পরন্তবেলার সূর্য

– বিদিশা মন্ডল

 

মি কোথায়, কি হয়েছে আমার?”- দূর্ঘটনায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিবু জ্ঞান ফিরে পাবার পর যন্ত্রণায় কাতর হয়ে প্রশ্নগুলো করলো। নার্স প্রত্যুত্তরে শিবুর স্যালাইন বোতল ঠিক করতে বলল-” ভাগ্য ভালো এযাত্রায় বেঁচে গেলেন, ওতো বড়ো ট্রাক ছিল। উনি আপনাকে ঠিক সময়ে হাসপাতালে এনেছিল-

” কে এনেছিল আমায়, কে নতুন জীবনদান করল আমাকে, আমি কি তাদের একবার দেখতে পারি?

” এই যে আসুন ভেতরে আসুন। এই যে এই মহিলা আপনাকে বাঁচিয়ে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। ইনি নারীকল্যান কমিটির সদস্যা “- নার্স একজন অল্পবয়সী তরুনীকে সাথে নিয়ে শিবুর সামনে নিয়ে এলো।

” একি? তুমি? শিউলি তুমি আমাকে নতুন জীবন দিয়েছ…একি ঈশ্বরের লীলা। আমাকে পারলে ক্ষমা করো তুমি, আজ আমি আমারই পাপের শাস্তি পাচ্ছি”- ডুকরে কেঁদে উঠল শিবু।

১ বছর আগে……

বিয়ের পর চাহিদামতো পণ দিতে না পারায় শিউলিকে বাপের বাড়ি ফিরে আসতে হয়েছিল। ভাগ্যবশত তাকে অন্যান্য শ্বশুরবাড়ির মতো পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়নি, এতেই কৃতজ্ঞ ওর গরীব বাবা মা। তাই আর নতুন করে পুলিশ কেসে যাননি ওরা।তবে ডিভোর্সের মামলা চলছিল কোর্টে। কয়েকদিনের মধ্যে আইনতভাবে শিউলি আর ওর অমানুষ স্বামী শিবু পাকাপাকিভাবে আলাদা হয়ে যাবে। এরপর শিবু ও তার বাড়ির লোকের উদ্দেশ্য ছিল শিবুর নতুন করে বিয়ে দিয়ে মোটা টাকা পণ নিয়ে নিজেদের লোভ চরিতার্থ করা।

ওদিকে শিউলি নিজেকে শক্ত করে, দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করতে থাকে ওই অমানুষগুলোর সাথে। সে কক্ষনো ভেঙে পরেনি পাশবিকতার কাছে।নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। সে ঠিক করে নিজের পায়ে রোজগার করবে, গরীব বাবা মার দুখ ঘোচাবে। এই উদ্দেশ্যে শিউলি ” নারীকল্যান সমিতি”র সাথে যোগাযোগ করে। এই সমিতির কাজই ছিল গরীব, অসহায় মেয়েদের স্বনির্ভর করে তোলা। আর তাছাড়া এই সমিতি একটা স্বেচ্ছাসেবক কমিটি হিসাবেও কাজ করত। যারা রাস্তাঘাটে দুর্ঘটনাগ্রস্ত মানুষদের উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, রক্তদান শিবির করা, বস্ত্রদান ইত্যাদি সেবামূলক কাজ করত। ধীরে ধীরে এই কমিটির একজন একনিষ্ঠ কর্মচারী ওরফে সদস্যা হয়ে ওঠে শিউলি। একাধারে হাতের কাজ শিখে রোজগার করে নিজের পায়ের মাটিকে শক্ত করে তোলে, অন্যদিকে অনেক দূর্ঘটনায় আক্রান্ত মানুষের প্রান বাঁচিয়ে পূর্ন্যলাভ করে।

আজ শিউলি তার অমানুষ স্বামীর প্রানদাত্রী। সে মানুষ তার ওপর এতো অত্যাচার করেছে, তাকে মেরে ফেলতেও যার হাত কাঁপত না, আজ ঈশ্বরের লীলায় সেই তাকে নতুন জীবনদান করল। সেদিন শিউলি কমিটির কাজের রাস্তায় বেরিয়েছিল, হঠাত দেখে একটা ট্রাক একজনের দিকে দ্রুতগতিতে ছুটে আসছে। অবশ্য যে পৌছাবার আগেই ট্রাকটা লোকটিকে ধাক্কা মেরে পালিয়ে যায়। রক্তভেজা মুখটা দেখে শিউরে ওঠে সে। এ কে? এতো তার অপরাধী, যাকে সে নিজের ঘৃন্নার যোগ্যও মনে করে না। সে মরে গেলেও তার কিছু যায় আসা উচিত নয় কিন্ত মানবিকতা তাকে নাড়া দেয়, যতই শিবু দোষ করে থাকুক শিউলি কমিটিতে যোগ দেবার সময় ব্রত নেয় যে সমস্ত মানুষ তার কাছে সমান। ধর্ম, মত, জাতিভেদ নির্বিশেষে সে সবার প্রান বাঁচাবে। তাই আজ হিংস্রতার কাছে বিবেকের জয় হয়। শিবুর প্রান বাঁচায় সে।

হাসপাতাল থেকে শিউলি যখন বেরিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়াল তখন আকাশে প্রায় অস্তগামী সূর্যটা রক্তিম আভায় সাজিত হয়ে উঠেছিল, যা তার কপালের লাল টুকটুকে টিপটার ঔজ্জ্বল্য বহন করছিল। তার জীবনের সূর্যও অস্তগামী হয়ে গিয়েছিল কিন্তু সে নিজের শক্তির জাল বিস্তৃত করে নিজেকে পরন্ত বিকেলের লাল সূর্যের মতোই সুন্দর করে তুলেছে।

_____


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment