কৃষ্ণবিবরের ইতিকথা

আমাদের অনেকেরই দিন শুরু হয় ঘুম থেকে ওঠার পর সূর্য প্রণাম করে। আর আমাদের এই বসুন্ধরায় সকল প্রাণের লালন পালনের মূলেই কিন্তু রয়েছে সেই সূর্যের অফুরন্ত শক্তি, যা কিনা তার পৃষ্ঠে অবিরাম ঘটে চলা পরমাণুর নিউক্লিয় সংযোজন ও বিভাজনের পরিণাম। আমাদের গ্রহে জীবজগতের আবির্ভাবের জন্যে আমরা যেমন পৃথিবীকে ‘মায়ে’র চোখে দেখি ঠিক তেমনই সূর্যকে ‘পিতা’র চোখে দেখলেও কিছু ভুল হবে না।আমরা জানি মহাবিশ্বে কেবলমাত্র ভর এবং শক্তি হল অবিনশ্বর বাকি সবকিছুই নশ্বর। অর্থাৎ জন্ম যেমন আছে মৃত্যুও তেমন নিশ্চিত, সৃষ্টি যেমন হবে ধ্বংসও তেমনই অবশ‍্যম্ভাবী। জীবন শেষ হলে জীবের যেমন মৃত্যু হয় তেমনই নক্ষত্রেরও হয় !
হ‍্যাঁ, হয়। শুনতে অবাক লাগলেও কথাটা সত‍্যি। তবে এ মৃত‍্যু ঠিক তেমন নয় যেমনটা আমরা সাধারণত ভেবে থাকি। কোনো পাপ-পুণ‍্যের হিসেব নেই, দাফন-দাহের ঝক্কি নেই, আছে শুধু রূপান্তর। পদার্থের এক অবস্থা থেকে অপর অবস্থায় রূপান্তর। এই রূপান্তরের কিছুটা আমাদের জ্ঞাত পদার্থবিদ‍্যার আওতায় পড়ে আর কিছুটা তার বাইরে। আশা করা যায় আসন্ন শতাব্দী শেষ হবার আগেই ওটুকুও বিজ্ঞানীরা আয়ত্তে নিয়ে আসবেন। তা সে যাইহোক, আজ আমরা জ্ঞানের আলোয় কিছুটা খুঁজে দেখার চেষ্টা করবো সেইসব অন্ধকারে ভরা গলিপথ যা দিয়ে নক্ষত্রেরা মৃত্যু বরণ করে।

একটু ইতিহাসে ফিরে যাই, সালটা ১৭৫৬। ফরাসিদের সাথে ইংরেজদের সপ্তবর্ষব‍্যপী যুদ্ধ শেষ হলেও তার আঁচ পড়েছে তাদের দখলে থাকা উপনিবেশগুলিতে। সেই যুদ্ধের আবহের সঞ্চার বাংলায় হওয়াতে তৎকালীন নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ওপর বেজায় চটে গেলেন। ফলস্বরূপ প্রথমে তাদের সাবধান করলেন যাতে তারা এখানে সেনাসমাগম না ঘটায় পরে সেই শর্ত লঙ্ঘন করায় তাদের কলকাতার দূর্গ (বর্তমানের ফোর্ট উইলিয়াম) আক্রমণ করে বসেন তিনি। সেই সময় এখানে নবাবকে আটকানোর লড়াইতে ইংরেজদের নেতৃত্বে দিচ্ছিলেন John Zephaniah Holwell।প্রতাপশালী যোদ্ধা ছিলো বটে কিন্তু নবাবের সামনে টিকতে পারলো না। পরিণাম-যুদ্ধবন্দী.. শোনা যায় ওনাকে এবং ওনার সহসৈনিকদের নিয়ে আনুমানিক ১৪৬ জনকে একটি ১৮ ফুট (প্রায় ৫.৫মি) বাই ১৪ ফুট (প্রায় ৪মি) এর জানালাবিহীন ছোট ঘরে বন্দী করে দেওয়া হয়। পরদিন সকালে ঘর খুললে মাত্র ২৩ জনকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়। বলা হয় অক্সিজেনের অভাবে দম বন্ধ হয়ে বা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে তাদের মৃত্যু হয়। উক্ত হিংস্র ঘটনাটি ইতিহাসের পাতায়  “অন্ধকূপ হত‍্যাকান্ড” বা “Black Hole Tragedy” নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে ১৯৫৯ সালে লেখক বৃজেন গুপ্ত বলেন Holwell এর দেওয়া সংখ‍্যাগুলি কাল্পনিক, অবাস্তব। আসলে সেখানে ৬৪ জনকে বন্দী করা হয়েছিলো, পরদিন সকালে ২১ জনকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়। আধুনিক যুগের ঐতিহাসিকরা এখন মনে করেন Holwell ভ্রান্ত ছিলেন, কারণ ওই হিসেবে অত ছোটো ঘরে অতবেশি সংখ‍্যক মানুষকে বইয়ের মতো পেতে রাখলেও জায়গার অভাব হবার কথা। তাই বলাই যায় পাশ্চাত‍্যের তথাকথিত সভ‍্যদের কাছে সুনাম অর্জনের জন‍্যে প্রাচ‍্যের এক নারকীয় রূপ তিনি তুলে ধরার জন‍্যেই এমন কাজ করেছিলেন।

এবার একটু এগিয়ে আসি সময়ের ধারা বেয়ে। সালটা ১৯১৬। বিশ্ববিখ‍্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিদ Albert Einstein তার সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব বা Theory of General Relativity প্রকাশ করেন। এই তত্ত্বের অনুসিদ্ধান্ত থেকেই প্রথম নক্ষত্রের মৃত্যুর আভাস পাওয়া যেতে থাকে। প্রথমে তো তিনি নিজেই নিজের আবিষ্কারে বিস্মিত হয়ে পড়েন এবং একপ্রকার ভেবেই বসেন যে তার গননায় কোথার ত্রুটি আছে।কিন্তু পরে Einstein সহ অনেকেই নির্ভুলতা অনুধাবন করলেন। মহাকর্ষ সম্পর্কে নিউটনের দেওয়া তত্ত্বকে আপাদমস্তক ঘষে মেজে নতুন রূপ দেওয়া হয় আইনস্টাইনের এই “সাধারন আপেক্ষিকতাবাদ” তত্ত্বে। আগে কখনো নক্ষত্রের এমন কোনো অবস্থার কথা কল্পনাও করা হয়নি তাই এর নামকরণের সমস‍্যা দেখা দেয়। নক্ষত্রের এই অবস্থাকে কেউ বলতে লাগলেন Dark Star আবার কেউ বললেন Frozen Star।

এখন হয়তো কোনো কোনো পাঠকের মনে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে যে কোথায় কবে এক রাজা ইংরেজ দের সাথে লড়েছিলো আবার তার প্রায় দেড়শো বছর পর এক পদার্থবিদ এক যুগান্তকারী তত্ত্ব দেন। এই দুয়ের সম্পর্ক কি ! কারো হয়তো মনে হচ্ছে আমি হয় কথকতা করতে গিয়ে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছি অথবা আমার মাথাটা বিগড়েছে। কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছুই হয়নি, বরং উত্তর পেতে হলে কালের ধারায় আরও একটু এগিয়ে আসতে হবে। সালটা হবে ১৯৬৭, আমেরিকার জনৈক তাত্ত্বিক পদার্থবিদ John Archibald Wheeler, Einstein এর  আপেক্ষিকতাবাদ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মরণশীল নক্ষত্রের এই বিশেষ অবস্থাকে  Black Hole নামে সর্বপ্রথম অভিহিত করেন। ওনার জগতজোড়া খ‍্যাতির অন‍্যতম একটি কারণ হল সহজ ও আধুনিক ভাষায় বিজ্ঞান কে সহজপাচ‍্য করে তোলার ক্ষমতা। এরূপ নামকরণের সম্ভাব্য কারণ হয়তো উনি অন্ধকূপ হত‍্যার সময় অত ছোটো ঘরের মধ‍্যে অল্প জায়গায় অত বেশি লোকের ঠাসাঠাসি করে থাকা এবং তথাকথিত Black Hole বা কৃষ্ণবিবরের মধ‍্য পদার্থের ঘনত্ব অসীম এর কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার মধ‍্যে সামঞ্জস‍্য খুঁজে পেয়েছিলেন। যে মহাজাগতিক বস্তুর নামকরণের ইতিহাস এমন মহাকাব‍্যিক আধুনিক মহাকাশ-বিজ্ঞানের জগতে এহেন বস্তুর গুরুত্ব যে অপরিসীম হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

নক্ষত্রের জন্ম হয় আন্তর্নাক্ষত্রিক মহাকাশে থাকা গ‍্যাস ও ধূলোর প্রকান্ড মেঘ থেকে, যাকে বলে নীহারিকা। এই মেঘে সর্বোচ্চ পরিমাণে থাকে ব্রহ্মান্ডের সরলতম মৌল হাইড্রোজেন পরমাণু ও সামান্য অন‍্যান‍্য উপাদান।এদের বিস্তার কয়েকশো আলোকবর্ষ পর্যন্ত হতে পারে যার মধ‍্যে কয়েক হাজার নক্ষত্রের সৃষ্টির জন্যে পর্যাপ্ত হাইড্রোজেন থাকে।
নিউটনের মহাকর্ষীয় সূত্র মেনে ভরযুক্ত ভাসমান হাইড্রোজেন পরমাণুগুলি পারস্পরিক মহাকর্ষজ আকর্ষণ বলের প্রভাবে জমাট বেঁধে ক্রমান্বয়ে বড় আকার ধারণ করতে থাকে। আকর্ষণের ফলে শুরু হয় পারস্পরিক আবর্তন, তার থেকে হতে থাকে পারস্পরিক ঘর্ষণ। যা পারিপার্শ্বিক উষ্ণতা ভীষণ বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ তাপে হাইড্রোজোন পরমাণু নিউক্লিও সংযোজনের মাধ্যমে তৈরি করে হিলিয়াম। প্রাথমিকভাবে হাইড্রোজোন গ‍্যাস বেশি থাকলেও উচ্চতাপে কিছু হিলিয়াম নিউক্লিও বিভাজন প্রক্রিয়ায় ভেঙে হয়ে যায় হাইড্রোজেন। এই দুই পরস্পরের বিপরীতে ঘটে চলা বিক্রিয়ার মধ্যে সাম‍্য স্থাপিত হলেই তারার গঠন এবং জীবনের পথচলা শুরু হয়। মহাকর্ষীয় আকর্ষণ বল সমগ্র তারার ভরকে তীব্র বলে কেন্দ্রে টেনে নিতে চায় আর পৃষ্ঠে ঘটে চলা নিউক্লিয় সংযোজন সমগ্র তারার ভরকে বিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাশূণ‍্যে ছড়িয়ে দিতে চায়। এই দুটি বলের সাম‍্য যতদিন চলে, নক্ষত্র ততদিন জীবিত আমাদের কাছে।এই সাম‍্য বিঘ্নিত হলেই বিপদ! বহুকোটি বছর এভাবে চলার পর নক্ষত্রের কেন্দ্রে সব হাইড্রোজেন যখন পুড়ে শেষ হয়ে হিলিয়ামে পরিণত হয়, কালের অমোঘ নিয়মে তাও পুড়ে শেষ হয়। অবশিষ্টাংশ থেকে তৈরি হয় সামান‍্য ভারী মৌল কার্বন ও অক্সিজেন। এই সময়ে নক্ষত্রের শক্তি উৎপাদনের হার আগের থেকে অনেক বেশি হয়। বিপুল শক্তির বাহ‍্যিক প্রবাহের দরুন পৃষ্ঠে থাকা হাইড্রোজেন সমৃদ্ধ অদাহ‍্য স্তরটি প্রসারিত হয়ে অতিকায় আকৃতি নেয়‌। পৃষ্ঠের উষ্ণতাও কমে প্রায় ৩৬০০℃ কাছাকাছি হয়। এই প্রক্রিয়ায় মাঝারি নক্ষত্র জন্ম দেয় লোহিত দানব বা Red Giant এর এবং প্রকান্ড নক্ষত্র জন্ম দেয় লোহিত মহাদানব বা Red Super Giant এর। নক্ষত্রের জীবনের অন্তিম পরিণতি নির্ভর করে তার জন্মকালীন ভরের ওপর। যদি কোনো তারার ভর ৮ সৌরভরের (সূর্যের ভরের আটগুণ) কম তাদের সমাপ্তি ঘটে Planetary Nebula বা গ্রহোপম নীহারিকা গঠনের মাধ্যমে।আর যাদের ভর তার থেকে বেশি তাদের সমাপ্তি ঘটে প্রচন্ড দৃষ্টিনন্দন রঙিন বিস্ফোরণের মাধ‍্যমে। একে বলা হয় সুপারনোভা। এর ফলে নক্ষত্রের বাইরের অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে অসীমে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে। গ্রহোপম নীহারিকার শেষে কেন্দ্রে পড়ে থাকা অবশিষ্টকে বলা হয় শ্বেত বামন বা White Dwarf এবং সুপারনোভার অবশিষ্টাংশকে বলা হয় Black Hole বা কৃষ্ণবিবর।

কৃষ্ণবিবর বা কৃষ্ণগহ্বরের জন্মকুন্ডলী নাহয় পাওয়া গেলো কিন্তু যাকে চোখে দেখা যায় না, যার অস্তিত্ব প্রমাণ করা কঠিন তাকে বিজ্ঞান মান‍্যতা দেবে কিকরে ! তাহলে উপায় !
উপায় একটাই, পর্যবেক্ষণ। জ‍্যোতির্বিজ্ঞানীদের সর্বক্ষণ রাতের আকাশে দূরবীন নিয়ে তাকে খোঁজা আর অপেক্ষা করা। কিন্তু না, এক্ষেত্রে তাতেও লাভ হবে না কারণ সাধারন দূরবীনে একে দেখা যাবে না। কৃষ্ণবিবর এর থেকে কোনো আলো নির্গত হয় না, এটি কোনোপ্রকার আলোর উৎস নয়, উপরন্তু অপর উৎসের আলো এর ওপর পড়লে তাও অনায়াসে গিলে খায় এই রাক্ষুসে মহাজাগতিক দানব কারণ এর ভেতরে মহাকর্ষজ আকর্ষণ বল এতটাই প্রবল যে তা আলোক তরঙ্গকেও পালাতে দেয় না। তাই একে শনাক্ত করা ভীষন কঠিন কাজ।

এখন এতকিছুর পরে প্রশ্ন হল আমি আজ আপনাদের মহাবিশ্বের এই রহস‍্যময় দানবের কথা শোনাতে শুরু করলাম কেনো ! কেনো খামোখা আমি খটমট বিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে একটু নধর, আরামপ্রিয় বাঙালির ভাতঘুমে বিঘ্ন ঘটাতে যাবো ! এহেন নিকৃষ্ট অপরাধের জন‍্যে কি সমাজ আমায় ক্ষমা করবে !! আসলে ভোটের আগমনী বার্তা, এবং তার সঙ্গে প্রাসঙ্গিকভাবে বেজে ওঠা ঢাকের আওয়াজে আমরা ভুলেই গিয়েছি যে গত ১০ই এপ্রিল একটি এমন ঘটনা ঘটে গেছে যা মানবসভ‍্যতার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বিজ্ঞানীরা প্রথমবার এমন মহাজাগতিক দৃশ‍্য দেখলেন যা আগে কল্পনাও করা যেত না।

একটি কৃষ্ণবিবরের ছবি তোলা হয়েছে। না না, ভয় পাবেন না। কোনো কল্পবিজ্ঞানের গল্প বলে আপনাদের আশার ছলনে ভোলানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে বা উদ্দেশ‍্য আমার নেই। সত‍্যিই, M87 আকাশগঙ্গার কেন্দ্রে অবস্থিত একটি কৃষ্ণবিবরের ছবি তোলা হয়েছিলো, সেটিই প্রকাশিত হল জনসমক্ষে এইদিন। এই আকাশগঙ্গা আমাদের পৃথিবী থেকে প্রায় ৫৫০০০০০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। ওই কৃষ্ণবিবরের ভর প্রায় ৬৫০০০০০০০০ সৌর-ভরের সমান। এর ব‍্যাস ১০০০০০০০০০ কিমি, এই আয়তন এতটাই বেশি যে আমাদের গোটা সৌরজগতটাই এর মধ‍্যে এঁটে যাবে, বুঝুন তবে এর বিস্তৃতি। এতদূরে অবস্থিত এবং অনুজ্জ্বল হবার জন‍্যে একে শনাক্ত করার জন‍্যে যে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজন তার ব‍্যাস পৃথিবীর মতো হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তেমন যন্ত্র আদৌ বানানো সম্ভব নয়। তাহলে উপায় ! অগত‍্যা মানবাজাতিকে আরো একবার জীবজগতে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা বজায় রাখার উদ্দেশ‍্যে অসাধ‍্য সাধন করতে হল। গোটা পৃথিবীর মোট আটটি রেডিও টেলিস্কোপ কে একত্রে সুসংবদ্ধভাবে আকাশের একটি নির্দিষ্ট দিকে তাক করে অবিরাম পর্যবেক্ষণের পরিণাম আজকের তোলা এই প্রায় অদৃশ‍্য  বস্তুর ছবি। এই আটটি টেলিস্কোপের সমবায়ের নাম রাখা হল Event Horizon Telescope (EHT). পৃথিবীর ২০০জন বিজ্ঞানী এই কর্মযজ্ঞে নিযুক্ত ছিলেন। গোটা পৃথিবীর সাতটি মহাদেশে কোনো এক মুহূর্তে সময়ের পার্থক‍্য থাকে, আর সেই কারণেই আমরা আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা মেনে সময়ের হিসেব করি। তাহলে ভিন্নভিন্ন মহাদেশে অবস্থিত এসব দূরবীনকে সুসংহত করার উপায় ! পারমাণবিক ঘড়ির সাহায‍্যে সেটি সম্ভব হল। প্রসঙ্গত উল্লেখ‍্য এই ঘড়ি এতটাই নির্ভুল যে কয়েক লক্ষ‍ বছরে হয়তো সময়ের এক সেকেন্ড হের ফের হতে পারে। টেলিস্কোপের এরূপ নামকরণের পেছনেও একটা কারণ আছে। কৃষ্ণবিবরকে দূরবীনে দেখতে না পাওয়ার কারণ আমরা আগেই জেনেছি। শূণ‍্যমাধ‍্যমে আলোর গতিবেগ এই মহাবিশ্বে সবথেকে বেশি, যার মান ৩০০০০০০০০ মি/সে। তত্ত্বগত আলোচনায় দেখা গেছে যে কৃষ্ণবিবরের বাইরে তীব্র মহাকর্ষজ আকর্ষণ বলযুক্ত একটি এমন নির্দিষ্ট অঞ্চল থাকে যার থেকে আলো নিস্তার না পেয়ে বৃত্তাকার পথে ওই কৃষ্ণবিবরের চারপাশে আবর্তন করতে থাকে। আবর্তনকালে আলোক রশ্মি স্পর্শক বরাবর ছিটকে সরলরেখা বরাবর বেরিয়ে যেতে পারে না, কারণ Einstein এর তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্বে আলোর গতিবেগের চেয়ে বেশি বেগে কোনো কণা যাত্রা করতে পারে না। মহাবিশ্বে আমরা প্রায় সবক্ষেত্রেই  দেখি আলো সরলরেখায় গমন করে কিন্তু এক্ষেত্রে তীব্র মহাকর্ষজ আকর্ষণ বল তার গতিপথকে বক্র করে দিতে সক্ষম হয়। এই উজ্জ্বল, আলোকিত অঞ্চলের নাম হল Event Horizon. টেলিস্কোপে ছবি তোলা হলে তা যে তরঙ্গের ওপর ভিত্তি করে তোলা হবে তা কৃষ্ণবিবরের ওই অংশ থেকেই আগত বলে এরূপ নামকরণ হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দুর্গম প্রান্তে অবস্থিত এই টেলিস্কোপগুলি, কোনোটি দক্ষিণ মেরু বা কুমেরুর কাছে কেউ আবার আগ্নেয়গিরির মাথায়, হয়তো কোনোটি আবার মরুভূমির মাঝে। এমন অবস্থানের কারণ হল বাতাসে জলীয় বাষ্পের স্বল্পতা। যদি বাষ্পের পরিমাণ দূরবীনের উপরিস্থিত বায়ুমন্ডলে বেশি হ’ত তবে নির্ভুল ছবি তৈরি সম্ভব হ’ত না।  টেলিস্কোপ নেটওয়ার্কের সাহায‍্যে তোলা ছবির তথ‍্য প্রথমে কিছু হার্ড ডিস্কে সেভ করা হয় এবং পরে তা একত্রিত করে একটি সুপার কম্পিউটারে দেওয়া হয়। তাতে তথ‍্যবিশ্লেষণ করে আজকের এই প্রাপ্তি।

এই প্রসঙ্গে বলতেই হয় এক্ষেত্রে একত্রিত তথ‍্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিলো পংরায় ৫ পেটাবাইটের মতো যা কিনা ৫০০০০০০ জিবি এর সমান। এই বিপুল তথ‍্য বিশ্লেষণের জন‍্যে সময়ও লেগেছে প্রচুর। ২০১৭ এর এপ্রিলে প্রথম এর ছবি তোলা হয় বিজ্ঞানীরা বলেন যে আনুমানিক একবছরে তাদের সমগ্র তথ‍্য বিশ্লেষণ করা হয়ে যাবে গতবছর সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয় ঘটনাক্রম পূর্বপরিকল্পনা মাফিক না চলায় তাদের সময় আরও বেশি লাগবে। তাই এবছর এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়। অবশেষে অপেক্ষার অবসান হ’ল।

সবশেষে একটা কথা বলি, তবে তার গুরুত্ব কিন্তু প্রথম সারির। ওই ভেবে নিন “বাঙালী আত্মবিস্মৃত জাতি” তাই..
সমগ্র বিশ্বব‍্যাপী এই কর্মকান্ডটি সার্থক হতে পারতো না একজন বাঙালি বিজ্ঞানীর অবদান ছাড়া। তার নাম জগদীশ চন্দ্র বসু। তিনিই প্রথম বেতার তরঙ্গ আবিষ্কার করেছিলেন ১৮৯৫ সালে পরাধীন ভারতবর্ষের একটি অনুন্নত শহরে বসে, যার নাম কলকাতা। EHT তে কোনো দৃশ‍্যমান আলোকরশ্মি ধরে ছবি তৈরি করা হয়নি, বরং সেই বেতার তরঙ্গের সাপেক্ষেই খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে মহাবিশ্বের এই বহস‍্যময় সদস‍্যকে। আজ থেকে প্রায় ১২০ বছর আগে একজন অদম‍্য সাহসী এবং উচ্চাকাঙ্খী বাঙালি বিজ্ঞানী এমন গর্বের কাজ করে গিয়েছিলেন উপযুক্ত পরিকাঠামো এবং সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই আর স্বাধীনতার এতবছর পরেও আমরা গোটা দেশে এমনকিছু উন্নত মানমন্দির স্থাপন করে উঠতে পারলাম না। যদি তেমনটা হ’ত তাহলে হয়তো  EHT তে আমাদের দেশেরও কোনো টেলিস্কোপের নাম থাকতো। ভাবতেও অবাক লাগে, একটি মহাজাগতিক বস্তু, যার থেকে আলো পর্যন্ত নিস্তার পায় না। মানবসভ‍্যতার কাছে তার জন্মলগ্নে নামকরণ থেকে শুরু করে আজ প্রায় এক শতাব্দীর আড়াল থেকে তাকে বের করে আনার বা শনাক্তকরনের প্রযুক্তির সাথে বাংলার কি নিবিড় যোগ, এ এক বিস্ময়। আশ্চর্যজনক সমাপতন। অথচ সেই বাংলাই আজ বিজ্ঞানের এই বিশ্বব‍্যাপী কর্মযজ্ঞ থেকে বঞ্চিত কারণ সেই একটাই “আত্মবিস্মৃতি”। হয়তো এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষ জীবনে আক্ষেপ করেই বলেছিলেন যে পরবর্তী জন্মে তিনি আর বাঙালি হয়ে জন্মাতে চান না। কতটা কষ্ট, কতটা গ্লানি মনে সঞ্চিত হলে একজন মহাপুরুষ এমন কথা বলতে পারেন ! এ আমাদের লজ্জা।


FavoriteLoading Add to library

    Up next

    প্রমাণ – সৌম্যদীপ সৎপতি... "আরে আরে, রাজেন না কি? কদ্দিন পর দেখা, এত রাত্রে বনের পথে যাচ্ছ একা একা? একসঙ্গেই যাওয়া যাবে, বাড়ি ফিরছ না কি? চলো তবে, আমিও এখন কাছাকাছিই থাকি। ...
    রিইউনিয়ন - প্রদীপ্ত দে  কিছু কিছু ঘটনা সব মানুষের জীবনেই মনে হয় ঘটে যাতে তাঁর স্বাভাবিক ছন্দে চলা জীবনটার তাল কেটে যায় । আমি তখন কর্মসূত্রে মুর্শিদাবাদে থাকি...
    বিরল বিবাহ -বিভূতি ভূষন বিশ্বাস... হিন্দু সমাজে আট রকম বিবাহের কথা বলা আছে তার মধ্যে চার রকমই দেখা যায় তবে বিখ্যাত হলো দুই রকম ১) দেখা শুনা করে বিয়ে । ২) প্রেম করে বিয়ে । আচ্ছা সব বুঝল...
    উত্তোরণ – সৈকত মন্ডল... যদি ভাবো এক লহমায় সরিয়ে নেবে নিজেকে, তবে থামো, এ সূর্য শেষ সকালের নয়... যদি মনে করো কফিনের নিস্তব্ধতায় মিলিয়ে যাবে, তবে বলে যাও, চেষ্টারও উর্দ্ধে ক...
    অমাবস্যার রাত – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়...      আমার দাদু বরুণদেব মুখোপাধ্যয়ের জীবনে এমন ঘটনা লক্ষ্য করেছিলেন মৃত্যু পাঁচ বছর আগে থেকেই। অমাবস্যার রাতেই এই ঘটনা একমাত্র ঘটতো। দাদুকে বহু ডাক্তার...
    দরজাটা খুলুন না – শাশ্বতী সেনগুপ্ত... অনেক কষ্টে শহরে বাড়িটা ম্যানেজ করতে পেরেছিল মানস। ভাড়া বাড়ি তাও ভাড়া পেতে প্রচুর ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বোকোদা বলে একজন পরিচিতর মাধ্যমে ভাড়া...
    আডোম শুমারী – সৌম্য ভৌমিক... কত বডি আসে দিনের অবকাশে জ্বালা করে ওঠে চোখটা , আদম শুমারী ঘরেতে কুমারী বিড়ি ধরিয়েছে লোকটা | একদিন রাতে প্রেমিকের হাতে খুন হলো যে যুবতী , লোকট...
    নরক থেকে স্বর্গ – বিভূতি ভূষন বিশ্বাস... চায়ের দোকানে গল্পগুজব করতে করতে হঠাৎ অমল বাবু কথা প্রসঙ্গে বলেই ফেললেন "আরে বিশ্বাস বাবু আপনি তো এ যুগের কর্ন ।"কথাটা শুনেই আমার মনে কেমন বিদ্যুৎ ...
    আম বাগানে কে? – শ্রাবণী সরকার... আমার মামারবাড়ি ওদলাবাড়ি। ডুয়ার্সের এক ছোট্ট চা বাগান ঘেরা মফস্বল টাউন। এখনও ভারী শান্ত। আমার মায়ের ছোটবেলায় সেটি ছিল আরো জনবিরল চুপচাপ একটি গ্রাম। মায়...
    মাছওয়ালী – পলাশ মজুমদার... ' ওই মাছটা কত করে দিচ্ছিস? ' - কোনটা, দেশী না বিলাসপুর? ' দেশী ' - দেশী একশো আশি, বিলাসপুর কুড়ি, পোনা দেড়শো। ' আর কাতলাটা? ' - ওটা তুই নিতে পারবি...
    SANTANU MAJUMDER

    Author: SANTANU MAJUMDER

    2
    Comments

    Please Login to comment
    2 Comment authors
    Sayantan PalSANTANU MAJUMDER Recent comment authors
    newest oldest most voted
    Sayantan Pal
    Member
    Sayantan Pal

    Sir your article has a reasonable content and most importantly it’s for all general public of all stream.