অভিমান- শ্বেতা আইচ

 

জ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল অভীক। তাড়াতাড়ি মানে রাত ১০টা আর কি। শ্রীময়ী কে সারপ্রাইজ দেবে। অনেকদিন পর……

বছর খানেক হতে চলল অভীক আর শ্রীময়ী সাতপাকে বাঁধা পড়েছে। কলেজের প্রথম দিন থেকে আলাপ, থুড়ি ভালো লাগা। সেই হিসাবে লাভ ম্যারেজ ই বলা যায়। শুধু প্রেম নয়, বলা যায় ওদের সম্পর্ক যেন এক দৃষ্টান্ত। দুজনেই ওয়েল এস্টাব্লিস  যাকে বলে ( এম এন সি তে কর্মরত, মোটা টাকা বেতন, নিজেদের ফ্ল্যাট, গাড়ি, গুড সেভিং…….)। কোন কিছুর ই যেন অভাব নেই ওদের পুঁচকি সংসারে। অন্তত ওরা তেমনটাই ভেবেছিল।

এতো গেল অতীত। এবার বাস্তবে আসা যাক। বিয়ের পর প্রথম প্রথম বেশ ভালোই চলছিল। হানিমুন কাটিয়ে ফেরার পর থেকেই যত বিপত্তি। ব্যাপারটা একটু খুলে বলা যাক।

বিয়ে ও হানিমুন মিলিয়ে মোটামুটি ১৮ দিনের লম্বা ছুটি কাটিয়ে এসে দুজনেই যখন কর্মজীবনে ফিরে গেল, তখন ওরা নিজেদের একরাশ কাজের মধ্যে খুঁজে পেল। একটা করে দিন পেরোল, কাজের চাপ যেন পুকুর নদী পেরিয়ে মাঝ সমুদ্রে এসে পড়ল। ছুটির দিনগুলো কোন ফাঁক দিয়ে গলে যেতে লাগল তা টেরই পেল না অভীক ও শ্রীময়ী। সারাদিন শেষে দুজনে ঘরে ফেরে শুধু এটুকুই। একটা সময় দুজনে দুজনকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সবরকম পরিস্থিতিতে একসাথে পাশাপাশি থাকবে। তাই ই তো চলছে, সকাল ৮টা টু রাত ৮টা।

আজ, ১৭ই এপ্রিল…ঘড়িতে ১০টা বাজল। শুক্রবার আজ, শ্রীময়ীর আগে ফেরার কথা। অভীক বেল বাজালো, আওয়াজটা কতদিন পর যেন শুনলো। মাস্টার কী এর দৌলতে ওটার ব্যবহার তো প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। একবার, দুবার, তিনবার। বেলটা কি তবে খারাপই হয়ে গেল ? না ! ভিতর থেকে আওয়াজ তো আসছে। তাহলে শ্রী নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছে। তবে কি ও আজকের দিনটা ভুলে গেল? মনের মধ্যে একটা ব্যথা অনুভব করল অভীক। এতটাই কি দূরে সরে গেছে ওরা একে অপরের থেকে?

কিছু সময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল অভীক। আবার বের বাজালো। নাঃ, কোন সাড়া শব্দ নেই। অগত্যা পকেট থেকে মাস্টার কী বের করে দরজা খুলে ফেললো। ড্রইং রুমটা অন্ধকার কেন? ও তো ভেবেছিল সারা ফ্ল্যাট জুড়ে আজ আর আলো থাকবে শুধু। কিন্তু কিছুই যেন অভীকের মনের মতো হচ্ছে না আজ। বেডরুমে আলোটা জ্বলছে, তারমানে শ্রী ভিতরেই আছে। কিন্তু দরজাটা তাহলে খুলল না কেন? একরাশ প্রশ্ন বুকের মধ্যে নিয়ে অভীক ঘরে ঢুকল ঠিক ই কিন্তু এত তাড়াতাড়ি উত্তর গুলো পেয়ে যাবে আশা করেনি। বিছানায় চোখ বুজে শুয়ে আছে শ্রীময়ী। তবে এই পস্তাতে শ্রী কে আগে কখনো শুতে দেখেনি অভীক। অনেকবার ডাকলাম, সাড়া নেই। পার্স চলছে। শ্রীময়ী সেন্সলেস।

“আপনি সত্যি কিছু জানতেন না?”

“ট্রাস্ট মি ডক্টর, আই ডোন্ট নো এনিথিং অ্যাবাউট ইট!”

“এই হচ্ছে আপনাদের জেনারেশনের সমস্যা। সারাদিন শুধু কাজ নিয়েই থাকতে জানেন। দুটো মানুষ তাও ঠিকঠাক খোঁজ খবর রাখেন না !”

মাথাটা নীচু হয়ে গেল অভীকের। সত্যি ওর বলার কিছু নেই। দুটো মানুষ পাশাপাশি থেকে ও এতটা দূরে কিভাবে সরে গেল বুঝতেই পারেনি। জীবনের সবথেকে বড় খুশির খবরটা ও কিনা সে এভাবে পেল? হ্যাঁ, খুশির খবরই তো! অভীক যে বাবা হতে চলেছে।

কেবিনের জানলার দিকে তাকিয়ে শ্রীময়ী। অভীক পাশের চেয়ারে চুপ করে বসে। একটা অসহনীয় নিস্তব্ধতা গোটা রুমটা জুড়ে। অভীকই প্রথম স্তব্ধতার দেওয়ার ভাঙল,

“আমরা কি এই দিন টার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম দুজন দুজনকে, শ্রী?”

“কতদিন পর শ্রী ডাকটা শুনলাম তোমার মুখে!”, অবশেষে কথা বলল শ্রী।

“এমনটা কেন হল শ্রী? কেন তুমি আমাকে এত খুশির খবরটা আগে দিলে না ? বলো কেন?”, শ্রী এর হাতটা নিজের হাতের মধ্যে টেনে নিল অভীক।

নিজেকে আর সামলাতে পারল না শ্রীময়ী। ভরা বর্ষার মেঘের মতো ঝরে পড়ল অভীকের শরীরে। দুহাতে জাপটে ধরল ওর ভালোবাসার মানুষটিকে। শেষ কবে এ আলিঙ্গন পেয়েছে অভীক জানে না। নিজের সবটুকু দিয়ে শ্রীময়ীকে আগলে রাখার নতুন প্রতিশ্রুতিটা মনে মনে নিয়ে নিল সে।

অভিমান, হ্যাঁ এটাই অভীক আর শ্রীময়ীর ছেলের নাম। কার্ডে তেমনটাই লেখা আছে-“ অভিমানের ১বছরের জন্মদিন উপলক্ষে আপনাদের নিমন্ত্রণ রইল।” খুব খুশি ওরা এখন। অভিমান যেন ওদের সকল অভিমানের প্রাচীরকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়েছে। এখন ওরা পালা করে অভিমানের দায়িত্ব নিতে শিখেছে। নো একস্ট্রা টাইম ইন্টারনেট অফিস, একসেপ্ট হোম। অভিমান ওদের কর্পোরেট ওয়ার্ল্ড থেকে ব্রেক নেওয়ার কারণ তো বটেই, সাথেই বেঁধে রাখার সুতোও এখন সে।

কখনো কখনো অভিমান যেমন দূরত্ব বাড়ায়, তেমন সব দূরত্ব মিটিয়ে দুটো মানুষ কে কাছাকাছি ও এনে দিতে পারে।

তাই সব সম্পর্কের আড়ালে কখনো কখনো কোথাও না কোথাও অভিমান থাকাটা শুধুমাত্র দরকার নয়, ম্যান্ডেটরি ও বটে।

_____


FavoriteLoading Add to library
Up next
প্রথম মিস্টার পারফেকশানিস্ট-  অস্থির কবি ( কল্লোল ...   উত্তম পর্ব -তিন   ইদানিং বলিউডের আমির খানকে মিস্টার পারফেকশনিস্ট বলা হয়। যেমন এক কালে রাহুল দ্রাবিড়কে ওয়াল বলা হত। ক্রিকেট দেখা ছেড়ে দি...
রিভিউ – এক যে ছিল রাজা – অন্বয় গুপ্ত... ২০১১ সালে সুভাষ ঘাইয়ের প্রযোজনায় ঋতুপর্ণ ঘোষ ' নৌকাডুবি ' সিনেমাটা বানিয়েছিলেন। আমরা তখন স্কুলে পড়ি। তদ্দিনে সৃজিত মার্কেটে চলে এসেছেন। সেই সিনেমায় ট...
প্রেমের গল্প -"একি বাবা তুমি খালি হাতে বসে রইলে যে?মিষ্টি গুলো তো তোমাদের জন্যেই আনা..দিদি বলুন না ছেলেকে,নিজেরই ঘর ভাবো বাবা...খাও খাও..মেয়ে তৈরী হচ্ছে,এক্ষুনি আস...
চোর – বিভূতি ভূষন বিশ্বাস...       সবে ডিউটি থেকে রানাঘাট সি.আর.ই রেল কোয়াটারে ফিরছি পাশেই রাজীব পল্লীতে অনেক লোকজনের ভীড় । দুটি পুলিস ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে, দেখেই বুঝে গেলাম ব্যাপারট...
স্মৃতি – স্বরূপ রায়...   ছিন্নভিন্ন দেহটা পড়ে ছিল বহুতলটার নিচে। চারিদিকে অসংখ্য মানুষের ভিড়। মাথাটার পাশে একরাশ রক্ত জমে আছে। জমে থাকা মানুষের ভিতর থেকে নানান মন্তব্য কানে ...
ভিলেন – অর্পণ সামন্ত... মানুষের জীবন এখানেই শুরু হয়। হসপিটাল। একেবারে শুভ্র চাদর পাতা শয্যা।যেমনটা হাসপাতালে দেখা যায়।হাসপাতালের মূল ঘড়িতে বারোটা বাজলো প্রায় নিঃশব্দে। ডিজিটা...
নির্ভুল – শ্বেতা মল্লিক... 'উফফ! সকাল সকাল এতবার ফোন করে ঘুম ভাঙ্গাচ্ছিস কেন সুমি? জানিস তো কাল কত রাতে ফিরেছি।' , ঘুম ও বিরক্তি মেশানো গলায় বলে উঠলো রণিত। ' তাড়াতাড়ি হোয়াট...
সম্পর্কের চিলেকোঠায় – বিদিশা মন্ডল... পরন্ত বিকেলে সূর্য যখন তার লালচে সংসার নিয়ে পশ্চিমদিকে ঢুলুঢুলু চোখে পাড়ি দিয়েছে তখন তানিয়া এককাপ ধোঁয়া ওঠা কপির কাপ হাতে ওর ফ্ল্যাটের বারান্দায় এসে দ...
মায়ের আঁচল- বিভূতি ভূষণ বিশ্বাস ...   আরে বাপরে ১০ টা বেজে গেছে,সর্বনাশ করেছে ১০ টা থেকেই তো ডিউটি । তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়লাম । কি আর করবো সব কাজই তো আমাকে করতে হয় । যাবার সময় মা ...
জঠর – পদ্মাবতী মন্ডল... কী গো! তোমার সকাল হল? বড় লোকের বেটি তিন পো বেলা কেটে গেল পেলাম না তো চা'টি । ঠাকুর দ্যেবতা ডর নেই মা এমন অলক্ষুণে , পাঁচ বছরেও ,জ্বলল নাকো বংশ ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment