আঁধার পেরিয়ে

– অদিতি ঘোষ

বাতের ব‍্যথায় রীতিমতো কাবু  মিত্তিরগিন্নী কোনরকমে পা টেনে টেনে এসে দাঁড়ালেন মিশ্রভিলার গেটে। কলিংবেলে বার দুয়েক চাপ দিয়েই অধৈর্য্য গলায় ডাক দিলেন―মাধু!ও মাধু!দরজাটা খোল বাবা।
টীপয়ে কফি-মাগটা নামিয়ে হন্তদন্ত হয়ে উঠে এল মাধু, মানে মাধবীলতা মিশ্র।
সুসজ্জিত ড্রয়িংরুমের উঁচু গদিওয়ালা সোফায় ভারি শরীরটা এলিয়ে দিয়ে হাঁফ ছাড়লেন মিত্তিরগিন্নী,সরমা মিত্র।
দুটো কাপে কফি ঢেলে,একটা কাপ মিত্তিরগিন্নীর দিকে এগিয়ে ধরলো মাধু―নিন কাকিমা, ঠান্ডার দিনে একটু কফি খান।

দামী হাউসকোট পরিহিতা লাবন‍্যময়ী মাধবীলতার দিকে একপলক তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সরমা মিত্র।
―আবার কফি খাব ? কিন্তু এদিকে যে দেরি হয়ে যাবে।
কথাটা বলতে বলতে হাত বাড়িয়ে কাপটা নিলেন সরমা।কফির কাপে এক চুমুক দিয়ে মুখ তুলল মাধবীলতা―কিসের দেরি কাকিমা?
―বড় দায়ে পড়ে আজ আবার তোর কাছে আসতে হল রে মাধু।
বুঝেও না বোঝার ভান করল মাধবীলতা―কি হয়েছে ?
ঢোক গিললেন মিত্তিরগিন্নী―আর কি হবে বাছা।সুনন্দ এমাসেও এখনো টাকা পাঠায়নি।এদিকে তোর কাকার ওষুধগুলো না কিনলেই নয়। আগের বার তুই সাহায্য না করলে কি যে হত জানিনা।
―কত লাগবে বলুন?
―আগের বারের দশ হাজার শোধ করতে দেরি হয়ে গিয়েছিল।এবার অতটা দেরি করব না।তুই পাঁচ কি ছয় দিতে পারবি?
টেবিলে কাপটা নামিয়ে রেখে উঠে গেল মাধবীলতা। মিনিট দুয়েক পরই ড্রয়িংরুমে ঢুকল হাতে টাকা নিয়ে।
―ছ’হাজার দিলাম কাকিমা।
হাত বাড়িয়ে টাকাগুলো নিতে নিতে সরমা মিত্র বললেন―কি বলে যে তোকে ধন্যবাদ জানাব?
সেকথায় কর্ণপাত  না করে অবাক চোখে মিত্তিরগিন্নীর ডান হাতের দিকে তাকিয়ে রইল মাধবীলতা। আশ্চর্য, একবারও কেঁপে উঠল না সরমা কাকিমার হাতটা ? অথচ ওই হাত দিয়েই একদিন……..
কি বিচিত্র চরিত্রের মানুষ এরা।এত অবলীলায় টাকা গুলো গুনে নিলেন,যেন এটা ওনার ন‍্যায‍্য দাবী।
মিত্তির গিন্নী চলে যেতে পুরোনো ভাবনাগুলো মনের মধ্যে দলা পাকাতে শুরু করছিল।কিন্তু শুরুতেই থেমে গেল সেটা,একমাত্র মেয়ে
সোহিনীর আদুরে গলা কানে আসতে।

―গুডমর্নিং মাম্মি।
―ভেরী গুডমর্নিং ডীয়ার বেবি।

মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ার চেষ্টা করল  মেডিক্যাল কলেজের সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট  সোহিনী মিশ্র।মেয়ের মাথাটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে,চুলের মধ্যে বিলি কাটতে লাগল মাধবীলতা।
―আচ্ছা মাম্মি, কেউ কি এসেছিল বাড়িতে?
চমকে উঠল মাধবীলতা। সর্বনাশ, মিত্তিরগিন্নীকে দেখে ফেলেনি তো সোহিনী ? না-না নিশ্চয় দ‍্যাখেনি। দেখলে এতক্ষণ চ‍্যাঁচামেচি শুরু করে দিত। কিন্তু মেয়ের মাথা কোলে নিয়ে মিথ্যে বলবে কি করে মাধবীলতা ? এখন বুদ্ধি খাটিয়ে প্রসঙ্গান্তরে যাওয়া ছাড়া পথ নেই।
―হ‍্যাঁ রে সোহাগ ! তোর সেই বন্ধুর মা এখন কেমন আছে?
―তোমাকে তো বলাই হয়নি মাম্মি, ওর মা এখন অনেকটাই ভালো। সেদিন আমাদের হস্টেলে এসেছিলেন, রাগিনীর সঙ্গে দেখা করতে।জান মাম্মি ওর মা খুব ভালো।তবে আমার মাম্মি বেষ্ট।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ধড়মড়িয়ে উঠল মাধবীলতা।আরে ওঠ,ওঠ। তৈরী হয়ে নে । তাড়াতাড়ি। আমি দেখি পদ্ম কতদূর কি করল।

সোফা ছেড়ে উঠতে উঠতে সোহিনী ভ্রু কোঁচকালো―ছুটিটা এত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়,ভাললাগেনা।
কিচেনের দিকে পা বাড়িয়েও,ফিরে তাকালেন মাধবীলতা―দেখতে দেখতে একমাস কেটে যাবে।এখন তাড়াতাড়ি কর।নাহলে আবার খাওয়ার সময় তাড়াতাড়ি লাগাবি।
সোহিনী বাথরুমে ঢুকতে,মাধবীলতা ব‍্যস্ত হয়ে পড়ল মেয়ের জন্য চিকেন বাটার মশালা বানাতে।এটা সোহিনীর খুব প্রিয়।কিন্তু একা সোহিনীর জন্যে করলে হবে না।ওর আরও চার বন্ধুর জন‍্যেও করতে হচ্ছে।প্রত‍্যেক মাসেই হস্টেলে ফিরে যাওয়ার সময় কিছু না কিছু খাবার নিজে হাতে বানিয়ে দেয় মাধবীলতা।
মাথায় তোয়ালে জড়িয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে পড়েছে সোহিনী।প্রতিবারের মত একই ভাবে তাড়া লাগাল―দাও,দাও মাম্মি।আর দেরী করলে চলবে না।
পদ্ম নানা আইটেম  বোলে তুলছিল।মাধবীলতা ভাত সমেত প্লেটটা এগিয়ে দিয়ে হাসল ―জানি তো খাওয়ার সময়টাই শুধু থাকবে না তোর।
চিংড়ির মালাইকারির বাটিটা কাছে টেনে নিয়ে মুখে আওয়াজ তুলল সোহিনী―ওয়াও।
পাশে দাঁড়িয়ে মাছের কাঁটা বেছে দিতে দিতে মাধবীলতা  হেসে ফেলল―আগে খেয়ে দ‍্যাখ কেমন হয়েছে?
মুখে কিছুটা মালাইকারি পুরে চোখ নাচালো সোহিনী―একসেলেন্ট।
―ঠিক আছে তুই খেয়ে নে। আমি তোদের খাবারগুলো এবার হট্-পটে ভরে দিই।
―ও কে মাম্মি।

সোহিনী চলে যাওয়ার পর বুকটা খানিকক্ষণ শূণ্য শূণ্য লাগে।প্রতি মাসে একবার করে আসে সোহিনী। শনিবার সন্ধ‍্যের থেকে সোমবার সকাল নটা পর্যন্ত সময়টা যে কোথা দিয়ে কেটে যায় বুঝতেই পারে না মাধবীলতা।
মাধবীলতা নামটা বাবার দেওয়া।এখন এ নামে কেউ ডাকে না আর। মা ডাকতো মাধু। তার থেকে পাড়ার সবাই এই নামেই ডাকতো । রাজেশ অবশ্য মাধবী নামে ডাকে।

বারো বছরের বড় রাজেশ মিশ্র যদিও যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করেছিল মাধবীলতাকে,তবুও স্বামী হিসেবে তাঁকে ভাবতে এতবছর পরও সংকোচ হয় মাধবীর। মানুষটাকে আজও দেবতার আসনে বসিয়ে রেখেছে মাধু। কিছুতেই সহজ হতে পারে না। সবসময় অন্তর্দ্বন্দ্বে ভোগে।মনে হয় ওকে করুনা করতে গিয়ে অত বড়মাপের একজন মানুষ ওর মত একটা নগন‍্যা মেয়ের সঙ্গে নিজের জীবনটা জড়িয়ে ফেলে,মস্তবড় ভুল করে ফেলেছেন।অথচ ঘটনাটা যখন ঘটেছিল, তখন ঊনিশ-কুড়ি বছরের মাধবীলতার তেমন বুদ্ধির প্রখরতা ছিল না।অবশ্য অগ্ৰপশ্চাদ ভাবার মত পরিস্থিতিও ছিলনা।একটা নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে, নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিল ও।
স্নান করে শীতের রোদটা গায়ে নেওয়ার অভ‍্যাস    মাধুর চিরদিনের।ভিজে চুলটায় হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে শ্রীহীন মিত্তির বাড়ির দিকে চোখটা চলে গেল।বাড়িটার কতদিন কোন সংস্কার করা হয়নি সেটা জানেনা মাধু। তবে গত সাতাশ বছরে একবারও রঙের প্রলেপ যে আর পড়েনি,সেটা জানে। অন‍্যদিন অতটা তাকায় না। আজ সরমা মিত্র টাকাটা ধার নিয়ে যাওয়ার পর ভীষণভাবে মনে পড়ে যাচ্ছে সাতাশ বছর আগের কথা।সরমা মিত্রের জিভে শান দেওয়া থাকতো সবসময়েই। তবে সেদিনের কথাগুলো ছিল একদম অন‍্যরকম। সেই কথার ধারে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল পনেরো বছরের কিশোরী মাধবীলতার হৃদয়। শুধু কি মুখ ? হাত চালাতেও দ্বিধা করেনি মিত্তির বাড়ির বড় বৌ সরমা মিত্র।

 

রাজেশ মিশ্রের গাড়িটা গেটে ঢুকতেই ছাদ থেকে তাড়াতাড়ি নেমে এল মাধু। মানুষটাকে কিভাবে যত্ন করবে ভেবে পায় না ও।বাইশ বছরেও ‛তুমি’ ডাকটা রপ্ত করতে পারেনি। এখনো আপনিই বলে স্বামীকে। এব‍্যাপারেও অনেক চেষ্টা করে ব‍্যর্থ হয়েছেন স্বনামধন্য ডাক্তার রাজেশ মিশ্র। বত্রিশ বছর বয়সে লন্ডন থেকে ফিরে যখন দেশেই সেটেল হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, তখন হঠাৎ করেই দেখা হয়ে যায় মাধবীলতার সঙ্গে।
তিনপুরুষ আগে বিহার থেকে বাংলায় এসেছিল রাজেশ মিশ্রের পরিবার। রাজেশের জন্ম কলকাতায়। একমাত্র পদবীটুকু ছাড়া,আর সব দিক দিয়ে ষোলোআনা বাঙ্গালী রাজেশ। সুন্দর বাংলা বলতে পারেন রাজেশ। এর কারন মা ছিলেন বাঙ্গালী ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান।
পাঁচবছর লন্ডনে ছিলেন রাজেশ। তবে একা নয়। সঙ্গে মাকেও নিয়ে গিয়েছিলেন । দেশে যখন ফিরলেন, তখন রীতিমতো অসুস্থ মায়ের সবসময় দেখাশোনা করার জন্যে প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল একজন যত্মশীলা মহিলার। তখনই তাঁর সংসারে আয়ার কাজ নিয়ে ঢুকেছিল মাধবীলতা। মুখার্জি পরিবারের মেয়ে মাধবীলতাকে পেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছিলেন রাজেশ মিশ্রের মা।বলেছিলেন―তুমি মুখার্জি,আমিও ছিলাম মুখার্জি। নিজের পদবীর একজন মানুষকে কাছে পেলাম যাহোক।
ওই মাতৃতুল্যা মহিলার সেবায়, পুরো একটা বছর নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়োজিত  রেখেছিল মাধবীলতা। মৃত্যুর আগে দুহাত তুলে আশীর্বাদ করে গিয়েছিলেন উনি ওনার সেবিকাকে।বলেছিলেন―তুই অনেক সুখী হবি জীবনে। তোর কোন সাধ অপূর্ণ থাকবে না।
অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিল সেই মানষটার ভবিষ্যৎ-বাণী।সত্যিই জীবনে যে সুখ মাধু পেয়েছে, সেটা ছিল ওর মত একটা অসহায় মেয়ের কাছে অলীক স্বপ্ন।

 

গতকাল রাত্রে দুটো সিরিয়াস অপারেশন ছিল। তাই নার্সিং-হোমেই রাতটা থাকতে হয়েছিল রাজেশকে। বাড়ি ফিরে নিত্য দিনের অভ‍্যাস মত সোজা ওয়াসরুমে ঢুকে পড়লেন। মাধু কিচেনে ঢুকল মিক্সড ফ্রুট -জুস বানাতে। লাঞ্চের কিছুক্ষণ আগে একগ্লাস ফ্রুট-জুস খান রাজেশ। কিন্তু সেটাও একগ্লাস বানালে চলবে না।তাঁর সামনে বসে মাধুকেও খেতে হবে একগ্লাস।
বাইশটা বছরেও এই মানুষটাকে নিয়ে বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি মাধুর।বিয়ে যখন হয়েছিল তখন মাধুর কুড়ি আর রাজেশের বত্রিশ।লজ্জায় জড়সর মাধু ঘনিষ্ঠ মুহূর্তেও সহজ হতে পারতো না।এরজন‍্যে প্রথম প্রথম অনেক স্যাক্রিফাইস করতে হয়েছে রাজেশকে। তবু অধৈর্য হননি। এই বিয়াল্লিশ বছর বয়সেও সেসব কথা মনে পড়লে লজ্জা পায় মাধু।
গায়ে তোয়ালেটা জড়িয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসছে রাজেশ। সুঠাম বলিষ্ঠ চেহারা,ধবধবে ফর্সা গায়ের রঙ। চুয়ান্ন বছর বয়সেও মুখে বয়সজনিত বলিরেখা তেমন পড়েনি। শুধু শরীর নয়,মনটাও এখনো তরতাজা।মাধু ও সোহিনীর সঙ্গে সুযোগ পেলেই মজা করেন। ট্রে সমেত জুসের গ্লাস দুটো টেবিলে নামিয়ে রাখতে রাখতে, একবার আড়চোখ রাজেশের দিকে তাকিয়ে নিজের মনে হাসল মাধু। এর পরের ঘটনা কি ঘটবে,তা জানা। বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঠাণ্ডা গায়ে একবার ওকে জড়িয়ে ধরে,তবেই জুসের গ্লাসে হাত দেবে রাজেশ। এর জন্যে মনে মনে তৈরী হয়েই ছিল। কিন্তু আজ নিয়মের ব‍্যতিক্রম ঘটল। সোফায় বসেই একটা চিরকুট এগিয়ে দিলেন রাজেশ। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মাধু―এটা কি?
গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করলেন রাজেশ―কাল রাত্রে আমার জন্যে যে ব‍্যাগে খাবার পাঠানো হয়েছিল,তার মধ্যে এটা ছিল।খুলে দ‍্যাখ।
ভয়ে ভয়ে চিরকুটের ভাঁজ খুলে,লেখাটার চোখ বোলালো মাধু।সোহিনীর হাতের লেখায় রাজেশের উদ্দেশ্যে ছোট্ট চিঠি।

 

ডিয়ার বাবি!
মাম্মি তোমাকে ‛তুমি’ না বললে কাল বাড়িতে কিছু খাবে না।
―সোহাগ
চিঠিটা ভাঁজ করতে করতে মিষ্টি করে হাসল মাধু। রাজেশ বললেন―আমার একমাত্র মেয়ের কথা অমান্য করি কি করে বল?তার থেকে জুসটা রেখে দাও। অবশ্য তুমি তোমারটা খেতে পার।
জুসের গ্লাস রাজেশের দিকে এগিয়ে ধরল মাধু―নাও খেয়ে নাও।
―খাবো,কিন্তু তার আগে তোমাকে কথা দিতে হবে যে শুধু আজ নয়,এবার থেকে আর কোনদিন আপনি টাপনি বলবে না।
―মেয়েটা খুব দুষ্টু হয়েছে।অনেকদিন থেকেই এই কথা বলছে।আমি তোমাকে আপনি বললে ওর নাকি অস্বস্তি হয়। ঠিক আছে আর বলব না। এখন খেয়ে নাও।
তৃপ্তির হাসি হাসলেন রাজেশ―তাহলে আমি এতবছরে যা পারিনি, মেয়ে তা পারলো ?
জুসটা হাতে তুলে নিয়ে ডঃ মিশ্র বললেন―আজ রাত্রে আমি ফ্রী। বাড়িতেই থাকবো। তোমার এই নতুন সম্বোধনটার জন্যে একটা সেলিব্রেশন না হলে হয় ?
হাঁ হাঁ করে উঠল মাধবীলতা।―কি যে বলেন, সরি বলো না ?  এই কারণে সেলিব্রেশন? ―আরে সেলিব্রেশন মানেই কি অনেক লোকজন ? আজ অন্য কেউ থাকবে না। শুধু আমি আর তুমি।এমন একটা প্রফেশন আমার যে এত সুন্দরী বৌটাকেও একটু বেশিক্ষণ কাছে পাইনা। আজ কিন্তু তোমাকে লাল শাড়ি পড়তে হবে।লাল শাড়ি পড়লে তোমায় অপূর্ব লাগে।পড়বে তো?
আলতো করে ঘাড় কাৎ করল মাধু।
মাধবীলতা সত‍্যিই আজও সুন্দরী।লন্ডন থেকে ফেরার পনেরো দিন পরই,নার্সিং হোমটার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন রাজেশ। ওখানে নার্সের সাদা পোশাক পরা প্রসাধনহীন মাধবীলতাকে দেখে মুগ্ধ চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন বিদেশ ফেরত ডাক্তার রাজেশ মিশ্র। ডাক্তার ভৌমিক আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন―এ হচ্ছে মাধবীলতা। ওর কাজ আমার খুব পছন্দ। আপনার মায়ের জন্য আমার একেই উপযুক্ত বলে মনে হয়েছে।
রাজেশ মিশ্র বলেছিলেন―কিন্তু উনি কি রাজি,সারাদিনের জন্যে ডিউটি করতে?
এবার উত্তরটা দিয়েছিল মাধবীলতা নিজে―আমি রাজি স‍্যার। তবে আমাকে আপনি বলবেন না। আমি বয়সে আপনার থেকে অনেক ছোট।
রাজেশ মিশ্র বলেছিলেন―ঠিক আছে। তাহলে আমি ওকে আমার মায়ের কাছে এখুনি নিয়ে যেতে চাই।
ডাক্তার ভৌমিক বলেছিলেন―হ‍্যাঁ, ও তৈরী হয়েই এসেছে।
এরপর নির্দ্বিধায় রাজেস মিশ্রের গাড়িতে উঠে বসেছিল মাধবীলতা।

প্রথম দিনই উর্মিলা মিশ্র মাধুর হাতদুটো ধরে বলেছিলেন―তোকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে।আমাকে ছেড়ে যাবি না তো মা?
কথা দিয়েছিল মাধু―আপনি না যেতে বললে যাবনা কোনদিন।
অনেকদিন পর যেন মায়ের হাতের স্পর্শ অনুভব করেছিল মাধু।মনে হয়েছিল ওই মহিলার সেবা যত্ন করলে মায়ের আত্মা হয়তো শান্তি পাবে।
মায়ের মৃত্যু সংবাদটা লোক মারফৎ পেয়েছিল মাধু।মেয়ের ওপর চরম ঘেন্না আর অবিশ্বাস নিয়েই পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিল মা।সত্যিটা মাকে জানাতে পারেনি মাধু।সে সুযোগও পায়নি।
অনেক মানুষের চেঁচামেচি শুনে হয়তো ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল মা।দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেখেছিল হাতে হাতকড়া পরিয়ে হিড়হিড় করে টানতে টানতে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে মাধুকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ-ভ‍্যানে তোলার জন‍্যে।পিছন পিছন চলেছে একদল লোক।সবার আগে আগে গলাবাজি করতে করতে হাঁটছিল সরমা মিত্রের বড় ছেলে রজত।সবাই ছিছিক্কার করছে।মাধুর মত ওর মায়ের কানেও নিশ্চয় ধাক্বা মারছিল চোর..চোর শব্দটা।বাড়ির পাশ দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় কিছুটা দূর থেকে অসহায়ের মত মাধু তাকিয়ে ছিল মায়ের দিকে।মায়ের চোখে ঠিকরে পরা রাগ আর ঘৃণা দেখে কষ্টে মুচড়ে যাচ্ছিল বুকের ভেতরটা।
সেই দিনই মাকে শেষ  দেখেছিল মাধু। আর কোনদিন  সুযোগ পায়নি দেখার।অপমানে, লজ্জায় মা সেদিন রাত্রেই  বাড়ি ছেড়েছিল। অবশ্য এরপর বেশিদিন বাঁচেনি।অনেক পরে জেনেছিল মাধু, মামা এসে কোন একসময় বিক্রি করে দিয়ে গিয়েছিল বাড়িটা।নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার হলেও, পাড়ায় একটা সম্মান ছিল মাধুদের ঠাকুরদার আমল থেকে।ঠাকুরদার পর,বাবাও যজ-মানি করতেন।ভালো পুরোহিত হিসেবে নামডাক ছিল বাবার।মাধু যখন ক্লাস এইটে পড়ে,তখন ছ’বছরের বড় দাদা কলেজ থেকে ফেরার সময় রোড-অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়।তারপর থেকেই ভেঙ্গে পড়ে বাবার শরীরটা।খুব ভুগতেন অসুখে।যাহোক করে চলছিল সংসারটা।কিন্তু দুবছর পর বাবাও মারা গেলেন। মাধু সেবছর ক্লাস টেনে উঠেছে। ওখানেই পড়াশোনায় ইতি টানতে হল।কিন্তু খাওয়া,পরার খরচই বা আসবে কোথা থেকে? অকালে স্বামী, সন্তানকে হারিয়ে ভেঙ্গে গেছে মায়ের শরীরটাও।

 

মাধু গিয়েছিল বাবার যজ-মান, মিত্তিরদের বাড়ি কিছু সাহায্যের আশায়।মিত্তির বাড়ির গিন্নীমা তখন পড়ে গিয়ে পা ভেঙ্গেছে।বড় বৌ সরমা মিত্র মাধুকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাঁর শাশুড়ির দেখা শোনার দায়িত্ব নেওয়ার জন্যে।প্রস্তাবটা শুনে প্রথমে ঘোর আপত্তি জানিয়েছিল মা।অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়েকে অন‍্যের বাড়ি কাজ করতে যেতে দিতে কোনভাবে রাজি হচ্ছিল না।এদিকে পরের দিন থেকে হাঁড়ি না চড়ার অবস্থা।অনেক বুঝিয়ে মাকে রাজি করিয়েছিল মাধু।

বেশ চলছিল।সকাল ছটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত গিন্নীমার দেখাশোনা করা বিনিময়ে মাধুর সারাদিনের খাওয়া দাওয়া ও পাঁচশো টাকা মাইনে।সেসময় পাঁচশো টাকার দাম ছিল।মাধুদের সংসারে ওই টাকাটা অনেকটাই উপকারে লেগেছিল।

চার মাস ঠিক মতো কাজটা করেছিল মাধু।তারপর এলো  জীবনের সেই অভিশপ্ত দিনটা।রমেন মিত্র আর সরমা মিত্রের ব্রিলিয়ান্ট ছেলে রজত হস্টেল থেকে বাড়ি এল কদিনের ছুটিতে।প্রথমদিন থেকেই বিরক্ত করতে শুরু করেছিল ছেলেটা মাধুকে।বুদ্ধি খাটিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে চলছিল মাধু।কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হল না।
রাত সাড়ে আটটায় ঘুমের ওষুধ খাইয়ে,নটা নাগাদ খই দুধ খাওয়াচ্ছিল  গিন্নীমাকে। তখনই ঘরে ঢুকল রজত।এটা ওটা কথা বলে কাটিয়ে দিল খানিকটা সময়। গিন্নীমার ঘুম আসতেই জাপটে ধরেছিল মাধুকে।টান মেরে খুলে ফেলেছিল মাধুর সস্তা ডুরে শাড়িটা। নিজেকে বাঁচাতে সজোরে ধাক্কা দিয়েছিল মাধু লম্পটাকে।টাল সামলাতে না পেরে, দরজার ওপর আছড়ে পড়েছিল রজত।মাথায় চোট লেগেছিল রজতের।রক্ত দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল মাধু।সেইসময় দ্রুত উঠে পড়ে ঘুমন্ত গিন্নীমার গলা থেকে তিনভরি ওজনের সোনার হারটা খুলে নিয়েছিল রজত। তারপর চিৎকার করে ডাকতে লেগেছিল―মা তাড়াতাড়ি এসো।চোর ধরতে গিয়ে আমি জখম হয়েছি।
ছুটে এসেছিল বাড়ির তিন বৌ আর তাদের স্বামীরা।ছেলে মেয়েরাও ভীড় করেছিল।সকলের মধ‍্যিখানে দাঁড়িয়ে হাতের মুঠোয় ধরা হারটা দেখিয়ে ছিল রজত।বলেছিল―আমি সময়মত না এলে আজকে ঠাম্মার হারটা যেত।আমাকে ধাক্কা দিয়ে পালাচ্ছিল ওই বদমাশ মেয়ে।
ছেলের মাথায় রক্ত দেখে মাথার ঠিক রাখতে পারেননি সরমা মিত্র।চুলের মুঠি ধরে মারতে লেগেছিল মাধুকে। মাধু বলতে চেয়েছিল, সত্যি কি ঘটেছিল। কিন্তু শুরুতেই থামিয়ে দিয়ে ফুঁসে উঠছিল সরমা মিত্র―ওরে হারামজাদি!এতবড় সাহস তোর,আমার সোনার টুকরো ছেলের গায়ে কলঙ্ক লাগাতে চাস ? তোকে পুলিশে দেব।জেল না খাটলে,তোর মত মেয়ের শিক্ষা হবে না।
এরপর আর কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের।

 

পুরো তিনটে মাস জেলের মধ‍্যে কদর্য রুচির দাগী আসামীদের সঙ্গে কাটাতে হয়েছিল মাধবীলতাকে।একমাত্র জেল সুপারের দয়ায় কিছুটা পরিত্রাণ পেত ও।তাঁর কড়া নির্দেশ ছিল,মাধুকে বিরক্ত না করার জন্য।
চুরি ও ছেলের ওপর হামলা করার অপরাধে, অ্যাডভোকেট রমেন মিত্র নিজে কেস করেছিলেন মাধবীলতার বিরুদ্ধে।মাধু তিন মাস জেল খাটার পর,কেসটা কোর্টে উঠলেও উপযুক্ত প্রমানের অভাবে টেকেনি সে কেস।মুক্তি পেয়েছিল মাধবীলতা।কিন্তু যাওয়ার মত তখন আর কোন আশ্রয় ছিল না তার।
আবার ঈশ্বরের আশীর্বাদ স্বরূপ পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন জেল-সুপার বিনোদ দত্ত।জেলে থাকাকালীন মাধবীলতার সব কথা শুনেছিলেন উনি।বিশ্বাস করেছিলেন মাধুকে।নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েই থেমে থাকেননি উনি।এক্সটারনাল হিসেবে মাধ্যমিক  পরীক্ষা দেওয়ার ব‍্যবস্থা করেছিলেন মাধুর।পাশ করার পর,একটা নার্সিং-ট্রেনিং দিইয়ে ছিলেন মাধুকে। সেখান থেকেই কাজ পেয়েছিল মাধু ডঃ ভৌমিকের নার্সিং-হোমে। কিচ্ছু লুকোয়নি মাধু রাজেশের কাছে। মায়ের ইচ্ছাতেই মাধুর কাছে বিয়ের প্রস্তাব রেখেছিলেন ডঃ রাজেশ মিশ্র। প্রস্তাব শুনে আঁতকে উঠেছিল মাধু।বলেছিল―এ অসম্ভব ডাক্তার মিশ্র।
রাজেশ পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন―সমস্যাটা কি বয়সের ডিফারেন্স নিয়ে? যদি তাই হয় তাহলে জোর করবো না তোমাকে।
এরপরই মাধু সংকোচ ঝেড়ে ফেলে বলেছিল নিজের জীবনের সব কথা।
সব কিছু শোনার পর যেন আরো জেদ বেড়ে গিয়েছিল রাজেশের।অনেক চেষ্টায় মায়ের দোহাই দিয়ে বিয়েতে রাজি করিয়েছিলেন মাধুকে।

 

চিন্তার গভীরে এতটাই ডুবে গেছে মাধু যে খেয়ালই করেনি কখন পায়ে পায়ে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন রাজেশ।চোখের সামনে নিজের আঙ্গুলগুলো নাড়াতে নাড়াতে বললেন―এই যে মাধবী ম‍্যাডাম! কি এত ভাবছেন? সিরিয়াস কিছু? আমি কিন্তু ইতিমধ্যে নার্সিংহোমে ফোন করে পেসেন্টদের খোঁজ খবর নিয়ে চলে এসেছি।
মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল মাধু―পদ্মকে লাঞ্চ রেডি করতে বলি?
―হ‍্যাঁ, তাতো বলবে। কিন্তু বললে না তো,কি এত ভাবছিলে?
হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ায়, মাধু বলল―আজকে সরমা মিত্র আবার এসেছিল। ছ’হাজার টাকা নিয়ে গেল।
রাজেশ হাসলেন―গুড। আরো লাগলে আরো দেবে।
অবাক চোখে তাকালো মাধু ―সত্যি আমি বুঝিনা,সব জানার পর কেন সরমা মিত্রকে সাহায্য করতে বলো তুমি?
রাজেশ বললেন― আমার কিন্তু খুব খিদে পেয়েছে।

 

লজ্জা পেয়ে তাড়াতাড়ি কিচেনের দিকে পা বাড়াল মাধবীলতা।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে প্রায় সব আইটেম অলরেডি গরম করে ফেলেছে পদ্ম।মাধু কিচেনে ঢুকতেই বলল―টেবিলে দিয়ে দিচ্ছি খাবার ।আপনি গিয়ে বসুন।মাছের কালিয়াটা গরম করলেই হয়ে যাবে।

মাইক্রোওভেনে মাছের কালিয়ার পাত্রটা ভরে দিল মাধু ―তুমি নিয়ে চল,আমি গিয়ে সার্ভ করে দিচ্ছি।
খাবার সার্ভ করতে করতে রাজেশের মুখের দিকে তাকালো মাধু। আশ্চর্য,আজকে রাজেশকে যেন অন‍্য রকম লাগছে।মুখের মধ্যে খুশির আভাস বেশ প্রকট।কি হল হঠাৎ।এতদিন পর মাধুর মুখে তুমি সম্বোধন শুনেই কি এত খুশী মানুষটা,না অন্য কিছু?

এই মানুষটার কোন খেয়াল খুশিরই মানে খুঁজে পায় না মাধু।বৌবাজারে অতবড় পৈত্রিক বাড়ি থাকতে, গড়িয়ায় মাধুর পৈত্রিক ভিটের কাছাকাছি জায়গা কিনে কনট্রাকটার দিয়ে কেন বাড়িটা তৈরী করিয়েছিলেন রাজেশ–তার কারণ আজও স্পষ্ট নয় মাধুর কাছে। তবে সরমা মিত্র টাকা ধার করতে আসা শুরু করার পর মনে হয়েছে, রাজেশ হয়তো মাধুর হৃত সম্মান ফিরিয়ে দিতেই সব কিছু করেছেন।সেদিনের সেই অপমানের কথা মনে পড়লে সরমা মিত্রের ওপর রাগ যতটা হয়,ততটাই করুনা হয় মাধুর।পুরো পরিবারটা শেষ হয়ে গেছে।সরমা মিত্রের স্বামী রমেন মিত্রের এখন বয়স পঁচাত্তর।গত পনেরো বছর ধরে উনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানাতেই কাটাচ্ছেন।বাকি জীবনটা এভাবেই কাটিয়ে দিতে হবে।সরমা মিত্রের সোনার টুকরো ছেলে রজত, ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে সমাজবিরোধীদের খাতায় নাম লিখিয়েছিল অনেক বছর আগে।মাঝে মাঝে জেল থেকে ছাড়া পেত।তবে এবারের অপরাধ আরও  বড়ো ।রেপ ও খুনের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের ব‍্যবস্থা পাকা করে ফেলেছে সে।ছোট ছেলে সুনন্দ চাকরি করে মুম্বাইয়ে।তবে সুখী সেও হয়নি।তার স্ত্রী তার বিরুদ্ধে কোর্ট-কাছারি করে ডিভোর্স নিয়েছে। যখন যেমন ইচ্ছা হয়,সেই টাকা পাঠায় মাকে।রমেন মিত্রের অন‍্য দুই ভাই নিজেদের সম্মান বাঁচাতে বাড়ি ছেড়েছে অনেকদিন।এখন জীর্ণদশা ফাঁকা বাড়িটায় পঙ্গু স্বামীকে নিয়ে একা থাকেন সেদিনের তেজী,অহংকারী সরমা মিত্র।

বিকেল চারটে বাজতেই রাজেশ মিশ্র মাধবীলতাকে তৈরী হওয়ার জন্য তাড়া লাগাতে শুরু করেছেন।কোথায় নাকি বেরুবেন তাকে নিয়ে।মাধুর ইচ্ছা সন্ধ‍্যের পর যাওয়ার, কিন্তু রাজেশ সাড়ে চারটের মধ‍্যেই বের হতে চান।অগত্যা তৈরী হতে হয়েছে মাধুকে।শুধু কি তাই? ডায়মন্ড সেট বার করে পরতেও হয়েছে।

গাড়িতে ওঠার আগেই বড়রকমের হৈ-হট্টগোল কানে এল।মাধু বুঝতে পারছেনা এত চ‍্যাঁচামেচি কিসের।রাজেশকে প্রশ্ন করে কোন উত্তর মিলল না।রাজেশ মিশ্রের বিদেশি গাড়িটা মিনিট দুই রান করেই থেমে গেল।নিজে গাড়ি থেকে নেমে স্ত্রীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন রাজেশ।গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে থমকে গেলো মাধু।কাতারে কাতারে লোক দাঁড়িয়ে।একটু দূরে দুটো পুলিশ- ভ‍্যান।হাতে লোহার হাতকড়া লাগানো একটা ঝাকড়া চুল ওয়ালা কদর্য চেহারার লোককে পুলিশ- ভ‍্যান থেকে নামানো হল।রাজেশ মাধবীলতার দিকে তাকালেন―চিনতে পারছো ওকে?
ঘাড় নাড়লো মাধু―কে ও?
―এই সরমা মিত্রের সেই সোনার টুকরো ছেলে।
মাধবীলতার হাত ধরে এগিয়ে গেলেন ডঃ রাজেশ মিশ্র।মিত্তির বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন সরমা মিত্র।পুলিশ অফিসারকে উদ্দেশ্য করে বললেন―দাঁড়ান অফিসার।এই পাপকে নিয়ে আর এগোনোর দরকার নেই।ওকে বাড়িতে ঢোকাবেন না।
ওর মৃত‍্যুপথযাত্রী বাবা ওকে দেখতে চায়নি।আমি অন্য কারণে  ওকে এখানে নিয়ে আসার জন্যে আবেদন ক‍রেছিলাম।
কাতারে কাতারে লোক দাঁড়িয়ে আছে, রমেন মিত্রের কুলাঙ্গার ছেলের পরিনতি দেখার জন্যে।মাধুকে যেদিন চোর বদনাম দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল– সেদিন যত লোক ভীড় করেছিল,তার বিশ গুন লোক আজ দাঁড়িয়ে আছে।
সরমা মিত্র এগিয়ে এসে রজতের দুগালে দুটো থাপ্পড় মেরে বললেন―আজ বল জানোয়ার! সেদিন আমার শাশুড়ির হার কে চুরি করেছিল ? ওই নিস্পাপ মেয়েটা, না তুই? তোর পাপে আমাদের পরিবার ধ্বংস হয়ে গেল।
রজত ঘড়ঘড়ে গলায় বলল ―আমি।

এতক্ষণ মাধবীলতার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলেন ডঃ রাজেশ মিশ্র।এবার এগিয়ে গিয়ে রজতের ঘাড়ে হাত দিয়ে, এক ধাক্কায় ওকে এনে ফেললেন মাধবীলতার পায়ের কাছে।সমস্ত মানুষ চিৎকার করতে লাগল–মার,পশুটাকে মার।সরমা মিত্র বললেন― আইন যা সাজা দেয় দেবে।তার আগে ওর মুখটা তুই লাথি মেরে থেঁতলে দে মাধু।
রাজেশের কথামতো আজ লাল রঙের কাঞ্জিভরম পড়েছে মাধবীলতা।হিরের গহনা আর হালকা সাজে দেবী প্রতিমার মত লাগছে ওকে। সমস্ত মানুষের মুগ্ধ দৃষ্টি ওর দিকে নিবদ্ধ।রজত নামের জানোয়ারটার ছোঁয়া বাঁচাতে, দুপা পিছিয়ে এল মাধু। স্ত্রীর হাত ধরে আবার গাড়িতে উঠলেন ডঃ রাজেশ মিশ্র। দুজনের চোখেই ফুটে উঠল অপার প্রশান্তি।

(সমাপ্ত)


FavoriteLoading Add to library

Up next

নরক থেকে স্বর্গ – বিভূতি ভূষন বিশ্বাস... চায়ের দোকানে গল্পগুজব করতে করতে হঠাৎ অমল বাবু কথা প্রসঙ্গে বলেই ফেললেন "আরে বিশ্বাস বাবু আপনি তো এ যুগের কর্ন ।"কথাটা শুনেই আমার মনে কেমন বিদ্যুৎ ...
আদমিভ – সৌম্য ভৌমিক... ওই যে গাছের কোটরখানি উলঙ্গ হয়েছে আজ, জীর্ণ পুরুষ শীর্ণ পিতা ছেড়েছে রাজার সাজ। হে পুরুষ তুমিও তো আয়েসি হতে পারতে, শীতের রাতে আগুনশিখা বুকের থেকে কাড়...
পিতৃত্ব – শ্বেতা মল্লিক... আমি অনীক সাহা, বয়স ৪০। পেশায় শিক্ষক। ১৫বছর ধরে এই পেশার সাথে যুক্ত আছি। অবিবাহিত থাকার অঙ্গীকার করেছিলাম। কিন্তু সন্তান সুখ যে কখনো পাব, তেমনটা ভা...
স্বর্ণযুগের ছড়া – প্রথম পর্ব।... গুপ্তযুগকে সুবর্ণযুগ বলা হত ইতিহাসেতেমনি এক সোনার যুগছিল এই বাংলাদেশেসাদাকালো সেসব ছবিরঙীন তার পোস্টারলবিকার্ড আর বুকলেটেআছে সে বিপুল সম্ভারউত্তম সুচি...
ভূতসঙ্গ – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়... অনেকদিন পরে বেড়াতে এসেছিলাম পানুর বাড়ি। সে আমার বন্ধু। এক সময় ক্যামেরাম্যান ছিল। বহু ছবিতে তার অসাধারণ চিত্রগ্রহণ আজ স্মৃতির অতলে। তা হোক, তবু বন্ধুত্...
Admin navoratna

Author: Admin navoratna

Happy to write

Comments

Please Login to comment