রাতের ট্রেন ভয়ঙ্কর

– অভিজ্ঞান গাঙ্গুলি
    ঘটনাটা বেশ কয়েক বছর আগের। তখন ফার্স্ট ইয়ার এ পড়ি। ওই মে মাস এর সেমিস্টার ব্রেক এ আমরা ঠিক করি কাশ্মীর ঘুরতে যাব। আমরা বলতে আমি, মা আর বাবা। জম্মূ তাবি এক্সপ্রেস এর এ.সি  ৩ টায়ার কামরায় উঠে দেখলাম আমাদের এক দিকের তিন টি সীট আর আমাদের উল্টো দিকে এক ধুতি পাঞ্জাবি পড়া এক সাধু গোছের লোক বসে। কপালে রক্ত চন্দন এর টিকা, গালে লম্বা পাকা দাড়ি। বেশ ব্যক্তিত্ব ফোটানো চেহারা। ট্রেন ছাড়ার পর বাবা কথা বলে জানলাম যে ইনি বীরভূম এর কোন এক পুরানো বহু প্রসিদ্ধ কালী মন্দির এর পূজারী। তার পাশের সীট দুটি খালিই থাকলো।
বিকেলের দিকে দুর্গাপুর থেকে এক মুসলিম স্বামী – স্ত্রী উঠলো কোলে কয়েক মাস এর একটি ফুটফুটে বাচ্চা। ওরা উঠতেই পুরোহিত মশাই কেমন যেনো ওসখুশ করতে শুরু করলেন। একটু পর বাবাকে ডেকে কি যেনো বললঃ। বাবা এসে মুচকি হেসে বললো- বুড়ো মুসলমান এর পাশে বসবে না তাই সীট পাল্টাতে বলছে আমার সাথে। বয়স্ক মানুষ বলে কিছু আর বললাম না। না হলে দু কথা শুনিয়ে দিতাম।
এরপর কথায় কথায় জানলাম যে এই স্বামী স্ত্রী এর নাম এরশাদ ও আসিফা। আর তাদের শিশু কন্যার নাম তারা রেখেছে নূরী।, তারা যাবে পাঞ্জাব এর কোন এক মাজার এ। কেনো তারা সেখানে যাচ্ছে জানতে চাওয়ায় তারা এক আজব কাহিনী শোনাল।
তাদের শিশুর উপর নাকি এক জিন এর ছায়া আছে। তাদের পড়ার পীর নাকি বলেছে যে একমাত্র ওই পঞ্জাব এর এক পীর ই নাকী তাদের শিশুকে বাচাতে পারবে। এই শুনে সাইড সীটে বসার ভদ্রলোক হেসে উঠলেন। বলে উঠলেন – হোয়্যাট রাবিশ!.. তোমাদের তো দেখে শিক্ষিত মনে হচ্ছে। তাও এইসব বিশ্বাস করো?
এরশাদ কিছু বলার আগেই আমাদের পুরোহিত মশাই বলে উঠলেন – না করার কি আছে?? এই জগত এর সব কিছু কি বিজ্ঞান বুঝিয়ে দিতে পারে ? এই জগত এর বাইরেও আরো অনেক জগত আছে। তাতে বহু অশুভ শক্তি আছে যা মানুষ এর ক্ষতি সাধন করার চেষ্টা করে।
এই কোথায় পাশের ভদ্রলোকটি রেগে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। বাবা তার আগেই তাদের থামিয়ে দিয়ে বললো – আরে দাদা বাদ দিন। যার যার নিজের বিশ্বাস। তো আপনি কি করেন??
উনি বললেন – আমি ডাঃ আবীর দে। আর এই আমার স্ত্রী প্রভা।
এর পর সবাই যে যার গল্প করছিলো। কিন্তু আমি এই এরশাদের বলা জিন এর গল্প শুনতে উসখুশ করছিলাম। সুযোগ পেয়ে আবার কথা তুললাম আমি নিজেই। তাদের থেকে জানলাম যে গত দু মাস ধরে তাদের শিশুটির রোজ রাতে ধুম জ্বর আসে এবং তার সাথে শুরু হয় কান্না। অনেক ডাক্তার বদ্দী দেখিয়ে লাভ হয়নি। শেষে এক পীর বাবা বলে যে তাদের শিশুর উপর কোনো এক শক্তিশালী জিন এর নজর আছে। দিব্যি ফুটফুটে সুন্দর বাচ্চা, দেখলে বিশ্বাস করা যায় না যে এইসব হওয়া সম্ভব।
দিনের আলোয় ভাবতেও পারিনি যে কি ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে কয়েক ঘণ্টা ব্যবধানে। সন্ধ্যা নামতেই বুঝতে পারি কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে আবহাওয়াএ। সকাল থেকে যে অনেক মানুষ এর কথা বা চলা ফেরার আওয়াজটা পেয়ে আসছিলাম সেটা যেনো কোনো এক অজানা কারণে বন্ধ হয় গেছে। বুঝতে পারছিলাম যে শুধু আমি না.. মা বাবা এবং বাকি সবাই ই এটা অনুভব করতে পারছে। আমাদের সামনের দম্পতিটি রীতিমতো আতঙ্কিত দেখতে পেলাম। শুধু স্থির চোখে শিশুটির দিকে তাকিয়ে আছে আমার পাশে বসা পূজারী মশাই।
রাত বাড়তেই পরিস্থিতি আরও জটিল হল। নূরীর গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। ডাঃ দে তার সুটকেস থেকে বের করে কোনো ওষুধ দিলো। কিন্তু এক ঘন্টা কেটে গেলেও কোনো ফল হল না। তিনিও বলেই ফেললেন যে এটা নরমাল নয়। একটা ছয়মাস এর শিশুর এত হাই টেম্পারেচার হতেই পারে না।
একতো চারিপাশের নিস্তব্ধতা এবং অদ্ভূত পরিবেশ। তায় যোগ হয়েছে ঠান্ডা। আমি হলফ করে বলতে পারি যে ট্রেন বগির ঠান্ডা অত্যন্ত লাস্ট দুই ঘন্টায় দশ ডিগ্রি কমে গেছে। কথা বলতে গেলে মুখ দিয়ে রীতিমতো ধোয়া বেরোচ্ছে এত টাই ঠান্ডা। কম্বলে শীত মানছে না। লাইট গুলোও আশ্চর্য ভাবে খুব কমে গাছে। রাত বাতির মত টিমটিম করছে । এইসব কি হচ্ছে..। কোনো এক অপার্থিব শক্তি আমাদের ঘিরে ফেলছে।
বাবা বাইরে গিয়ে কেয়ারটেকার কে এ.সি বন্ধ করতে বলতে যাচ্ছিল। মা বললো একা যেও না। ছেলে কে সাথে নিয়ে যাও। বাবাও আপত্তি করলো না। পরিস্থিতিটা যে অস্বাভাবিক সেটা বাবাও টের পাচ্ছিল। কামরার আশেপাশে দেখে আমরাও চমকে গেলাম। সবাই গভীর ঘুমে বসে, কেউ শুয়ে। কিন্তু সবাই জেনো বসে থাকতে থাকতেই ঘুমিয়ে গেছে। কামরার বাইরেও এক হিমশীতল অবস্থা। কেয়ার টেকার কে বাবা অনেক ধাক্কা দিয়ে ডেকেও ওঠানো গেলো না। সারা কামরা জেনো মৃত্যুপুরি হয় গেছে।
আমরা ফিরে এসে কিছু বললাম না। দেখলাম আসিফা কান্না শুরু করেছে। রোজ রাতে এরম হয় বটে কিন্তু এতটা ভয়ানক পরিস্থিতি এই প্রথম। পীর তাদের বলেছিলো যে শয়তান জিন তাদের শিশুর অনেক কাছে চলে এসেছে। যে কোনো দিন সে মরণ কামড় বসবে। বোধহয় দেরী হয় গেলো.. আজ ই বোধহয় শেষ রাত।
এইবার আমাদের পুরোহিত মশাই (উনার নাম মনে নেই.. ভট্টাচার্য ছিল কিছু একটা ) উঠে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি বদলে গ্যাছে।
আমাদের বললঃ – তোমরা এখন কোথাও যাবে না আর। বস আমার আশপাশে। আমার ব্যাগে ঘটে মন্ত্রপুত মা শ্যামার চরণঅমৃত ও ফুল আছে। তার প্রভাবে এখনও তোমরা গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওনি। কিন্তু শয়তান রাত এর সাথে সাথে তার শক্তি বাড়বে। এর প্রতিকার করতে হবে। এই ভট্টাচার্য তার প্রতিকার করবে।
উনি চোখ বন্ধ করে কপাল এ হাত ঠেকালেন আর বিড়বিড় করে বললেন কিছু মন্ত্র বোধহয়। তারপর চোখ খুলে শিশুর মা এর দিকে তাকিয়ে বললেন – মা। ভয় পেয়না। তুমি ভয় পেলে যে চলবে না। মা এর অনেক ক্ষমতা থাকে। তার থেকে তার শিশুকে কেড়ে নেয় কোন অপদেবতা?? আমি থাকতে তা হবে না। ঈশ্বর এর অদ্ভূত খেলা যে আজ রাতে তোমরা আমার সফর সঙ্গী। তার যখন ইচ্ছা যে আমি এই শিশু কে রক্ষা করি.. তো আমি প্রাণ দিয়ে হলেও আজ সেটা করব। কিন্তু তুমি দুর্বল হয়না। নিজের কোলে নিয়ে রাখো শিশু কে।
নিজের ব্যাগ থেকে একটি ঘটি বের করে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো – পৈতে আছে গলায় বাবা?
আমি থতমত খেয়ে বললাম হ্যাঁ আছে।
‘এই ফুল টা নাও আর পৈতে দিয়ে ধরে এই ফুলটা ওই শিশু টার কপালে চেপে ধর। আর গায়ত্রী পাঠ করো মনে মনে। থামবে না ভুলেও। ‘
আমার মা কিছু বলতে যাচ্ছিল তার আগেই ভট্টাচার্য মশাই বলে উঠলেন – চিন্তা করোনা। তোমার ছেলের কোনো ক্ষতি হবে না আমি থাকতে। কিন্তু তার সাহায্য আমার প্রয়োজন। ঈশ্বর পরম করুণাময়… তিনি রক্ষা করবেন।
এরপর আমি তাই করতে থাকলাম অনেকক্ষণ ধরে। আর পুরোহিত মশাই একটা ফুল ওই ঘটের জলে চুবিয়ে ছিটাটে থাকলেন। সাথে ধীর গলায় মন্ত্র পাঠ।
কতক্ষণ চলছিল খেয়াল নেই হঠাৎ করে নূরী কেঁদে উঠলো। আর কি আশ্চর্য সাথে সাথে কামরার প্রতিটা শিশুও কেঁদে উঠলো। এক সাথে তাল মিলিয়ে। জেনো স্বপ্নে তারা সবাই কোনো ভয়ানক কিছু দেখেছে।
এবার আশপাশে তাকিয়ে দেখলাম যে বাবা মা সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। শুধু আমি, ভট্টাচার্য আর নূরীর মা জেগে। আমার ও চোখ ভারী হয় আসছে… ঘুম পাচ্ছে… গায়ত্রী ভুলে যাচ্ছি… ঘুম..
‘ খবরদার। ঘুমাবে না। ‘ ভট্টাচার্যের চিৎকারে আবার জ্ঞান এলো। ‘মন শক্ত করো.. শয়তান তোমায় ভয় দেখাবে.. গায়ত্রী স্মরণ করো। যাই দেখবে ভয় পাবে না। গায়ত্রী বন্ধ করো না’।
কিন্তু একি??? আমি এটা কিসের কপালে ফুল চেপে আছি?? এটা তো একটা ঘৃণ্য মাংসপিণ্ড… বীভৎস.. পচা দুর্গন্ধ পাচ্ছি এটা থেকে নাক এ। হাত সরে যাচ্ছিল.. কিন্তু জোর করে মন শক্ত করলাম। আরো জোরে গায়ত্রী পড়তে থাকলাম মনে মনে। চোখ সরিয়ে নিলাম এই মাংসপিন্ডোর দিক থেকে।
চোখ বন্ধ করে ছিলাম কতক্ষণ জানি না। শুধু কানে আসছিল ভট্টাচার্যের বিড়বিড় মন্ত্রোচ্চারণের। হঠাৎ নাকে একটা তীব্র ঝাঝাল পঁচা গন্ধ এসে লাগলো। গা গুলিয়ে উঠলো আর বুঝতে পারলাম আমার সামনে কিছু একটা ভয়ংকর এসে দাঁড়িয়েছে। কোনো এক অমোঘ টানে আমি চোখ খুল্লাম। যা দেখলাম তার জন্য কখনোই কেউ প্রস্তুত থাকতে পারে না। ঘন অন্ধকার এর ভেতর একটা অবয়ব… সেটাও অন্ধকার দিয়েই যেনো তৈরি.. তার কোনো আকৃতি নেই। কোনো ইহজগত এর জীব বা অন্য কিছুই এটা হতে পারে না। শুধুই অন্ধকার, শুধুমাত্র মুখের মত জায়গায় লাল আগুন এর মত সেটা জ্বলছে।
তীব্র আতঙ্ক আমাকে গ্রাস করেছিলো। জ্ঞান হারাচ্ছিলাম… তখনি আবার দৃঢ়প্রত্যয় গলা শুনলাম…
‘ভয় করোনা ওটা কে.. ওটা তোমায় ভয় দেখিয়ে আটকাতে চাইছে আমাকে। ইশ্বরের নাম নাও তোমার কোনো ক্ষতি করার ক্ষমতা ওটার নেই। দেখো না ওদিকে।’
আবার মন্ত্রোচ্চারণ কানে আসতে শুরু হল। আমিও চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
কতক্ষণ এভাবে কাটলো জানি না। হঠাৎ ঘুম নেমে এলো আমার চোখে। ঘুমের আগে শেষ কথা শুনেছিলাম সেই ভট্টাচার্যের – ‘আমরা জিতেছি.. আর ভয় নেই। বিপদ কেটে গিয়েছে। ‘
পরদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙে বাবার ডাকে। উঠে দেখলাম সবাই উঠছে একে একে। চোখ পড়লো কোন এর সীটে। দেখলাম মুখে চরম প্রশান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে আছে ভট্টাচার্য মশাই, আর তার কোলে খেলা করছে ছোট্ট নূরী। সবার ঘুম ভাঙল কিন্তু ভট্টাচার্যের ঘুম ভাঙল না। ডাঃ দে পরীক্ষা করে বললেন যে উনি আর আমাদের মধ্যে নেই। সকালের আলো রাত এর সব আধার মুছে দিয়েছে। ভট্টাচার্যের পা এর কাছে বসে কাঁদছে স্বামী স্ত্রী। শিশু তার মা এর কোলে সুরক্ষিত।
আশ্চর্য লাগছিল.. কাল যে মানুষ তাদের স্পর্শ করতে চাইছিল না, সেই কাল রাতে তাদের শিশু কে বাঁচিয়ে দিয়ে গেল নিজের প্রাণের বিনিময়ে। মনুষ্যত্বের জয় হয়েছে জাত-ধর্মের উপর। অশুভ পরাজিত হয়েছে আরও একবার শুভর কাছে।
———-


FavoriteLoading Add to library

Up next

চল দাওকি – দেবাশিস_ভট্টাচার্য... মন খারাপ করা এক বিকেলে রুশা দাঁড়িয়ে ছিল দাওকি ফরেস্ট বাংলোর সামনের লনে। অস্তগামী সূর্যের লাল আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে দূরের পাহাড়গুলোর অন্দ...
সাধ - তমালী চক্রবর্ত্তী     সকাল থেকেই আজ বেশ হিমশিম খাচ্ছে সুজাতা। মৌ এর সাধ। সময়মতো মৌ এর জন্য রান্না শেষ না করতে পারলে...কথার অন্ত থাকবে না।...
চোর – বিভূতি ভূষন বিশ্বাস...       সবে ডিউটি থেকে রানাঘাট সি.আর.ই রেল কোয়াটারে ফিরছি পাশেই রাজীব পল্লীতে অনেক লোকজনের ভীড় । দুটি পুলিস ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে, দেখেই বুঝে গেলাম ব্যাপারট...
তোমাকে দিলাম – সৌম্য ভৌমিক... তোমাকে দিলাম ভোরের লালচে আকাশ শরৎ মাখা নদীর ধারের কাশ , তোমাকে দিলাম ড্রইং খাতার রং মেঘ চিরে যাওয়া শঙ্খচিলের ঢং | তোমাকে দিলাম আমার ভাবনাগুলো ছ...
বিচার – শুভদীপ্ত চক্রবর্তী... মন্দিরের চাতালে ছোট্ট একর‌ত্তি দেহটি পড়ে আছে, শরীরে একটুকরো সুতোও নেই... রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত — নিস্পাপ খোলা দুটি চোখ ঈশ্বরকেই যেন খুঁজছে ! মিটিং...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment