সাধ

– তমালী চক্রবর্ত্তী

 

  সকাল থেকেই আজ বেশ হিমশিম খাচ্ছে সুজাতা। মৌ এর সাধ। সময়মতো মৌ এর জন্য রান্না শেষ না করতে পারলে…কথার অন্ত থাকবে না। কম করে ১০০ জন নিমন্ত্রিত। তাদের জন্য ক্যাটারার আছে, কিন্তু বংশের নিয়মাণুযায়ী শাশুড়ীকে বৌমার জন্য রান্না করতে হবে। রিক নিজে পছন্দ করে মৌকে বিয়ে করেছে। সুজাতা বা আবিরের মৌকে কোনদিনই পছন্দ ছিল না। মৌ সত্যিই কী পছন্দ হওয়ার মতো?..নাহ!..রূপের জন্য নয়। মৌ সুন্দরী-তণ্বী,সরকারী অফিসার। পুঁথিগত বিদ্যাও প্রচুর। বিয়ের বাজারে যথেষ্ট মূল্য তার। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। যে মেয়ে বিয়ের দিন শ্বশুরবাড়ীর তত্ত্ব দেখে বলে যে সেগুলো ভাগাড় থেকে এসেছে তার মতো মেয়েকে পছন্দ হওয়াটা বেশ কষ্টকর। অথচ বরাবরই সুজাতা তার রুচিশীলতার জন্য বাহবা পেয়েছে। যদিও বিয়ের অনেক আগেই সুজাতা মৌ এর স্বভাবের পরিচয় পেয়েছিল। আবিরও ছেলেকে অনেক বুঝিয়েছিল। কিন্তু রিকের জেদের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিল তারা।

থাক..আজ আর এইসব কথা সুজাতা মনে করবে না। এই প্রথম সে ঠাকুমা হতে চলেছে। ছেলে হোক বা মেয়ে, আগন্তুকের কথা ভেবেই সে খুব খুশি। তার আজকের পরিশ্রম তো শুধু তারই জন্য। গত আট বছর ধরে সুজাতা এই দিনটার অপেক্ষা করেছে। নাতি-নাতনির মুখ দেখবে অবশেষে। হ্যাঁ.. ৮ টা বছর। রিয়ার বিয়ের পর থেকেই। রিয়া রিকের দিদি। বিয়ের চারবছর পর রিয়া জানতে পারে যে সে কোনোদিন মা হতে পারবেনা। সমস্যাটা অভীকের। রিয়া কথাটা শ্বশুরবাড়ীর কাউকে জানায়নি। অভীক কেও না। জানে অভীক কষ্ট পাবে। সব দোষ তাই নিজের ঘাড়ে নিয়েছে। ব্যাপারটা জানে শুধু সুজাতা।

তার খুব খারাপ লাগে রিয়ার জন্য। চুপচাপ সবার সব গঞ্জনা মুখ বুজে দিনের পর দিন সহ্য করে যাচ্ছে শুধু অভীককে ভালবেসে। কিন্তু অভীক উদাসীন। সুজাতা ওদের সম্পর্কে কখনও মাথা গলায়নি। বছরের পর বছর একটা প্রশ্নেরই জবাব দিয়ে যেতে হচ্ছে রিয়াকে। শুধু কী পরিবার? আত্মীয়স্বজন,প্রতিবেশী, অফিসকলিগ সবাইকে। শুধু রিয়া কেন? সুজাতা বা আবিরকেও তো কতবার এই একই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। মাঝে মাঝে সুজাতার মনে হয় মেয়েরা কী শুধুই জন্মেছে সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য?..তাদের শিক্ষাদীক্ষা, সামাজিক কর্তব্য, মূল্যবোধ, রুচিশীলতা এগুলোর কী কোনো দাম নেই? নাহলে সকলে সব জানা সত্বেও একই প্রশ্ন কেন বারবার করে? রিয়া তো সবদিক থেকে মৌ এর থেকে অনেক ভালো, কিন্তু আজ সন্তান জন্ম দেওয়ার সুবাদে মৌ এর মূল্য আজ আকাশছোঁয়া।

যথাসময়ে সাধের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হল। অতিথিতে গমগম করছে বাড়ির হলঘর। আত্মীয়স্বজন সকলে উপস্হিত। নব আগন্তুকের জন্য সকলে রিক আর মৌকে উপহারসহ শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। আবির-সুজাতা আপ্যায়ণে ব্যস্ত।এমন সময়ে সুজাতা শুনতে পেল ঘরের এক কোনে বসে থাকা মৌ এর মা এবং অভীকের মা এর কথোপকথন।  খুব তাড়াতাড়ি দিদা হবো। আমরা তো খুবই খুশি। কবে তার মুখ দেখব এটাই সবসময় ভেবে চলেছি। তা আপনাদের কী খবর দিদি? খবর আর কই? সবাই কী আর আপনাদের মতো ভাগ্যবতী?

– তা বৌমাকে ডাক্তার দেখাচ্ছেন না কেন?

– ডাক্তার তো অনেক আগেই দেখিয়েছিল। তাতেই তো বোঝা গেল যে মেয়েটা আটকুঁড়ে। যত্তসব। আমাদের কপালেই জুটল বাঁজা মেয়েমানুষ। আগে জানলে বিয়েই দিতাম না। আমার একটামাত্র ছেলে। বংশ উদ্ধার তো করতেই হবে। অভীক কে কতবার বলেছি আজকাল কত কি ট্রিটমেন্ট বেরিয়েছে। সেগুলো করে যেভাবেই হোক একটা নাতি চাই। আর নাহলে রিয়াকে বিদায় করে আবার একটা বিয়ে কর। ঐ অ্যাডপ্টেড কার না কার বাচ্ছা আমার বাড়িতে ঢুকবে না। তা কিছুদিন আগে দেখলাম যে বাবুর মত হয়েছে। রিয়া এখনও জানে না। ঠিক সময় বুঝে অভীক রিয়াকে বলবে বলেছে। আগে ডিভোর্সের কাগজপত্র তৈরী হোক।

সুজাতা আর সহ্য করতে পারল না। সোজা হলের মাঝখানে চলে গিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল – সুধী অতিধিবৃন্দ, আপনারা সকলে এই আনন্দানুষ্ঠানে উপস্হিত হয়েছেন বলে আমরা খুবই খুশি হয়েছি। প্রথমবার নাতি-নাতনির মুখ দেখব, ভেবেই এত আনন্দ হচ্ছে যে শব্দে প্রকাশ করার মতো ভাষা নেই আমার। কথায় বলে যে মানুষের ইচ্ছার কোনো শেষ নেই। আমারও আজ খানিক তাই হয়েছে। ঠাকুমা হচ্ছি, কিন্তু মনে দিদা হওয়ার সাধ ও জেগেছে। অবাক হচ্ছেন না? যে রিয়া কী করে….হ্যাঁ। রিয়ার ক্ষমতা আছে মা হওয়ার। সমস্যাটা অভীকের। অভীকের কথা ভেবেই এতদিন রিয়া নিজের কাঁধে সব দোষ নিয়েছে। এখন যখন অভীক বংশরক্ষার জন্য অন্য বিয়ে করতে প্রস্তুত তখন আমার মনে হয় যে রিয়ার ও তাকে সে সুযোগ দেওয়া উচিত। আর রিয়া তোমাকে বলি যার কাছে তোমার দেওয়া ৮টা বছরের কোনো দাম নেই, তার জন্য পুরো জীবন নষ্ট করা বৃথা। আপনারা সকলে দয়া করে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করুন যাতে আমরা রিয়ার একটা ভাল বিয়ে দিতে পারি আর আমার দিদা হওয়ার সাধ যেন তাড়াতাড়িই পূর্ণতা পায়।

কথাশেষে করতালি দিয়ে উঠল আবির, সঙ্গে উপস্হিত অতিথিরাও। আবিরের আজ গর্ব হচ্ছে সুজাতাকে নিয়ে। অভীক পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। রিয়ার চোখের জল যেন আজ বাঁধ মানছে না। সুজাতা রিয়াকে জড়িয়ে ধরে চুমুতে ভরিয়ে দিল।

 

_____

 


FavoriteLoading Add to library

Up next

মুখরোচক দইয়ের চপ বানিয়ে ফেলুন সহজেই – মালা ... কথায় আছে 'যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে,' | তবে আমাদের অর্থাৎ গৃহিণীদের কাছে এই প্রবাদবাক্যটি হয়তো তেমনভাবে খাটে না মূলত আমাদের সন্তান এবং পতিদেবতার সৌজন্যে ...
ওরা ভালবাসতে জানে না – কৌশিক প্রামাণিক... ওরা ভালবাসতে জানে না, শরীরটা যেন ভোগ্যপণ্য মেকি প্রেমের মোড়কে, সদ্যজাত শিশুর তাই স্থান হয় নির্জন সড়কে | ওরা ভালবাসতে জানে না, পশুদের ধারালো দন্তে ...
ভাবি আনমনে -সৌম্য ভৌমিক শিশির ধোয়া জানালার কাচে জেগে থাকে মুখোশের সারি ছোট টবে বনসাই বাঁচে বিবর্ণ হওয়া ফ্ল্যাট বাড়ী । ঘামে ভেজা শরীরের ভীড়ে খুঁজে পাওয়া...
কাল বৈশাখী দারুন এক ঝঞ্ঝা এসে উড়িয়ে দিল এক নিমেষে, সব কিছু কি? ছিন্ন হল সব সংস্কার, সব পুরানো চিন্তার বাঁধন, সেকি কাল বৈশাখী? নতুন এক অংকুরের সৃষ্টি করে, যখন বিন...
অমাবস্যার রাত – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়...      আমার দাদু বরুণদেব মুখোপাধ্যয়ের জীবনে এমন ঘটনা লক্ষ্য করেছিলেন মৃত্যু পাঁচ বছর আগে থেকেই। অমাবস্যার রাতেই এই ঘটনা একমাত্র ঘটতো। দাদুকে বহু ডাক্তার...
মায়া – সরোজ কুমার চক্রবর্তী... ছোট সে এক ছেলে সারাদিন টোটো করে বেড়াই সে খেলে | আমাদেরই বাড়ির নীচে একটা বস্তি আছে সেখানেই তার বাস | হঠাৎ সেদিন ঘুমের মাঝে কার ডাকে ঘুম গেলো ভেঙে...
ভালোবাসি অন্ধকারকে – রুমা কোলে... তোমার চাহিদা দিনের , আমার রাতটুকুই প্রিয় । তুমি ভালোবাসো আলো , আর আমি ! রাতের কালো । হ্যাঁ ,  কালো , অন্ধকার , কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার , যেখানে নিজ...
Vinci Da Movie Review ভিঞ্চিদা পরিচালক - সৃজিৎ মুখোপাধ্যায়       সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় যে থ্রিলার ছবি তৈরী করতে সিদ্ধহস্ত তা তিনি আবার প্রমাণ করলেন `ভিঞ্চিদা' বানিয়ে। এর আগে...
উত্তোরণ – সৈকত মন্ডল... যদি ভাবো এক লহমায় সরিয়ে নেবে নিজেকে, তবে থামো, এ সূর্য শেষ সকালের নয়... যদি মনে করো কফিনের নিস্তব্ধতায় মিলিয়ে যাবে, তবে বলে যাও, চেষ্টারও উর্দ্ধে ক...
পুজো – ডঃ মৌসুমী খাঁ... পুজো আমার শিউলি ফোঁটা ভোর নীলাকাশ জুড়ে পেঁজা তুলোর মেঘ, বাতাসে ঢেউ তোলা কাশের বন আকাশ ভরা সোনা রোদের আলো , ক্ষেত জোড়া সবুজ ধানের শিষ কুমারটুলির স...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment