গ্রান্টেড

– অভিষেক মিত্র

 

  অনেকদিন থেকেই একটা ভালো মোবাইল ফোন কেনার ইচ্ছে দীনেশের। কিন্তু ওদের অর্থনৈতিক যা অবস্থা তাতে আর ঠিক কেনা হয়ে উঠছিল না। টিউশনি করে যা পায়, তার প্রায় অর্ধেকটা খরচ হয়ে যায় কলেজের ফি দিতে। বাকিটা মাসের শেষে মায়ের হাতে তুলে দেয়, পাঁচ জনের সংসারে যতটা সাহায্য করা যায় আর কি। তবুও প্রতি মাসে একটু একটু করে টাকা জমায় ও। কখনও টিফিন না খেয়ে আবার কখনও ক্লাস তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলে হেঁটে বাড়ি ফিরে। কিন্তু তাতে আর কতই বা বাঁচে?

দীনেশ বাংলায় অনার্স করছে চারুচন্দ্র কলেজ থেকে। পড়াশোনায় যে খুব ভালো তা নয়, তবে একদম খারাপও নয় সে। মোটামুটি রেজাল্ট করেছে প্রথম বর্ষে, ৫১ শতাংশ। ওর ইচ্ছে বাংলায় এম. এ. করবে। কিন্তু এই অবস্থায় কতদিন আর পড়াশোনা চালাতে পারবে জানে না ও। চন্দ্র বলে, “তুই শুধু শুধু চিন্তা করিস। তোকে তো আগেই বলেছি, গ্রাজুয়েশনটা শেষ কর আমার কাকাকে ধরলে কোথাও ঢুকিয়ে দেবে ঠিক। এম. এ. করে কি করবি?”
দীনেশ বলে, “না রে ভাই, যতদিন পারব এম. এ. করার চেষ্টা চালিয়ে যাব। ওটা আমার স্বপ্ন রে।”

চন্দ্র হল দীনেশের প্রিয় বন্ধু চন্দ্র শেখর তিওয়ারী। ওই একই কলেজে পড়ে অঙ্কে অনার্স। ওদের অবস্থা বেশ ভালো। লেখাপড়ায়ও দীনেশের তুলনায় ঢের ভালো ও। ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে গত বছর। দুজনের মধ্যে সামাজিক ফারাকটা একটু বেশি হলেও ওদের বন্ধুত্বের মাঝে কোনদিন তা আসেনি। কলেজে তো সবাই ওদের মানিক জোড় বলে ডাকে। তবু একটা কথা চন্দ্র শেখরকেও বলেনি দীনেশ, যে সুচন্দ্রাকে ও খুব ভালবাসে। ও জানে, বললেই চন্দ্র লেগে পড়বে জড়ি-মেকার হিসাবে আর সারা কলেজে রটে যাবে ব্যাপারটা। দীনেশ জানে, ওদের যা অবস্থা, তাতে প্রেম করা চলে না।

যাই হোক, গত এক বছর ধরে টাকা জমাচ্ছে ও, মোবাইল কেনার টাকা। কিন্তু এখনও সেটা দেড় হাজারেই আটকে। দীনেশ ভাবল, ‘এতে তো চায়না মোবাইলও হবে না’। মনটা খারাপ হয়ে গেল ওর। ভেবেছিল পরীক্ষা শেষ হলে নতুন মোবাইল কিনবে। তৃতীয় বর্ষের নতুন ক্লাসে নতুন ফোন। কিন্তু তা আর হবে না মনে হয়। চন্দ্রকে কথাটা বলতে ও বলল, “সে কি রে! এ আবার কোন প্রবলেম নাকি? চল তোকে সস্তায় ভালো মোবাইল কিনিয়ে দিচ্ছি। সিগারেট খাওয়াতে হবে কিন্তু। গোল্ড ফ্লেক।”

দীনেশ রাজি হয়ে গেল। চন্দ্রের উপর ওর অগাধ বিশ্বাস। কলেজের পাশে হারুদার দোকান থেকে দুটো গোল্ড ফ্লেক কিনে একটা চন্দ্রকে দিয়ে বলল, “চল। কিন্তু জায়গাটা কোথায়?”
“খিদিরপুরের ফ্যান্সি মার্কেটে চ, অনেক কমে ভালো মোবাইল পেয়ে যাবি। আমার চেনা দোকান আছে।”
খিদিরপুর যে মাত্র চোদ্দশো টাকায় নতুন এন ৭২ পেয়ে যাবে সেটা দীনেশ স্বপ্নেও ভাবেনি। আনন্দে চন্দ্রকে জড়িয়ে ধরে ও বলল, “থ্যাংকস ভাই। আর একটা সিগারেট খাবি? গোল্ড ফ্লেক?”

একটা সিম কার্ডও ওখান থেকেই কিনে নিল ও। তিরিশ টাকায় তিরিশ টাকা টক টাইম। কলেজে ফিরে নতুন ফোন দেখাল সবাইকে। সুচন্দ্রা তো প্রায় ভিরমি খাচ্ছিল দাম শুনে। সুচন্দ্রা হেসে বলল, “কেয়া বাত বস। কাঁপিয়ে দিলে তো।” দীনেশ কিছু বলে না। সুচন্দ্রার এই হাসিটা দীনেশের সবচেয়ে প্রিয়। ওকে হাসতে দেখলে ও যেন সব দুঃখ কষ্ট ভুলে যায়।

ভালোই চলছিল, কিন্তু ঘটনাটা ঘটল সেইদিন রাতে। শুতে শুতে রোজই প্রায় বারোটা বাজে দীনেশের। সেইদিনও তাই হল। সবে আলোটা বন্ধ করেছে, ওমনি ফোনটা বেজে উঠল। ফোনে সুচন্দ্রা আর চন্দ্র ছাড়া কারুর নম্বরই সংরক্ষণ করা হয়নি। তাই ফোনটা চোখের সামনে এনে নম্বরটা দেখতে গেল ও। মোবাইলের স্ক্রিনে লেখা আছে জিরো কলিং। একটু অবাক হল দীনেশ। জিরো বলে আবার কার নম্বর সেভ হয়ে গেছে। ও নিজে তো সেভ করেনি এটা ওর স্পষ্ট মনে আছে। তবে কি চন্দ্র করল মজা করে। ভাবতে ভাবতে ফোনটা কেটে গেল। নম্বরটা দেখার জন্য কল লিস্টে দেখল দীনেশ। কোই কোন মিসডকল নেই তো? কি হল? নতুন ফোন গণ্ডগোল করছে ভেবে কান্না পেল দীনেশের। দোকানদার কেনার সময়ই বলে দিয়েছে, “দেখুন দাদা, এসব কাস্টমসে ধরা পড়া মাল। গ্যারান্টি নেই কিন্তু। ভালো করে চেক করে নিন।” কি করবে ভাবছে, এমন সময় আবার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে সেই জিরো কলিং। ফোনটা কানে দিল দীনেশ।
“হ্যালো।”
ওর ‘হ্যালো’-র জবাব না দিয়ে একটা ভীষণ রকম গম্ভীর ও কর্কশ স্বরে ওপার থেকে কথা এল, “তুমি খুব ভাগ্যবান দীনেশ সেন যে এই ফোনটা তুমি পেয়েছ।”

একটু বিরক্ত হয়েই দীনেশ বলল, “দেখুন দাদা, অনেক রাত হয়েছে ফোনটা রাখুন। এটা মজা করার সময় না।”
এই বলে দীনেশ ফোনটা কেটে দিল। সঙ্গে সঙ্গে আবার বেজে উঠল ফোনটা। ‘ধুর,” বলে ফোনটা অফ করে দিল ও। মনে মনে বলল, “কর এবার যত করতে পারিস।”
দীনেশকে প্রায় চমকে দিয়ে আবার বেজে উঠল ফোনটা। এইবার একটু ভয় লাগলো ওর। এই কাণ্ড যে ঘটতে পারে সেটা স্বপ্নের ভাবেনি ও। এবার বেশ ভয়ে ভয়েই ফোনটা ধরল ও।
সেই একই রকম গলায় ওপার থেকে কথা ভেসে এল, “আমি জিরো মানে শূন্য। তার বেশি জেনে তোমার কাজ নেই। শুধু এটা জেনে রাখো যে আজ থেকে তোমার ভাগ্য পালটে যাবে।”
“মা- মানে?” দীনেশের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে।
“আমি তোমার চারটে উইস পূর্ণ করব। ভেবে চিনতে বল কি চাও, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তোমার একটা করে উইস পূর্ণ হলেই আবার আমার ফোন পাবে। কিন্তু একটা শর্ত আছে।”
“কি শর্ত ?” একটু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল দীনেশ। শুধু ভয় নয়, মনে মনে একটু আনন্দও হচ্ছে ওর। ছোটবেলায় ঠাকুমার কাছে আলাদীনের গল্প শুনেছিল ও। আলাদীনের সেই আশ্চর্য প্রদীপের।
“শর্ত হল এই যে তুমি যা চাইবে আমি তার উল্টোটা করব। মানে অপোজিটটা। তাই ভেবে চিনতে বল তোমার প্রথম উইসটা কি?” একই রকম কর্কশ গলায় বলল ‘জিরো’।

দীনেশ চুপ করে আছে। কি চাইবে বুঝতে পারছে না। একবার ভেবেছিল ফোনটা কেটে দিক। তার পর মুহূর্তে মনে হয়েছিলো সত্যি যদি ওর চারটে উইস পূর্ণ হয় তাহলে ওদের সব দুঃখ দুর্দশা ঘুচে যাবে। বেশ খানিকক্ষণ ভেবে দীনেশ বলল, “পরশু আমার রেজাল্ট, আমি যেন পরীক্ষায় লাস্ট হই।”
অপারের কর্কশ স্বর বলে উঠল, “গ্রাণ্টেড।”
ফোনটা কেটে যাওয়ার পর দীনেশ আবার চেক করেছিল কল লিস্টটা। কোন নম্বর নেই। সেই কলটার কোন চিহ্নই নেই। সেই ফোনের কথাটা সবার থেকেই চেপে গেল ও। চন্দ্রকেও বলল না।

এই ঘটনার দুদিন কেটে গেছে। আজ রেজাল্ট দীনেশদের। সকালবেলায় ঠাকুর প্রনাম করে, বেশ ভয়ে ভয়েই কলেজে গেল। ও। অষ্টম পেপারটা খুব একটা ভালো হয়নি ওর। রেজাল্টের টেনশনে রাতের ফোনটার কথা প্রায় ভুলেই গেল ও। রাস্তায় যানজট থাকার দরুন কলেজে পৌছতে আধ ঘণ্টা দেরী হয়ে গেল দীনেশের। রেজাল্ট টাঙিয়ে দিয়েছে এতক্ষণ। ‘কি জানি কি হবে’, এই ভেবে বেশ একটু চিন্তিত হয়েই কলেজে ঢুকল ও।
ওকে ঢুকতে দেখেই চন্দ্র দৌড়ে এল।

“কি গুরু পার্টি কবে হচ্ছে?”
“কিসের পার্টি?” বুকটা ধুকপুক করছে দীনেশের।
“আরে পাগলা, তুই যে ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট হয়েছিস রে। তাড়াতাড়ি বল, কবে দিচ্ছিস পার্টি। আমিনিয়ায় খাব কিন্তু।”
মনটা আনন্দে ভরে গেল ওর। মনে মনে ভাবল, ‘একটা উইস পূর্ণ হল। বাকি রইল তিন। অষ্টম পেপার যা দিয়েছিলাম, তাতে জিরো বাবাজির দৌলতেই এই রেজাল্ট।’

রাতে বাড়ি ফিরে ওর রেজাল্ট শুনে মা আনন্দে দিশেহারা হয়ে গেল। ছোট বোন বলল, “দাদা, ফাটিয়ে দিয়েছ কিন্তু।”
দীনেশের মাথায় কিন্তু অন্য কথা ঘুরছে। “জিরো বলেছিল ‘একটা উইস পূর্ণ হলে সে আবার ফোন করবে দ্বিতীয় উইস জানতে।’ তার মানে আবার ফোন আসবে আজ রাতে।”
কিন্তু কি চাইবে আজ? ভাবতে লাগলো দীনেশ। না, আজ আর নিজের নয়, আজ পরিবার আর বাবার জন্য চাইবে ও। ঠিক রাত বারোটায় ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে লেখা জিরো কলিং।

“হ্যালো,” বলল দীনেশ।
আজকেও ওর ‘হ্যালো’-র কোন উত্তর পেল না। সেই একই গলা বলে উঠল, “তোমার প্রথম উইস পূর্ণ হয়েছে। বল, তোমার দ্বিতীয় উইসটা কি?”
আজকে দীনেশ তৈরি ছিল। বলল, “আমার বাবা আজ পনেরো বছর লটারির টিকিট কাটছে। কোনদিন এক পয়সাও প্রাইজ পায়নি। আমার দ্বিতীয় উইস হল, আমার বাবা যেন ‘বেঙ্গল বেস্ট’ লটারির প্রথম পুরষ্কার না পায়।”
ওপারের কর্কশ কণ্ঠ বলে উঠল, “গ্রাণ্টেড।”

এই ঘটনার প্রায় দু মাস কেটে গেল। এই দুমাসে বলার মত কিছুই ঘটেনি। সুচন্দ্রাকেও কিছু বলে উঠতে পারেনি দীনেশ। একবার ভেবেছিল চন্দ্রকে বলবে সুচন্দ্রার ব্যাপারে। তারপর ভাবল না নিজেই বলবে সুচন্দ্রাকে যে ও ওকে ভীষণ ভালোবাসে। ওকে ছাড়া দীনেশ বাঁচবে না। অনেক ভেবে ও ঠিক করল যে আসছে সোমবার ও সুচন্দ্রাকে প্রপোজ করবে। এই সোমবার দিনটার বিশেষত্ব হল এই যে সোমবার ‘বেঙ্গল বেস্ট’ লটারির রেজাল্ট বেরবে। সুচন্দ্রা যদি প্রত্যাখ্যান করে তা হলে রাতে তো জিরোর ফোন আসছেই।

সোমবার সকালে বেশ সেজে গুজে কলেজে গেল দীনেশ। বেরনোর আগে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আজ ‘বেঙ্গল বেস্ট’ লটারির রেজাল্ট বেরবো না?” ছেলের এমন একটা প্রশ্নে বেশ অবাকই হল দীনেশের বাবা, শুভময় সেন।
কলেজে ঢুকতে না ঢুকতেই ওদের ক্লাসের শিবজিত দৌড়ে এল। বলল, “দিনু ভাই, আবার পার্টি।”
“আজ আবার কিসের পার্টি বস?” একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল দীনেশ।
“সে কি তুই চন্দ্র শেখরের বেস্ট ফ্রেন্ড আর তুই জানিস না?” হেসে বলল শিবজিত।
“এই শালা, হেঁয়ালি করিস না তো। কি হয়েছে সেটা বল,” একটু রেগেই বলল দীনেশ।
“আরে খিস্তি করছিস কেন? আমি কি করে জানব যে তুই খবরটা জানিস না। আরে চন্দ্র শেখর মাল তুলে ফেলেছে। আমাদের সুচন্দ্রা রে। শালা বুঝতেই দেয়নি, ডুবে ডুবে জল খাচ্ছিল এতদিন।”
“কি যাতা বলছিস?” মাথাটা গরম হয়ে গেল দীনেশের।
“ভালো, যা নিজেই গিয়ে দেখে ওই ক্যান্টিনে বসে আছে হাত ধরে।”

শিবজিতের কথা শেষ হওয়ার আগেই ক্যান্টিনের উদ্দেশ্যে ছুট লাগাল দীনেশ। রাগে মাথাটা ঝিমঝিম করছে ওর। বন্ধু হয়ে বন্ধুত্বের সম্মান রাখল না চন্দ্র। ও আবার বন্ধু। দীনেশকে ক্যান্টিনে ঢুকতে দেখে চন্দ্র দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল দীনেশকে। দীনেশ শুধু বলল, “কনগ্র্যটস, ভাই।”
দীনেশ আর দাঁড়াল না। ‘একটু কাজ আছে’ বলে বেরিয়ে গেল কলেজ থেকে। সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াল। চন্দ্র যে ওর সাথে এই রকম করবে সেটা ও ভাবতেই পারেনি। রাগে ওর চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগলো। চন্দ্রর উপর রাগ আস্তে আস্তে ঘৃণায় পরিবর্তিত হতে লাগলো। মনে মনে ঠিক করে ফেলল ও কি করবে। আজ তো ‘বেঙ্গল বেস্ট’ লটারির রেজাল্ট। তার মানে আবার ফোন আসবে রাত বারোটায়।

বাড়ি ফিরে দীনেশ দেখল হুলুস্থুল ব্যাপার। ঘরে ঢুকতেই ওর মা এসে ওর হাতটা ধরে বলল, “বাবা, তুই যত ইচ্ছে পড়। আমাদের সব দুঃখ ঘুচে গেছে রে। তোর বাবা লটারিতে পঞ্চাশ লাখ টাকা জিতেছে। এতদিনে ঠাকুর মুখ তুলে চাইলেন আমাদের দিকে।”
দীনেশ একটু হাসল মাত্র। এ তো ওর কাছে জানা খবর। ও চুপচাপ নিজের ঘরে চলে গেল। মাকে বলল, “শরীরটা ভালো নেই গো। আজ আর খাব না।”
ওর মা দু একবার খেতে বলেছিল। দীনেশ তবু সে রাত্রে খেল না। বিছানায় শুয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো কখন রাত বারোটা বাজবে।
ঠিক রাত বারোটার সময় ফোনটা বেজে উঠল। ফোন কানে দিতেই ওপার থেকে জিরোর কর্কশ গলা শোনা গেল, “তোমার দ্বিতীয় উইসটা পূর্ণ হয়েছে। বল তোমার তৃতীয় উইসটা কি?”

“আমার বন্ধু চন্দ্র আমাকে বিটট্রে করেছে। আমার তৃতীয় উইস হল চন্দ্র যেন বেঁচে থাকে,” ভীষণ ঠাণ্ডা গলায় বলল দীনেশ।
ফোনের ওপার থেকে জিরোর গলায় শোনা গেল, “গ্রাণ্টেড।”
আজ গলাটা যেন একটু নরম আর ‘গ্রাণ্টেড’ বলার সময় যেন একটা হলকা হাসির রেষ ছিল। একটু অবাকই হল দীনেশ। যাই হোক, পরের দিন কলেজে গিয়ে শুনল চন্দ্রর নাকি আগের দিন রাত থেকে খুব শরীর খারাপ। সেদিন সকালে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রচণ্ড পেটে ব্যাথা নিয়ে। সুচন্দ্রা বলল, “এই দীনেশ চল না একবার আমার সাথে। সাউথ ক্যালকাটা হসপিটালে ভর্তি আছে ও। চল না একবার দেখে আসি?”

সুচন্দ্রার কোন কথায় না করতে পারে না দীনেশ। তাছাড়া ওর নিজেরও খুব কৌতূহল হচ্ছিলো। দুজনে বাসে করে হাসপাতালে গিয়ে খবর পেল চন্দ্র বেশ অসুস্থ। লিভারে কি যেন একটা হয়েছে। বেশ সিরিয়াস। মুখে দুঃখ প্রকাশ করলেও মনে মনে ভীষণ আনন্দ পেল ও। এত তাড়াতাড়ি যে ওর উইসটা পূর্ণ হবে, সেটা ও ভাবতেও পারে নি। সুচন্দ্রা ভীষণ কাঁদছে। এই একটা জিনিস ওর একদম সহ্য হয় না। সুচন্দ্রাকে একটু সান্তনা দিয়ে উঠে পড়ল দীনেশ। মনে মনে ঠিক করতে লাগলো শেষ উইসে কি চাইবে। কি আবার সুচন্দ্রা আর কি? মনে মনে ঠিক করে নিল কি বলবে জিরো ফোন করলে। বলবে, “সুচন্দ্রা যেন আমাকে বিয়ে না করে।” ব্যস। আনন্দে মনটা নেচে উঠল দীনেশের।

রাতে খাটে শুয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো কখন ফোন আসবে হাসপাতাল থেকে। কখন শুনবে আনন্দের খবরটা। ওর নিজের শরীরটাও ঠিক ভালো লাগছিল না। রাতে খাওয়ার পর থেকেই বুকে একটা ব্যাথা ব্যাথা করছে। দীনেশ ভাবল, ‘অম্বল হয়ে গেছে মনে হয়। আর একটু দেখি তারপর না হয় ওষুধ খেয়ে নেব।’
একটু তন্দ্রা এসে গিয়েছিল দীনেশের। ঘুমটা ভাঙল ফোনের আওয়াজে। তাড়াতাড়ি ফোনটা নিয়ে দেখল, শিবজিত। ও আজ হাসপাতালে আছে। সুখবরের আসায় ফোনটা কানে দিল ও, “বল?”
“চন্দ্র শেখর এখন ভালো আছে রে। আউট অফ ডেঞ্জার। মনে হয় পরশুই ছেড়ে দেবে।”
“ও আচ্ছা। ভালো খবর।”

খুব অনিচ্ছা সত্ত্বেও দুটো কথা বলে ফোন কেটে দিল দীনেশ। ওর মনটা খারাপ হয়ে গেল আবার। ভেবেছিল আজই সব মিটে যাবে কিন্তু না, আবার অপেক্ষা। পাশ ফিরে শুতেই আবার ফোনটা বেজে উঠল। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল স্ক্রিনে লেখা জিরো কলিং। ‘কি হল?’ একটু অবাক হল দীনেশ, ‘আজ তো ফোন আসার কথা নয়?’ ফোনটা কানে দিল ও, “হ্যালো।”
আজ কিন্তু হ্যালো-র উত্তর এল।
“হ্যালো, দীনেশ। আজ একটু আগেই ফোন করলাম। তোমার তৃতীয় উইসটা প্রায় পূর্ণ হয়ে এল। বল তোমায় শেষ উইসটা কি?”
দীনেশ একটু থমকে গেল। বলল, “কোথায়? এই তো হাসপাতাল থেকে ফোন এল চন্দ্র সুস্থ হয়ে উঠছে। কোই ও মরল না তো?”
এবার যেন একটা হাল্কা হাসির শব্দ এল ওপাশ থেকে। জিরো বলল, “চন্দ্র মরবে কেন? মরবে তো তুমি।”

হঠাৎ ভীষণ একটা ভয় চেপে ধরল ওকে। কাঁপা গলায় দীনেশ বলল, “মা-মানে?”
ওপার থেকে কথা এল, “মনে কর তুমি কি বলেছিলে। তুমি বলেছ, ‘চন্দ্র যেন বেঁচে থাকে।’ আমি তো উল্টোটাই করছি। চন্দ্র-র উল্টো তো সূর্য। আর সূর্য মানেই দীনেশ। তাহলে উল্টোটা কি দাঁড়াল?”
দীনেশ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “দীনেশ যেন মরে যায়।”

ধড়ফড় করে উঠে বসল দীনেশ। বসতেই বুঝতে পারল, ওর নাক দিয়ে যেন একটা তরল গড়িয়ে পড়ছে। হাত দিতেই টের পেল ওটা রক্ত। ভয়ে সারা শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল দীনেশের।
জিরো আবার বলে উঠল, “সময় কম দীনেশ। তাড়াতাড়ি বল চতুর্থ উইসটা কি?”
দীনেশ বুঝতে পারছে ওর বুকের ব্যথাটা যেন অনেকটা বেড়ে গেছে। নিশ্বাস নিতে পারছে না ও। বুকের উপর যেন একটা বিরাট পাথর বসিয়ে দিয়েছে কেউ। মৃত্যু ভয়ে দিশেহারা হয়ে গেল ও। গলা দিয়ে আওয়াজ বেরচ্ছে না। শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে দীনেশ চেচিয়ে উঠল, “আমার কিচ্ছু চাই না, আমি বাঁচতে চাই। আমি বাঁচতে চাই।”
ফোনের ওপার থেকে অল্প হাসি মিশ্রিত কর্কশ গলায় কথা এল, “গ্রাণ্টেড।”

(সমাপ্ত)


FavoriteLoading Add to library

Up next

স্বাধীনতা - কৌশিক চক্রবর্ত্তী   আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অসংখ্য কাঙ্খিত নৈমিত্তিক চাহিদার মধ্যে স্বাধীনতা অগ্রগণ্য বলেই আমার ধারণা। কিন্তু স্বাধীনতার সংজ্ঞাটি মনে...
আলোর উৎসব – গার্গী লাহিড়ী... বাঙালির প্রিয় শারদোৎসব হয়ে গেল শেষ রয়ে গেছে শুধু শুভেচ্ছা বিনিময়ের রেশ , আসন্ন দীপাবলি ঘরে ঘরে রঙিন লাইট মাটির প্রদীপ পলকা ভারি করতে পারেনা ফাইট | ...
পাতু দি গ্রেট – প্রিয়াঙ্কা চ্যাটার্জী...  সুর করে দুলে দুলে পড়ে চলেছে শ্রীমান পাতু ওরফে প্রতুল। সন্ধ্যাবেলায় পড়তে না বসলে শান্তি জেঠুর লাঠির হাত থেকে তাকে কেউ রক্ষে করতে পারবে না। পাতুর জ...
বৃষ্টিভেজার গান   - সৌম্যদীপ সৎপতি, চায়ের কাপের কুণ্ডলি ধোঁয়া, আকাশ ঝরায় অভিমান কাকভেজা মন আত্মমগন, পাগলা হাওয়ায় অভিযান মেঘেদের ভীড়ে নস্টালজিয়া, বজ্রে আকাশও দেয় ...
টিয়াপাখি – সৌম্য ভৌমিক... You will be rich within three months, when I am assuring you, it will happen surely. কথাটা ফুটপাথ থেকে ভেসে এলো, লাঞ্চ করতে বেরিয়েছি। একটু অবাকই হলাম...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment