ফাঁস

– সিদ্ধার্থ নীল

 

জুতো জোড়ার ডানপায়েরটি ডান ও বাঁপায়েরটি বাঁয়ে ক্ষয়ে এসে একটু হেলে থাকছে। বহুদিনের অত্যাচার, রোদ বৃষ্টি সয়ে সয়ে আজ এই অবস্থা।
শ্রীলেদার্স থেকে কেনা হয়েছিল দু বছর চার মাস আগে। তারিখটা মনে আছে কারণ অফিস থেকে কিছু টাকা ইনসেনটিভ হিসেবে এসেছিল।
তিনি অবশ্য কিনতে চাননি।চেয়েছিলেন চর্মশ্রী থেকে বা এলিট থেকে সস্তা দরের একজোড়া নিতে। হবু স্ত্রী এর বাধার মুখে আর পারা গেল না। “কিপটেমি আর কত করবে !”―  বলে নিয়ে গেলেন শ্রীলেদার্সের দোকানে। দুহাজার দিয়ে নিতে হল। দাম বেশী হলেও আরামদায়ক।

এখন আবার সেই কিপটেমির অপবাদ মাথার উপর আসছে। কিন্তু অপবাদ ঘোচানোর রাস্তা খুঁজে পাচ্ছেন না। মাসমাইনে কোথা দিয়ে আসে আর কোথায় যায় ঠিক বোঝা যায় না। পিসি সরকারের যাদু যেন !
ইলেকট্রিক বিল, গ্যাস, মুদীদোকানের বাকী, পাওনাদার, কেবল লাইনের বিল, কাগজের বিল, ভাইয়ের কোচিং ফি, সব দিয়ে পাঁচ তারিখেই হাত ফাঁকা।
একেক মাসে একেক জনের কাছে বিশেষ দরকারে ধার করতেই হয়। বাড়িটা নিজেদের বলে রক্ষা। কতবার ভেবেছেন এইবার পাই পাই হিসেব করে খরচ করবেন। প্রয়োজনে সবার বায়নার উপর স্টীমরোলার চলবে।

কিন্তু কোথায় কি? প্রতিমাসে কোনো না কোনো বন্ধুর বিয়ে, নয় অন্নপ্রাশন , নয় জন্মদিন লেগেই আছে।এছাড়া ,ডাক্তার আর উটকো প্রয়োজন তো থাকছেই।এখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন।
গতকাল রাতে বিয়ের নিমন্ত্রণ ছিল। সকালে তাই জুতোজোড়াকে চলনসই রূপ দেওয়ার জন্য হাতে নিয়ে বাজারের তালিকা মুখস্থ করে ব্যাগ হাতে বেরিয়ে গেলেন।

বনধের সকালে মুচি যখন পালিশ করছিল তখন পিলারে হেলান দিয়ে ছায়ায় দাঁড়িয়ে এসব ভাবছিলেন।

পুজোর অপেক্ষায় থেকেও লাভ হচ্ছে না। বোনাস পেয়েও পাল্লা দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ গত বারের পুজোর সময়টাতেই ভেবেছিলেন এ জোড়া ফেলে দেবেন। কিন্তু পুজোর বাজার শেষে আর মনের জোর রইল না। ‛দেখা যাক পরেরবার’-বলে ভুলে গেলেন।
রোজ উত্তরপাড়া থেকে ময়দানে অফিস করতে আসেন। ট্রেনে আসেন হাওড়া স্টেশন ,তারপর বাসে ময়দান ,তারপর বাকীটুকু হেঁটে।ফেরেন সন্ধ্যা আটটার ট্রেনে। লোকাল ট্রেন। ভিড় থাকে তবু যানজটের খপ্পরে তো পড়তে হয় না। নিজে সবসময় আপোস করতে করতে পাপোষ হয়ে গেছেন। একেবারে নারকেলের ছোবড়া দিয়ে বানানো। সবাই যেতে আসতে পাড়িয়ে জুতোর ময়লা পরিষ্কার করে যাচ্ছে।তিনিও উপকার করছি ভেবে ভেবে খুশি মনে চালিয়ে যাচ্ছেন।

কিন্তু ইদানিং তার উপলব্ধি হচ্ছে। তার এই ত্যাগের মূল্য কারো কাছেই নেই। সবাই ভাবছে তিনি অলস। যতটুকু করতে পারতেন করছেন না এবং করেনওনি। নিজেকে তালের রস নিংড়ে ফেলে দেয়া তালের আঁটি মনে হয় মাঝে মাঝে। কদিন পর শাস বেরুলে এক কোপে দু ভাগ করে সেটাও নিয়ে যাবে।

পাশের বাড়িতে বিশাল টিভি দেয়াল জুড়ে ঝুলে থাকছে। ছবি নাকি একবারে জ্যান্ত মানুষের সমান। তার উত্তাপ কদিন ধরে টের পাচ্ছেন। মা বললেন।
নিজের একখানা কম্পিউটারের প্রয়োজন ছিল। অফিস লোন দেয়নি।
এখন হবু স্ত্রীয়ের আবদার তার একখানা ডিএসএলআর ক্যামেরা লাগবে।  টিউশনের টাকা জমিয়ে নাকি দামের অর্ধেক জোগাড় করে ফেলেছে। বাকী টাকা দিতে হবে।
জবাব দেননি , ঝিম ধরে ছিলেন।

কি করা যায় ! টানাটানির এই ভারসাম্য খেলা কিভাবে সামলাবেন বুঝে উঠতে পারেন না।

দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মাথা ঝিম ধরে যায়, বুকটা একটু ব্যথা করতে থাকে বাঁ পাশে, কান যেন হঠাৎ কেউ চেপে ধরল।তিনি পড়ে গেলেন।

অতঃপর,
তার পকেটের মোবাইলটিতে নাম্বার খুঁজতে ব্যর্থ চেষ্টা করছে এখন কয়েকজন। লোক জড়ো হয়েছে বেশ কয়েকজন।কিন্তু মোবাইলটাই বন্ধ হয়ে আছে। কাল রাত থেকেই বন্ধ। ভেবেছিলেন আজ ফেরার পথে মোবাইল সারাইয়ের দোকানে দেখাবেন। হলো না।

তিনি রেখে গেলেন বৃদ্ধা মা , হবু স্ত্রী আর হবু গ্র্যাজুয়েট ভাই আর একটি গিলোটিন জীবন।তিনি বেঁচে গেলেন।

____


FavoriteLoading Add to library
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment