গতি – শ্বেতা আইচ

‘তার মানে আমার আর কোন প্রয়োজন নেই, তাই তো?’

‘উফফ! আমি কি একবারও সে কথা বলেছি?’

‘মুখে বলোনি,তবে বলে দিলে বোধহয় ভালো করতে।’

গত ৩ মাস ধরে সম্পর্কটা বয়ে নিয়ে চলছে সুমি। ৩ মাস আগে এতটা ভার মনে হয়নি, যতটা এখন মনে হচ্ছে। একটা প্রাইভেট ফার্মে কাজ করে সুমি। মাইনে যা পায় তাতে একার মত চলে যায়। সচ্ছল পরিবারের মেয়ে, তাই প্রায় পুরো মাইনে টাই সুমির পকেট মানি হয়ে থেকে যায়। খুব হাসিখুশি মেয়ে সুমি, কথা বলতে বড্ড ভালোবাসে। অফিসে যদিও একটু আধটু সিরিয়াস ইমেজ রাখতে হয়, তবু সুযোগ পেলেই আড্ডা দিতে এক ফোঁটা ও সময় নষ্ট করে না।

বারবার প্রেমে পড়তে বেশ ভালোই বাসে সুমি। ভগবান ওর মনের কোণের কোন জায়গা ফাঁকা রাখেনি। স্কুল, কলেজের প্রায় প্রতিটি ক্লাসে নতুন নতুন মানুষ কে পেয়েছে, কখনো সিনিয়র হিসেবে, কখনো বা প্রেমিক হিসেবে। মোর দ্যান ফ্রেন্ড সিপ ও হয়েছে কয়েক বার। প্রতি বার ব্রেক আপ, কয়েক দিনের কষ্ট আর কান্নাকাটি। ব্যস, তারপর সব ভুলে নতুন স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া, এই নিয়েই তো সুমির লাইফ। কিন্তু এরকম আপস্ অ্যান্ড ডাউনসের মাঝে হঠাৎ যে কোনখান দিয়ে জীবনটা থমকে গেল তার বুঝতেই পারিনি সুমি।

ঘটনাটা একটু খুলে বলা যাক। এক বছর আগে কোম্পানি জয়েন করে সুমি। সবাই সিনিয়র, কাজ হোক বা বয়স। একটু অস্বস্তি হত প্রথম প্রথম সুমির, এতগুলো মানুষের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। টেনশন,ভয়, আনন্দ সব একসাথে কাজ করলে কেমন লাগতে পারে তা‌ সুমি খুব ভালো করে বুঝেছে। তবু সেল্ফ কনফিডেন্স লেভেলটা ছোট থেকেই একটু বেশি, তাই দুমাসের মধ্যেই অফিসে নিজের জায়গাটা পাকাপাকি ভাবে করেই ফেলল। তবে সমস্যাটা ছিল একজনকে নিয়ে, ঋষি। মেপে কথা বলা, মেপে হাসা, এগুলোর কম্পিটিশন হলে ঋষি হয়ত ফার্স্ট হবে এমনটাই মনে করত সুমি। অফিসে সবাই বলে, ওর বউ যে কি করে ওর সাথে থাকে কি জানি? মুখে যাই বলুক, মনে মনে সুমির বেশ ভালোই লাগত ঋষিকে। সুযোগ পেলেই কথা বলতে চাইত। আসলে সুমির বরাবরই একটু অন্যরকম মানুষদের পছন্দ।  ঋষি কেও সেই ক্যাটাগরিতে ফেলেছিল।

সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু অফিস পার্টির দিনটা জীবনে একটা নতুন মোড় এনে দেবে তা কখনো ভাবিনি সুমি। প্রথম শাড়ি পরে অফিস যাওয়া, সবার নজর কেড়েছিল সুমি। তবে একজনের চোখ যে সেদিন আটকে গেছিল একথা সুমি বেশ বুঝতে পেরেছিল। সেই রাতে প্রথম ঋষির ফোনটা এসেছিল, ‘বাড়ি পৌঁছে গেছো  ?’ সত্যি অবাক হয়েছিল সুমি। ইট ওয়াজ রিয়্যালি আনএক্সপেকটেড। তার মানে ছেলেটা কথা বলতে জানে, সুমি বুঝতে পেরেছিল।

 এরপর থেকে ঋষির মধ্যে বেশ কিছু চেঞ্জেস সুমির চোখে পড়ে। ধীরে ধীরে নাইট চ্যাটিং বেড়ে যায়। ম্যারেড ম্যানের সাথে এই প্রথম সম্পর্কে জড়ানোর হাতেখড়ি কিনা। মুভি ডেট, রেস্টুরেন্ট মিটিং এর পাশাপাশি সম্পর্কটা আরো গাঢ় হতে শুরু করে। দুজনে দুজনকে লাইফের অনেক আনটোল্ড স্টোরি শোনাতে থাকে, পাওয়া না পাওয়ার গল্পে মেতে ওঠে ওরা। এরকম পরিস্থিতিতে গন্ডি পার করে যাওয়াটা খুব একটা অস্বাভাবিক ছিল না।

দুজনের চ্যাটিং এ বোল্ড টাচ হয়ত ছিল, কিন্তু বোল্ড স্টেপটা এভাবে ওরা নিয়ে নেবে সেটা বুঝতে পারিনি। সামান্য টাচ থেকে শরীরী খেলায় মেতে ওঠার সময়কালটা খুব বেশি ছিল না। অলিখিত চুক্তির মত একে অপরকে অপূর্ণতার জাল থেকে বের করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল। ছিল না ভবিষ্যতের চিন্তা, বর্তমান টাই ওদের কাছে প্রিয় ছিল। তবে শরীরের আড়ালে মনটা কিন্তু ঢাকা পড়ে যায়নি সুমির। কিছুদিনের মধ্যেই ভালোবেসে ফেলল ঋষিকে। ভালোবাসা হয়ত ঋষির দিক থেকেও ছিল, কিন্তু সুমি কে সে ক্রস করতে পারেনি। ভালোই চলছিল সময়টা। প্রফেশনাল আর পার্সোনাল কে কখনো এক করে ফেলেনি ওরা। তবু মাঝে মধ্যে কাজের ব্যাপারে ঋষি একটু বকে দিলে অভিমান হয় বটে সুমির। প্রথম প্রথম ঋষি সেটা বুঝতে পারত, মানিয়ে নিত। কিন্তু গতি জিনিসটা যে সব সময় এক থাকে না, সেটা সুমি জানত না। সময়ের সঙ্গে সুমির ভালোবাসা যেমন বেড়েছে, অভিমান,রাগ, ডিপেন্ডেন্সি এগুলোর পরিমাণও বেড়েছে। সাথে করে এনেছে অনেকটা ভুল বোঝাবুঝি। সময়ের সাথে সাথে ঋষির ওকে সময় দেওয়া কমেছে। ঋষির কাজের চাপকে সুমির এখন অজুহাত মনে হয়। ধৈর্য হারিয়ে যাচ্ছিল সুমির।

অবশেষে বাঁধ ভাঙল, অফিসে ঋষির সাথে অনেক কথা কাটাকাটি হল। খুব কষ্ট হচ্ছিল সুমির, বুকের মধ্যে তোলপাড় করছিল। সারা রাত ছটফট করেছে, শুধু একটা ম্যাসেজের অপেক্ষায় রাত কেটেছে। কিন্তু সেদিনের পর থেকে আর কোন কথা হয়নি ঋষির সাথে। অফিসে খুব সুন্দর ভাবে এড়িয়ে গেছে সুমিকে। অনেকগুলো দিন অপেক্ষা করে সুমি আজ ফোন করল-

‘আমি আসলে সে ভাবে কিছু ভাবিনি, আমার মনে হচ্ছিল আমাদের একটু স্লোলি মুভ করা দরকার, কোথাও যেন কিছু একটা ঠিক চলছে না, তাই এখন কদিন চুপচাপ আছি’, অবশেষে মুখ খুলল ঋষি।

‘কি ঠিক চলছে না? সেটা কি একবারও আমাকে বলা যেত না? আগে তো আমার সামান্য অভিমান ভাঙ্গানোর জন্য আমার বাড়ি অবধি চলে আসতে, আজ একাই এত কিছু ভেবে ফেললে? ডিসিশন নিয়ে ফেললে?

‘তুমি কিন্তু ভুল করছ, আমি কোন ডিসিশন নেইনি। জাস্ট একটু চুপচাপ আছি।’

‘ফাইন, দেন আমিই ডিসিশনটা নিয়ে নিলাম। সত্যি বলতে তোমার এই চুপ থাকাটা আমাকে অনেক কিছু শেখালো।’

‘তো কি বুঝলে?’

‘তুমি গতি কমিয়েছ, আমি গতি থামালাম। সর্ম্পকটা দুজনের ইচ্ছাতে শুরু হয়েছিল, তাই যেখানে আমার ভালো খারাপের কোন দাম থাকে না, সেখানে আমি ও থাকি না।’

এরপর আর কখনো কথা হয়নি ঋষির সাথে সুমির। ঋষি অনেক ভাবে যোগাযোগ রাখতে চেয়েছে, হয়ত আজও চায়। কিন্তু সুমি পারেনি। ভালোবাসা শক্তি, আত্মসম্মান পুরষ্কার। এগুলোকে যে দুর্বলতা ভেবে নেবে, তার জন্য সুমির জীবনে কোন জায়গা নেই। দুজনে আজও একই অফিসে চাকরি করে, একটা সুন্দর প্রফেশনাল রিলেশনশিপ মেইনটেইন করে চলেছে। কিন্তু অফিসের বাইরে ওদের জগৎটা আলাদা হয়ে গেছে। পালিয়ে যেতে পারেনি সুমি,কারণ সে একটা মানুষ কে দিয়ে কখনো অন্যদের বিচার করেনি। আসা যাওয়া তো লেগেই থাকবে কিন্তু জীবন একবারই আসবে। সেই জীবন কেই উপভোগ করে চলেছে সুমি, এগিয়ে চলেছে। সামনের দিকে, নতুনের দিকে।

____


FavoriteLoading Add to library
Up next
শেষ থেকে শুরু -পায়েল সেন    সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। তাই সুজয় চললো তার ঘরের সমস্ত জানলা বন্ধ করতে। ভিজে গিয়েছিল প্রায়। ঘর অন্ধকার করে এসে একমনে বসেছিলো ...
দৃষ্টিভেদ – শুভেন্দু সামন্ত... হিমের ভোর-জানালার রোদ শিখার মতো তোমার মায়াভরা দৃষ্টি , বুক ভেদ করে যায় চোলে । এ-প্রান্ত থেকে ও- প্রান্ত ।এ বড় মধুর দহন , যেন স্বপ্নের দেশে স্ব...
ভূ-স্বর্গ ঘুরে আসুন... - বিভূতি ভূষন বিশ্বাস               ভ্রমন করতে কে না ভালোবাসে কিন্তু ভ্রমন করাই মানে যেমন আনন্দ করা তেমনই এটাও খেয়াল রাখা উচিত সেটি কোনমতেই যেন নিরান...
শৈশবের উত্তমকুমারকে ফিরে দেখা... - অস্থির কবি (কল্লোল চক্রবর্তী)  উত্তম পর্ব- ১ ছোট বেলা। সবে জ্ঞান হয়েছে। একটা চিত্র প্রদর্শনীতে গেছি। হাসিমুখের এক ব্যাক্তির ছবিতে চোখ আটকে গেল। বল...
মুক্তি - রুমা কোলে   কোন এক এলোমেলো বিকেলে পড়ন্ত রোদের আঙিনায়, এক বন্য পাখি বসেছিল অনেকক্ষণ, ওড়েনি তার ঠিকানায় l পরম যত্নে,পরম আদরে পুষেছিলাম ...
রিভিউ – এক যে ছিল রাজা – অন্বয় গুপ্ত... ২০১১ সালে সুভাষ ঘাইয়ের প্রযোজনায় ঋতুপর্ণ ঘোষ ' নৌকাডুবি ' সিনেমাটা বানিয়েছিলেন। আমরা তখন স্কুলে পড়ি। তদ্দিনে সৃজিত মার্কেটে চলে এসেছেন। সেই সিনেমায় ট...
শুধু তুমি চাও যদি – পদ্মাবতী মন্ডল... ফোনটা সাইলেন্ট মোডে ছিল। অনেক কটা মিসড্ কল হয়েছে।বাড়ীতে থাকলে ফোনটা সাইলেন্টই থাকে। মা বা বাপি কেউ জানতে পারলে আর রক্ষে নেই । আসলে বৃন্দার কাছে যে ফোন...
আম বাগানে কে? – শ্রাবণী সরকার... আমার মামারবাড়ি ওদলাবাড়ি। ডুয়ার্সের এক ছোট্ট চা বাগান ঘেরা মফস্বল টাউন। এখনও ভারী শান্ত। আমার মায়ের ছোটবেলায় সেটি ছিল আরো জনবিরল চুপচাপ একটি গ্রাম। মায়...
ক্ষত - বর্ষা বেরা প্রাপ্তি নীরবতা, ট্রিগারে জীবন্ত দহন l উন্মাদ জ্বলন্ত প্রেম, গাইছে সাতকাহন ll নিকোটিনে হয়েছি বিভোর, কেটেছে শতরাত্রি l দিবানিশি ভেব...
মহালয়া – মুভি রিভিউ... মহালয়াপরিচালক - সৌমিক সেন বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হল মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে মহিষাসুরমর্দিনী শোনা। ১৯৩১ সাল থেকে শুরু হয...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment