,তাঁরা বলেন সন্ধ্যে হয়ে গেছে মেয়ে ফিরছে না দেখে রাই এর বাবা সুভাষবাবু মাঠে গিয়ে দেখেন,রাই নেই, আশেপাশে দেখে পাতুদের বাড়ি এসেছে যদি রাই এসেছে।ওনাদের মুখ শুকিয়ে গেছে,রাই এর মা পাগলের মত কান্নাকাটি করছিলেন।শান্তিপ্রিয় বাবুও ওনাদের সাথে গ্রামে সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ করলেন,কিন্তু মেয়েটা যেন কর্পুরের মতই উবে গেছিল কুসুমপুর থেকে।এদিকে রাই এর মা বার বার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন, আর সুভাষবাবু পাগলের মত গোটা গ্রাম খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন।তাদের এই ছোট্ট গ্রামে এরম ঘটনা এই প্রথম।পুলিশেও রিপোর্ট লেখানো হল।ভগ্নহৃদয়েই সুভাষ বাবু বাড়ি ফিরে গেলেন।হরি জেঠুও ছি ছি করে বললেন,কি দিনকাল পড়েছে, গ্রামেও এই ঘটনা ঘটছে, আসল কথা হল বাপ মা এর শিক্ষার অভাব,না হলে এরম কাজ কেউ করে।যদিও ওনার কথা শোনার আগ্রহ ছিল না করো তবুও সবার মনটাই বড় খারাপ।তবে মরমে মরে গেছিল পাতু।
সে একটু শিক্ষেই দিতে চেয়েছিল,কিন্তু রাই এর এই নিরুদ্দেশ হযে যাবার জন্যে তার বারবার মনে হচ্ছিল সেই দায়ী।তার মনটা একদম ভালো নেই।রাতে কিছু খেতেও পারল না পাতু।পরদিন ইস্কুল যাবার নাম করে বেরুল কিন্তু ইস্কুল যেতে তার মন আজকে চায় না।নদীর পাশ দিয়েই হাঁটছিল সে।মনটা ভার হয়ে আছে।কাল রাই এর সাথে কথা বললে এই সর্বনাশটা হত না।নদীর ধারের এই দিকটা খুব ফাঁকা ফাঁকা। নদীর পাশ দিয়ে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই চোখে পড়ল পাতুর সেই বাড়িটা।তবে বাগানটায় বেশ ডাঁসা পেয়ারা আর আম আছে দেখে পাতুর চোখটাও চকচক করে উঠল।আহা এত সুন্দর ডাঁসা পেয়ারা আর পাকা পাকা হলুদ রঙের আম দেখে  পাতুর মনটা বেশ খুশি খুশি হয়ে গেল। পাঁচিল টপকে সহজেই সে ঢুকে গেল বাগানে।বেশ বড় এই বাগানটা।কত গাছ।বাডির পাশেই একটা কুয়ো ।সবে কটা আম পাড়তে যাবে এমন সময় শুকনো পাতার উপরে হাঁটার শব্দ তার কানে এল।
গলাটা শুকিয়ে গেছে ।যদি ধরা পড়ে উত্তম মধ্যমতো জুটবেই ।তার পরে আবার হরি জেঠুর বাগানে চুরি,গোটা কুসুমপুরে শান্তি জেঠুর শিক্ষা দেওয়া নিয়ে চর্চা করবে। ইস্কুল যাবার নাম করে চুরি করার জন্য তার কপালে যে শনি নাচছে সেটা ভেবেই প্রচণ্ড ঘামতে লাগল পাতু।গাছের উপরে নিজেকে চেষ্টা করল যথাসম্ভব আড়াল করার।একটা বেশ ষণ্ডাগোছের লোক এদিকে ওদিকে তাকাতে তাকাতে সোজা বাড়ির ভেতরে গেল।আসতে আসতে গাছ থেকে নেমেই পাতু পালাতে উদ্যত হলেই খেয়াল করল ঐ ষণ্ডাগোছের লোকটা বেরুচ্ছে।তাড়াতাড়ি সে বাগানের কুয়োটার পেছনে চলে যায়।
লোকটা ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায়,পাতুও  ভাবল চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। তার সাধের আম আর পেয়ারা ছেড়ে যাবার জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যাগটা নিয়ে বিফল মনোরথে গেটের দিকে যাবার আগেই চোখে পড়ল কুয়োটার থেকে দুই হাত দূরেই বাড়ির গা ঘেঁষে একটা চৌকো ফাঁকা অংশ।পাতুর মন পাতুকে বলছে বাবা পাতু অত কৌতুহলে কাজ নেই,সবে লোকটার নজর থেকে বেঁচেছিস,চুপচাপ ঘরে ফিরে যা,কিন্তু আরেকটা মন বলছে চল না পাতু একটি বার দেখেই চম্পট দিবি।বেশ খানিকটা সাহস নিয়ে ঐদিকে যেতেই সে দেখে ঐ চৌকো গর্তের সাথে একটা লোহার দরজাও আছে ,তবে দরজাটা খোলা।
সিঁড়ি নেমে গেছে ঐ চৌকো অংশের ভেতর দিয়ে।খুব ভয় লাগলেও আসতে আসতে সিঁড়ি দিয়ে নামে পাতু।কি অন্ধকার নীচে।ছয় সাতটা ধাপ নেমেই মেঝে।খুব অল্প আলো।পাতু দেখল বেশ কিছু বস্তা আছে।চোখে পড়ল আরেকটা রুমের দরজা।পাতু মনে মনে ভাবল ,না ঘরেই ফিরে যাই,তার জেঠু জানতে পারলে তার পিঠ থেকে চামড়া ছাড়িয়ে দেবে।হঠাৎ মনে হল কেউ যেন কাঁদছে। অনেক সময় পেত্নিরাও ছোট ছেলেদের এরমভাবে ভোলায়,পাতুর জেঠিমা বলেছে তাকে।পিঠ দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।তবু মনে হল একটিবার দেখি কি আছে??  বুক কাঁপলেও কৌতুহল বশত ঐ ঘরের দরজা আসতে করে ঠেলে ঢুকলো।এত অন্ধকার যে কিছু ঠাওর করাই দায়।ব্যাগ থেকে তার ছোট্ট টর্চটা বের করল।এটা পাতুর বাবা পাতুকে দিয়েছে,তাই সে কাছে রাখে।আজ কাজে লাগবে করে পাতু টর্চটা জ্বালাল।একটু এগিয়ে  টর্চটা ঘরের এই কোনা থেকে ঐ কোনা পর্যন্ত ঘোরাতেই পাতুর চোখ দুটো ছানা বড়ার মত গোল গোল হয়ে সে প্রায় ভিরমি খাচ্ছিল।ঘরের মধ্যে আট নটা মেয়ে।হাত পা বাঁধা তাদের।তার মধ্যে রাই ও আছে।
প্রথমে চিনতে না পারলেও এখন সে চিনতে পেরেছে।তাড়াতাড়ি রাই এর হাত পা এর বাঁধন খুলতে থাকে পাতু। রাই ছাড়া পেয়ে বলে এদেরগুলো খুলে দি ।পাতু বলে না রে রাই এখন না,এখন চল আগে পালাই।বাকি মেয়েগুলো মুখ বাঁধা অবস্থায় গোঁ গোঁ করতে থাকে ।পাতু রাই এর হাত ধরে আসতে আসতে উপরে উঠে দেখে তখনো কেউ আসে নি।রাইকে নিয়ে পাঁচিল টপকে নদীর ধার দিয়ে  যেতেই দেখে ঐ ষণ্ডামত লোকটা আসছে।ওরা পাশের আমবাগানে লুকিয়ে যায়।তখনো বিকেল হয় নি।পাতু বলে রাই আর সময় নেই রে।যত জোরে পারিস দৌড়।ওরা দৌড়ে দৌড়ে রাই এর বাড়িতে আসে।
রাই এর ঠাকুমা মা বাবা সবাই রাইকে দেখে খুউব খুশি হয়।পাতু রাই এর বাবাকে বলে কাকু ঐ হরি জেঠুর বাড়ির তলায় রাইকে হাত পা  বেঁধে রেখেছিল,আরো অনেক মেয়ে আছে,তুমি পুলিশের কাছে শিগগির চল।মেয়েগুলোকে নইলে সরিয়ে দেবে আর খোঁজ পাওয়া যাবে না।সুভাষ বাবুও পুলিশকে খবর দিয়েছিল।পুলিশের তৎপরতায় সব মেয়েগুলোই উদ্ধার হল।জানা গেল এই কাজ হরি বাবুর গুনধর বড় পুত্রের কীর্তি।নদীর এই ধারটায় গ্রামের শেষ কিনারা তাই বেশী কেউ আসে না।ব্যবসার নাম করে ছোট মেয়েদের   বিক্রি করে বড় বড় শহরে।
কুসুমপুরের সবাই একবাক্যে পাতুর সাহস আর বুদ্ধির তারিফ করলেও শান্তিজেঠু গম্ভীর স্বরে বললেন কিন্তু তুমি হরিদার বাগানে কেন ঢুকলে সেটাতো বললে না পাতু।পাতুও কাঁদো কাঁদো ভুখে বলে জেঠু খুব ভালো আম হয়েছিল তাই খুব লোভ লাগছিল।হাসি পেলেও সেটা চেপে শান্তিবাবু বললেন আর যেন ইস্কুল কামাই না হয়।তা হলে তুমিও জান পাতু তোমায় কি শাস্তি পেতে হবে।পাতুও কাঁদো কাঁদো মুখে বলে হবে না জেঠু কথা দিচ্ছি।বাড়ির ভেতর থেকে শান্তিপ্রিয় বাবুর স্ত্রী এর তীক্ষ্ম কণ্ঠ শোনা গেল,বাছাকে আর কত জেরা করবে,ও পাতু আয় বাবা,আর ওনার মা বললেন তুই তোর পুলিশি জেরা থামা দিকি শান্তি,বাছার আমার কিছু হলে কি হোত বলতো।এই বলে চোখ মুছতে মুছতে ভেতরে গেলেন পাতুকে নিয়ে জেঠুর কবল থেকে মুক্ত করে।অবশ্যই শান্তিপ্রিয়বাবুর পাতুর গর্বে বুক ভরে যাচ্ছিল। আজকাল হরি বাবু আর কারো শিক্ষা ও সংস্কার নিয়ে কথা বলেন না।
_____


FavoriteLoading Add to library

Up next

শূন্য বসন্ত বাতাসে যখন আগুন, ফাগুন তার বায় বসন্তের আগমনবার্তা প্রজাপতি বলে যায় । আমিতো দেখেছি পলাশ শিমুল কৃষ্ণচূড়ার লাল ও পাড়ার ঐ সুনন্দা, কেন অশ্রুসিক্ত ওর গা...
জাতিভেদ প্রথা ও স্বামী বিবেকানন্দ – অঙ্কুর ... ভারতীয় হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা বহু প্রাচীন কাল থেকেই প্রচলিত রয়েছে। এই প্রথার উদ্ভব বেশ জটিল ও নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রথাটি তার বর্তমান রূপ পে...
ধন্য জীবন – সরোজ কুমার চক্রবর্তী...   জীবন আমার ধন্য মাগো এমন দেশে এসে , গর্বে বলি ভারতবাসী আমি ভালোবেসে | বড় হলাম এই বাংলায় সুখে কাটাই দিন , ছোট বড় নেই ভেদাভেদ সবাই স্বাধীন...
সত্যজিতের চিড়িয়াখানা-প্রচুর আলোচনা ও সামান্য সমালো... একটা সিনেমা তৈরির পেছনে যে ইন্টারেস্টিং গল্পগুলো থাকে তা দিয়েই হয়তো আরেকটা সিনেমা বানানো হয়ে যেতে পারে। এরকম বহু ছবি আছে যা তৈরি হতে হাজারো বাধা এসেছি...
সম্পর্ক – বিভূতি ভূষন বিশ্বাস... আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি ।  ১৯৮০ সালের এক ঘন বর্ষার দিন প্রায় এক সপ্তাহ ধরে রিমঝিম করে অনবরত বৃষ্টি পড়েই চলেছে থামার কোন নাম গন্ধ নেই । গ্রামের রাস্তা...
কল্পবৃক্ষ – সুস্মিতা দত্ত রায়... নদীর পাড়ে ঝাঁকড়া অশ্বত্থ গাছটায় হেলান দিয়ে বসেছিল কালু। এই অশ্বত্থ গাছটা থেকে পশ্চিমে কিছুটা গেলেই জঙ্গলের সীমানা শুরু। জঙ্গল আস্তে আস্তে গভীর থেকে গভ...
পুরুষ – তুষার চক্রবর্তী...  দুপুর তিনটে বাজে। কাকলির আজ আর ঘুম আসছে না। বার বার ঘড়ির দিকে দেখছে। সাড়ে পাঁচটা বাজলে, কাকলিকে যেতে হবে অয়নদের বাড়িতে। অয়নের বাবার সাথে তাকে দেখা কর...
রোগীদের জন্য ভারতের প্রথম চ্যাটবট অন্যা – অঙ... চ্যাটবট কি? চ্যাটহল এমন একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যা মানুষের সাথে কথা বলে। বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ( শিক্ষা, ব্যবসা, স্...
পরিশোধ স্পৃহা -তুষার চক্রবর্তী...    সুমনা সোফায় বসে ফোনের অপেক্ষা করছে। বেশ অধৈর্য্য লাগছে। সময় যেন কাটছে না। চিন্তাও হচ্ছে। পল্লবের ছেলেরা কি ঠিকঠাক কাজটা করে উঠতে পারলো না! এতো দেরি...
সম্পর্কের চিলেকোঠায় – বিদিশা মন্ডল... পরন্ত বিকেলে সূর্য যখন তার লালচে সংসার নিয়ে পশ্চিমদিকে ঢুলুঢুলু চোখে পাড়ি দিয়েছে তখন তানিয়া এককাপ ধোঁয়া ওঠা কপির কাপ হাতে ওর ফ্ল্যাটের বারান্দায় এসে দ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment