কিপটে ভূতের গল্প – শাশ্বতী সেনগুপ্ত

      নাদেশ্বর বাঁড়ুজ্যে মরে গেলেন। ভূত হয়ে ভূত জগতে পর্দাপণ মাত্রই শুনতে পেলেন তাকে নিয়ে ফিসফিসানি আরম্ভ হয়েছে। তিনি হাওয়ায় কান পাততেই কথা স্পষ্ট হল, শুনতে পেলেন,  ভূতেরা বলছে, জীবিতকালে হাড় কিপটে নাদেশ্বর পরিবার ও প্রতিবেশীসহ বন্ধু -বান্ধবদের জ্বালাতন করে মেরেছে। না জানি আমাদের জগতে এসে কি কাণ্ডই করবে। এ কথা শুনে নাদেশ্বরের খুব কষ্ট হল। সে ভাবল, এ কি কথা! এই মাত্র ভূত সমাজে সে পদার্পণ করছে আর সঙ্গে সঙ্গে এ সব আরম্ভ হয়েছে। তিনি খুব অপমানিতও বোধ করলেন। ঠিক করলেন, ভূত জগতে তিনি থাকবেন না। সুতারাং সোঁ করে আবার মর্তে ফিরে এলেন এবং নিজের গোপন চোরা কুঠুরিতে সেঁদিয়ে গেলেন। এই কুঠুরিতে তিনি একটি বিশাল সিন্ধুক টাকা, সোনা ও হীরের গহনায় ভর্তি করে রেখেছিলেন। সারা জীবন কিপটেমী করে বিশাল ব্যবসা থেকে যা কামিয়েছেন যৎসামান্য খরচ করে বাকিটা এখানে গচ্ছিত করেছিলেন। তিনি ঠিক করলেন, এই সিন্দুকের ভিতর যক্ষর মত থেকে যাবেন। অবশেষে তিনি তাই করলেন। সিন্দুকের ভিতর ঢুকে পড়লেন।

মরার আগে তিনি নাতির বিয়ে দিয়েছিলেন। নাতিকে খুব ভালোবাসতেন। একদিন ব্যবসার কাজ সেরে আসার সময় এক গ্রামে একটি মেয়েকে দেখেন। তার বয়স খুব অল্প ১৮ বা ১৯ হবে। মেয়েটি যেমন অপরুপ সুন্দরী তেমনি মিষ্টি ব্যবহার। তিনি তার সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারলেন মেয়েটির নাম বিন্তি। তারপর তার বাড়িতে গিয়ে একেবারে বিয়ের কথা পাকা করে নিলেন। আর নাতির সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলেন। এই বিয়েতে সামান্য কিছু খরচ তিনি করেছিলেন। বিন্তিকে নাদেশ্বর খুব ভালোবাসতেন। কারণ রূপের জন্য নয়, তার গুনের জন্য। মেয়েটির মিষ্টি ব্যবহারের মতই রান্নায় ছিল দারুণ হাত। আর আশ্চর্যের বিষয়, সব রকম রান্নায় সে পটু ছিল। নাতবউ বলতে তাই তিনি অজ্ঞান ছিলেন। কিন্তু বেশিদিন কপালে সুখ সইল না। কয়েক মাস যত্ন খেয়ে হঠাৎই নাদেশ্বর মারা গেলেন। তার আগে নাতবউকে কিছু টাকা দিলেন, নাতিকেও দিলেন।  মরার পর নাদেশ্বর অনুভব করলেন, নাতবউয়ের প্রতি তার মেয়ের মত টান রয়ে গেছে।

সোঁ করে ভূত সমাজ থেকে নেমে এসেই তিনি অবাক হলেন। বাঃ বাড়িটা তো বেশ রঙ করেছে নাতি। বাঃ বাঃ। তারপরই হায় হায় করে উঠলেন। শালা যত টাকা দিয়েছিলুম খরচ করে ফেললো নাকি? হঠাৎ রাগ হয়ে গেল তার। ঠিক করলেন নাতিকে একটু ভয় দেখাবেন। যাতে ফালতু বিলাসিতা না করে। কিন্তু নাতিকে ভয় দেখাতে গিয়ে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। বেশি ভয় খরচ করে ফেললে ধন-দৌলত আগলে থাকবেন কি করে! যদি আরো বড় কাণ্ড ঘটে তখন ভয় পাবেন কোথায়! মহাবিপদে পড়ে তিনি নাতির শোবার ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে পড়লেন। আর তখনই রান্নার সুবাস তার মন ভরিয়ে দিল। নিজের মনেই হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠে বললেন, আরে পোস্তর বড়ার সুগন্ধ! আহা, আহা, গুনগুন করলেন, ও আমার নাত বউ গো ধন্য তুমি ধন্য হে….। বলে গুটি গুটি পায়ে রান্নাঘরের জানলায় দাঁড়িয়ে জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটলেন। আহা, আহা নাত বউ গো, ‘ তুমি কোন কাননের ফুল কোন গগনের তারা…’ তারপরই হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ও আমার বিন্তি একটা দুটো আমায় দে না মা। জিভ সার্থক করি। কত খাইয়েছিস আমায় জীবীতকালে। বিন্তি নাদেশ্বরের কথা শুনতে পাচ্ছিল না। নাদেশ্বর হাত বাড়াতেই চমকে উঠে বিন্তি বলল, ও মা গো, কে গো? নাদেশ্বর বলল, আহা, নাত বউ ভয় পাস না, আমি, আমি তোর দাদুরে মা। আয় মা কাছে আয়। বিন্তি এতক্ষণে নাদেশ্বরকে দেখতে পেয়ে বলল, তুমি মরে গিয়েও এলে? নাদেশ্বর বলল, তা আসবোনি রে? কি চমৎকার পোস্তর সুবাস মা। দে মা হাতে দুটো দে দিখিনি।

বিন্তি বলল, হাত পুড়ে যাবে দাদু, দাঁড়াও আমি প্লেটে দিচ্ছি। বিন্তি গরম গরম দুটো পোস্তর বড়া প্লেটে দিয়ে এগিয়ে  দিল। নাদেশ্বর মুখে দিয়ে আরাম করে খেয়ে বললেন, কি সুন্দর করেছিস মা? বাসনা জুড়িয়ে গেল একেবারে। আর কিছু চাই না মা। আবার পরে তোর কাছে আসব। বিন্তি বলল, কাল বেলার দিকে এসো। কুচো চিংড়ি দিয়ে লাউ করব। তোমায় পেট ভরে ভাত আর লাউ চিংড়ি খাওয়াব। সঙ্গে কুলের অম্বল। আরো থাকবে আসবে কিন্তু। নাদেশ্বর গদগদ হয়ে বললেন, গত জনমে তুই আমার মেয়ে ছিলিস নাতবউ। নাহলে এত যত্ন! বলেই হুস করে চোরাকুঠির সিন্দুকে ঢুকে গেল। তারপরই মনে পড়ল আরে, দিনের বেলায় সূর্যের আলো তো গায়ে লাগাতে পারব না। আবার হুস করে বেরিয়ে এসে দেখলেন, বিন্তি শুয়ে পড়েছে। নাতি ওর সঙ্গে দুষ্টুমি করছে। চোখে হাত চাপা দিয়ে নাদেশ্বর লাফিয়ে উঠে বলল, আমিও তোর মায়ের সঙ্গে অল্প বয়সে কত না দুষ্টুমি করতাম। ঠিক আছে মা তোরা দুষ্টুমি কর। আমি যাই।

পরদিন দিনের বেলাব নাদেশ্বর সিন্দুক থেকে বের হতে পারল না। দিনের আলোয় বের হতেই প্রচণ্ড অস্বস্তি হল তার। তিনি সিন্দুকে ঢুকে গেলেন। ঠিক রাতে বের হয়ে রান্নাঘরের কাছে এলেন। ডাক দিলেন, ও নাত বউ, আমি এসে গেছি মা। বিন্তি এখন নাদেশ্বরের কথা শুনতে পায়, দেখতেও পায় তাকে। রাগ করে বলল, দিনে এলে না কেন? হাঁ করে বসেছিলাম। নাদেশ্বর বললেন, রাগ করিস না মা। আমি তো ভূত দিনে কি করে বের হই বল মা। দে দিখিনি কি করেছিস। বিন্তি খাবার টেবিল দেখিয়ে বলল, ওখানে বসো দাদু। আমি বেড়ে নিয়ে আসছি। বিন্তি খাবার আনতেই নাদেশ্বরের চক্ষু চড়কগাছ। গরম ভাত তার সঙ্গে শীতের ইয়া বড় বেগুন পোড়া। আহা, বেগুন আর কাঁচালঙ্কার গন্ধে ম’ ম’ করছে টেবিলটা। নাদেশ্বর ঝপ করে টেবিলে বসে পড়ে খেতে শুরু করে দিল। প্রথম পাত শেষ হতে বিন্তি বলল, আরও ভাত নিতে হবে দাদু। এখনো ছোট ছোট ফুল কপি দিয়ে মুগের ডাল করেছি তার সঙ্গে চচ্চড়ি আছে। শেষ করলে পাবে লাউ চিড়িং। গপাগপ খেয়ে নিল নাদেশ্বর। তারপর লাউ চিড়িং খেয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল সে। শেষ পাতে কুলের অম্বল। চেটেপুটে খেয়ে নাদেশ্বর হাত বাড়াল নাত বউকে আদর করার জন্য। বিন্তি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ তার দু’গালে বরফের মত স্পর্শ অনুভব করল। বিন্তি চমকালো না। হাসি হাসি করে রইল মুখটা। নাদেশ্বর বললেন, কালকে আবার আসব মা। দেখি কি খাওয়াস।

বিন্তি বলল, তোমার যখন ইচ্ছা হবে আসবে দাদু। আমি রেডি থাকব। নাদেশ্বর ভক করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বললেন, আমি আছি তোর পাশে। কোনও সময় কোনও কিছুতে ঘাবড়াবি না। বলেই তিনি হুস করে চলে গেলেন। বিন্তি টেবিল থেকে থালা তুলতে তুলতে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। ভাবল, মানুষটাকে সব্বাই খারাপ বলে, কিপটে বলে। কিন্তু দাদুর ভিতর একটা মন ছিল সে তা স্পষ্ট বুঝতে পারল।

_____


FavoriteLoading Add to library

Up next

কি যাদু মা ডাকতে - অদিতি ঘোষ      প্লীজ, স্টপ ইট্। এই ধানাই পানাই ভাল লাগেনা আমার। প্রত‍্যেকদিন সেই একই আলোচনা। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে কথাকটা উগলে দিয়ে,পার্শটা...
জন্ম শতবর্ষে সত্য চৌধুরী – শ্রদ্ধাঞ্জলি R... "তখনো ভাঙেনি তখনো ভাঙেনি প্রেমেরও স্বপনখানি। আমারও এ বুকে ছিল প্রিয়া, ছিল রাণী। আজ যত দূরে চায় আসে শুধু এক ক্ষুধিত জনতা প্রেম নাই, প্রিয়া নাই...
সহজেই বানান পনির পাতুরি... - মালা রাণী নাথ   কোন অনুষ্ঠান বাড়িই হোক কিংবা প্রতিদিনকার ঘরের খাবার,নিরামিষ পদটি আমাদের রন্ধনশিল্পের সাথে যেন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত হয়ে আছে।  এমন অন...
কৃষ্ণবিবরের ইতিকথা... আমাদের অনেকেরই দিন শুরু হয় ঘুম থেকে ওঠার পর সূর্য প্রণাম করে। আর আমাদের এই বসুন্ধরায় সকল প্রাণের লালন পালনের মূলেই কিন্তু রয়েছে সেই সূর্যের অফুরন্ত শক...
টান – সুস্মিতা দত্তরায়... নাম ছিল তার নেপাল মাহাতো। আমরা ডাকতাম 'নেপুদা' বলে। হয়তো কখনও কোনো উঁচু ক্লাসের দিদি আদর করে এই নামটা দিয়েছিল, তারপর থেকে সেই নামটাই রয়ে গেছে। সে যাই ...
অন্তরালে – স্বরূপ রায়... -স্যার, টিকিট প্লিজ! -স্যার, টিকিট! ‘অ্যাঁ’ করে একটা শব্দ করে চোখ খুললেন অনিমেষবাবু। মিটমিট করে তাকিয়েই চোখের সামনে টিটি-কে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে ...
সুদূরের পিয়াসী – বৈশাখী চক্রবর্তী... কথা হচ্ছিলো সেদিন বিকেলে তোমার সাথে, মুঠো ফোন ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে, শত সহস্র মাইলের ব্যবধান,  তোমার ওই মাটি আর আমার এই প্রাঙ্গনে।।    দেশ ভ...
প্রথম মিস্টার পারফেকশানিস্ট-  অস্থির কবি ( কল্লোল ...   উত্তম পর্ব -তিন   ইদানিং বলিউডের আমির খানকে মিস্টার পারফেকশনিস্ট বলা হয়। যেমন এক কালে রাহুল দ্রাবিড়কে ওয়াল বলা হত। ক্রিকেট দেখা ছেড়ে দি...
রাতের ট্রেন ভয়ঙ্কর - অভিজ্ঞান গাঙ্গুলি     ঘটনাটা বেশ কয়েক বছর আগের। তখন ফার্স্ট ইয়ার এ পড়ি। ওই মে মাস এর সেমিস্টার ব্রেক এ আমরা ঠিক করি কাশ্মীর ঘুরতে যাব। আমরা বলতে...
ভূ-স্বর্গ ঘুরে আসুন... - বিভূতি ভূষন বিশ্বাস               ভ্রমন করতে কে না ভালোবাসে কিন্তু ভ্রমন করাই মানে যেমন আনন্দ করা তেমনই এটাও খেয়াল রাখা উচিত সেটি কোনমতেই যেন নিরান...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment