কথোপকথন

 

সদ্য বিয়ে হওয়া বউমা আর শাশুড়ি কথোপকথন –

সকালবেলা-
-” এই যে মেয়ে, বাপের বাড়ি থেকে তো কিছুই শিখে আসোনি, বলি কটা বাজে খেয়াল আছে?এতো বেলা করে উঠলে বলি সংসারটা চলবে কেমন করে”

-” সরি মা, একটু লেট হয়ে গেল। আসলে কাল রাতে ” গেমস অফ থ্রোনের” নিউ সিরিজটা শেষ করতে গিয়ে ২ টো বেজে গেল..তাই একটু.. “

-” ওমা গো, মেয়ের মুখে মুখে কথা শোনো, রাত্রি জেগে কিসব ছাইপাঁশ দেখেছে, তার বৃতান্ত শোনাচ্ছে আবার, লজ্জা করে না তোমার”

-” লজ্জা কেন করবে মা? আর গেমস অফ থ্রোন ছাইপাঁশ নয়। দারুন জিনিস। আপনাকে একদিন দেখাবো। ফ্যান হয়ে যাবেন পুরো”

” রক্ষে করো বাবা, ওসব আমি দেখব না আর এবার থেকে তুমিও ওসব দেখা বন্ধ করো। শোনো স্নানটা করে, পূজোর ঘরে তাড়াতাড়ি চলে এসো”

-” স্নান? এই ঠান্ডায় এতো সকালে স্নান করব কি করে? “

-” ওসব আমি বুঝিনা। এ বাড়ির এটাই নিয়ম। সকালবেলা বাড়ির বউরা স্নান করে কাচা কাপড়ে পূজা দিয়ে বাড়ির বাকি কাজকর্ম করবে। তোমার মতো মর্ডান মেয়েরা এসব বুঝবে কি করে? বাবুরো বলিহারি নিজের পছন্দ মতো বিয়ে করে আনলো..তুমি এবাড়ির যোগ্য কোনো দিনো ছিলে না.. ;বুঝলে”

-” এ বাড়ির যোগ্য হবার জন্য যদি আমাকে সকালবেলা স্নান করতে হয়, তাহলে আমি তাই করব মা। “

-” হুঁ…আদ্যিখেতা”

সকালবেলা পূজো মিটে যাবার পর-

-” বলি এই যে মেয়ে বলি এবার তো রান্নার ব্যবস্থা করতে হবে। রান্নাবান্না তো কিছুই জানোনা। শুধু শিখেছ ধিঙিপনা করতে। জিন্স, টপ এইসব পরে ছেলেদের গায়ে ঢলে পরা, ছ্যা ছ্যা..এইযুগের মেয়েরা সব অসভ্যের দল”

-” জিন্স, টপ কোনো নোংরা পোশাক নয় মা। আচ্ছা শাড়ি পরলেও তো পেটে তিন ইঞ্চি ফাঁক থাকে। সেটা যখন শালীনতার প্রতীক হতে পারে তখন সর্বাঙ্গ ঢাকা জিন্স পরলে সেটা অসভ্যতামি হয়ে গেল। আর ছেলেদের সাথে গল্প করলেই সেটা ঢলানি হয়ে যায়? কেনো মা একটা ছেলে আর মেয়ে বন্ধু হতে পারে না… “

-” না…মানে…সে যাইহোক এসো রান্না ঘরে। মাছের ঝোলটা আজ শিখিয়ে দেবো”

মুছকি হেসে শাশুড়িকে পরাস্ত করে জয়ী বউমা একজন বাধ্য ছাত্রীর মতো তার টিচারকে অনুসরন করতে লাগল।

তারপর দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর্ব মিটে যাবার পর পরন্তবেলায় সূর্য যখন ঢুলূঢুলু সেই সময় বারান্দায় বসে শাশুড়ি আর বউমা।

-” কিগো মেয়ে, বলি বিকেলে চা টা কিছু পাবো নাকি, ওদিকে বাবু আর তোমার শ্বশুরমশাই অফিস থেকে খেটেখুটে ফিরে আসবে। তাদেরও তো চা দিতে হবে নাকি। তোমার শ্বশুরমশাই য়ের তো আবার তোমার হাতের চা ছাড়া মুখে রুচেনা। দুদিনের আসা মেয়েই এখন আপন হলো। যতসব ঢং”

-” চা করাটা তো আপনিই শিখিয়ে দিয়েছেন মা। নাহলে আমি কি পারতাম নাকি। আচ্ছা মা আপনি কেন বাবার মতো আমাকে মামনি বলে ডাকেন না। আপনার মুখ থেকে এই শব্দটা ভারী মিষ্টি লাগবে।জানেন?”

-” উউউউ, ন্যাকামো। তুমি কি আমার মেয়ে নাকি, যে মামনি বলতে হবে?”

-” কেন মা আমি কি আপনার মেয়ে হবারো যোগ্য নয়? এতোই খারাপ আমি?”

-” মেয়ে হলেই হয়না বুঝলে, সেটা পালন করতে জানতে হয়। কি কি করতে পারবে আমার জন্য তুমি?”

-” অনেককিছু পারব মা। যেমন ধরুন আপনাকে মাছের ঝোল করে খাওয়াব, আবার যেদিন ঝগড়া করবেন সেদিন একটু নুন বেশি দিয়ে দেব। ওষুধ খেতে ভুলে গেলে খুব বকা দেবো। সিরিয়াল দেখার সময় চোখে পাওয়ারের চশমাটা পরিয়ে দেবো, নাহলে কাছ থেকে টিভি দেখে চোখের পাওয়ার আবার বাড়াবেন। তারপর সবজিওয়ালার সাথে দাম কমানোর জন্য একসাথে জুটি বেঁধে ঝগড়া করব। আপনার বাতের ব্যথাটা বাড়লে তেল মালিশ করে দেবো। আপনার ছেলে আর শ্বশুরমশাই তো সবসময় নিজেদের কাজে ব্যস্ত,আমাদের জন্য সময়ই নেই তাদের। তাতে কি, আমরা মা মেয়ে মিলে সিনেমা দেখব, চুটিয়ে ঘুরব। আর আপনার সব শাড়ি কিন্ত আমিই পছন্দ করে দেবো। আর আপনার রাগ ভাঙাতে জাপটে ধরে আমার গালটা আপনার গালে ঘসে দেবো, ঠিক এইভাবে”- বলেই বউমা শাশুড়ি কে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল

” এবার তো আমাকে ক্ষমা করে দাও মা, আমি কথা দিচ্ছি তোমার মনের মতো গড়ে তুলব নিজেকে”

শাশুড়ি মুখটা গম্ভীর করে -” না, তোমাকে আমার মনে মতো কোনদিনো হতে দেব না আমি…কারন তুমি যেমন আছো আমার তেমনটাই চাই তোমাকে সারাজীবন.. পাগলি মা আমার..”

পৃথিবী আগেও যেমন ছিল এখনো ঠিক তেমন থাকবে কিন্তু এই পরন্ত বিকেলে এক শ্বাশুড়ি বউমার সম্পর্কের মধ্যে নতুনভাবে সূর্যের আলো এসে চারিপাশটা আলোয় ঝলমল করে দিলো।


    বিদিশা মন্ডল

    Author: বিদিশা মন্ডল

    Comments

    Please Login to comment