নিজের সঙ্গে দেখা

– দেবাশিস ভট্টাচার্য

 

আজ বিয়ের পঁচিশ বছর সম্পূর্ণ হলো।আমি অনিন্দিতা বসু।  ব্যাংক এর ডেপুটি ম্যানেজার সায়ক বসুর স্ত্রী। নবনীতা বসুর মা। এই এখন এটাই আমার পরিচয়। মা আর বাবা ছোটবেলায় একটি আদরের ডাক নাম রেখেছিল “অনি” সেই থেকে আসল নামটাই লুপ্ত হয়ে গেল।বাড়ির সবাই “অনি” বলেই ডাকতো। শুধু স্কুলের বন্ধুরাই ডাকতো “অনিন্দিতা” বলে। সায়ক এর সঙ্গে আমার পরিচয় ক্লাস নাইনে।ও তখন ক্লাস টুয়েলভে পড়ে।একটা একটা করে দিন কেটে গিয়ে কখন যে সাতটা বছর কেটে গেছে বুঝতেই পারিনি।

হুঁশ ভাঙলো বাবার কথায়। যখন বিয়ের সম্বন্ধ দেখা শুরু হল। আমি এই প্রথম বিদ্রোহ করলাম বাবাকে সিধে বলে দিলাম।
“আমি যদি বিয়ে করি সায়ককেই করবো। অন্য কাউকে নয়”। সায়ক তখনো তেমন কিছু করে না।একটা ছোট কোম্পানিতে জুনিয়র আকাউন্টেন্ট হিসেবে জয়েন করেছে।ওর বাবা,মা কিন্তু দুজনেই খুব ভালো ছিলো।একদিন নিজেরাই এলেন আমাদের বাড়িতে বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে।

সায়ক এর বাবা খুব বড় পোস্টে চাকরি করতেন।সে তুলনায় আমার বাবা একটা সাধারণ মার্চেন্ট ফার্ম এর কেরানি। প্রথমে বাবা একটু গুইগাই করলেও শেষ অবধি মেনেও নিলেন।তার কিছুদিনের মধ্যে বিয়ের ডেট ঠিক হওয়া।তারপর ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল। আর কিছুদিনের মধ্যে সায়ক এর ব্যাংক এ চাকরি পাওয়া। তখন আমি খুশিতে ভাসছি। বাপের বাড়ি শ্বশুর বাড়ি দুই জায়গার আনন্দে আমি তখন মাতোয়ারা। প্রতি শনিবার সায়ক এর সঙ্গে  এদিক ওদিক যাওয়া রাতের ডিনার করে বাড়ি ফেরা।

এর কিছুদিন বাদে আমি প্রেগন্যান্ট হলাম। জন্ম হলো নবনীতার। দাদু ঠাকুমার খুব আদরের।ঠিক এই সময় একটা অঘটন ঘটে গেল। আমার শ্বশুর মশাই এর বাজারে গিয়ে সেরিব্রাল হয়ে গেলো। নার্সিং হোমে যমে মানুষে টানাটানির পর বাড়ি ফিরে এলেন।কিন্তু পুরো প্যারালাইসিস। কথা বলতে পারতেন না। স্মৃতিশক্তি নেই। তাও নাতনি কে দেখলে কি খুশি।

তিন বছর এই ভাবে কাটার পর শ্বশুর মশাই মারা গেলেন। সংসারের সুরটা এরপরই কাটতে শুরু করলো।শ্বাশুড়ীর হার্ট এর প্রবলেম ধরা পড়লো।কিছু দিনের মধ্যে শ্বাশুড়ী মাও চলে গেলেন। পুরো বাড়ি ফাঁকা।আমার নিজের সংসার করা শুরু হলো তখন থেকে।

সকাল থেকে সায়কের টিফিন ওর রান্না ।নবনীতার স্কুল ওর প্রাইভেট টিউশন,বাড়ির রান্না,দায় দায়িত্ব সব মিলিয়ে অনিন্দিতা কবে যে মরে গেলো নিজেই জানি না। হুঁশ ফিরলো যখন তখন চব্বিশ টা বছর পেরিয়ে গেছে।যদিও দায়িত্ব একটুকু কমেনি, বরং আরো বেড়েছে।

ইদানিং সায়ক কে কি রকম যেন দূরের মানুষ মনে হয় কথা কম বলে।সবসময় শুধু কাজ আর কাজ। মেয়েটাও তার নিজের জগৎ নিয়ে ব্যস্ত। ভালো চাকরি পেয়ে গেছে।বন্ধু বান্ধব, কলিগ সব নিয়ে সেও চূড়ান্ত ব্যস্ত।এত নিঃসঙ্গ লাগে নিজেকে। এর মধ্যে একটাই ভালো হয়েছে মেয়ে চাকরি পেয়ে প্রথম যে গিফটটা আমাকে দিয়েছিল একটা স্মার্ট এন্ড্রয়েড ফোন। হাতে ধরে ধরে শিখিয়ে দিয়েছিল বিভিন্ন রকম এপ্লিকেশন। কি ভাবে নাম সেভ করতে হয়। ফোন কি ভাবে ধরতে হয়। এর সাথে হোয়াটস আপ,ফেসবুক,ইউটিউব আরও কত কিছু।

আমাদের মতো বাড়ির বউরা যারা বরকে ছাড়া মার্কেটিং এ যেতে পারে না।মাসের শেষে অপেক্ষায় থাকে কখন হাত খরচের টাকাটা পাবে। তাদের কাছে এটা একটা ম্যাজিক প্রদীপ যাতে হাত ছুঁয়ে দিলেই খুলে যায় সারা পৃথিবী। প্রথম ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট টা পাঠালাম মেয়ে আর বরকে। সঙ্গে সঙ্গে একসেপ্ট। এর পর আরো কতজনকে বন্ধু বানালাম নিজেই জানি না। একটা সময় দেখলাম অচেনা বন্ধুর সংখ্যা চেনা বন্ধুর চেয়ে বেশি।

মোট কথা এখন দারুন আছি। আমার সোশ্যাল ও ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড আমার অনেক নিকট হয়ে গেল। কত ছোটবেলার বন্ধু স্কুল এর বন্ধু কলেজের বন্ধু,চেনা জানা কত কিছু। হোয়াটস আপ এ তিনটি গ্রুপ।এছাড়া নেটফ্লিক্স, আমাজন সিরিয়াল সব মিলিয়ে সময় কমতে লাগলো।

সেদিন রাতে সায়ক বিছানাতে শুয়ে জিগ্যেস করলো “কি ব্যাপার আজকাল তো আর বেশি কথাই বলো না।কি ব্যাপার বলতো”। এই প্রথম আমার আনন্দ হলো। কারণ উপেক্ষার জবাব আরো বেশী উপেক্ষা।আমি বললাম ‘তোমার কিছু তাতে আসে যায় সায়ক’ ? অনেক দিন বাদে সায়ক বললো “অনি আমি কাল ছুটি নিয়েছি। আগে যে রকম আমরা ভোর বেলায় মর্নিং ওয়াক যেতাম কাল যাবে”?

বললাম” হটাৎ এত প্রেম কি ব্যাপার বলো তো”।সায়ক বললো “কিছু না এমনি।যাবে তো”।আমি বললাম “ঠিক আছে যাবো”। ভোর চারটে বোধহয় সায়ক ধাক্কা মেরে ডাকলো ‘কি গো যাবে না’।খুব আলস্য লাগছিলো।কিন্তু একটা ভালোবাসা ছড়িয়ে যাচ্ছিল মনের অন্দর মহলে।

দরজার ইন্টারলক টেনে বেরিয়ে এলাম আমরা। নিস্তব্ধ অন্ধকার রাস্তায় শুধু “ও আর আমি”  সায়ক ই প্রথম কথা বললো “কত দিন বাদে আবার একসাথে বেরোলাম”।আমি চুপ করে রইলাম,উচ্ছ্বাস  দেখাবো না।

আচমকা সায়ক আমার হাতটা ধরে বললো “অনিন্দিতা আজ আমাদের বিয়ের সিলভার জুবিলী তোমার মনে আছে”।কত দিন বাদে হ্যাগো ওগো ছেড়ে আবার আমি অনিন্দিতা হতে পারলাম।

আমি ওর মুখের দিকে চেয়ে বললাম ।”তোমার মনে আছে। ও বললো কেন মনে থাকবে না।আচমকা পেছন থেকে কেউ আমার চোখটা চেপে ধরে বললো হ্যাপি এননিভার্সারী মা”। চোখটা ছেড়ে আমায় জড়িয়ে ধরলো আমার মেয়ে আমার আত্মজা নবনীতা।”মা আজ আমিও ছুটি করেছি।বাবার সাথে লাস্ট পনেরো দিন ধরে আমরা আলোচনা করেছি আজকের দিনটা কি ভাবে সেলিব্রেট করা যাবে”।

‘আজকে দুপুরের লাঞ্চ এর ট্রিটটা আমি দিচ্ছি।বাবা তুমি যাওয়া আসার খরচ আর রাতের ডিনার তুমি প্রোভাইড করছো ঠিক তো”।

সায়ক বললো “একদম ঠিক বলেছিস মা।আর ওইটা…..”

নবনীতা বললো “আমি তোমার জন্যে একটা কাঞ্জিভরম সিল্ক কিনেছি। আর বাবা তোমার জন্যে একটা কানের দুল ডায়মন্ড দেয়া কিনেছে।খুশি তো মা তুমি।
কিন্তু তুমি আমাকে আর বাবাকে হট চকোলেট সস উইথ আইসক্রিম খাওয়াবে।
বাবা বলেছে এটা নাকি তোমার খুব ফেভারিট”।

আমি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললাম।আজকের দিনে আমার এত পাওনা ছিলো আমার কল্পনার বাইরে।সায়ক আমার কাঁধে হাতটা দিয়ে বললো “আজকের দিনে কান্না নয়”। আর আমার মনের পঁচিশ বছরের রাগ অভিমান সব ঝরে যাচ্ছে আমার মন থেকে আমি বোকার মতো শুধু বাইরে টা দেখেছি ভিতরের ভালবাসাটা দেখিনি।

সায়ক বললো “চা খাবে।সেই দোকানটায় পঁচিশ বছর আগে যেখানে আমরা চা খেতাম’।বুড়িয়া বললো “আমিও খাবো বাবা”।
আমি বললাম এই পয়সাটা “আমি দেব”।বাবা এবং মেয়ে সমস্বরে বলে উঠলো” ঠিক হ্যায় ম্যাডাম”।

(সমাপ্ত)


FavoriteLoading Add to library

Up next

হ্মুধাগ্নি – প্রীতম সাহা... সেবারের মনমাতানো শারদোৎসবে, নয় বছরের ছেলেটা বোঝেনি কিছু-- বোঝাইনি কেউ তাকে, হাঁ করে সে গিলেছে শুধু মণ্ডপাবৃত,বারাঙ্গনার জীবন চিত্রায়ন। তখন,সত্য আ...
মোহিনীর আতঙ্ক – শাশ্বতী সেনগুপ্ত...    জঙ্গলে পিকনিক? কথাটা শুনেই না করে দিয়েছিল রাজ। জঙ্গল এমনিতেই ভয়ঙ্কর। তার ওপর আবার এক রাত থাকা। মুখের কথা নাকি? কোনও দরকার নেই ভাই, পরিস্কার কথাটা ফ...
উল্টো ছন্দ - গার্গী লাহিড়ী   (৩) রাজপথ জনশূন্য হয়ে পড়ে ধীরে ধীরে কমে আসে যান চলাচল ঝমঝম বৃষ্টি নামে শহরে নিথর দেহ পড়ে থাকে রাস্তায় মাথায় হাত রাখার...
দত্তক - গার্গী লাহিড়ী মধ্যরাতে বারান্দার কোনটিতে একলা বসে লেখিকা অনুসূয়া আজ সে বড় ক্লান্ত পোষমানা স্মৃতির পাতাগুলো বিতর্কের ঝড়ে এলোমেলো অবাধ্য এত ক্ষো...
কুমড়ো পাতায় ইলিশ ভাজা – রুবি ঘোষ... বর্ষার আগমন বেশ কিছুদিন হলো ঘটেছে আর বর্ষার সবথেকে লোভনীয় জিনিসটি হলো ইলিশ | বর্ষায় ইলিশ এসে আকাশ বাতাস তার গন্ধে ভরিয়ে তুলেছে | যে বাড়ির পাশ দিয়েই যা...
ভালোবাসি অন্ধকারকে – রুমা কোলে... তোমার চাহিদা দিনের , আমার রাতটুকুই প্রিয় । তুমি ভালোবাসো আলো , আর আমি ! রাতের কালো । হ্যাঁ ,  কালো , অন্ধকার , কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার , যেখানে নিজ...
অবশেষে খুঁজে পেলাম তোমাকে... -অর্পিতা সরকার    আর যাই করিস ওই মেয়ের দিকে ভুলেও তাকাস না সৌম্য, একবার যদি তোর লাইফে ঢোকে তাহলে তোর কেরিয়ার ফিউজ হয়ে যাবে গুরু। শত হস্ত দূরে থাক ওই...
বঙ্গদেশ – বৈশাখী চক্কোত্তি... বঙ্গ দেশের ভান্ডার, বিভিন্ন রতনের সম্ভার খুলে দেখো পুস্তিকা, ইতিহাস সাক্ষী তার। শাসক হয় শাসিত, পরাধীনতার ফাঁদে জড়িত, যুগে যুগে আছে প্রতারক, তাদের ক...
স্বর্ণযুগের ছড়া – প্রথম পর্ব।... গুপ্তযুগকে সুবর্ণযুগ বলা হত ইতিহাসেতেমনি এক সোনার যুগছিল এই বাংলাদেশেসাদাকালো সেসব ছবিরঙীন তার পোস্টারলবিকার্ড আর বুকলেটেআছে সে বিপুল সম্ভারউত্তম সুচি...
লাইটহাউস – সৈকত মন্ডল... আরও একটা বছর, আরও কয়েকটা মাইলস্টোন, তাতে লেখা স্বপ্নপূরনের দ্বুরত্ব, আরও কিছুটা রাস্তা, অন্ধকার, তবে কেন জানিনা ঠিক নিসঙ্গ নয়, অচেনা, অজানা কেও...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment