ভৌতিক সন্ধ্যা – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়

ত কি না ঘটে। যার ব্যাখ্যা আমরা পাই না। যতই তর্ক বিতর্কে জড়াইয়া না কেন, কেন ঘটে বা ঘটল তার হদিস কে দেবে? এই ঘটনাটাই পড়ুন। আশ্চর্য হবারই কথা। আমিও হয়েছি।
ইদানিং যত না বৃষ্টি হয়, তার চেয়ে বেশি ব্রজাঘাত পড়ে। কেন রে বাবা, কে জানে। তবে বিজ্ঞানীদের মতামত হল, বিশাল কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হতে পারে এটা। সামান্য মেঘ করলেই রোজই নিউজ ডেস্কে যে হারে ব্রজঘাতে মৃত্যু সংবাদ আসতে থাকে তা সত্যি ভাবায়। তা যাই হোক, সন্ধ্যাবেলা একলা ঘরে বসে একটা গল্প লিখছিলাম। স্ত্রী বাড়িতে নেই। আসবেন সেই শুক্রবার বা শনিবার। কারণ তাঁকে বদলি করা হয়েছে। যেখানে এখন পোস্টিং সেখানে একটা চমৎকার বাড়িতে কয়েকজন মেয়ে সহকর্মী মিলেমিশে থাকেন। মাঝে মাঝে হোয়াটসঅ্যাপে লিখে পাঠান, ‘তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম..’। আমার কাছে এটাই অনেক পাওয়া। কখনও বা ফোন, এই করেছ, ওই করেছ? এবারে গিয়ে যেন কোথাও ঝুল না দেখি। কাজের মেয়েটাকে বলো, ঝেড়ে সাফ করে দিতে। তবে তুমি থেকো নইলে কাজ হবে না। কখনও বা ফোনে বলেন, এ্যাই একটা ভূতের গল্প বলো, আমার বন্ধুরা একসঙ্গে শুনব। স্পীকার অন করছি। শালা বাইরে থাকলেও হ্যাপা অনেক।

লিখতে লিখতে কখন সন্ধা নেমে এসেছে খেয়াল করিনি। ঠাকুরঘরে আলোটা জ্বালাতে হবে, ধূপটা দিতে হবে। ও বাবা, বারান্দায় এসে দেখি আকাশ জুড়ে ঘন মেঘ। এতক্ষণ মালুম পাইনি। মেঘ জমছিল নিঃসাড়ে। হঠাৎ ব্রজপাত শুরু হল, সাংঘাতিক। নিউজ চ্যানেল চালানো ছিল। সব সময় নিউজ চ্যানেল চালিয়ে রাখতে হয়, খবরের মধ্যেই থাকতে হয়। তাড়াতাড়ি বারান্দার দরজা বন্ধ করে দিলাম। টি ভি অফ করলাম। সন্ধ্যা দেখিয়ে চা বসালাম। একটু না খেলেই নয়, আর পারছি না। চা করে টেবিলে ফিরে এলাম। কমপিউটার অন করলাম আবার। লেখাটা লিখছিলাম, বার করলাম। মাত্র দুটো প্যারা হয়েছে। এখনও খানিকটা লিখতে হবে। একটা ভূতের গল্প লিখছি, পুরশু দিতে হবে একট পত্রিকায়।

পরিবেশটা চমৎকার। বাইরে ঘনঘোর বৃষ্টি, ঘনঘন ব্রজঘাতের আওয়াজ, বিদ্যুতের চমক। সব মিলিয়ে উপযুক্ত আবহাওয়া। এমন সময় বেল বাজল। এ সময় তো কেউ আসে ন, কে রে বাবা। উঠে গিয়ে দরজা খুললাম। আরে তুষারদা আপনি? আমার প্রতিবেশী। তিনি জুতো খুলতে খুলতে বললেন, আরে, দোকান গেছলাম একটু। গরম গরম চপ খাবার ইচ্ছা তোমার বৌদির তাই। বৃষ্টি পড়ছিল ঠিক আছে, কিন্তু এত জোরে ব্রজপাত আরম্ভ হয়েছে যে, তোমার বাড়ি সামনে পেয়ে ঢুকে পড়লাম। আমি বললাম, তা বেশ করেছেন। আমিও তো একা ছিলাম। একটু গল্প করা যাক। চা খাবেন কি? তুষারদা আমতা আমতা করে বললেন, আবার তোমায় কষ্ট দেব ভাই? আমি বললাম, আরে না, আমি একটু আগে চা করে ফ্যাক্সে রেখে দিয়েছি। দাঁড়ান আনছি। চা এনে ওনাকে দিলাম। চায়ে চুমুক দিয়ে তুষারদা বললেন, এবার কোন গল্প লিখছো? তোমায় তো আবার ভূতে ধরে আছে। ভূত ছাড়া কিছু বোঝ না! আমি হেসে বললাম, ঠিক বলেছেন। ওই একটা লিখছি আর কি। তুষারদা বললেন, একটু শোনাও তো, কেমন হচ্ছে শুনি। আমি খানিকটা শোনালাম। তুষারদা শুনে বললেন, ভাই একটা অনুরোধ আছে। আমি তার মুখের দিকে চেয়ে বললাম, বলুন না। তিনি বললেন, এই যে আমি এলাম, বসলাম, গল্প করলাম। একটু লিখে দিও। কয়েকজনও তো জানতে পারবে আমাকে। আমি বললাম, এ আর কি কথা, বেশ তো। চা খেয়ে তুষারদা চলে গেলেন।

একটু ছন্দপতন ঘটল বটে। তবে কুছ পরোয়া নেই। আমি আবার শুরু করলাম। গল্পটা জমজমাট লিখতে চাইছি। আগে আমার অনেক গল্প ওই পত্রিকা ছেপেছে। তাই মানটা ঠিকঠাক রাখতে হবে। সবে শুরু করেছি আবার বেল বাজল। ধ্যৎ তেরিকা, মাথা খারাপ হয়ে যাবে দেখছি। এই দুর্যোগের রাতে কে এল আবার? আরে অভয়া! এখন তুই? আমাদের কাজের মেয়েটা। তুই বাড়ি যাসনি! অভয়া বলল, কি করে যাব দাদা, ট্রেন তো বন্ধ হয়ে গেছে। এখন রাস্তাও খুব জ্যাম। একটু বসে নিই, বৃষ্টির বেগটা কমুক তারপর যাব। আমি বললাম, এখান থেকে দু’তিনটে অটো চেঞ্জ করলেই তো পৌঁচ্ছে যেতে পারিস। অভয়া বলল, তা পারি কিন্তু টাকা অনেক লাগবে যে দাদা। আমি বললাম, ঠিক আছে। টাকাটা আমার সঙ্গে নিয়ে যাস। অভয়ার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। আমি বললাম, একটা কাজ করতে পারবি? অভয়া হেসে বলল, বলো না দাদা। আমি বললাম, চা খেয়ে খেয়ে মুখটা কেমন হয়ে গেছে। ফ্রিজে দুধ আছে নিয়ে একটু কফি বানাতো। অভয়া রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। আবার গল্পটা লিখতে শুরু করলাম। জমে উঠেছে প্লট। যদি ঠিকঠাক দাঁড় করাতে পারি দারুণ হবে। খানিকটা লেখার পর অভয়া কফি নিয়ে আমায় দিয়ে বলল, দাদা, বৃষ্টির বেগটা কমেছে এবার যাই। আমি পকেট থেকে টাকা বার করে ওকে অটোর ভাড়া দিয়ে দিলাম। ও হাসি মুখে চলে যেতে দরজা বন্ধ করলাম। আর যেন কেউ না আসে বাবা। গল্পটা শেষ করতেই হবে তাড়তাড়ি। না হলে একটা ক্লান্তি আসছে।

আজকের সন্ধ্যাটাই বোধহয় আমার পক্ষে খারাপ। নইলে এমন ঘটনা ঘটবে কেন? আবার বেল বাজতেই আমি খুলে বললাম, একি তুই এখন? আসার কথা তো রাত দশটায়। আমায় যে রাতের রুটি দিয়ে যায়। সেই ভোলা নামে যুবকটি হাজির। ভোলা বলল, দাদা, আজকে বড্ড ওয়েদার খারাপ তাই দিদি বলল, যা যাদের বাড়ি বাড়ি দিস তাড়াতাড়ি দিয়ে আয়। আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। কারণ মারাত্মক বৃষ্টি এখনও চলছে। শুধু বললাম, একটু বসে যা। কি মন গেল কে জানে ভোলা বলল, বেশ, তুমি তো একা থাকো একটু বসি। ও বসে বলল, এত বৃষ্টি হলে রাতে আমাদের ঘরে জল চলে আসবে দাদা। একে তো নিচু জমি। আমি বললাম, এই এক কষ্ট তোদের। এমন সময় প্রচণ্ড জোরে বাজ পড়ল। ভোলা চমকে বলল, দাদা, আমি বরং যাই। এখনও দু’বাড়ি যেতে হবে। রুটি ঠাণ্ডা হয়ে গেলে পাটি গজগজ করে। ভোলা চলে গেল।

দূর আর লিখতে ভালো লাগছে না। আমি কম্পিউটার বন্ধ করে দিলাম। গরম গরম রুটিটা আছে এই বেলা তরকারিটা গরম করে খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ি।

খুব ঘুম হয়েছে। একেবারে সকালে ঘুম ভেঙেছে। সকাল তখন আটটা হবে। বাইরে বের হলাম। সিগারেট একটাই ছিল শেষ হয়ে গেছে। বাইরে বেরিয়ে সিগারেটের দোকানে গিয়ে শুনলাম, প্রতিবেশী তুষারদা কাল সন্ধ্যায় মারা গেছেন। হার্টের সমস্যা ছিলই। বজ্রপাতের প্রচণ্ড আওয়াজে তিনি শেষ। আমি চমকে উঠলাম। তারপর শুনলাম, ভোলা রুটি দিতে বেরিয়ে ছেঁড়া ইলেকট্রিকের তার মাড়িয়ে ফেলে বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে মারা গেছে। আমি আঁতকে উঠে ঈশ্বরকে স্মরণ করলাম। এই সকালে দুটো মৃত্যু সংবাদ পেয়েছি আর যেন না পাই। চমকে উঠে ভাবলাম, এরা দুজনেই তো আমার কাছে আসার আগেই মারা গেছে! তাদের আত্মা এসেছিল! বাড়িতে ঢুকে বাথরুমে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। বেল বাজল, দরজা খুলে একজন মহিলাকে দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, দাদা, খবরটা দিতে এলাম। কাল অভয়া মারা গেছে বাড়ির কাছে একটি লরির ধাক্কায়। আমি সময় ক্যালকুলেশন করে দেখলাম, তিনজনই মৃত্যুর পর আমার কাছে এসেছিলেন। দূর মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। আর ভূতের গল্প লিখবই না।

____


FavoriteLoading Add to library

Up next

দূর্গামায়ের সিন্দুরকৌটো – স্বরূপ রায়... ১ আজ চতুর্থী। টুনু আর ফজিল বসে ঠাকুর গড়া দেখছিল। টুনুদের বাড়িতে প্রতি বছর দুর্গাপূজা হয়। টুনুর প্রপিতামহ সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এই অঞ্চলের জমিদার। ...
ছুটি – পরিতোষ মাহাতো... বৈশাখের ভ্যাপসা গরমে পিঠে সভ্যতার বোঝা বাবার অব্যবহৃত সাইকেল আর ঝোলা ব্যাগটার সঙ্গে বন্ধুত্ব সারা সপ্তাহের অবিরত  ছুটে চলা লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন...
অসুখ – তমালী চক্রবর্ত্তী... "ডাক্তারবাবু হামার মরদ কে দয়া করে বাঁচিয়ে লিন।" - প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ল লছমী। গত রাত থেকে অসহ্য পেটের ব্যাথায় কাতরাচ্ছে বাবুলাল। আজ তাই লছমী বাবুলাল ...
সঙ্গী – অনিন্দিতা পাল (অর্না)... ভূমির মনটা খারাপ। সারাদিন মোবাইল ঘাটায় ওর মা ওকে বকেছে। কিচ্ছু ভাল লাগছে না ওর। বন্ধু অর্নাকেও অনেকবার ফোন করল সেও ফোনটা ধরছে না। কলেজে কিছু কাজ আছ...
মন মিলান্তি(পর্ব-৪~শেষ পর্ব)... #মন_মিলান্তি_পর্ব_৪ #মুক্তধারা_মুখার্জী #চরিত্র_ঘটনা_কাল্পনিক,#মিল_খুঁজে_পেলে_লেখিকা_দায়ী_নন😊 বমিটা হওয়ার পর থেকেই শরীরটা কেমন করছিল যেন শ্রেয়সীর। ত...
শেষ ঠিকানা -স্নিগ্ধা রায়... অস্তমিত সূর্যের গোধূলী আলোয় ম্লান হয়ে আসা দিনের শেষে ক্লান্ত বিধ্বস্ত পায়ে তখন শুধুই ঘরে ফেরার তাগিদ, শ্মশানের অশ্বত্থ গাছের ডালে চলছে কাক চিলের মিট...
মৃত্যুহীন ভালোবাসা... - ডঃ মৌসুমি খাঁ ভালোবাসার মৃত্যু নেই সে চিরন্তন বয়ে চলেছে হৃদয় জুড়ে - মনের এক ফল্গু নদীর চোরাস্রোতের মতো, কখনও উদ্দাম উচ্ছল জলধারা ভাসিয়ে নিয়ে য...
বেল – অদিতি রায় সাইকেল নিয়ে ফিরলে আর বেল দিতে শুনিনা সজোরে, যে বেল এর সঙ্গে ছিল সান্তার থলির থেকে অনেকটা আনন্দের হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসার নির্মল আওয়াজ৷ দূরের কোনো...
ভূতের সঙ্গে এক পলক – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়... ঘটনাটা কেউ বিশ্বাস করবে না জানি। আসলে আমিই তো এখনও বিশ্বাস করতে পারি না। অন্য কেউ করবে কি করে! তবে ফালতু কথায় লাভ নেই। আসল কথায় আসা যাক। ঘটনা খুব একটা...
ব্যর্থ স্বাধীনতা – সৌমিক মান্না... বেলাশেষে রবি বিদায় নিল দূর দিগন্ত হতে। আকাশটাও ক্ষত -বিক্ষত অচেনা রক্তপাতে॥ আহত আকাশ বার্তা দিল ,ভারত হয়েছে পরাধীন। রক্তাক্ত মাতৃভূমি তখন ব্রিটিশ শ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment