একটা রাত – মুক্তধারা মুখার্জী

 উফফ! আজকে একটু বেশীই রাত হয়ে গেলো। এখন তো কোনো ট্যাক্সিও পাবো না। আর মেইন রাস্তার মোড় অব্দি না গেলে ওলাগুলোও আজকাল ঠিকঠাক পাওয়া যায় না। নাঃ! হাঁটতেই হবে এতটা। কি আর করা যাবে !তাড়াতাড়ি পা চালালো অস্মি। দু পা এগোতেই দেখে তিনটে মাতাল টাইপ লোক তাকে যেন ঘুরে ঘুরে দেখছে। ফোনে ওলা অ্যাপটা খুলে আবার দেখতে লাগলো যদি কোনো গাড়ি পাওয়া যায়। নাঃ, সেই একই অবস্থা। এদিকে লোকগুলো যেন ওরই পিছু পিছু আসছে। খুব ভয় করছে অস্মি। আজকাল কাগজ টিভি খুললেই ধর্ষণ আর খুন। রাস্তায় মেয়েদের নিরাপদে চলাফেরাই মুশকিল হয়ে গেছে। শয়তানগুলো একটা বাচ্চাকেও পর্যন্ত ছাড়ে না। এত নির্মম নিষ্ঠুরও কেউ হতে পারে ভাবনার অতীত। মেইন রোড এসে গেছে। কিন্তু কোনো গাড়ী পাচ্ছে না অস্মি। তিনটে লোক এখান অব্দি এসে গেছে। কি করে নিজেকে এবার বাঁচাবে অস্মি? ব্যাগে মিনিমাম বডি স্প্রে টুকু নেই। ফোন করে কার কাছেই বা সাহায্য চাইবে?

—- দিদি, কতদূর যাবেন?

চমকে ফিরে দেখে ওই তিনজনের মধ্যে একজন।

—-আমি যেখানেই যাই, আপনার তাতে কি?

—- না দিদি, আজ তো আর গাড়ি পাবেন না। ওলা উবের কিসব দাবিতে আজকে সার্ভিস বন্ধ রেখেছে। আপনি এত রাতে কিভাবে যাবেন তাই জিজ্ঞাসা করছিলাম।

অস্মি ভালো করে চেয়ে দেখে ছেলেগুলো কে। দূরে তার সঙ্গী দাঁড়িয়ে আছে। কি মতলব কে জানে? তাকে হয়তো ভুলিয়ে ভালিয়ে সাহায্যের নাম করে…. ভাবলেই হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। উঁহু! ভয় পেয়ে চলবে না।

—- দিদি, ভয় পাবেন না। আমরা এই এলাকারই ছেলে।পাড়ায় টহল দি। আজ আমার জন্মদিন ছিল। তাই একটু  বুঝতেই তো পারছেন খেয়ে ফেলেছি। ওরাই বেশি খেয়েছে তাই দূরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ট্যাক্সি চালাই। কতদূর যাবেন যদি বলেন গাড়ি নিয়ে আসতে পারি।

— না। ঠিক আছে। আমি দেখে নিচ্ছি।

অস্মির কথায় ছেলেটা যেন সামান্য আহত হয়। হয়তো সে অস্মির চোখে নিজের জন্য অবিশ্বাসটা দেখে ফেলে। সত্যিই তো! যা দিনকাল পড়েছে! কি করেই বা একটা অজানা অচেনা ছেলেকে বিশ্বাস করবে। মাথা নীচু করে বাকি দুই সঙ্গীর কাছে গিয়ে দাঁড়ায় আর কি সব বলে।

অস্মি আড়চোখে তাকিয়ে দেখে ওদের। নিজেদের মধ্যে কিসব নিয়ে বাক বিতন্ডা হচ্ছে যেন! তবে কি ছেলেটা ওকে ভুলিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি বলে বাকিরা ওকে দুষছে? এবার কি ওরা জোর করে ওকে….. আরেকবার মোবাইলটা অন করে একবার উবেরটা চেক করে। উঁহু! কিচ্ছু নেই। এমন সময় একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়ায়।

—পার্ক সার্কাস যাবেন?

— পাঁচশো লাগবে।

— কি? এত গলা কাটছো ভাই! পঞ্চাশ টাকা বেশি নাও তা বলে এতো?

— এটাই লাগবে। নয়তো যাবো না।

অস্মি চিন্তায় পড়ে যায়। এগারোটা বেজে গেছে। অথচ এরকম অন্যায় দাবী ও মোটেই মানতে পারে না।

— ওই হারামি বেশী বেড়ে গেছো না? চল। মিটার চালু কর। যা ভাড়া তাই নিবি। এক টাকাও বেশি নিবি না। নয়তো কাল থেকে তুই কি করে গাড়ি চালাস আমিও দেখে নেবো।

অস্মি দেখে ওই গ্রুপেরই আরেকটি লোক এসে ধমকাচ্ছে ট্যাক্সি ড্রাইভার টাকে।

ট্যাক্সি ড্রাইভারটা সামান্য তরপে ওঠে,

— ওই! কাকে রেলা দেখাচ্ছিস?

— তোকেই বে! আমি কে আছি জানিস! যার ট্যাক্সি চালাচ্ছিস সে আমার গুলাম আছে বুঝলি? লাগা নয়তো তোর হারানদা কে ফোন। নাকি আমি লাগাবো?

টাক্সিওয়ালাটা যেন মিইয়ে যায়। অস্মি কে বলে,

— বসুন দিদি। পৌঁছে দিচ্ছি।

মাস্তান টাইপ ছেলেটা বলে,

— যান দিদি। ও আপনাকে ছেড়ে দেবে। কোনো অসুবিধা হলে আমাকে ফোন করতে পারেন । এক মিনিট দাঁড়ান। ওই রাজু একটা কাগজ দে তো।

প্রথম ছেলেটা দৌড়ে আসে।

—রাজু দিদিকে আমার নম্বরটা দিয়ে দে তো। আর দিদি, মাল খেয়েছি ঠিকই কিন্তু এখনো মনুষ্যত্ব আছে। কিছু করার হলে এতক্ষণ কথা বলতাম না। অনেক আগেই…..

—- আহ! রনি দা, কিসব বলছো ওনাকে?

—- নারে! ঠিকই বলছি। উনি আমাদের যা ভাবছিলেন আমরা ততোটাও যে খারাপ নই সেটা অন্তত জেনে যাওয়া উচিত।  তো যা বলছিলাম দিদি, আমরা আপনাদের মত ভদ্দরলোক নই ঠিকই কিন্তু মেয়ে মানেই এক খাবলা মাংস ভাবি না। মেয়ে মানেই আঁচল ধরে টান দিইনা। ছোটলোক ঠিকই মালও খাই কিন্তু এখনো ভুলে যাইনি আমিও আপনারই মত কোনো মেয়ের যোনি থেকে বেরিয়েছি।  তবে কি বলুন তো, আপনাকেও  দোষ দেওয়া যায় না । চারদিকে যা হচ্ছে, ধর্ষণ আর পুরুষ একই ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কি জানেন সব পুরুষই ধর্ষক নয়! এই এলাকাটা রাতের পর রাত টহল দি যাতে একটা মেয়ের গায়ে আঁচড় টুকুও যেন না পড়ে! এতদিন পুরুষ মানে বাবার কথা সব মেয়েদের মনে আসতো আর এখন পুরুষ মানেই ধর্ষকের কথা মনে আসে। এই ছবিটা আমি পাল্টে দিতে চাই। শুধু আপনারা একটু বিশ্বাস করবেন, অন্ধ বিশ্বাস নয়। অল্প একটু বিশ্বাস—অন্তত যে ছেলেগুলো মেয়ে আর যোনি এক ভাবে না, যে ছেলেগুলো বোনের কথা উঠলে টুঁটি টিপে ধরে তারা কিন্তু আজও সংখ্যায় অনেক বেশী। শুধু খারাপের আড়ালে আমরা তাদের যেন ভুলে না যাই। ভালো থাকবেন দিদি। চললাম। ওই, গাড়ি স্টার্ট মার। চল রাজু।

ট্যাক্সি চলতে শুরু করলো। অস্মির চোখে জল। মনে মনে ভাবে,

 তোমাদের মতো দাদাগুলোকে যদি বিপদের সময় সব মেয়ে পাশে পেতো আজ তবে মনে এই সন্দেহের বিষ ঢুকতো না। পারলে ক্ষমা কোরো আমায়।

____


FavoriteLoading Add to library

Up next

মা - বিভূতি ভূষণ বিশ্বাস বুঝলে বিপিনের মা এবার নিজের চেহারার দিকে একটু খেয়াল দাও দিন দিন যা মোটা হয়ে চলেছ যদি এক বার বিছানায় পড়ো বিপিন তো দূরের কথা দশ জ...
মন মিলান্তি(পর্ব-৪~শেষ পর্ব)... #মন_মিলান্তি_পর্ব_৪ #মুক্তধারা_মুখার্জী #চরিত্র_ঘটনা_কাল্পনিক,#মিল_খুঁজে_পেলে_লেখিকা_দায়ী_নন😊 বমিটা হওয়ার পর থেকেই শরীরটা কেমন করছিল যেন শ্রেয়সীর। ত...
ভালো থেকো বাবা - মুক্তধারা মুখার্জী   “কি ব্যাপার? হঠাৎ এখানে? এতদিন পর ?” “কেন বাবা আমি কি আসতে পারিনা ? তোমার কথা খুব মনে পড়ছিলো,তাই....” “থাক,থাক।মিথ্য...
সে যে মানে না মানা বলেছিলাম অনেক কথা বলিনি তবে কিছু গোপন থেকে সব কথাকে ই বলে দিয়েছি কিন্তু,বুঝলেন না!গুলিয়ে গেলো,আমার ও ঘেঁটে ঘ,প্রেম কিন্তু বড্ড জটিল,প্রেম জটিলতার জট!"...
জন্ম শতবর্ষে সত্য চৌধুরী – শ্রদ্ধাঞ্জলি R... "তখনো ভাঙেনি তখনো ভাঙেনি প্রেমেরও স্বপনখানি। আমারও এ বুকে ছিল প্রিয়া, ছিল রাণী। আজ যত দূরে চায় আসে শুধু এক ক্ষুধিত জনতা প্রেম নাই, প্রিয়া নাই...
ভাবি আনমনে -সৌম্য ভৌমিক শিশির ধোয়া জানালার কাচে জেগে থাকে মুখোশের সারি ছোট টবে বনসাই বাঁচে বিবর্ণ হওয়া ফ্ল্যাট বাড়ী । ঘামে ভেজা শরীরের ভীড়ে খুঁজে পাওয়া...
বেইমান- তমালী চক্রবর্ত্তী... সব্জিভর্তি থলে নিয়ে অনেক কষ্ট করে বাড়ির দরজার তালা খুলল ফাতিমা বেগম। আজকাল আর আগের মতো দৌড়ঝাঁপ পোষায় না। ৬০ তম বসন্ত কিছুদিন আগেই পেরিয়েছে, হাঁপ ধরা স...
আমরা ছিলাম আমরা আছি আমরা থাকবো – দেবাশিস ভট্... "200671 আপ হাওড়া নাগার্জুন এক্সপ্রেস দশ নম্বর প্লাটফর্ম থেকে রাত নটা পনেরো মিনিটে ছাড়বে"। ঘোষণাটা শুনে সুজন নিজের ট্রলি ব্যাগটা নিয়ে এগিয়ে চললো নির্দ...
পুজো – ডঃ মৌসুমী খাঁ... পুজো আমার শিউলি ফোঁটা ভোর নীলাকাশ জুড়ে পেঁজা তুলোর মেঘ, বাতাসে ঢেউ তোলা কাশের বন আকাশ ভরা সোনা রোদের আলো , ক্ষেত জোড়া সবুজ ধানের শিষ কুমারটুলির স...
বিবেক নাকি অন্য কিছু – অভিজ্ঞান গাঙ্গুলী...       সাগর আজ অনেক বড় বিজ্ঞানী। ভারতের DRDO তে কর্মরত এবং তার রিসার্চ হল মডার্ন weaponary অর্থাৎ নতুন অস্ত্র বানানো হলো তার কাজ। আগের বছর গোরা...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment