না ভৌতিক চেয়ার

 – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়  

 

   ফ্ল্যাটটা কেনার সময়ই প্রোমোটারকে বলে দিয়েছিলাম, একটা ঘর এক্সট্রা চাই। ঘরটা এমন ভাবে কাটিং করে বার করবেন যা খুব বড় না হলেও চলবে। মাঝারি হলে ক্ষতি নেই আবার তার চেয়ে একটু ছোট হলেও ক্ষতি নেই। আর ঘরটা একটু তফাতে চাই আমাদের মূল ঘর থেকে। চমৎকার কাটিং করে ঘরটি বের করেছিলেন পরিচিত প্রেমোটার। আমার স্ত্রী জানেন, ঘরটা আমি বাবার জন্য করেছি। আর তিনি বাধাও দেননি। আসলে বাবা আমার স্ত্রীকে বউমা ভাবতে পারতেন না। বাবার সখ ছিল একটি মেয়ের। তা হয়নি। তাই আমার স্ত্রী লাবণ্যকেই মেয়ে হিসাবে মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন।

লাবণ্য বাবাকে কোনদিন অমর্যাদা করেনি। এসব আমার খুব ভালোলাগত। তাই বাবার ঘরটা যখন ওই নতুন ফ্ল্যাট কেনার সময় করলাম, লাবণ্যও খুব খুশি হয়েছিল। বাবা অবশ্য বেঁচে নেই। অনেক আগেই মা মারা গেছিলেন। তারপর বাবা। দেখতাম, বৃদ্ধ বয়সে সঙ্গী চলে গেলে একজন মানুষের কি অবস্থা হয়। তিনি কতটা বেদনায় আর অসহায়তায় ভোগেন।  আমাদের কোনও ত্রুটি না থাকলেও তিনি এক মুহূর্তের জন্য মাকে ভুলতে পারতেন না।

আমি চমৎকার মুখার্জি এখন এসব ভাবছি। আমার এই নামটা বাবাই দিয়েছিলেন। অদ্ভুৎ নাম। এখনও পর্যন্ত কারোর পাইনি। বাবা হয়ত দিয়েছিলেন আমাকে সুন্দর দেখতে বলেই। তবে নামটা আমার খুব উপকারে লেগেছে। একবার পরিচয় হলে সে মুটে মজুর থেকে খুব বড় ব্যক্তিত্বও ভুলতে পারেন না। আমি চমৎকার মুখার্জি এত কিছু ভাবছি তার কারণ রয়েছে যথেষ্ট। কারণটা হল একটি চেয়ার। হাসছেন তো সবাই, তা হাসুন আর আমি সেই ফাঁকে ঘটনাটা বলে যাই। বানানো ভাবলে বানানো আর সত্যি ভাবলে সত্যি। আমি কোনও ব্যাখ্যা দেব না।

বাবা মা মারা যাবার পর থেকে পুরানো বাড়িতে দোতলার জানলার ধারটায় এই আর্ম চেয়ারটায় শরীর হেলিয়ে প্রায় সময়ই বসে থাকতেন। বসে থাকতেন পাশের বাগানের দিকে চেয়ে অথবা আকাশের দিকে চেয়ে। তা না হলে এমনই বসে থাকতেন চোখ বুজে। আআমি জানি না বাবা কি ভাবতেন। তবে আমার ধারণা বাবা মায়ের কথাই ভাবতেন। বয়স হলে মানুষকে সবচেয়ে বেশি টানে অতীত। আমি নিশ্চিন্ত, বাবা অতীতকে চোখের সামনে তুলে আনতেন। কারণ মাঝে মাঝে দেখেছি, বাবা আপন মনে কাঁদতেন, আপন মনে কথা বলতেন আবার মৃদু মৃদু হাসতেন। না না, আমার বা লাবণ্যর কখনই মনে হয়নি ওনার ভীমরতি ধরেছে বা মাথার গণ্ডগোল হয়েছে।

এভাবেই বাবা একদিন সন্ধ্যায় লাবণ্যকে ডাকলেন। আমি তখনও অফিস থেকে ফিরিনি। ফিরলাম একটু পরে। বাবা লাবণ্যকে বলেছিলেন, আমার সময় বোধহয় শেষ হয়ে আছে লাবু। কারণ তোমার মাকে অহর্নিশি দেখছি। মনে হচ্ছে, তিনি আমার কাছে আসছেন আর চলে যাচ্ছেন। এর একটা গভীর কারণ থাকে বৌমা। পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে আমি মনে করি কারণহীন নয়। হয়ত আমরা বুঝতে পারি না নতুবা আমাদের জ্ঞানের বাইরে। তা চমৎকার ফিরে এলে ভালো হয়। তাহলে তোমাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখি আর একটা কথা বলার আছে লাবু। একটু অপেক্ষা করি যদি চমৎকার ফেরে তাড়তাড়ি। ঠিক তখনই আমি ফিরেছিলাম। লাবণ্য ওই সব কথা আমায় বলার পর আমি কালবিলম্ব না করে বাবার ঘরে ঢুকি। বাবা আমাকে দেখে বলেন, আহা, একটু ফ্রেস হয়ে এসো, কিছু খেয়েটেয়ে এসো। সময় এখনও আছে তো। আমি যখন ঠিক আছে বাবা বলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছি তখন পিছু ফিরে দেখি, বাবা জানলার বাইরে চেয়ে খুব খুশি মনে হাসছেন। আমি অবাক হলেও মাথা ঘামায়নি।

ফ্রেস হয়ে বাবার ঘরে হাজির হই দুজনে। উনি ডেকে নিয়ে প্রথমে লাবণ্যর মাথায় তারপর আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বলেন, একটা ছোট্ট অনুরোধ আছে তোদের কাছে। আমরা অবাক হয়ে বলি, অনুরোধ কেন বলছ বাবা? বলো, আদেশ। বাবা হেসে বলেন, তা যাই হোক। কথা হল, আমি মরে গেলেও এই চেয়ারটা জঞ্জালের স্তুপে ফেলিসনি যেন। অন্তত কিছুদিন রেখে দিস বাবার স্মৃতি হিসাবে। যদি কোনওদিন কোথাও চলে যাস এই পুরানো জীর্ণ বাড়ি বিক্রি করে তখনও সেই ঝাঁ চকচকে নতুন ঘরে এই চেয়ারটাকে একটু ঠাঁই দিস। কারণ কি জানিস? এই চেয়ারে আমার অনেক সুখ, দুঃখ জড়িয়ে আছে। এটুকুই তোদের আমার বলার ছিল।

বউমা,  আমায় একটু চা খাওয়াতে পারো? লাবণ্য চা করতে যাবার আগে বলল, বাবা, এভাবে কেন বললেন? আমরা আপনাকে কতটা ভালোবাসি তা তো জানেন। আপনি না থাকলেও যতদিন পারব চেয়ারটাকে রাখার চেষ্টা করব। আপনি ভাববেন না। আমি চমৎকার মুখার্জি, খুব উচ্চ শিক্ষিত, সাংঘাতিক এক পদে চাকরি করি। কিন্তু আমার আধুনিক বোধবুদ্ধি দিয়ে বাবার কথার কোনও অর্থ পাইনি। তবে আমাদের নতুন ফ্ল্যাটের তিনতলার যে ঘরটা বাবার নামে করিয়ে ছিলাম সেখানে জানলার ধারে চেয়ারটি রয়েছে।

প্রতিদিন অফিস বের হবার সময় আমি চেয়ারটাকে ছুঁয়ে প্রণাম করি। মনে করি, ওখানে বাবার স্পর্শ লেগে আছে। লাবণ্য প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় ওই ঘরটায় ধূপ দেয়। বাবার মৃত্যু দিন আসার আগে প্রতিবছর চেয়াটায় রঙ করাই। মৃত্যুদিনে বাবার হাসিমুখের ছবিটি রেখে সাদা ফুল দিয়ে সাজায় লাবণ্য। এভাবে কেটে যাচ্ছিল দিন। একদিন একটা ঘটনা ঘটে গেল। সেদিনটার কথা আমার আর লাবণ্যর এখনও স্পষ্ট মনে আছে। শ্রাবণ মাস। এক গভীর রাতে আমি আর লাবণ্য বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম। বাইরে তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের ফ্ল্যাটটা শহর ঘেঁষা হলেও অনেক গাছপালা দিয়ে ঘেরা। সেখানে বৃষ্টি পড়ছে। আওয়াজ উঠছে মধুর। গভীর রাত, একেবাদে সুনসান চত্বর। অদ্ভুৎ পরিবেশ। কেমন যেন মন উতল করা।

লাবণ্য আমার কাঁধে হাত রাখল। নিবিড় এক ভালোবাসায় আমরা ডুবে যাচ্ছিলাম। সেই সময় খুট করে একটা আওয়াজ। প্রথমটা পাত্তা দিই দুজনে। পরে আওয়াজটা একটু জোরে হতে মনে হল, বাবার ঘরের দিক থেকে আওয়াজটা আসছে। আমি আর লাবণ্য মুখ চাওয়াচায়ি করে বাবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। চমকে উঠলাম দুজনে। বাবা অন্যদিকে মুখ করে চেয়ারে বসে আছেন। আমাদের অবস্থা তখন বলার বাইরে। দুজনকেই ভয় জাপটে ধরছে। মানুষ যতই প্রিয় হোক মৃত্যুর পরে সে ভয়ার্ত হয়ে ওঠে।

তারপরই ঘটে গেল সেই অঘটন।

আমরা ওই গভীর রাতে স্থাণুর মত লক্ষ্য করলাম শুধু। চোখের সামনে দেখলাম, চেয়ারটা ভেঙে যাচ্ছে। বাবা উঠে দাঁড়িয়ে হাসছেন মৃদু মৃদু। আমরা  দুজন ওই বড় ফ্ল্যাটটায় কি করব বুঝতে পারছি না। লাবণ্য ফিসফিস করে বলল, আলো জ্বেলে দিই? আমি ওর হাত জাপটে ধরে বললাম, না, কক্ষনো নয়। তারপরই লক্ষ্য করলাম, বাবা আমাদের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে কি যেন ঈশারা করে মিলিয়ে গেলেন।

ভোর রাত। বিছানায় দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কখন খেয়াল নেই। লাবণ্য বলল, অদ্ভুৎ স্বপ্ন দেখেছি গো। আমি বললাম, কি স্বপ্ন? লাবণ্য লজ্জা লজ্জা মুখে বলল, বাবা আমাদের সন্তান হয়ে জন্ম নিচ্ছেন। আমি বললাম, সত্যি! লাবণ্য বলল, এক বর্ণও মিথ্যে নেই।
চেয়ারটা ফেলে দিয়েছিলাম। আর কি বা প্রয়োজন? আর হয়তো  সেই জন্যই বাবা নিজে  চেয়ারটা ভেঙেছিলেন।
আমাদের সন্তানের হাবভাব বহুগুণ ঠিক বাবার মত। এমন কি কথার টোনটাও। কি যে সব ঘটে বুদ্ধির বাইরে। কি জানি বাবা। আমি চমৎকার মুখার্জি এর কোনও ব্যাখ্যা আজও পাইনি।

 

(সমাপ্ত)


FavoriteLoading Add to library

Up next

অপরাহ্নের আলো - অদিতি ঘোষ   আজ সকাল সকাল স্নান সেরে ঠাকুরঘরে ঢুকেছেন যূথী।কৈশোর থেকেই দোল-পূর্ণিমার এই দিনটায় মধুর এক আবেশে ভরে থাকে যূথীর মন।ঠাকুরদার প্...
মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ, অন্যভাবে... -   অনুজিত দাস  আমরা সবাই যখন মুর্শিদাবাদ তথা হাজার দুয়ারী ঘুরতে আসি এবং সময়াভাবে শুধুমাত্র গঙ্গার পূর্বের দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থানগুলি এবং নবনির্মিত...
শরীরকে সুস্থ রাখতে চ্যবনপ্রাশের ভূমিকা – অঙ্... এ কথা আজ সর্বজনবিদিত যে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা পদ্ধতির উৎস হল এই ভারতবর্ষ। এই চিকিৎসা পদ্ধতি বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, শুধু ভারতেই নয় অন্যান্...
জন্ম শতবর্ষে সত্য চৌধুরী – শ্রদ্ধাঞ্জলি R... "তখনো ভাঙেনি তখনো ভাঙেনি প্রেমেরও স্বপনখানি। আমারও এ বুকে ছিল প্রিয়া, ছিল রাণী। আজ যত দূরে চায় আসে শুধু এক ক্ষুধিত জনতা প্রেম নাই, প্রিয়া নাই...
কিপটে ভূতের গল্প – শাশ্বতী সেনগুপ্ত...       নাদেশ্বর বাঁড়ুজ্যে মরে গেলেন। ভূত হয়ে ভূত জগতে পর্দাপণ মাত্রই শুনতে পেলেন তাকে নিয়ে ফিসফিসানি আরম্ভ হয়েছে। তিনি হাওয়ায় কান পাততেই কথা স্পষ্ট হল,...
Admin navoratna

Author: Admin navoratna

Happy to write

Comments

Please Login to comment