খতরনাক খেল – সৌম্যদীপ সৎপতি

খেলার কথা শুনবি যদি, বলছি যা দে মন তাতে,
দেখেছিলুম খেল একখান হ্যালোইনের সন্ধ্যাতে।
সেদিন রাতে ভূতুম পাড়ার “মামদো ইলেভেন্স” দলে
“স্কন্ধকাটা ক্লাব”কে চ্যালেঞ্জ করেছিল ফুটবলে।
পুরানো নিমগাছের পাশেই হারান দাসের পোড়ো ক্ষেত,
নেমেছিল খেলতে সেথায় দুইটি দলের বাইশ প্রেত।

গিয়ে দেখি ভূত-ভূতুমে আসর সেথায় জমজমাট,
সম্মানীয় প্রেতের ভীড়ে অমাবস্যার চাঁদের হাট।
প্রেতে-প্রেতে প্রেতারণ্য, তিল ধারণের নাই কো স্থান,
ভীড়ের মাঝে কানাঘুষোয় শুনতে পেলুম ব্যাপারখান।

ব্যাপারটা যা স্থির হয়েছে, মাঠের পাশেই শ্যাওড়াগাছ,
তাতে চড়ে ধারাভাষ্য করবেন শ্রী ট্যাব পিশাচ।
ঘুরে ঘুরে ম্যাচটা পুরো বিলেতফেরত স্টাইলো ঘোস্ট
হ্যান্ডিক্যামে রেকর্ড করে ‘ভূতবুকেতে’ করবে পোস্ট।
(শুনছি নাকি পরে সেটা ইউটিউবেও সেন্ড হবে,
সবার আশা জরুর সেটা এক নম্বর “ট্রেন্ড” র’বে।)

একধারেতে বেহ্মদৈত্যি পাকান বসে পুষ্ট মোচ,
টেনশনটা তাঁরই বেশী, মামদো টিমের তিনিই কোচ।
চিয়ার লিডার পেতনীরা সব রামদা দিয়ে এক কোপে
নিজের মুণ্ডু কেটে আবার নিজের হাতেই তায় লোফে।
এই সবেতে সাঁঝ পেরিয়ে হল মধ্যরাত যখন,
ম্যাচ-রেফারির হুইশলেতে খেলা হল স্টার্ট তখন।

সে কী খেলা! ভাবতে গিয়েই বাড়ছে দিলের ধড়কানি,
খেলা তো নয়, মাঠটা জুড়ে বাইশ প্রেতের তড়পানি।
করছে সবাই সবায় তাড়া, চলছে যেন বুল ফাইট,
এরই মাঝে মামদো দলে করলে দু’টো সেমসাইড।
হাফটাইমে স্কন্ধকাটা এগিয়ে গেল আট গোলে,
দর্শকদের পয়সা উসুল দেখে এমন ফুটবলে।

হাফ টাইমে বেহ্মবুড়ো খেলার মাঠের এককোণে
মামদো দলকে ডেকে কীসব বুঝিয়ে দিলেন নির্জনে।
বুড়ো কোচের কথায় সকল মামদো বয়েজ নাড়ল ঘাড়,
হাফ টাইমের ব্রেকের শেষে শুরু হল খেল আবার।
আটটি গোলে এগিয়ে থেকে স্কন্ধরা সব আটখানা,
বুঝবে তারা কেমনে বেহ্মবুড়োর সে আঁটঘাট খানা?

খেলা শুরু হবার পরেই ময়দানময় ধুন্ধুমার,
ব্যাপার দেখে দর্শকদের মুখগুলো হয় অন্ধকার—-
মামদো দলের দুই খেলোয়াড়, হোঁতকা এবং বোঁচাতে
ফাটিয়ে দে’ছে বলটা কখন পায়ের নখের খোঁচাতে।

একখান বল যা-ও বা পাওয়া গেছল অনেক চেষ্টাতে,
তার অভাবে খেলাই বুঝি পণ্ড হবে শেষটাতে—
এই ভাবনাই ভাবছে যখন দর্শকেরা পরস্পর,
বেহ্মবুড়োর এক কথাতেই কম্প দিয়ে ছাড়ল জ্বর।
বুড়ো বলেন, “একটাই পথ, ভূত সমাজের রাখতে মান
কোনও ভূতে বল হিসেবে নিজের মুণ্ডু করুক দান।”

বুড়োর মতটা যদিও হল সবাইকারই মন-মতো,
কারোর মাথাই হয় না তবু লাথি খেতে সম্মত।
বুড়ো তখন যেন অনেক ভেবে বলেন, “তা হলে
আমিই দেব মুণ্ডু আমার, কারোর অমত না হলে।”

আট গোলেতে এগিয়ে ছিল স্কন্ধকাটা দল তখন
অহঙ্কারে সর্প দেখেও করল তারা রজ্জুভ্রম।
বললে, “মোদের আপত্তি নাই”—-অমনি বুড়ো এক টানে
নিজের মুণ্ডু উপড়ে ফেলে দিলেন ছুঁড়ে ময়দানে।

আলোর চেয়েও বেগে ছোটে বেহ্মবুড়োর মাথা,
ফন্দিটা তাঁর সরল হলেও একদমই নয় যা-তা।
মুণ্ডুটা তাঁর মাঠে পড়েই সবার নাগাল এড়িয়ে
জড়িয়ে গেল হঠাৎ জালে গোলকিপারকে পেরিয়ে।
স্কন্ধকাটা ক্লাবের সবাই হতভম্ব দাঁড়িয়ে
মামদো দলে সেলিব্রেশন করে দু-হাত বাড়িয়ে।

সবাই চেঁচায়, “চিটিং, চিটিং; চলছে যাত্রাপালা কি?
লাফাচ্ছে বল নিজের মতে, এ কী রকম চালাকি?”
রেফারি কন, “সে কী কথা! কে ক’য় ওরা চিটিং করে?
নামিয়েছি এ বল মাঠে সবার সঙ্গে মিটিং করে।
তখন বাপু ছিল না তো কারোর এতে আপত্তি,
এখন তবে গোলটা খেয়ে বাধাস কেন বিপত্তি?”

মাঠটা জুড়ে দর্শকেরা উঠল হঠাৎ সব ক্ষেপে,
ধরল দু’জন স্কন্ধকাটা রেফারিকে খুব চেপে।
মামদো-স্কন্ধ সমর্থকের উঠল জমে তর্ক তো,
“দেখে নেব”, “মামদোবাজি?”, “আয় দেখি তোর জোর কত!”
কোনায় বসে তখন আমি ভগবানকে ডেকেই যাই,
“লড়াই যদি বাঁধেই, ঠাকুর, সবটা যেন দেখতে পাই।”

এমন সময় হঠাৎ করে উঠল ডেকে ভোরের কাক,
লড়াই-টড়াই কোথার বা কী, এক নিমেষেই চিচিংফাঁক!
মাঠের মাঝে আছে কেবল খুলি গোটা দুই পড়ে,
কী আর করা? ফিরে এলেম কুড়িয়ে নিয়ে তা-ই ঘরে!
খুলি দুটো আজও আছে পড়ে আমার বস্তাতে,
কিনতে চাইলে বলতে পারো, বিক্রি করব সস্তাতে!

_____

 


FavoriteLoading Add to library

Up next

১৬-১-১৯-১৯-২৩-১৫-১৮-৪ - মনীষা বসু     ।। ১।। এয়ার পকেটে পড়ে প্লেনে জোর ঝাঁকুনি লাগতেই ল্যাপটপ থেকে চোখ ওঠালেন সূর্য। মানুষ যেমন ঘুম থেকে উঠে চারিদিকে তাকিয়ে বুঝতে চায়, সে...
অভাবে নাকি ভালোবাসা পালায় – রুমা কোলে... কথায় আছে - " অভাব যখন দরজায় কড়া নাড়ে প্রেম নামক ভালোবাসাটা নাকি জানালা দিয়ে পালায় " না বক্তব্যটির বা বচনটির সত্যতা যাচাই বা বিরুদ্ধাচারণ কোনোটাই আমা...
পাখি পাঁচালী – সৌম্য ভৌমিক... পাতি কাকটা তক্কে আছে কখন বেরোবে চড়াই, দোয়েল রানী শিস দিয়ে যায় না করে বড়াই। টেলিগ্রাফের তারে বসে ফিঙেটা লেজ নাড়ে, শুনতে পেলাম ঝগড়া করে তিনটে ছ...
করিডোর - বর্ষা বেরা   ব্ল্যাক করিডোর,কানে হেডফোন,কফিতে চুমুক        হাতে ব্যোমকেশ। মুখে সাদা ধোঁয়া,গুনছে প্রহর,এক ঝড়েতেই    সবশেষ ।। হঠাৎ বসন্ত,...
সম্পর্কের চিলেকোঠায় – বিদিশা মন্ডল... পরন্ত বিকেলে সূর্য যখন তার লালচে সংসার নিয়ে পশ্চিমদিকে ঢুলুঢুলু চোখে পাড়ি দিয়েছে তখন তানিয়া এককাপ ধোঁয়া ওঠা কপির কাপ হাতে ওর ফ্ল্যাটের বারান্দায় এসে দ...
FAULTS IN OUR STARS – মধুর্পণা বৃষ্টি ঘোষ... এক মরা জীবকে ভালবেসেছ এক পক্ষকাল; হৃদযন্ত্রকে হৃদয় করেছে স্নেহের ওম। পাথরগুঁড়ো জড়ো করে নরম কাদায় আলতো দু'টো আঙুলে নতুন আকার; মাঝ ব্রিজের মা...
মাস্টারপিস – শ্বেতা মল্লিক... অ্যালার্ম টা বাজতেই বাস্তবের মাটিতে ফিরে এলাম। একবার কলম ধরলে আর ছাড়া যায় না,এমন কথাটাই প্রযোজ্য লেখক দের জন্য। আরও যদি পছন্দসই লেখার মাধ্যমে পাঠকদ...
মজুমদারবাবু - প্রিয়া সরকার    সে অনেককাল আগের কথা,তা বিশ পঁচিশ বছর আগের তো বটেই।আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি,হাফ ইয়ার্লি আর অ্যানুয়্যাল সাকুল্যে দুটি পরীক্ষা...
মনপাখি – রাজেশ সামন্ত... 'মনপাখি' চল নারে আজ অনেকদূর যাই , সবুজ ঘেরা ভালোবাসার নিশান যেথায় পাই | মেঘকে আজ ভেলা করে আকাশে দেবো পাড়ি , শঙ্খচিলেরা উড়বে যেথায় দলবেঁধে সারি সারি...
অলৌকিক – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়... নিঃঝুম গ্রাম, গরমের ঘন দুপুর। বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে তবু তাপ কমার নাম নেই। কমবেই বা কি করে? সারা দিনের প্রখর রোদের তাপ খেয়ে প্রকৃতি আগুন হয়ে আছে। এ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment