বাজারে বিপত্তি

-গার্গী লাহিড়ী

বিবারের সকাল বেলা চায়ের কাপ নিয়ে সবেমাত্র আয়েশ করে বসেছি । ভাবছি মুখপুস্তিকায় চোখ রাখবো নাকি খবরের কাগজে ? এমন সময় বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো গিন্নি এসে বাজারের থলে আর ইয়া পেল্লাই ফর্দ ধরিয়ে বললো আজ মেয়ে জামাই আসবে সে খেয়াল আছে ?
অগত্যা উঠতেই হলো । মেয়ে জামাই বলে কথা !! বেরোতে যাবো এমন সময় রান্নাঘর থেকে আওয়াজ এল ‘ গুপির দোকানে চা নিয়ে বসবেনা কিন্তু , যত্তসব গুলতানি মাস্টার’ !!

বাজারে পৌঁছে ভাবলাম গুপির দোকানে চা টা খেয়েই যাই , কি এমন দেরী হবে ?
একটু মন দিয়ে চা খাচ্ছি এমন সময় কানে এল কিছু ছেঁড়া ছেঁড়া কথা- ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম সরকার মশাই আর রথীন দা চায়ের গ্লাস হাতে আড্ডায় মজেছেন ।
– আরে রথীন বাবু এ আর এমন কি ? আপনি বলছেন অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি , সে তো রাহা বাবুর ছোট ছেলেও সরকারি অফিসার হতে পারেনি । বেচারা প্রচুর খেটে ছিল কিন্তু পাস না করতে পারলে কি হবে ? এখন তো বাবার দোকানেই বসে । ওসব রোদ্দুর ফোদ্দুর কিছু নয় মোট কথা হলো সরকারি চাকরি এখন লটারির থেকেও বেশী দামি ।

আমি ভাবলাম রোদ্দুর আর সরকারি চাকরি  !! বিকিরনে মনে হয় সমান উজ্জ্বল । নাঃ আর বেশিক্ষণ এখানে থাকা ঠিক হবে না । যেভাবে অমল কান্তির পোস্ট মর্টেম হচ্ছে তাতে করে আমি আশ্চর্য হব না যদি রথীন দা আমাকে বলে বসে – কি অবনি বাড়িতে বউ আছে ?
আমি তফাতে চলে এলাম । সবজি বাজারে যাই , গিন্নি বলেছে কচি দেখে লাউ আনতে । জামাই বাবাজীবন নাকি লাউ এর পায়েস কখনো খায় নি !!!! সবাই যেমন আঁচড়ে , কামড়ে কচি লাউ চেনে তেমন কোনো অস্ত্র আমার কাছে নেই । তাই যথা সম্ভব হাত বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করছি  – এমন সময় কানে এল দুই মহিলার কথোপকথন –

– দিদি জানেন আজ সকালে রাসুর মাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে
– ওমা সেকি !! কি হয়েছে ?
– আরে বাতিকে বুড়ি সারাদিন কলঘরে পড়ে থাকে । খেয়েছে  আছাড় । কোমর নাকি ভেঙে গেছে । কি জানি !!!
– বাতিক যদি বলিস তো রায় বাড়ির মেজ বউ, ওই যে মিতা না কী যেন নাম ,,
– কেন মেজ বউ কি সারাদিন বাথরুমে পড়ে থাকে ?
– আরে না না , আরো বড় বাতিক । দরজায় তালা দিয়ে মানুষ একবার পরখ করে দুবার পরখ করে কিন্তু বউ তো সারাদিন তালা ধরেই বসে থাকে !!!!
– বলো কি ? এত সাঙ্ঘাতিক !!!
– তবে আমার বড় পিসির মেয়েকে ছোট বেলায় দেখেছিলাম …..

আমি আর ওখানে থাকার সাহস পেলাম না । বাতিকের ফিরিস্তি শুনে আমিই না বাতিক গ্রস্ত হয়ে পড়ি !!! মাছের বাজারের দিকে যাই । ভাবলাম যে মেয়ে তালা ধরে সারাদিন বসে থাকে তাকে কি বলা যায় ? বাতিক গ্রস্ত ? নাকি সংশয় ত্রস্ত ? মরুক গে যাক , আমি মাছের বাজারে ঢুকি ।
গিন্নি আবার ইলিশ আনতে বলেছে । মেয়ের আবদার ,, তোমাদের জামাই তেলাল ইলিশ ভাপা খেতে খুব ভালোবাসে । ভালোবাসারও বলিহারি যাই !!! ইলিশের দাম তো আবার — যাক গে , পা বাড়াই মাছ বাজারের দিকে । বেশ সরেস পাবদা দেখে কিঞ্চিৎ দাঁড়িয়ে যাই । কিছুটা পাবদা নিলে মন্দ হয় না । পাবদার ঝালটা বেশ মৌজ করে খাওয়া যাবে । গিন্নির হাতে ওটা আবার খোলে ভালো ।
হঠাৎ কানে এলো
– সেকি ? আলমারির ভিতর চোর ঢুকে বসে ছিল ? আলমারি কি খোলা ছিল নাকি ?
কান সজাগ করি । কোথায় আবার চুরি ডাকাতি হল রে বাবা !!!
কানে এল পুরো ঘটনা ….
– তাহলে আর বলছি কি ? শোবার ঘরে বিকাশ দার মা রাতে আলো নেভাতে গিয়ে দেখে আলমারি টা নড়ছে । সঙ্গে সঙ্গেই তো চিৎকার । সবাই জড় হয়ে আলমারি টা খুলতেই দেখে সিরিঙে মার্কা একটা লোক হাঁফাচ্ছে ।
ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন বলে ওঠে
– পুলিশে দিয়েছে ? নাকি নিজেরাই আড়ং ধোলাই …
– না না সেসব কিছু না , চোর তো এখন বিকাশ দার বাড়িতেই আছে ।
– সে আবার কি ? চোর কে কেউ বাড়িতে আশ্রয় দেয় নাকি ?
– আরে পুরোটা শোনো না ,
লোকটা তো হাঁফাচ্ছিল , তখন সবাই জল টল দেয় । কেন আলমারির ভিতর ঢুকে বসেছিল জিজ্ঞেস করাতে সে বলে , ও নাকি রাতে চুরি করতেই বেরিয়ে ছিল । কিন্তু কতকগুলো কুকুর তাড়া করায় সে বিকাশ দা দের বাড়ির পেছনের পাইপে উঠে পড়ে । আর সোজা ঘরে চলে আসে । আলমারিতে চাবি ঝোলানো আছে দেখে আর লোভ সামলাতে পারেনি । ভেবেছিল এখান থেকেই জিনিসপত্র নিয়ে ভেগে যাবে । আলমারি সবে খুলেছে এমন সময় একটা ধেড়ে ইঁদুর কোথা থেকে ছুটে ঘরে ঢুকে পড়ে । চোর বেচারা ভয়ে আলমারির মধ্যে ঢুকে পড়ে ।

আমি ভাবি এ আবার কেমন চোর যে কুকুর , ইঁদুর সবই ভয় পায় ?
যাক গে বাকি টা শুনি তো তারপর কি হল ?
– লোকটাকে তো পুলিশে দেওয়া উচিত ছিল ।
– না ওরা পুলিশে দেয় নি । লুচি তরকারি করে খাওয়াচ্ছে । সবাই সমস্বরে বলে ওঠে সেকি !!!
– হ্যাঁ তাই । বিকাশ দার বাবা জিজ্ঞেস করে তোমার নাম কি ? চোর বাবাজী বলে অশোক ভদ্র । ব্যস , সেই শুনেই বাবার রাগ জল হয়ে যায় । নামেই মহামতি অশোক তাও আবার ভদ্র !!! এ ছেলে খারাপ হতেই পারেনা । পরিস্থিতির শিকার !!

আমার মাছ কেনা হয়ে গিয়েছিল । আমিও আর দাঁড়ালাম না বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম । নামের আমি নামের তুমি নাম দিয়ে যায় চেনা !! বাব্বা , সুকুমার রায় মাথায় উঠে গেল । নামে কী এসে যায় !! শেক্সপিয়ারের পিন্ডি চটকে গেল । এই বিকাশের বাবা কে কি বলা যেতে পারে ? মহামতি নাকি মূর্খ অতি ?

তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে হবে ।
গিন্নির হাতে বাজারের থলি দিয়ে বলি এই নাও তোমার বাজার । আর হ্যাঁ তুমি বলনি তাও একটু পাবদা এনেছি । বেশ রসিয়ে রাঁধ দেখি ।

আবার পাবদা !!! আমাকে মারতে চাও নাকি ? ঠিক আছে দেখছি ।

আমি আয়েশ করে বসে মুখপুস্তিকা তে মুখ গুঁজলাম । হঠাৎ রান্নাঘর থেকে চিল চিৎকার ।  এগুলো কি এনেছো ? কচি লাউ আনতে বললাম ঝিঙে নিয়ে চলে এলে ? এগুলো কি করব শুনি ? চিংড়ি কে আনতে বলেছিল ? ইলিশ কোথায় ? জামাই কি চিংড়ি খায় ? তার চিংড়ি তে এলার্জি জান না ? ও মাগো !! পাবদা কোথায় ? গোটা কতক ট্যাংরা দেখছি তো !!!

বুঝলাম অন্যের কথা আড়ি পেতে শোনার ফল ভোগ করতে হচ্ছে । ভেতর থেকে কে যেন বলল – অবনি বাড়ি থেকো না । আবার বাজারে চলো ।।

(সমাপ্ত)


FavoriteLoading Add to library

Up next

পিতৃত্ব – শ্বেতা মল্লিক... আমি অনীক সাহা, বয়স ৪০। পেশায় শিক্ষক। ১৫বছর ধরে এই পেশার সাথে যুক্ত আছি। অবিবাহিত থাকার অঙ্গীকার করেছিলাম। কিন্তু সন্তান সুখ যে কখনো পাব, তেমনটা ভা...
লাল গাড়ির রহস্য – অরুণাভ দত্ত... ফটোগ্রাফি বিট্টুর প্যাশন | সুযোগ পেলেই সে ক্যামেরা নিয়ে এদিক ওদিক বেরিয়ে পরে  | আজ রাতের খাওয়া শেষ হওয়ার পরেই সে তার নতুন কেনা ডিএসএলআর টা নিয়ে ছাতে চ...
চলো অসুখ কুড়োই – সৌম্য ভৌমিক... খুশখুশে কাশি, ঘুষঘুষে জ্বর, ঘুরছে মাথা বনবন, থেকে থেকেই বুকের ভেতর করছে বেজায় টনটন। অম্বল নাকি চোঁয়া ঢেকুর! পেটটা ফুলে হয়েছে ঢোল, কানের মধ্যে কটকট,...
স্মার্টফোনের দুনিয়া কাঁপাতে আসছে Xiaomi A2... - অভিষেক চৌধুরী   বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মোবাইল দুনিয়ায় বিপ্লব ঘটাতে আসতে চলেছে xiaomi A2। ভারতের বাজারে Xiaomi- র জনপ্রিয়তা নিয়ে নতুন কর...
বিষয় অনিল – অভিনব বসু...   বাংলা ছবির স্বর্ণ যুগে খুব কমই অভিনেতা আছেন যারা তিন মহারথী পরিচালকের ছবিতেই অভিনয় করেছেন, ঋত্বিক, মৃণাল এবং সত্যজিত এবং এঁদের সাথে অবশ্যই জ...
Admin navoratna

Author: Admin navoratna

Happy to write

Comments

Please Login to comment