বাজার অভিযান – সমর্পণ মজুমদার

 আজকের মেসের বাজারের পালা পড়েছে আমার ওপর। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে  সবার ওপরেই একেকদিন পড়ে। যার যেদিন বাজার করার থাকে, সে চলতি মাসের ম‍্যানেজারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় টাকা নিয়ে বিকেলবেলায় বাজার করে আনে। আজ যেহেতু মঙ্গলবার, তাই আজ রাতে মাছের ঝোল রান্না হবে। যথাসময়ে এমাসের ম‍্যানেজার বিধানদার থেকে সাতশো টাকা নিয়ে, মেস থেকে নেমে এলাম। রুমমেট প্রত‍্যুষকেও সঙ্গে নিয়ে নিলাম। তারপর দুজনে মিলে হেলতে দুলতে হাতে থলি ঝুলিয়ে বাজারের অভিমুখে যাত্রা  করলাম। চব্বিশজনের মাছ আনতে হবে আজ, সঙ্গে কাল সকালের জন্য সব্জি।

              সন্ধ্যে ততক্ষণে নেমে গিয়েছে। ফিরতে বেশি দেরি করা যাবে না। নাহলে রান্নার মাসিকে এসে বসে থাকতে হবে। ওজন-টোজন করে, ভোম্বল কাকুকে বললাম মাছদুটোকে মোট চব্বিশ খন্ড করতে। ততক্ষণে সব্জি বাজারটা সেরে নিলাম। কুমড়ো, পুঁইশাক, বরবটি আর পটলের সম্মিলিত আয়তনে থলিটা বেশ স্ফীত হয়ে উঠেছে। এরপর মাছের দোকানে যাওয়ার ঠিক আগে যা শুরু হলো, তার বিবরণ দেবার জন্যই এতোকিছু লেখা ! বরাহনগরের আকাশে জমে থাকা মেঘ থেকে হঠাৎ করে পড়তে শুরু করলো জোরালো আর নাছোড়বান্দা বৃষ্টি ! এর ফলে এই বরাহনগর শহরের সমস্ত জনজীবন মোটেও স্তব্ধ হলোনা। শুধু সেইসব বেচারারা যে যেখানে ছিল সেখানেই থেমে গেল, যারা আমাদের মতো ছাতা নিয়ে বেরোয়নি। বর্ষাকালের বিকেলে ছাতাহীন বহির্গমনের বোকামির ফলাফল ভালোমতন ভোগ করছি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। তারপর ভ্রু কুঁচকে গোমড়ামুখে বৃষ্টি কমার অপেক্ষা করতে লাগলাম। আর কল্পনা করতে লাগলাম রান্নাঘরে উপবিষ্ট মাসির শ্রীমুখ হতে নিঃসৃত হবার জন্য কোন্ কোন্ বাছা বাছা মিষ্টবাক‍্য আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে ! হে ভগবান, এই দুই বেচারার পূর্বকৃত কোন পাপ থাকলে ক্ষমা করুন।

             নাঃ ! ভগবান আছেন দেখলাম। মিনিট দুয়েকের জন্য বৃষ্টিটা একটু কমতেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করলাম। সব্জিবাজার থেকে, পাকা খেলোয়াড়ের মতো কয়েকটা লংজাম্প দিয়ে চলে এলাম মাছের বাজারে। মাছ ততক্ষণে প‍্যাকেটবন্দী করে ফেলেছে ভোম্বল কাকু। টাকাপয়সা চুকিয়ে দিয়ে আমরা বাজার পরিত‍্যাগ করে মেসপানে অগ্রসর হবার চিন্তা করার সঙ্গে সঙ্গেই ভগবান আমাদের সাথে ইয়ার্কি মারলেন। বৃষ্টি তিনগুন হয়ে গেল এক লহমায়। আবার দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে শুরু করলাম। তবে বেশিক্ষণ না ! চার-পাঁচ মিনিট পরেই আমার মধ্যে জেগে উঠলো প্রতিবাদী সত্তা। সে এক প্রবল, সুতীব্র, উন্মত্ত, ভীষণ জগদ্বিজয়ী চিন্তায় আমার মন উত্তাল হয়ে উঠলো ! পাশে দাঁড়ানো শুষ্কমুখো প্রত‍্যুষের উদ্দেশ্যে গর্জন করলাম, “প্রত‍্যুষ ! আর নয়” ! বাইরের ঝমঝম বৃষ্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমার আওয়াজটাও যেন একেবারে গমগম করে উঠলো। “যতই বৃষ্টি পড়ুক, এবার আমাদের বেরোতেই হবে”, আমি বললাম। প্রত‍্যুষ আমার দিকে সবিস্ময়ে তাকালো। ঠিক ঐভাবে তাকিয়েই বোধহয় অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দেখেছিলেন। যাইহোক ওর অবাক মুখ আমায় একটুও নিরস্ত করলো না। আমি তখন ডিটারমাইন্ড !

           কেজি চারেকের থলি হাতে নিয়ে বীরদর্পে এগিয়ে গেলাম আমি। দুয়েকবার কুঁইকাঁই করে শেষমেষ প্রত‍্যুষও এগোতে লাগলো। সজোরে পতনশীল অবিরাম বৃষ্টি মাথায় করে, রাস্তায় জমে যাওয়া জল পায়ে করে এগিয়ে চললাম কোন এক অজানা ভবিষ্যতের উদ্দেশ্য ! প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই বরাহনগর শহরের রাস্তায়, ব‍্যাঙের মূত্রও অনেকসময় বন‍্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যাইহোক, এভাবেই আমরা সকল বাধা অতিক্রম করতে করতে নৈপুণ্যের সাথে এগোতে লাগলাম। সামনে নর্দমা আছে কিনা তা নির্ণয় করতে করতে, ভারী থলেটাকে এহাত ওহাত করতে করতে এগোতে লাগলাম। যে অংশে জল জমে নেই, সেখানে হনহন করে হাঁটতে লাগলাম।

            প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে বলে বেশি কেউ পথচারী নেই। কিন্তু যারা আছে, তারাও ছাতাহাতে ! সুতরাং, আমরা দুজন বেশ আকর্ষণের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিলাম। আটকে পড়ে রাস্তার পাশের দোকানে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি কমার অপেক্ষা করা মানুষেরা, সলজ্জ দৃষ্টি দিয়ে তাকাচ্ছিলো। আমিও মনে মনে বলছিলাম, “দেখো সবে, কিছুই আমাদের থামাতে পারেনা। আর ছাতা ? ওসব আমরা অপছন্দ করি !” এভাবেই বীরের মতো হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম মেসের কাছে।

             মাসি তো নিশ্চয় এসেই গেছে কিছুক্ষণ আগে। অবশ্য বৃষ্টিতে আটকেও পড়তে পারে। থলের সব্জিগুলো যা ভিজেছে, তার পরে আর ধোয়ার দরকার পড়বে বলে মনে হয় না। আর মাছ ? জল পেয়ে ওরা সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে নিশ্চয়ই। পুকুরপাড়ের বড়ো অ্যাকোয়ারিয়ামটায় বেশ কিছু বাহারী মাছ আছে ! ওরা বেশ সৌভাগ্যবান বলে মনে হলো। জলের ভেতরে থেকে বাইরের বৃষ্টি দেখা কি সবার ভাগ‍্যে জোটে ? যাইহোক, অবশেষে আমরা জয়লাভ করে মেসে প্রবেশ করলাম ! রান্নাঘর সেই পাঁচতলায়। উঠতে উঠতেই ভাবছিলাম, কি হতে চলেছে এবার।  যথারীতি বসে বসে শিকারের, থুড়ি আমার অপেক্ষাই করছিলো। কিন্তু কি অদ্ভুত ! আমি রান্নাঘরে যেতে, মাসি আমার অবস্থা দেখে হেসেই ফেললো। আমিও সগর্বে বললাম, “এই রইল বাজার” ! একটা প্রচন্ড বিজয়গর্বে মন ভরে উঠলো ! টানা পনেরো মিনিটের বৃষ্টিভেজা বাজার অভিযানে আমি আর প্রত‍্যুষ সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছি।

                ঘরে এসে দেখলাম পকেটের ৫৮৫ টাকার অবস্থা টাইট ! পাঁচ টাকার মুদ্রাটার তো কোন সমস্যা নেই। কিন্তু পাঁচশো, পঞ্চাশ আর কুড়ি টাকায় থাকা গান্ধীজীর ততক্ষণে ভিজে-টিজে সর্দি হয়ে গেছে !

যাই এবার আমরাও একটু স্নান করে আসি। নইলে আবার বৃষ্টির জল বসে গেলে আমাদেরও সর্দি হয়ে যাবে।

____


FavoriteLoading Add to library

Up next

প্রসঙ্গ সত্যজিৎ প্রসঙ্গ সত্যজিৎ পর্ব - ১সত্যজিৎ রায় যে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারি ছিলেন তা সর্বজনবিদিত । তাঁর ছিল অসামান্য আঁকার হাত। যার জন্য এগুলো বলা তার কারণ হল আজ ...
ক্ষত - বর্ষা বেরা প্রাপ্তি নীরবতা, ট্রিগারে জীবন্ত দহন l উন্মাদ জ্বলন্ত প্রেম, গাইছে সাতকাহন ll নিকোটিনে হয়েছি বিভোর, কেটেছে শতরাত্রি l দিবানিশি ভেব...
আমরা ছিলাম আমরা আছি আমরা থাকবো – দেবাশিস ভট্... "200671 আপ হাওড়া নাগার্জুন এক্সপ্রেস দশ নম্বর প্লাটফর্ম থেকে রাত নটা পনেরো মিনিটে ছাড়বে"। ঘোষণাটা শুনে সুজন নিজের ট্রলি ব্যাগটা নিয়ে এগিয়ে চললো নির্দ...
ওরা ভালবাসতে জানে না – কৌশিক প্রামাণিক... ওরা ভালবাসতে জানে না, শরীরটা যেন ভোগ্যপণ্য মেকি প্রেমের মোড়কে, সদ্যজাত শিশুর তাই স্থান হয় নির্জন সড়কে | ওরা ভালবাসতে জানে না, পশুদের ধারালো দন্তে ...
শাসন - সরোজ কুমার চক্রবর্ত্তী   ড্যাডি বলে প্রফেসার মম্  বলে ডাক্তার দাদু , দিদা বলে ভাই হতে হবে অফিসার l বই আর খাতা নিয়ে কাটে সারাক্ষণ, ভাল...
মনপাখি – রাজেশ সামন্ত... 'মনপাখি' চল নারে আজ অনেকদূর যাই , সবুজ ঘেরা ভালোবাসার নিশান যেথায় পাই | মেঘকে আজ ভেলা করে আকাশে দেবো পাড়ি , শঙ্খচিলেরা উড়বে যেথায় দলবেঁধে সারি সারি...
মোহিনীর আতঙ্ক – শাশ্বতী সেনগুপ্ত...    জঙ্গলে পিকনিক? কথাটা শুনেই না করে দিয়েছিল রাজ। জঙ্গল এমনিতেই ভয়ঙ্কর। তার ওপর আবার এক রাত থাকা। মুখের কথা নাকি? কোনও দরকার নেই ভাই, পরিস্কার কথাটা ফ...
অমানুষ, এক অমর উত্তম গাথা-... - অস্থির কবি (কল্লোল চক্রবর্ত্তী) (উত্তম পর্ব ২) উত্তম কুমারের প্রায় শেষ দিকের অভিনয় জীবনের এক মাস্টার স্ট্রোক হল - "অমানুষ"। এই ছবির পর তিনি বম্বেত...
ছুটি – পরিতোষ মাহাতো... বৈশাখের ভ্যাপসা গরমে পিঠে সভ্যতার বোঝা বাবার অব্যবহৃত সাইকেল আর ঝোলা ব্যাগটার সঙ্গে বন্ধুত্ব সারা সপ্তাহের অবিরত  ছুটে চলা লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন...
মুক্তি - রুমা কোলে   কোন এক এলোমেলো বিকেলে পড়ন্ত রোদের আঙিনায়, এক বন্য পাখি বসেছিল অনেকক্ষণ, ওড়েনি তার ঠিকানায় l পরম যত্নে,পরম আদরে পুষেছিলাম ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment