একটি হাত- শাশ্বতী সেনগুপ্ত

 

’দিন ধরে অসুস্থ থাকার জন্য মৌ স্কুলে যেতে পারেনি। সে শিক্ষকতা করে একটি প্রাইমারি স্কুলে। তার পাশের পাড়ায় থাকেন তার বৃদ্ধ মা বাবা। ক’দিন ধরে মৌয়ের কাছে আসতে চেয়েও তারা পারেনি। কারণ বার্ধক্যজনিত। তারা বাড়ি থেকে বের হতে পারেন না। মৌ সমস্ত কিছু করে দেয়। সময় পেলে তার স্বামী বিনয় করে দেয়। তবে বিনয়ের রবিবার ছাড়া সময় নেই। তার কাজের এমনি চাপ যে, সকালে বেরিয়ে ফেরে বেশ রাতে। সুতরাং সব দায়িত্বটাই বহন করে মৌ। এখন সে সুস্থ আছে। তাই ভাবল, সন্ধ্যায় গিয়ে মা বাবার সঙ্গে দেখা করবে আর প্রয়োজনীয় জিনিসের লিস্ট নিয়ে এসে কাল সকালে কিনে দিয়ে আসবে।

সন্ধ্যার আগে থেকে টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। মৌয়ের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এই ধরণের বৃষ্টি খুব বিরক্তিকর। তার মধ্যেই ওর মা ফোন করে বললেন, বৃষ্টি জোরে হলে আসার দরকার নেই। কিন্তু মৌ শুনল না। ছাতা মাথায় দিয়ে বের হয়ে পড়ল। পাশের পাড়ায় যেতে সময় খুবই কম লাগে।

ওর বাপের বাড়ির লেনটা ব্লাইড লেনই বলা যায়। সচরাচর ওই গলিটায় লোকজন যায় না, একেবারে পাড়ার শেষ প্রান্ত হওয়ায় যে ক’ঘর ওখানে থাকে তারাই চলাচল করে। ওর বাপের বাড়িটা একেবারে লেনের শেষে। তারপরই বড় একটা পুকুর রয়েছে, বেশ জঙ্গলও আছে। টিপটিপ বৃষ্টি পড়েই চলেছে। মৌ হাঁটছে।
বাপের বাড়ির আগে বাঁদিকে তিনটি মাত্র বড় বাড়ি পড়ে। ডানদিকে একটাই খুব বড় বাড়ি। তার ওপর বাড়িটার অর্ধেকটা পোড়ো বাড়ি। সেই দিকটায় এখন আর কেউ থাকেন না। পোড়ো বাড়িটার মূল দরজার সামনে দিয়েই তার বাপের বাড়ি যেতে হয়। এক সময় বাড়িটা জমজমাট ছিল। কিন্তু একে একে সব্বাই মারা গেছেন, একমাত্র ওই পরিবারের মেজ মেয়ে বেঁচে আছেন। তিনি দীর্ঘদিন বাড়িটা আগলে পড়ে ছিলেন। ক্রমে বাড়িটার ছাদের অর্ধেক ভেঙে পড়ে, তারপর দরজা, জানলা। তবে মূল দরজাটা ঠিক রয়েছে। সেটা বাইরে থেকে তালা দেওয়া। তার পাশের দুটো জানলার পাল্লা আর গরাদ নেই। শুধু ফ্রেম রয়েছে। জানলাটা হা হা করে পড়ে আছে। প্রায় রোজই মৌ এই পোড়ো বাড়িটা পেরিয়ে বাপের বাড়ি যায়। এই লেনটার প্রতি মিউনিসিপ্যালিটিও উদাসীন। এখানে কোনও পোস্ট লাইট নেই। আছে একটু দূরে। তারও আলো এতটাই ম্লান যে, সামান্য আলো ওই লেনটার পোড়ো বাড়ির আনাচে কানাচে পড়ে রহস্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছেই। মৌ ছাতা নিয়ে পোড়ো বাড়িটার কাছাকাছি এসে পড়েছে।

ছাতার ভিতর থেকে মুখ বাড়িয়ে পোড়ো বাড়িটার দরজার দিকে তাকাল। তারপরই ফাঁকা জানলাটার দিকে নজর গেল। সহসা তার মনে হল, আবছা অন্ধকার ওই জানলার ফাঁকে কার যেন একটা সাদা মত হাত সরে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ওর বুকটা মারাত্মক চমকে উঠলো। সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো। আবার আড় চোখে জানলাটার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাল। আবার মনে হল, একটা হাত যেন সরে গেল। হাতটা সম্ভবত মহিলারই হবে। গড়ন তাই বলছে। ও আর তাকাল না, দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বাপের বাড়ির দরজায় নক করল।

মৌয়ের মা যেন রেডি হয়েই ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে দিয়ে বললেন, ভিতরে আয়। তখনও বৃষ্টি পড়ছে। ওর মা বললেন, কি দরকার ছিল এখন আসার? শরীর খারাপ থেকে উঠেছিস। ভিজে গেলে মুশকিল। তুই বোস, আমি আদা দিয়ে চা করে দিচ্ছি। চা খেয়ে প্রয়োজনীয় কি জিনিসপত্র আনতে হবে বুঝে নিয়ে মৌ ওঠার প্রস্তুতি নিল। নাহ, মা বাবাকে ওই ব্যাপারে কিছু বলল না। কারণ দুই বৃদ্ধ বৃদ্ধা একা থাকেন। এই নিয়ে ভয় পেতে পারেন, দুঃশ্চিন্তা করতে পারেন। খুব বেশিক্ষণ না বসে মৌ উঠে পড়ল। তার মন ওই পোড়ো বাড়ির দিকে পড়ে আছে।

বাড়িটার কাছাকাছি হতেই অদ্ভুৎ ভাবে তার গা ছমছম করতে লাগল। হঠাৎ মূল দরজাটার দিকে চাইতেই মনে হল, আবছা একটা মূর্তি দরজার তালাটা যেন খুলছে। ওর মারাত্মক ভয়ে শরীর কেমন করে উঠলো। মুখ দিয়ে আওয়াজ ঠিকরে বের হতে চাইছিল। মৌ মুখে চাপা দিল নিজের। ওর মনে হল, মূর্তিটা দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে গেল। আশ্চর্য হল, ওই ভয়ঙ্কর পোড়ো বাড়িটায় কে ঢুকতে পারে! চাবিই বা পেল কোথায়? তারপরই সব যেমন তেমনই হয়ে গেল। ও সন্তর্পণে বাড়িটা পেরিয়ে যেতে গিয়ে আড় চোখে দেখলো, মূল দরজাটায় তালা যেমন লাগানো ছিল লাগানোই আছে। দ্রুত ও পেরিয়ে গেল ব্লাইন্ড লেনটা। নিজের বাড়িতে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

সারা রাত ঘুমাতে পারল না মৌ। পোড়ো বাড়ির ঘটনার কথাটা স্বামী প্রলয়কে বলতেও পারল না। কারণ প্রলয় হেসে উড়িয়ে দিয়ে মজা করবে। অথচ ঘটনাটা সম্পূর্ণ সত্যি। রাতটা ওর খানিকটা ঘুমিয়ে আর খানিকটা জেগে পেরিয়ে গেল। মাঝে মাঝে ভয়ও করেনি যে তা নয়। মা বাবার জন্যও চিন্তা হয়েছে।

তখন সকাল ৮টা বাজে। ওর মোবাইল বাজল। ও জানে এ সময় মা ফোন করে। ফোন ধরে বলল, বলো মা। ওর মা বললেন, জানিস তো গতকাল বিকালে পোড়ো বাড়িটার মেজ মেয়ে মারা গেছে অর্থাৎ চুমকি। চমকে উঠে মৌ বলল, তাই নাকি? সে তো দূর সম্পর্কের এক বোনের বাড়ি থাকত। মানে ওকে ওই বোনই নিয়ে গিয়ে নিজের বাড়িতে রেখেছিল। মৌয়ের মা বললেন, হ্যাঁ। কিন্তু গতকাল মারা গেছে চুমকি। ক’দিন ধরেই নাকি কঠিন জ্বরে ভুগছিল। মৌ কোনও কথা না বলে ফোন রেখে দিল।
ও ভাবল, তবে কি বাড়িটার মায়া ত্যাগ করতে পারিনি চুমকি দি! কারণ বহুদিন তো ওই বাড়িটা আগলেই ও পড়েছিল। এই সকালেও মৌয়ের কেমন যেন ভয় ভয় করল।

____


FavoriteLoading Add to library
Up next
জীবনের বিধান-ডঃ বিধান চন্দ্র রায়... - সমর্পণ মজুমদার   দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, নিষ্ঠাবান, কর্মদক্ষ, সচেতন মানুষের জীবন অতি সুশৃঙ্খল হয়। একজন সুশৃঙ্খল মানুষই এরকম হতে পারেন। তিনি হন প্র...
শেষ ট্রেনের যাত্রী – পরিতোষ মাহাতো... শেষ ট্রেন ধরার লক্ষ্যে দৌড়াচ্ছে লক্ষ লক্ষ অ্যাথলেটিক্স বাড়ি ফিরতে হবে , বাড়ি ঠিক নয়, আশ্রয় রাত্রিটুকুর জন্য আমরা যাকে বাসস্থান বলি সেটা ঠিকান...
অন্ত্যমিল – মধুপর্ণা ঘোষ... অধিকাংশ সময় ছন্দহীন বাক্যগুলো ভীষণরকম ছন্নছাড়া; অন্ত্যমিলের খোঁজ যেটুকু বা ছিল সেটুকুও আজ আতিশয্য! তবুও হঠাৎই মিলে যায় শেষ শব্দগুলো - যেমন হঠা...
ফ্যাশন শো – অন্বয় গুপ্ত... ফ্যাশন শো। এরই নাম গভীর রাত ! শাটার টেনে দোকানি ছুটে গেল র‍্যাম্পের শেষ মাথায়-স্টেশন নাম ! ঘামের মেকআপ তোলা বাকি। ভ্যানওলা,লুঙি গেঞ্জির কস্টিউমে ...
কি যাদু মা ডাকতে - অদিতি ঘোষ      প্লীজ, স্টপ ইট্। এই ধানাই পানাই ভাল লাগেনা আমার। প্রত‍্যেকদিন সেই একই আলোচনা। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে কথাকটা উগলে দিয়ে,পার্শটা...
ধন্য জীবন – সরোজ কুমার চক্রবর্তী...   জীবন আমার ধন্য মাগো এমন দেশে এসে , গর্বে বলি ভারতবাসী আমি ভালোবেসে | বড় হলাম এই বাংলায় সুখে কাটাই দিন , ছোট বড় নেই ভেদাভেদ সবাই স্বাধীন...
বিচার – শুভদীপ্ত চক্রবর্তী... মন্দিরের চাতালে ছোট্ট একর‌ত্তি দেহটি পড়ে আছে, শরীরে একটুকরো সুতোও নেই... রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত — নিস্পাপ খোলা দুটি চোখ ঈশ্বরকেই যেন খুঁজছে ! মিটিং...
দত্তক - গার্গী লাহিড়ী মধ্যরাতে বারান্দার কোনটিতে একলা বসে লেখিকা অনুসূয়া আজ সে বড় ক্লান্ত পোষমানা স্মৃতির পাতাগুলো বিতর্কের ঝড়ে এলোমেলো অবাধ্য এত ক্ষো...
স্মৃতি – স্বরূপ রায়...   ছিন্নভিন্ন দেহটা পড়ে ছিল বহুতলটার নিচে। চারিদিকে অসংখ্য মানুষের ভিড়। মাথাটার পাশে একরাশ রক্ত জমে আছে। জমে থাকা মানুষের ভিতর থেকে নানান মন্তব্য কানে ...
জঠর – পদ্মাবতী মন্ডল... কী গো! তোমার সকাল হল? বড় লোকের বেটি তিন পো বেলা কেটে গেল পেলাম না তো চা'টি । ঠাকুর দ্যেবতা ডর নেই মা এমন অলক্ষুণে , পাঁচ বছরেও ,জ্বলল নাকো বংশ ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment