চল দাওকি – দেবাশিস_ভট্টাচার্য

মন খারাপ করা এক বিকেলে রুশা দাঁড়িয়ে ছিল দাওকি ফরেস্ট বাংলোর সামনের লনে। অস্তগামী সূর্যের লাল আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে দূরের পাহাড়গুলোর অন্দরমহলে। পাহাড়ের নিচের চিনার,রডোডেনড্রন গাছগুলো বেয়ে উঠে আসছে এক আদিম অন্ধকার…..

গায়ে একটা শিরশির করা ঠান্ডা লাগতেই আচমকা
একটা শীত শীত ভাব লাগতে আরম্ভ করলো। পাশের টেবিলে পড়ে থাকা চাদর টা হাত দিয়ে তুলে গায়ে দিল রুশা। নিচের থেকে এক আদিম অন্ধকার তর তর করে উঠে আসছে ওপর দিকে। দূরের পাহাড়ি গ্রামগুলোর টিমটিম করে জ্বলা আলোগুলোর দিকে একবার চেয়ে ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো রুশা।

দরজাটা খুলে ঘরের মধ্যে ঢুকে এসে বেল টিপে রুম সার্ভিসে জিজ্ঞেস করলো রাতে কি পাওয়া যাবে? শুধু চিকেন আর আলুভাজা সাথে রুটি। রাতের ডিনার এর কথা বলে বিছানাতে একটু পিঠটা ঠেকলো রুশা।

মেঘালয় এসে প্রথম থেকেই ঠিক ছিল একটা কি দুটো রাত দাওকী তে থাকবে।সেইমত আজ দুপুরে এসে পৌঁছছে এই ফরেস্ট বাংলোর এই ঘরে। কত স্মৃতি কত ভালোবাসা জড়িয়ে আছে এই জায়গা টার সাথে।মনে হয় এই তো সেদিন……..

তীর্থর পাগলামো টা সেই স্কুল লাইফ থেকে। ও যা ভাববে সবই আলাদা হবে। ওর সব কিছুতেই নতুনত্ব কিছু আলাদা।স্কুল ছেড়ে কলেজ তারপর প্রেম বিয়ে সবেতেই নতুন ইনোভেটিভ আইডিয়া।
দিদি বলেছিল “এ তো একদম পাগল রে একে নিয়ে ঘর করতে পারবি তো?”

তখন রুশার সারা পৃথিবী তীর্থময় বলেছিল “কি বলছিস দিদি ওর এই পাগলামো টাই আমার দারুন লাগে সবাই কি পারে এই রকম পাগলামো করতে।” দিদি কিছুক্ষন চুপ করে বলেছিল “আমার অনুমান টা  ভুল হলেই ভালো।”

এর পর বিয়েটাও হয়ে গেলো তীর্থর সাথে। ওর মা নেই তীর্থর যখন দশ বছর বয়েস তখন উনি আচমকাই মারা যান দুদিনের জ্বরে। ওর বাবা একটা বহুজাতিক কোম্পানির উচ্চপদস্থ অফিসার বম্বেতে থাকেন।তীর্থ র পড়া শুনার সুবিধার জন্যে দক্ষিণ কলকাতায় একটা বড়ো ফ্ল্যাট কিনেছেন।

বিয়ের আগেই তীর্থ একটা বড়ো কোম্পানিতে জুনিওর অফিসার হয়ে জয়েন করেছে। বিয়ের ঠিক তিনদিন আগে ফোন করে বলেছিল “দাওকি যাবি ?”
রুশা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল “সেটা আবার কোথায়?”ওদিক থেকে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হেসে উঠেছিল তীর্থ।বলেছিল “ভালই হলো তুই জানিস না,আমরা ওখানেই যাচ্ছি আমাদের মধুচন্দ্রিমার জন্যে।” আর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ফোনটা কেটে দিয়েছিল তীর্থ। বাসরঘরে আর একবার জিজ্ঞেস করেছিল রুশা “বল না জায়গাটা কোথায়”।

খুব আস্তে করে কানের কাছে মুখটা এনে তীর্থ বলেছিল “নরকে ম্যাডাম নরকে”।তারপরই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েছিল রুশার কোলে।অরিন্দম, নিশা, সুজান আর বাকি সবাই জিজ্ঞেস করেছিল “কি ব্যাপার মাইরি আমাদের নিয়ে খিল্লি করছিস না তো।” তীর্থ হাসতে হাসতেই বলেছিল “না রে এটা আমার আর রুশার ব্যাপার।”

এরপর বিয়ে,বৌভাত,অষ্টমঙ্গলা সব মিটে যাওয়ার দুদিন পর তীর্থ বলেছিল “চল দাওকি”
ঠিক এর পরের দিনের ফ্লাইট এ ওরা রওনা দিয়েছিল শিলং।ওখান থেকে গাড়ি নিয়ে সন্ধ্যে নাগাদ যখন ফরেস্ট বাংলোতে পৌঁছেছিল তখন চারদিক প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে একটা ঠান্ডা ঘিরে ধরেছিল ওদের দুজনকে।

এক অসাধারণ আনন্দে কেটে গিয়েছিল পরের কয়েকটা  দিন।শুধুই আনন্দ নিজেদের আরো কাছে পাওয়ার আর চেনার আনন্দ ।আর তার সাথে পাহাড় লেক জঙ্গল সব মিলিয়ে এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা।

ফিরে যাওয়ার আগের দিন রুশা র হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল একটু দূরে এক জঙ্গলে ওখানেই এক চিনার গাছের কাছে নিয়ে গিয়ে বলেছিল “চল আমরা চিরজীবন এখানে থেকে যাই’? রুশা আশ্চর্য হয়ে বলেছিল “সেটা কি ভাবে হবে?”
পকেট থেকে ছোট একটা পেন্সিল কাটার বের করে তীর্থ বলেছিল “দেখ কি করে হয়।”

তারপর চিনার গাছটার গায়ে কুদে কুদে ছুরিটা দিয়ে লিখলো “তীর্থর নিজের ভালোবাসা রুশাকে অনেক আদর। আজ থেকে এই জঙ্গলের মালিক আমরা।”সেই জঙ্গলে এক ঠান্ডা হাওয়ার মাঝে তীর্থ কে জড়িয়ে এক অস্থির আনন্দে মেতে উঠেছিল রুশা। হাসতে হাসতে তীর্থ বলেছিল “আমরা অমর হয়ে গেলাম বুঝলি আজ থেকে এই বন এই গাছ সব আমাদের। একান্ত ভাবে শুধু তোর আর আমার।”

আচমকা যেন হুশ ফিরে এলো রুশার রুম সার্ভিস থেকে লোক এসেছে রাতের খাওয়া নিয়ে।
রাতের খাওয়া শেষ হলে আলো নিভিয়ে জানলাটা দিয়ে বাইরে তাকালো রুশা।

চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ দূরের জঙ্গল  দাওকি লেক সব যেন আলোতে ভেসে যাচ্ছে। একটা পিন ফেললেও যেন শব্দ পাওয়া যাবে।

বেশ কিছুক্ষন জানলার কাছে চুপ করে দাড়িয়ে রইলো রশা।অন্ধকারের মধ্যে দূরে টিম টিম করা আলো তার সঙ্গে চাঁদের আলো সব মিলিয়ে এক অলৌকিক সুন্দর্য্য।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানার এসে বসলো রুশা।

সময় কাঁটা ক্রমশঃ পিছিয়ে যাচ্ছে এক,দুই,তিন করে প্রায় পনেরো বছর।পঁচিশ বছরের রুশা মিত্র আর তীর্থ সরকার।নতুন ফ্ল্যাট সাজানো সংসার।শনি রবিবারের উইকেন্ডে পার্টি লং ড্রাইভে যাওয়া।জীবন সম্পূর্ণ আলাদা।এর মধ্যে রুশা একটা সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতায় পাস করে কেন্দ্রীয় সরকারের একটা বড় পোস্টে জয়েন করেছে। সব কিছুই ঠিকঠাক চলছিল।কিন্তু মানুষ ভাবে এক হয় আর এক।

সেদিন রাতে একটা নামী হোটেলে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করতে করতে তীর্থ আচমকাই বললো জানিস আমি বেশ অনেকদিনের জন্যে বাইরে যাচ্ছি।কোম্পানির একটা বড় প্রজেক্ট এর কাজে আমাকে জার্মানি যেতে হবে। রুশা তীর্থর মুখের দিকে না চেয়েই বললো “আবার শুরু হল তোর ঢপের গল্প চুপচাপ খেয়ে নে”। তীর্থ হাসতে হাসতে বলল “বিশ্বাস কর মা কালীর দিব্যি একটাও মিথ্যা কথা বলি নি।”

এরপর আর কথা তেমন এগোয় নি। তিনদিন বাদে রুশা বুঝতে পারলো ওর হিসেব টা ভুলই ছিল তীর্থই ঠিক কথা বলেছে।ওর পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন এর জন্যে লোকাল থানা থেকে একজন অফিসার এসেছিলেন।

রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে রুশা জিগ্যেস করলো”তুই সত্যি ই তাহলে যাচ্ছিস”? তীর্থ একটু মুচকি হেসে বললো “আমি তো তোকে আগেই বলেছি তুই তো বিশ্বাস করলি না”।
“আমার কথা ভেবেছিস?”
“বাহ রে তুইও তো আমার সাথেই যাবি।কিরে যাবি না?”
রুশা মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে বললো “বাঃ রে আর আমার চাকরি?”
তীর্থ একটু থতমত খেয়ে জিগ্যেস করলো “সে কি তুই না গেলে কি করে হবে? আমার সব কিছু তো তুই আর তুই না গেলে হবে কি করে।”
রুশা এবার আচমকা ই ভীষণ জোরে চেঁচিয়ে বললো “তোর কাছে তোর ক্যারিয়ার যেমন দামী আমার কাছে আমার ক্যারিয়ার টা ও সমান দামী।”
তীর্থ আর কোনো কথা না বলে চুপ করে রইলো বললো “ঠিক আছে যা ব্যাপারে আমরা পরে কথা বলি।”

এর পর কেটে গেছে আরো কটা দিন।রুশা বুঝতে পারছে একটা সমস্যা বেড়েই চলেছে। তীর্থ কদিন ধরেই খুব গম্ভীর প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া আর কোনো কথাই বলে নি।

রুশা নিজেই একদিন জিজ্ঞেস করলো “কি রে তুই সত্যিই যাচ্ছিস?”
“তোর কি কোনো সন্দেহ আছে না ভাবছিস আমি ইয়ারকি মারছি।”

এরপর হটাৎ একদিন রাতে বাড়ি ফিরে তীর্থ জানালো আগামী মাসের ফার্স্ট উইক এ ও জার্মানি রওনা হচ্ছে।
রুষা খুব আস্তে করে বললো “তাই! খুব ভালো খুব ভালো।”

কিন্তু একটা জেদ একটা অভিমান একটা রাগ সব মিলিয়ে রুশা আর বলতেই পারলো না “তুই যাস না তীর্থ তুই আমার সবকিছু তোকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না।তুই আমার অক্সিজেন।”
এরপর সবকিছুই গতানুগতিক হয়ে গেছিলো। তীর্থর চলে যাওয়া নিজের ফ্ল্যাট ছেড়ে বাবা মার কাছে ফিরে যাওয়া।

এরপরও তীর্থ দুচরবার রুসা কে বলেছিল জার্মানি আসার জন্যে।কিন্তু একটা জেদ আত্মভিমান ও একটা রাগ থেকে রুশা বলেছিল “আমি কোনদিনই চাকরি ছেড়ে জার্মানি যাবো না তীর্থ। তুই বরং এ খানে ফিরে আয়।”

এরপর থেকে সম্পর্কটা একটা হ্যালো হাই কোতে পরিণত হল।আস্তে আস্তে রুশা  বুঝতে পারছিল যে কোনোদিন একটা অঘটন ঘটতে চলেছে।

কিন্তু ওই জেদ হেরে যাওয়ার ভয় রুশা কে গুটিয়ে দিয়েছিল শামুকের মতো।
শেষ ফোনটা এলো দু একদিন বাদেই। দু একটা কথার পরেই তীর্থ র প্রশ্ন ছিল “রুশা আসবে না? ওর সিদ্ধান্ত একই আছে।”

রুশা চিবিয়ে চিবিয়ে একটাই কথা বলেছিল” না আমি যাবো না।তোর দরকার থাকে তুই ফিরে আয়।” আর কথা এগোয় নি।

বেশ কিছুদিন বাদে নিশার কাছ থেকে খবর টা পেয়েছিল তীর্থ জার্মানির নাগরিকত্ব নিয়েছে ও আর ইন্ডিয়াতে আসবে না।

সেই শেষ এরপর থেকে তীর্থ র কাছ থেকে আর কোনো ফোন আসে নি।একটা অভিমান,রাগ,জেদ সব আঁকরে ধরে দেখতে দেখতে পার হয়ে গেছে পনেরো টা বছর।

বিছানা তে শুয়ে শুয়ে রুশা ভাবছিল এই সব কথা।সময় কি দ্রুত চলে যায়।সেদিনের রুশা মিত্র আজকে এই সংস্থার একজন ডেপুটি ডিরেক্টর।দুটো ডিপার্টমেন্ট ইনচার্জ।ভীষণ ব্যস্ততা নিজের জন্যে একটা ফ্ল্যাট কিনেছে যোধপুর পার্ক।গাড়ি বাড়ি,ব্যাংক ব্যালেন্স সব মিলিয়ে একটা সফল নারী।
কেউ যে জীবনে আসে নি নয় কিন্তু তীর্থ র জায়গাতে অন্য কারুর কথা ভাবতেই পারে নি।সুতরাং মিসেস মিত্র হয়েই কেটে গেছে পনেরো বছর।

ঘটনার সূত্রপাত দিন কুড়ি আগে একটা মেসেজ ঢুকেছিল রুশার ফোনে লাঞ্চ করছিল বলেই ফোনটা তুলে দেখলো একটা আননোন নম্বর।
কার মেসেজ দেখার জন্যে মেসেজ বক্স খুলতেই বুকটা ধড়াস করে উঠলো একটাই কথা বাংলাতেই লেখা “চল দাওকি দেখা হচ্ছে পঁচিশে নভেম্বর  আমাদের সেই গাছটার কাছে।”

একটা শিরশির করা ভালোবাসা একটা রাগ একটা চূড়ান্ত অভিমান সব কিছু দলা পাকিয়ে একটা কান্না তার সাথে হাহাকার করে ছিটকে বেরিয়ে এলো রুশার গলা থেকে।
নেহাত লাঞ্চ আউরস না হলে কারুর চোখে পড়ে যেত। টয়লেট এ গিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলো রুশা। একটু বাদে নিজেকে সামলে বাইরে বেরিয়ে এসে এসি টা চালিয়ে কিছুক্ষন চুপ করে বসে রইল।
হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিয়ে প্রথমে নম্বরটা দেখলো একটা আননন্ নম্বর। রিং ব্যাক করার পর দেখলো সুইচ অফ।আরো বড় কয়েক করার পর একই রিপ্লাই সুইচ অফ।
একটা বিরক্তি একটা রাগ একটা কষ্ট নিয়ে বাকি দিনটা কাটিয়ে সন্ধ্যের দিকে আর একবার ফোন করলো ওই নাম্বারে সেই একই কথা সুইচ অফ।

অফিস থেকে বেরোনোর আগে একবার ফোন করলো ট্রাভেল এজেন্ট কে চব্বিশ এ নভেম্বর শিলং যাওয়ার কোনো ফ্লাইট আছে কি না?
কিছুক্ষন এর মধ্যেই জানা গেলো টিকিট কনফার্ম।
তার সাথে দাওকি তে ফরেস্ট বাংলো ও বুকিং কনফার্ম।

ট্রাভেল এজেন্ট সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে চেপে রওনা হলো দাওকির দিকে।প্রায় সন্ধ্যে নাগাদ যখন পৌঁছলো চারিদিক অন্ধকার হতে শুরু করেছে।

শেষ পনেরো বছরে অনেক চেঞ্জ হয়েছে
জায়গাটার আগের সেই ফাঁকা ফাঁকা ভাবটাই চলে গেছে অনেক হোটেল আর তার সাথে বেশ ঘিঞ্জি।

সকাল বেলাতে উঠেই ব্রেকফাস্ট কফি খেয়ে রুশা একবার তারিখ টা দেখলো। তারপর বেরিয়ে পড়লো তার নিজের সাম্রাজ্য নিজের মসনদ এর সেই গাছটা খুঁজতে।

জঙ্গল আগের চেয়ে অনেক পাতলা তাও কিছুতেই খুঁজে পেলো না সেই গাছ যা সাক্ষী ছিল ওর আর তীর্থ র ভালোবাসার।অনেকক্ষন খোঁজাখুঁজির পর রুষা ভেঙে পড়লো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই জড়িয়ে ধরলো সামনের গাছটাকে। দুহাত দিয়ে পরম মমতায় আদর করতে লাগলো ওর নিজের সাম্রাজ্যের প্রজাকে।

চোখ বন্ধ করে পেতে চেষ্টা করলো তীর্থ র উত্তাপ।কিছুক্ষন এই ভাবে দাড়িয়ে সবে পেছন ঘুরতে যাবে সেই সময় কেউ যেনো পরম মমতায় চেপে ধরলো রুশার চোখ দুটো।

একটা চেনা হাতের স্পর্শ।একটা চেনা শরীরের গন্ধ পেতে থাকলো রুশা। চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে থাকলো এই স্বপ্নটাকে।

আচমকাই চোখটা খুলে গেলো।আধা ঝাপসা আধা পরিষ্কার চোখে যে মানুষ টা সামনে দাড়িয়ে আছে এটাই কি সেই তীর্থ।

মানুষটাই বলে উঠলো “কেমন আছিস”?

এত দিনকার অভিমান,রাগ,কষ্ট, দুঃখ সব একাকার হয়ে আছড়ে পড়লো তীর্থ র বুকে।পরম মমতায় তীর্থ ওকে জড়িয়ে ধরে বলেই যেতে লাগলো “প্লিজ ক্ষমা করে দে ক্ষমা করে দে।” গুমগুম করে কিল মারতে মারতে একটা সময় রুশা আর পারলো না।তীর্থ পরম মমতায় ওকে আস্তে আস্তে বসিয়ে দিল জঙ্গলের নরম সবুজ ঘাসে।
নিজেও সামনে বসে পরম মমতায় রুশা মুখটা ধরে  বললো “দেখ আমি ফিরে এসেছি তোর কাছে তোর সাম্রাজ্যে রুশা।আমাকে থাকতে দিবি তোর এই রাজ্যে।”
রুশা শুধু ওর মুখের দিকে চেয়েই রইলো তারপর খুব আস্তে আস্তে বললো “ফিরিয়ে দিতে পারবি তোর আমার পনেরো টা বছর।ফিরিয়ে দিতে পারবি আমার রাগ,অভিমান,দুঃখ,কষ্ট।আমি জানি তুই কিছুই ফেরাতে পারবি না তীর্থ।তার চেয়ে এই বেশ ভাল আছি।বেঁচে থাকুক আমার নিজের তীর্থ আমার পঁচিশ বছরের তীর্থ।”

তীর্থ কিছুক্ষণ চুপ করে বললো “তাহলে এখানে
এলি কেন? কেন আমার ডাকে সাড়া দিলি।”

বেশ কিছুক্ষন চুপ করে রুশা বললো “কেনো জানিস।আমার তীর্থ আমাকে যে সাম্রাজ্য দিয়ে গিয়েছিল সেটা অক্ষত আছে কি না দেখার জন্যে।”

তীর্থ বললো “সেটা তো আমিই রে।তুই কি পাগল হয়ে গেলি ।”

আস্তে আস্তে উঠে দাড়ালো রুশা।এখন বেশ হালকা লাগছে পনেরো বছরের অপমান,রাগ দুঃখ,অভিমান সব উধাও।

“চলি রে তীর্থ আজ আমি তোকে দান করে গেলাম তোর সাম্রাজ্য তোর রাজত্ব  তোর মসনদ।যা তুই আমায় দান করে ছিলিস একদিন। আর আজ তোর দান আমি তোকেই ফিরিয়ে দিলাম”ভালো থাকিস।”

তীর্থ শেষে বারের মত একবার হাতটা ধরতে গেলো
রুশার।

রুশা শুধু আস্তে করে বললো “আর নয় তীর্থ তোর অধিকার তুই শেষ করে দিয়েছিস নিজের হাতে।ওকে চলি রে আজ বিকেলেই ফ্লাইট।”

এক পা এক পা করে ঠিক পনেরো পা পার করার পর রুশা একবার পেছন ফিরে তাকালো।হতাশ এক ভেঙ্গে পড়া মানুষ কে দেখতে পেলো। আর কষ্ট হচ্ছে না তো আর দুঃখও হচ্ছে না।বরং এক অলৌকিক শক্তি ঘিরে ধরেছে রুশাকে।এই তো সেই বন জঙ্গল এই তো সেই চিনার গাছটা আর ওই যে সামনে দিয়ে হাতে হাত ধরে যে ছেলে মেয়েটা চলে গেলো ওরাই তো রুশা আর তীর্থ।

মুক্তি আর মুক্তি সেই না জানা মুক্তির খোঁজেই এগিয়ে চললো রুশা পাহাড়ী সূর্যের নরম আলো গায়ে মেখে।

______


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment