কনফেশন – তমালী চক্রবর্ত্তী

 থানায় ঝড়ের বেগে ঢুকল এক অল্প বয়সী ছেলে। অফিসার কে বলল স্যার আমি কিছু বলতে চাই। অফিসার তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে জলের গ্লাস টা এগিয়ে দিল। একবারে জল শেষ করে সে অফিসার কে বলতে থাকল পুরোটা, একদম প্রথম থেকে।
——–
রোজ পার্টি আর পার্টি। বাড়িতে ঢুকতেই ইচ্ছে করে না ঋভুর। অভ্র-ঋতার একমাত্র সন্তান সে। মাসে বরাদ্দ মোটা টাকার হাত খরচ। টাকা চায় না ঋভু। চায় একটু সময়। যেটা অভ্র-ঋতা কারোর কাছে নেই।
স্কুল ফেরত বাড়িতে ঢুকতেই ঋতা ঋভু কে বলল – আজ তোমার বাপির প্রোমোশন উপলক্ষে রাতে পার্টি থ্রো করা হয়েছে। বাড়িতে অনেক অতিথি আমন্ত্রিত। তুমি জানো যে তোমাকে কী করতে হবে। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে তৈরী হয়ে নাও। হ্যাঁ, ঋভু জানে যে কী করতে হবে। হামেশাই যে করে অভ্যস্ত। বড়দের পার্টি আলাদা বাড়ির গার্ডেন এরিয়ায় হয়, আর ছোটদের বাড়ির হলঘরে। ছোট বলতে ১৮ র নীচে যাদের বয়স। বেশিরভাগই আমন্ত্রিত আঙ্কেল-আন্টিদের ছেলেমেয়ে। একটাই নিয়ম, ছোটদের গার্ডেনে প্রবেশ নিষিদ্ধ। ঋভুকে নজর রাখতে হয় যাতে কেউ নিয়ম লঙ্ঘন না করে। খুব অবাক লাগে ঋভুর। বেশিরভাগ বন্ধুরা কী সুন্দর বিয়েবাড়ি বা অনুষ্ঠাণ বাড়ি মা-বাপির সাথে যায়, কত মজা করে। অথচ তার বেলায় আলাদা নিয়ম। পার্টি শেষে সবাই যখন বাড়ি ফেরে তখন আবার কেউ কেউ তো নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মতো অবস্হায় থাকে না। বাড়ির কাজের লোকেরা ধরাধরি করে তাদের গাড়িতে তুলে দেয়। প্রথম-প্রথম অবাক লাগলেও এখন এসব দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে ঋভু।
আমন্ত্রিতরা উপস্হিত হলে যথাসময়ে পার্টি শুরু হল। হলঘরও বেশ গমগম করছে। কিছুসময় পর ঋভু একটা জুসের গ্লাস তুলে হলঘর সংলগ্ন ব্যালকনির দিকে এগিয়ে গেল। ঋভু অন্তরমুখী। পার্টি ব্যাপারটা কোনোদিনই খুব একটা এনজয় করে না সে। একাকিত্বতেই তার সাচ্ছন্দ। হঠাৎ ঋভু কাঁধে একটা হাত অনুভব করল। ঘুরে দেখল আর্য। আর্য,অভ্রের বসের ছেলে। বয়সে ঋভুর বছর ২ বড়।
– একা কেন ব্রাদার? সব ঠিকঠাক তো?
– একদম। মিউজিক লাউড লাগছে তাই…
– মিউজিক লাউড না অন্য কিছু?
– না ব্রো। সামনে এক্সাম তাই একটু চাপে।
আর্য জুসের গ্লাসটা টেনে নিয়ে তাতে এক চুমুক দিয়ে বলল
– ফ্রুট জুস? গুড বয়। একটু চলবে নাকি?
আর্য পকেট থেকে একটা ছোট বোতল বার করে দেখাল।
– আমি মদ খাই না আর্য দা। ভাল লাগে না আমার।
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল আর্য।
– আরে কদিন পর তো বড়দের পার্টিতে জয়েন করবি। এখন থেকেই একটু প্র্যাকটিস করে নে ভাই না হলে পার্টিতে প্রথম খেয়ে কেশে মরবি। তুই কী জানিস না বড়দের পার্টিতে কী হয়?
– জানি কিন্তু যখন হবে দেখা যাবে।
– বোঝো। দাড়ি বেরিয়ে গেলো তবু ছেলে বড় হল না। আমি তোর বয়সে কী না করিনি। স্মোকিং, ড্রিঙ্কিং সব। শোন ভাই, এখন বুঝবি না। কিন্তু পরে বুঝবি। সবার জীবনে কিছু না কিছু কষ্ট আছে। এসব ভুলে থাকার উপায় হচ্ছে এইগুলো। একবার ট্রাই করে দেখ, দেখবি স্বর্গে আছিস বস। দুঃখ-কষ্ট কিছুই ফিল হবে না। আর এই নে তোর আজকের বড় হওয়া উপলক্ষে গিফ্ট।
আর্য পকেট থেকে একটা ছোট সাদা প্লাস্টিকের প্যাকেট বের করে ঋভুর হাতে দিল।
– কী এটা আর্য দা?
– হেরোইন। একবার নিয়ে দেখ। তারপর বলিস আমাকে।
– না না। এটা তোমার কাছেই রাখো।
– ধুর বোকা। রাখ এটা। ইচ্ছে হলে ইউস করিস না হলে করিস না। গিফ্ট দিলাম ব্রো, ফেরত দিস না।

——–
কিছুদিন পর …
রাতে মা-বাপির বেডরুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় টুকরো কিছু কথা ঋভুর কানে ভেসে এল। ঋতা অভ্রকে সন্দেহ করে, ঋভু জানে।অভ্রর পি. এ. রেশমি কে নিয়ে ঋতার মনে কালো মেঘ।
কিন্তু আজ মা এর কথা বাপি কেন সব মেনে নিল? তাহলে কী মা-বাপির ডিভোর্স হয়ে যাবে? আর ভাবতে পারল না ঋভু। যন্ত্রণাটা যেন গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠে এল। হঠাৎ আর্যদার বলা কথাগুলো মনে পড়ে গেল। ড্রয়ার হাতড়ে সাদা প্যাকেটটা খুঁজে বার খরল ঋভু। প্রসেসটা আর্য দা সেদিনই বুঝিয়ে দিয়েছিল। অনিচ্ছা সত্বেও শুনেছিল ঋভু কারণ আর্যদা বাপির বসের ছেলে। ধীরে-ধীরে ঋভুর চেতনা বিলীন হয়ে এল।
পরদিন অনেক দেরিতে ঘুম ভাঙল ঋভুর। দুপুর হয়ে গেছে। মাথা ভার হয়ে আছে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল ঋভু। কাল যা করেছে কোনোদিন আর তা করবে না। অনিচ্ছা সত্বেও মধ্যাহ্নভোজন সাঙ্গ করল। ঘরে এসে প্যাকেট টা ডাস্টবিনে ফেলে দিল। মা তো জানেও না যে আজ ঋভু স্কুলে যায়নি। নাহ!..মা কে আজ সব খুলে বলবে ঋভু। পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেল মায়ের বেডরুমের সামনে। দরজার সামনে আসতেই অদ্ভুত কিছু শব্দ কানে এল ঋভুর। দরজাটা নিঃশব্দে অল্প একটু খুলতেই দেখতে পেল ঋতা এবং গাড়ির ড্রাইভার মুস্তাক চুড়ান্ত সম্ভোগে ব্যস্ত। এতটাই ব্যস্ত যে দরজা দিতে ভুলে গেছে, ঋভুকে তারা খেয়ালই করেনি। আবার কান্নাটা গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠে এল। ঋভু দরজাটা আস্তে করে ভেজিয়ে নিজের ঘরে ফিরে এল। ডাস্টবিন থেকে সাদা প্যাকেটটা তুলে নিল।

——–
১ বছর পর…

গঙ্গার পাড়ে বসে ঋভু আর আর্য।
– তুমি এবার টা আমাকে মাফ কর আর্য দা। আমি জাস্ট পারব না এটা করতে। আজ অনেক কষ্টে বাড়ি থেকে বেড়িয়েছি টিউশন আছে বলে। আমাকে জাস্ট এক টিপ ধার দাও ব্রো। না হলে আমি বাঁচবো না। আমি তোমাকে সব টাকা দিয়ে দেবো।
– ধারে ধারে তো তুমি ডুবে আছো চাঁদু। সেটা শোধ করার জন্যই তো উপায় বললাম। টাকা দিতে পারবি না তো কাজ কর। খুনটা করতেই হবে তোকে। এই লাইনে ঢোকা যায়, বেরোনো যায় না। আর একটু এদিক ওদিক দেখলেই তোমার কেল্লা ফতে।
– আর্য দা আমি এই গত একবছরে কী করিনি? বাবাকে বলে পকেটমানি বাড়িয়েছি, সেটায় না মিটলে বাবার থেকে এক্সট্রা টাকা চেয়েছি, পাইনি, নিজের বাড়িতে চুরি করেছি দিনের পর দিন। শেষ পর্য্যন্ত ধরা পড়ে গিয়ে পকেটমানিটাও বন্ধ হয়ে গেল। সবসময় আমাকে চোখে চোখে রাখা হয় বাড়ির মধ্যে। নিজের সোনার আংটি,ঘড়ি সব বিক্রি করে দিয়েছি। বিভিন্ন এ. টি.এম বাইরে দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে ছিনতাই করেছি তোমাদের কথায়। শেষবার বিদেশে ফ্যামিলি টুরে যাওয়ার সময় রিস্ক নিয়ে হেরোইনও পাচার করেছি। কিন্তু খুন? আমাকে মাফ করো আর্য দা। ছেড়ে দাও দয়া করে।
জলে চোখ ঝাপসা হয়ে এল ঋভুর।
– করেছিস। কিন্তু নিজের খোরাক মেটাতে করেছিস ঋভু। আর বিদেশের ব্যাপারটা পুরোটা সেটিং করা ছিল। বেকার মাথা খাসনা আমার। ধার শোধ করলে মাল পাবি আবার। রাতে কাজটা শেষ করিস। সকালে মাল তোর কাছে পৌঁছে যাবে। আর কাজে ফেল করলে বাঁচবি না। মাথায় রাখিস।
গাড়িতে উঠে ঋভু ভাবতে লাগল। একবছর আগেও কতটা সুন্দর ছিল তার জীবন। না না…অনেক ভুল, অনেক অন্যায় করেছে। আর না। খুন সে কিছুতেই করতে পারবে না। ঋভুর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ড্রাইভারকে গাড়িটা থানায় নিয়ে যেতে বলল।
———–
ঋভুর সাহায্যে ড্রাগ ডিলার চক্র ধরা পড়ল। ড্রাগ ডিলিং ছাড়াও অন্য অপকর্মেও এরা জড়িত ছিল। জুভেনাইল কোর্টের রায়ে হোমে স্হান হল ঋভুর। হোমে নেওয়ার সময় ঋতা ও অভ্র এগিয়ে এল ঋভুর কাছে। ঋতা জিজ্ঞাসা করল-
কেন করলি বেটা? কেন? কীসের অভাব ছিল তোর?
ঋভু হেসে বলল – তোমাদের ভালবাসা আর সময়ের অভাব ছিল মা। নিজের শান্তির জন্য করেছি এসব যাতে বাপি, রেশমী আন্টির সাথে আর তুমি মুস্তাক চাচার সাথে ভাল থাকতে পারো।

 

(সমাপ্ত)


FavoriteLoading Add to library

Up next

নিয়মিত জীবন-যাপন - সমর্পণ মজুমদার   জীবনে অনেক কিছুই করতে ইচ্ছে হয় আমাদের। যা দেখেই আমরা অনুপ্রাণিত হই, সেটাই করতে ইচ্ছে করে। সেটা যে কোনো নির্দিষ্ট একটা বিষ...
Poem…ফাগুনের ডাক   ফাগুনের ডাক চারিদিকে শুধু জ্বলছে আগুন জ্বলুক না, আজ আগুনকে বইছে ফাগুন বউক না।।   বনভূমিতে আজ আবির রঙ লাগুক না, পলাশ শিমুলে যেন খুশির ঢঙ জাগুক না।।...
হ্মুধাগ্নি – প্রীতম সাহা... সেবারের মনমাতানো শারদোৎসবে, নয় বছরের ছেলেটা বোঝেনি কিছু-- বোঝাইনি কেউ তাকে, হাঁ করে সে গিলেছে শুধু মণ্ডপাবৃত,বারাঙ্গনার জীবন চিত্রায়ন। তখন,সত্য আ...
সক্রিয়তা, বিবেকানন্দের আলোকে... - সমর্পণ মজুমদার    "শক্তিই জীবন দূর্বলতাই মৃত্যু" -স্বামী বিবেকানন্দের এই বাণীতে জগৎ খুঁজে পাওয়া যায়। শক্তিই মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান উপাদান। স্...
কাল-পুরুষ ও পৃথিবী – রথীকান্ত সামন্ত... পূর্ণপৃথক দৃষ্টিকোণ, আর দেহ ছাড়ার তাড়ায় চোখের আয়নায় মুখ দেখতে ভুলে গেছি আমি যেটুকু আঁধার জোনাকি-আলোয় হারায় কাঁটা জেনেও সে পথেরই হই অনুগামী। বিরহ আ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment