কনে দেখা

– মুক্তধারা মুখার্জী

—আহাহা! দারুন পাত্র জানিস তো! ইঞ্জিনিয়ার,বিদেশে থাকে, সুন্দর দেখতে। তুই এবার আর কোনো ব্যাগড়া দিস না আগে থেকেই বলে রাখলাম। আমার বন্ধুর ছেলে একদম রত্ন।

—-রত্ন যখন তুমি আঙুলে আংটি করে পরে ফেলো,আমার গলায় ঝোলানোর কি আছে রে বাওয়া! মনে মনে বলে উঠলো তমসা।

—-আর শোন মা আজ কুষ্টি মিলিয়ে এলাম একদম রাজজোটক বুঝলি। শুধু তোর একটু রাহু টা ভারী এবার থেকে মঙ্গলবার টা নিরামিষ খাস।

—-উফফ! বিরক্তিকর। একে তো এই সং সেজে বসাটাই বিরক্তিকর তার ওপর এসব জ্যোতিষীর বিধান—দু চক্ষের বিষ একেবারে! তমসা বুঝতেই পারে না জ্যোতিষীই যদি সব বলে দিতে পারতো তবে তো জীবনে কোনো সমস্যাই থাকতো না। সব আগে থেকেই জানা থাকতো। যাই হোক, এখন এটা ইম্পর্ট্যান্ট নয়, ইম্পর্ট্যান্ট হলো এই পাত্র দেখতে আসার ব্যাপার টা। এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।

—-ওকে অত বলার কি আছে বুঝিনা। শোন, আজ বিকেলেই দেখতে আসছে। কোন্ শাড়িটা পরবি তার সাথে কি গয়না পরবি এখনই দেখে রাখ। পাঁচটার মধ্যেই ওরা এসে যাবে।

চুপচাপ তমসা সব শুনে স্নান করতে চলে গেলো। বেশি ঘাঁটিয়ে এদের লাভ নেই। আগে দেখা যাক কি হয়!

অতঃপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত। পাত্র, মা বাবা জ্যেঠু মামী সহযোগে এসে হাজির। মা প্লেটের পর প্লেট সাজাচ্ছে আর এরাও খাবো না খাবো না বলে দিব্যি টুকটাক চালিয়ে যাচ্ছে। এত খাবার দিয়ে কখনো আমাকেও তো এরা আপ্যায়ন করতে পারে। তা না বাইরের লোকগুলোর জন্য একেবারে কাজুবাদাম থেকে শুরু করে কোল্ড ড্রিংকস মিষ্টি ফিশ ফ্রাই কোনোকিছুর অভাব নেই।

—তা মেয়ে কে নিয়ে আসুন।

আমাকে নিয়ে মা ঢুকলো ঘরে।

—বসো মা। বসো।

—চুল টা মা এত ছোট করে কেটেছো কেন? এবার থেকে একটু বাড়াবে কেমন? মেয়েমানুষের এরকম মানায় নাকি?

—-তা গান জানো নাকি একটু আধটু?

—হ্যাঁ জানি।

—বাহ! বাহ! ভালো ভালো। আমিও এক কালে ভালো গাইতাম বুঝলে? তুমি এলে নতুন করে দুজনে মিলে শুরু করা যাবে কি বল?

হা হা হা! বলে ছেলের মা হেসে উঠলেন।

তমসার বাবা মা বেশ গদগদ। তার মানে মেয়েকে তাদের মনে ধরেছে।

—তা তোমার দুটো ছবি তুলে নি মা? বাড়িতে আরো আত্মীয় স্বজন দেখতে চাইবে। দেখাতে হবে তো। একটু এই সাইড হয়ে দাঁড়াও দেখি। হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে। আরেকবার ঐদিকে মুখ করে…হ্যাঁ হ্যাঁ। ভালো আসছে না বুঝলে। একবার এদিকটায় আলোর দিকে এস দেখি।হুম হুম। ঠিক আছে ঠিক আছে।

তমসার চোখ ফেটে জল আসছে। কখন বন্ধ হবে এই প্রহসন! ছবি তোলার নাম করে তাকে হাঁটিয়ে চলিয়ে বিভিন্ন দিক দিয়ে যে পরিমাপ করে নেওয়া হচ্ছে সেটা তার আর বুঝতে বাকি নেই—প্রথা সেই আদ্যিকালের শুধু পন্থা আধুনিক!

—বুঝলেন, আমাদের তো মেয়ে পছন্দ। তাই তো নাকি? জ্যেঠু বলে উঠলেন।

সকলে একযোগে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন।

—এবার তাহলে দেনা পাওনার ব্যাপারটা মিটিয়ে নেওয়া যাক।

— হ্যাঁ হ্যাঁ। বলুন না। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। একটাই তো মেয়ে আমাদের।

হাত জড়ো করে বলে উঠলেন তমসার বাবা।

—আচ্ছা বেশ।  আমাদের বংশের খুব নাম ডাক বুঝলেন!আর ছেলেকে তো দেখছেন। এরকম রত্ন খুঁজে পাবেন না কোথাও। পড়াশোনায় ছোট থেকেই বেস্ট। এখন চাকরিও করছে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। বিয়ে করেই আবার ফিরে যাবে বিদেশে।

তা যা নিয়ে বলছিলাম….ওই নমস্কারী শাড়িগুলো যেন একটু হাই রেঞ্জের হয়। নয়তো একদম কাউকে দেওয়া যায়না জানেন তো! আপনার মেয়েরই সম্মানের ব্যাপার বুঝলেন কিনা।  গলাটা ভর্তি থাকে যেন। একদম হালকা কিছু না দেওয়াই ভালো। ওইসব তো আমরা পরে করেই দেবো। আর হাতে বালা, চূড় ছাড়া ছয় গাছা করে সলিড সোনার চুড়ি আর অবশ্যই মানতাসা দেবেন কিন্তু। এত বাড়ির বউ হতে যাচ্ছে এটুকু না থাকলে বড় বেমানান লাগবে দাদা। আর তত্ত্ব নিয়ে তো বেশি কিছু বলার নেই। এত লোকজন আমাদের সবার কথা ভেবেই দেবেন। খাটটা কিন্তু সেগুন কাঠের হয় যেন! আলমারী একটু বড় সাইজের….

—যা না মা অভয় কে একটু আমাদের বাগান টা ঘুরিয়ে দেখিয়ে আন।

শুকনো মুখে বলে ওঠেন তমসার মা। মেয়ে এসবের মধ্যে না থাকাই শ্রেয় মনে মনে ভাবেন।

—অতই শখ যখন নিজে গেলেই তো পারতে মা। মনে মনে গজগজ করে তমসা। বুকটা কষ্টে ফেটে যাচ্ছে। এসব দেখার জন্য সে আজ রাজি হয়েছিল!

— হ্যাঁ।হ্যাঁ। যা না অভয়। তোরাও একটু কথা বলে যে নিজেদের মধ্যে। তোরাই তো সংসার করবি আমরা আর কদ্দিন!

 বাগানে গিয়ে….

—বয়ফ্রেন্ড ছিল?

—না।

—সত্যি বলছো?

—হুম।

—আর ইউ ভার্জিন?

তমসা তাকিয়ে দেখে এবার অভয় কে কড়া দৃষ্টিতে। ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙছে যেন!

—ওকে। ওকে। নো ইস্যু। বলতে হবে না। বিয়ের পর বাইরে থাকতে তোমার কোনো অসুবিধা হবে না তো?

—না। বিয়ের পর মেয়েদের নিজের বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি থাকাটা ওই বিদেশ থাকারই সমান। কোনো পার্থক্য তো দেখি না!

—না আমি তা বলছি না। ওটা তো কমন। কিছু করার নেই। বাট বিদেশে আমার সাথে পার্টি বা গ্রুপ টুগেদারে যেতে হবে সকলের সাথে কথা বলতে হবে মিশতে হবে তাই আস্ক করছিলাম আর কি।

—আমাকে কি আপনার বোবা কালা মনে হলো?

—ওঃ!  নো নো। একচুয়ালি আই মিন টু সে, তুমি তো বেঙ্গলি মিডিয়ামের স্টুডেন্ট ওখানে ইংলিশে কমিউনিকেট করতে হবে একটু আধটু সোশ্যালি ড্রিংক করতে হবে। পারবে তো?

–ওঃ! আচ্ছা।এবার বুঝলাম। আপনি ওই গোত্রের বাঙালির মধ্যে পড়েন নিশ্চয়ই যারা নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় দিতে লজ্জা পান? আর কোনো জাতের মধ্যে এটা পাবেন না জানেন? এই আপনাদের মত দু একটা খড়কুটোর জন্য বাংলা ভাষার এই হাল।

তা আপনার বাপ মা আপনার সাথে ইংরেজিতে কথা বলেন বুঝি? নাকি ওদেশে তাদের নিয়ে গেলে বোবা বলে চালিয়ে দেবেন? আসলে কোনোদিন হয়তো নিয়েই যাবেন না এটাই মোদ্দা কথা।

—ওকে।ওকে। এত লেকচারের কি আছে রে বাবা! সুক্ত মোচার ঘন্ট এসব জানো তো? আমার ওখানে খাওয়া দাওয়া টা ঠিক….

—এক মিনিট দাঁড়ান। আসছি।

এই নিন।

–কি এটা?

—ভালো রাঁধুনি পাওয়া যায় এই সেন্টার থেকে। নিয়ে যান সঙ্গে করে কাজে দেবে।

—মানে?

—মানে রান্না আমি করতে জানি। কিন্তু যার কাছে আমি রান্না জানি কিনা বাসন মাজতে পারি কিনা এইসব আমার যোগ্যতার মাপকাঠি তাকে আমি আমার পায়ের নখের যুগ‍্যিও ভাবি না।

বরং আপনি আমার কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দিন দেখি?

—ওকে ফাইন।

—বিদেশে নাইট ক্লাবে যান?

—ন- না। একদমই না। গিয়েছি এক দুবার বন্ধুরা নিয়ে গিয়েছিল আর কি!

—রোজ ড্রিংক করেন?

—না। ওই মাঝে মধ্যে….

—রিয়েলি?

—ওই অফিসের পর বন্ধুরা জোর করলে প্রায়ই হয়ে যায় আর কি…বুঝতেই তো পারছেন এইসব ইন্ডাস্ট্রি তে হয়েই থাকে এসব।

—ওঃ! বেশ। তা আজ পর্যন্ত কতজনের সাথে বিছানায় শুয়েছেন?

—হোয়াট?

—পর্ন মুভি দেখেন?

—রাবিশ!

—মাস্টারবেট?

—কিসব বলছেন কি? আপনার কি মাথা খারাপ?

—কেন? এর বেলায় মাথা খারাপ হয়ে গেলো অমনি! নাকি বলতে চাইছেন না?

হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে আসে অভয়।

—মা। মা। এসব ভুলভাল মেয়ের সাথে আমি বিয়ে করতে পারবো না।

—কে ভুলভাল আমি না আপনি? আপনার কি যোগ্যতা আছে শুনি? শুধু ওই কতগুলো ডিগ্রি? ওই দিয়ে আর যাই হোক প্রকৃত মানুষ হওয়া যায় না। আর এই যে আপনারা…. আপনাদের ভান্ডারে এত বড় রত্ন থাকতে লজ্জা করলো না আমার মা বাবার কাছে ভিখারীর মত হাত পাততে। ছেলেকে এতদিন খাওয়ানো পড়ানোর খরচ টা আমার বাবার কাছে থেকে নিতে হচ্ছে শেষমেশ! তা কাকু আপনিও কি এইভাবে নিজেকে বিয়ের সময় বিক্রি করেছিলেন? কত অব্দি বুলি উঠেছিল আপনার?

—মামনি থাক না।

—কেন থাকবে বাবা? এই চুপ থাকার জন্য পড়াশোনা শিখিয়েছিলে আমায়? তার থেকে জন্মের পরই মেরে ফেলতে পারতে তাহলে আজ অন্তত নিজেকে বাজারে দাঁড় করিয়ে দর বিচার করতে হতো না আমাকে।

—মাম!

—ভুল কি বলেছি? তোমরাই তো ছোটবেলা থেকে পইপই করে শিখিয়েছো অন্যায় কোনোদিন সহ্য করবি না। তাহলে আজ চুপ করাচ্ছো কেন? মেয়ে বলেই কি আমি দায় হয়ে গেলাম এত? এই তো তোমাদের রাজপুত্তুর। বাংলা বলতে লজ্জা পায় যে, সে কোনোদিন নিজের বাবা মায়ের পরিচয় দেবে ওদেশে নিয়ে গিয়ে? কোনোদিন ফিরেও দেখবে না। তার হাতে তুলে দিতে চাইছো যে নিজের দেশ, ভাষা কোনোটাকেই সম্মান করে না। বিদেশ যাওয়াটা খারাপ নয় কিন্তু নিজের সংস্কৃতি নিজের শিকড় ভুলে যাওয়া অপরাধ। আর এরকম ছেলে  আমায় কোন সম্মান দেবে শুনি? তার জন্য নিজেকে বিকিয়ে দিতে যাচ্ছ তোমরা? ছি! আর এই যে আপনারা শুনুন, নিজের ছেলে কে অন্য জায়গায় গিয়ে বিক্রি করুন। এরকম ভিখারী পরিবারের বউ হয়ে আমি যাবো না। বড় বংশ! ছি! জাত ভিখারী সব। এতদিন মেয়েরা বিক্রী হত বাজারে। আজকাল স্পাইনলেস ছেলেরা বিক্রী হয় বিয়ের নামে। আর আমি এমনিতেও ইউসড মাল ব্যবহার করি না। কি মিস্টার অভয়? কিছু ভুল বললাম নাকি?

ভ্রূ নাচিয়ে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হেসে বলে ওঠে তমসা।

— মা তোমরা কি উঠবে নাকি? আমি চললাম।

— হ্যাঁ হ্যাঁ। যান শিগগিরই। নয়তো লোকাল থানায় ফোন করতে বাধ্য হবো।

গটগট করে অভয় রেগেমেগে বেরিয়ে গেল। পিছন পিছন বাকি সবাই।

(সমাপ্ত)


FavoriteLoading Add to library

Up next

অন্ত্যমিল – মধুপর্ণা ঘোষ... অধিকাংশ সময় ছন্দহীন বাক্যগুলো ভীষণরকম ছন্নছাড়া; অন্ত্যমিলের খোঁজ যেটুকু বা ছিল সেটুকুও আজ আতিশয্য! তবুও হঠাৎই মিলে যায় শেষ শব্দগুলো - যেমন হঠা...
আষাঢ়ে ভূত – শাশ্বতী সেনগুপ্ত...  আকাশ এখন অনেক বদলে গেছে। বেশি সময়-টময় নেয় না আর। প্রথমেই দুহাতে এক রাশ কালো মেঘ টেনে আনে। তারপর নিজের বুকটাকে ঘন কালো মেঘে ছেয়ে দেয়। ঝটাঝট কয়েকটা ব...
কি যাদু মা ডাকতে - অদিতি ঘোষ      প্লীজ, স্টপ ইট্। এই ধানাই পানাই ভাল লাগেনা আমার। প্রত‍্যেকদিন সেই একই আলোচনা। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে কথাকটা উগলে দিয়ে,পার্শটা...
আমার বন্ধু অমলকৃষ্ণ... - দেবাশিস ভট্টাচার্য    কলেজে পড়ার সময় বেশ কয়েক বছর আমাকে কলুটোলার একটি মেসে থাকতে হয়েছিল। আমার বাড়ি মেদিনীপুরে। রোজ কলকাতা  যাতায়াত এর অসুবি...
টিয়াপাখি – সৌম্য ভৌমিক... You will be rich within three months, when I am assuring you, it will happen surely. কথাটা ফুটপাথ থেকে ভেসে এলো, লাঞ্চ করতে বেরিয়েছি। একটু অবাকই হলাম...
Admin navoratna

Author: Admin navoratna

Happy to write

Comments

Please Login to comment