মায়ের আঁচল- বিভূতি ভূষণ বিশ্বাস 

 

রে বাপরে ১০ টা বেজে গেছে,সর্বনাশ করেছে ১০ টা থেকেই তো ডিউটি । তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়লাম । কি আর করবো সব কাজই তো আমাকে করতে হয় । যাবার সময় মা ঠিকই বলে গিয়েছিলেন ” বাবা তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নিস” । কিন্তু মা মনের মতো মেয়ে তো পাইনা । কি করবো বলো । এই সব ভাবতে ভাবতে অফিসে রওনা দিলাম । ১০ মিনিট পায়ে হেঁটে স্টেশনে পৌঁছে দেখি লোকে লোকারণ্য । ওহ এখন তো গঙ্গা সাগরের মেলা চলছে । মনেই নেই আর কি করেই বা মনে থাকবে আমরা যে স্টেশন মাস্টার দিনরাত সপ্তাহের নামও ভুলে যাই । শুধু ডিউটি আর ডিউটি ছাড়া কিছু বুঝি না ।

       লক্ষ্মীকান্ত পুরই তো  গঙ্গাসাগরে  যাবার মেইন স্টেশন । এই মাস দুই হলো আমার পোস্টিং হয়েছে । সিঁড়ি দিয়ে অফিসে উঠতেই দেখি এক ভদ্রমহিলা বসে আছে সিঁড়ির উপর । বয়স ৫০/৫৫ হবে । আমি জিজ্ঞাসা করলাম আপনি এখানে বসে কেন ? উনি যে কি ভাষায় কথা বললেন বুঝতেই পারলাম না । অগত্যা পাশ কাটিয়ে দু’তলায় আমার অফিসে চলে গেলাম । রাত আটটায় আমার ছুটি হলো তখনো দেখি উনি ওখানে ঠাঁই বসে আছেন আর ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন । জিজ্ঞাসা করলাম বাড়ি কোথায় ? কি যে বললো বুঝতেই পারলাম না অগত্যা পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম নিজের রেল- কোয়াটারে ।

        অস্থির অস্থির লাগছে ঘুম আসছে না শুধু ঐ মহিলার কথা মনে পড়ছে অগত্যা স্টেশনে গিয়ে দেখি উনি এখনো ওখানেই বসে আছেন । জিজ্ঞাসা করলাম কিছু খাওয়া দাওয়া হয়েছে ? উনি হা করে চেয়ে রইলেন । অগত্যা ইশারা করে খাবার কথা জিজ্ঞাসা করলাম । এবার হাত নাড়িয়ে উত্তর দিলেন — ‘না’ । ইশারা করে আমি বললাম আমার সঙ্গে যেতে । উনি উঠে পড়লেন আমি একটা হাত ধরে আমার রেল-কোয়াটারে নিয়ে গেলাম ।

     এখন উনি মায়ের মতো সব কাজ করেন কিন্তু দুজনের মধ্যে ইশারাতে কথা হয় । যেন দুজনাই বোবা । আমাকে আর কষ্ট করে রান্না করতে হয় না । মাস খানেক পর এক দিন ভোরে কলিং বেল বেজে উঠলো দরজা খুলে দেখি পুলিশ ও দুজন অচেনা লোক । পুলিশ জিজ্ঞাসা করলেন ——- ‘আপনি কি মিস্টার বি.বি. বিশ্বাস’ ।

——- আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’।

পুলিস বললেন ——-  আপনার ম্যাসেজ আমরা পেয়েছি । এনারা এনাদের মা কে হারিয়েছেন তাই দেখতে এসেছেন । এদিকে ভদ্রলোক মহিলাকে দেখে মা মা বলে কেঁদে ফেলে জড়িয়ে ধরলেন । ওনারা বললেন মা শুধু তামিল ভাষাই বোঝেন । খুবই কষ্ট হয়েছিল সেদিন ওনাকে বিদায় দিতে ।

_____


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment