আমার তুমি- মুক্তধারা মুখার্জী

 

“কিগো, তাড়াতাড়ি এসো না। মশারিটা তাড়াতাড়ি টাঙিয়ে দিয়ে যাও না। আর কতক্ষণ বসে থাকবো। বসে বসে তো গাঁটের যন্ত্রণাটা বেড়ে গেল”।

“তো আমি কি করবো? আমি সিরিয়ালটা শেষ না করে আসি না সেটা তুমি যেন জানো না”।

“সারাদিন তো চলছে তোমার ওই প্যানপ্যানানি। কি যে ভাল লাগে ভগবানই জানে”!

“তা বুঝবে কি করে। জীবনে কোনো কিছুই কি বোঝার চেষ্টা করলে তুমি? তাহলে তো আজ আর একা পচে মরতে হতো না। কত করে বলেছিলাম একটা ছেলেপুলে অন্তত দত্তক নিতে দাও। নাহ! নিজের রক্ত ছাড়া নাকি অন্য যে কোনো রক্তের ওপর ভরসা করা যায় না। কে জানে কোন বংশের, কোন চোর ডাকাতের রক্ত।বড় হয়ে নাকি আমাদের দেখবে না”।

“কতটুকু জানো তুমি বাইরের জগৎ সম্পর্কে। ঠিকই বলেছিলাম আমি। অনেক রাত হলো। ঘুমোতে দাও তো”।

একরাশ মন খারাপ নিয়ে শুয়ে পড়লো আশালতাদেবী। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে সেই কোন ছোট বয়সে উৎপলবাবুকে বিয়ে করে এসেছিলেন। দু হাতে করে সংসার সামলেছেন। সব পেয়েছেন। শুধু সন্তানসুখ বোধহয় ভগবান তার কপালে লেখেননি। শত চেষ্টা সত্ত্বেও সন্তানের মুখ দেখার সৌভাগ্য হয়নি তার। নয় নয় করে তিন কুড়ি বয়স হলো। কত মন্দির কত মানত কত জড়িবুটি, যে যেখানে বলেছিল ছুটে ছুটে গিয়েও লাভ হয়নি। আর আজ এত বড় বাড়িটা যেন গিলে খেতে আসে।

এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন চোখটা লেগে যায়। ঘুম ভেঙে যায় সকালের দিকে একটা চিৎকার চেঁচামেচিতে। দুজনেই উঠে বসে একে অপরের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়। বহু বছর এ পাড়ায় বাস তাদের। বেশ শান্তি আছে, ঝুট ঝামেলা বিশেষ নেই বললেই চলে।কোনোদিন কোনো টু শব্দও পাওয়া যায় না। ধীর পায়ে দুজনে বাইরে এসে দেখে উল্টোদিকের বাড়িতে অশান্তির ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ওই বাড়িতে প্রবীরবাবু, তার স্ত্রী, তার ছেলে বৌমা ও নাতনি থাকে। প্রবীরবাবু আর তার স্ত্রীকে জিনিসপত্র সমেত বাইরে বের করে দিয়ে দরজায় তালা দিয়ে ছেলে বৌমা নাতনিসহ বেপাত্তা। পাড়ার লোক সবাই ওনাদের ঘিরে রয়েছে। কেউ কেউ উত্তেজিত। “তালাটা ভেঙে ফেললেই তো হয়”—ভিড়ের মধ্যে কে যেন বলে উঠলো। বৃদ্ধ প্রবীরবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “নিজের বাড়িতে আর যাই হোক চোরের মতো ঢুকতে পারবো না”।

এগিয়ে গিয়ে উৎপলবাবু জিজ্ঞেস করেন ঘটনাটা কি হয়েছিল। রোজকার মতো সকালে মর্নিং ওয়াকে গিয়েছিলেন সস্ত্রীক। ফিরে এসে দেখেন তাদের কিছু জিনিসপত্র বাইরে এরকম ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলা আর দরজার গায়ে একটি চিঠি আটকানো। প্রবীরবাবু চিঠিটা উৎপলবাবুর হাতে ধরিয়ে দেন।

“বাবা, এই বাড়িটা তুমি আমার নামে লিখে দিয়েছ, আশা করি মনে আছে। পুরোনো এই বাড়িটা আঁকড়ে পড়ে থাকতে আমি পারবো না। আমাদের বেশ অসুবিধা হচ্ছে এত ছোট জায়গায় মানিয়ে নিতে। বাড়িটা তাই প্রমোটারকে বেচে দিলাম।সেই টাকা দিয়ে একটা ফ্ল্যাট কিনেছি। সেখানেই চললাম আমরা। তোমাদের জিনিসপত্র দিয়ে গেলাম। ভালোই পেনশন পাও তুমি। বাকি জীবনটুকু কোনো ভালো বৃদ্ধাশ্রমে নিজেদের মতো করে কাটিয়ো”।

স্তম্ভিত হয়ে যান উৎপলবাবু। ধীর পায়ে চলে আসেন ঘরে। আশালতাদেবী ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করে, “কি গো, কি হলো? কিছু জানতে পারলে?”

ফ্যালফ্যালে দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন উৎপলবাবু। তারপর পুরো ঘটনার বিবৃতি দিয়ে কান্নাভেজা গলায় আশালতার হাতটা ধরে বলে ওঠেন,

“গিন্নি, এই পৃথিবীতে কেউ কারোর নয় গো। নিজের শরীরের অংশ, নিজের রক্ত, নাড়ির টান সব মিথ্যে। শুধু তোমার আমার সম্পর্কটাই সত্যি। ধ্রুবতারার মতোই স্থির। কাউকে লাগবে না গো আমাদের। তুমি আমাকে আর আমি তোমাকে সারাজীবন দেখবো। আর কিছু না পারি, আমরা একে অপরকে এইভাবে নিখাদভাবে ভালোবেসে যেতে পারবো না? বলোনা গিন্নি, পারবো না?”

বুকের ভিতরটা যেন মোচড় দিয়ে ওঠে আশালতাদেবীর।

“পারবো গো। নিশ্চয়ই পারবো। কাউকে লাগবে না আমাদের। আমরাই একে অপরের পরিপূরক”।

দুই বৃদ্ধ বৃদ্ধা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে। তাদের চোখে জলে ধুয়ে যায় বহু বছরের জমে থাকা গ্লানি,কষ্ট,যন্ত্রণা।

(সমাপ্ত)


FavoriteLoading Add to library

Up next

বিরল বিবাহ -বিভূতি ভূষন বিশ্বাস... হিন্দু সমাজে আট রকম বিবাহের কথা বলা আছে তার মধ্যে চার রকমই দেখা যায় তবে বিখ্যাত হলো দুই রকম ১) দেখা শুনা করে বিয়ে । ২) প্রেম করে বিয়ে । আচ্ছা সব বুঝল...
১৬-১-১৯-১৯-২৩-১৫-১৮-৪ - মনীষা বসু     ।। ১।। এয়ার পকেটে পড়ে প্লেনে জোর ঝাঁকুনি লাগতেই ল্যাপটপ থেকে চোখ ওঠালেন সূর্য। মানুষ যেমন ঘুম থেকে উঠে চারিদিকে তাকিয়ে বুঝতে চায়, সে...
একটি গোলাপ গাছের প্রেম কথা – বৈশাখী চক্রবর্...   একটা গোলাপ চারা পুঁতেছিল কেউ বাগানে, বর্ষার জল পেয়ে পৌঁছলো সে শৈশব থেকে যৌবনে।   প্রথম কুঁড়ি এলো গাছে,   লাল টকটকে রঙ  যার, এক ভ্রমর এলো গ...
স্মার্টফোনের দুনিয়া কাঁপাতে আসছে Xiaomi A2... - অভিষেক চৌধুরী   বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মোবাইল দুনিয়ায় বিপ্লব ঘটাতে আসতে চলেছে xiaomi A2। ভারতের বাজারে Xiaomi- র জনপ্রিয়তা নিয়ে নতুন কর...
Vinci Da Movie Review ভিঞ্চিদা পরিচালক - সৃজিৎ মুখোপাধ্যায়       সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় যে থ্রিলার ছবি তৈরী করতে সিদ্ধহস্ত তা তিনি আবার প্রমাণ করলেন `ভিঞ্চিদা' বানিয়ে। এর আগে...
কল্পনায় অ্যাটলান্টিস... - রাজদীপ ভট্টাচার্য্য   সম্প্রতি ২২ সে জুলাই দা ওয়ার্ল্ড অফ ডি সি সিনেম্যাটিক ইউনিভার্স এর অন্যতম ছবি একোয়া ম্যান এর প্রথম ট্রেইলার রিলিস হ...
পুজোর একদিনের পরকীয়া প্রেম (সাথে সুজয় দা আর পুচকী)... আমি সোহিনী , আর ওই যে দালানে হলুদ পাঞ্জাবী পরা ভদ্রলোকটি আমার দাদা আর তার ঠিক পাশেই বেগুনী পাঞ্জাবী , দাদার বন্ধু সুজয় দা । আজ অষ্টমীর সকাল আর আমাদের...
ওই লোকটা – গার্গী লাহিড়ী... আবার এসেছে ওই লোকটা দু হাত মুষ্টিবদ্ধ , কাঁধে বিশাল এক ঝোলা মুঠোর মাঝে কি আছে বোঝা যায় না দুর্বোধ্য ভাষায় হেঁকে যায় গলি থেকে গলি লোকটা কি ফেরি ক...
সম্পর্ক – বিভূতি ভূষন বিশ্বাস... আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি ।  ১৯৮০ সালের এক ঘন বর্ষার দিন প্রায় এক সপ্তাহ ধরে রিমঝিম করে অনবরত বৃষ্টি পড়েই চলেছে থামার কোন নাম গন্ধ নেই । গ্রামের রাস্তা...
ঝিনুকমালা -স্বরূপ রায়... ২৫সে ডিসেম্বর, ২০১১। এই ২৫ তারিখটা আমার জীবনে একটা আলাদা অনুভূতি নিয়ে এসেছে। কারন, এই বছর কলেজে আমার লাস্ট-ইয়ার। একটা কাজেরও ব্যবস্থা হয়েছে। আগামী এপ্...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment