জন্ম শতবর্ষে সত্য চৌধুরী – শ্রদ্ধাঞ্জলি – দিব্যেন্দু দে

“তখনো ভাঙেনি
তখনো ভাঙেনি
প্রেমেরও স্বপনখানি।
আমারও এ বুকে ছিল প্রিয়া,
ছিল রাণী।
আজ যত দূরে চায়
আসে শুধু এক ক্ষুধিত জনতা
প্রেম নাই, প্রিয়া নাই।
আপনার ঘরে আছি মোরা
পরবাসী……..!
পরবাসী…..!
উপবাসী প্রিয়া
অধরে জাগে না হাসি।
কাঁদিছে জননী,
কাঁদে বোন,
কাঁদে ভাই।
আজ যত দূরে চায়
আসে শুধু এক ক্ষুধিত জনতা
প্রেম নাই, প্রিয়া নাই।
বন্ধু আমার খোলো গো
দুয়ারও খোলো……
বন্ধু আমার খোলো গো
দুয়ারও  খোলো।
আজিকে পাবে
মিলনস্বপনো গুলো।
এসো নবজীবনের জয় গাই…
মোরা গাই।
আজ যত দূরে চায়
আসে শুধু এক ক্ষুধিত জনতা
প্রেম নাই, প্রিয়া নাই…..”
1946 এ মোহিনী চৌধুরীর অমর বাণীতে আর সুরের যাদুকর কমল দাশগুপ্তের মায়াবী সুরে এ গান গেয়েছিলেন অমর কণ্ঠশিল্পী সত্য চৌধুরী।
আমি শুধু এই সামাজিক অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ভাবি পরাধীন ভারতের সেই গান আজও, আজও কতটা প্রাসঙ্গিক , কতটা বাস্তবিক।
কিন্তু অবাক লাগে এই ভেবে এতবড় একজন কন্ঠশিল্পী আজ প্রায় বিস্মৃত। ১৯৪৭ এ গাওয়া তাঁর গানের কথা তেই আজ মনে পড়ে……
কথা- উমাপদ লাহিড়ী
সুর ও শিল্পী- সত্য চৌধুরী
“ভুলে গেছ
ভুলে গেছ জানি
জানি
একদিন কোনো রাগে
সঁপেছিলে মোরে
তোমার হৃদয়খানি।
ভুলে গেছ জানি
জানি…
গোপনে কহিলে
ভালোবাসো মোরে
মিছে নয়, মিছে নয়
তুমি আছো হিয়া ভরে,
শুধু কেমনে ভুলিব জীবনে
শোনাও মোরে সে বাণী।
ভুলে গেছ জানি
জানি…।।
প্রিয় প্রভাত বেলায়
ভুলে যাবে যদি
গোধূলির যত কথা
তবে রাঙা গোধূলিতে
রেঙে ছিলে কেন
আমার আঁখির পাতা।
প্রিয়া রে শুধাই
প্রেম সেতো নয়
সেতো ক্ষণিকের শুধু অভিনয়
তবু হিয়া মোর
ভুলিতে পারেনা  ক্ষণিকের ফাল্গুনী
ভুলে গেছ…
ভুলে গেছ জানি…”
প্রায় বিস্মৃত  সেই শিল্পীকে আজ আরো  আরেকবার স্মরণ করার প্রয়াস করছি শুধু আমার নিজের মত করে…
কি অসম্ভব সুরেলা ও ব্যক্তিত্বময় কন্ঠের অধিকারী ছিলেন এই মানুষটি, কিন্তু তাঁর শেষজীবন কেটেছিল চরম অবহেলায়। গান গাওয়া ছাড়াও তিনি বেশ কিছু ছায়াছবিতে অভিনয়ও করেছিলেন।সারাজীবনে তিনি অসংখ্য অমর গান আমাদের উপহার দিয়েছেন…কিন্তু আমরা তাঁকে মনে রেখেছি শুধু “পৃথিবী আমারে চাই” এর শিল্পী হিসাবে…। আর কেউ কেউ তাঁর নামই শোনেনি। এটা আমাদের লজ্জা। বাংলা গানের কান্ডারী ছিলেন এঁরা…বাংলা কে জানতে হলে বাংলা গান কে বুঝতে হলে এঁদের মত মহান শিল্পীকে জানা অবশ্যই প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
মরণ পথের ওপার থেকে যেন এই গান ভেসে আসছে …তিনি গাইছেন
“ভুলে গেছ…
ভুলে গেছ জানি…
জানি”
“ইতিহাসে মোর নাম লেখা নাই
আমি অজানার দলে…।
আমি জেগে আছি প্রেমিকের মনে
বিরহীর আঁখিজলে…..
আমি ভূল ভেঙে দিই
মাটির মানুষ ভালবাসা ভুলে গেলে….
প্রেমের প্রদীপ জ্বেলে……।”
জন্মশতবর্ষে পদার্পণ কারী সত্যরঞ্জন চৌধুরীর জন্ম, ১৯১৮ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর কলকাতার ৩১ নং গ্রে স্ট্রিটের বাড়িতে। । বাবা যতীন্দ্রমোহন চৌধুরী ছিলেন হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট। আদি নিবাস রাজশাহির মাদারিপুর গ্রাম। ঠাকুরদা কিশোরীমোহন চৌধুরী ছিলেন রাজশাহীর বিশিষ্ট ব্যক্তি, দেড় বছর যখন বয়স সত্যর, তখন তাঁর বাবা চলে আসেন মামারবাড়ির কাছে ল্যান্সডাউন রোডে। সত্য চৌধুরীর পড়াশোনা পদ্মপুকুর ইনস্টিটিউশনে ক্লাস এইট পর্যন্ত, তার পর মিত্র ইনস্টিটিউশনে, সেখান থেকে ম্যাট্রিকুলেশন। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি ও বটানি নিয়ে স্নাতক হয়েছেন আশুতোষ কলেজ থেকে।
দাদামশাই উপেন্দ্রলাল মজুমদার বিবাহ করেছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ভাইঝিকে। দিদিমার খুড়তুতো ভাই, দ্বিজেন্দ্রপুত্র দিলীপকুমার রায়ের বিশেষ স্নেহের পাত্র ছিলেন সত্যরঞ্জন। ওঁর কাছেই তিনি পেয়েছিলেন রবীন্দ্রসংগীত ও কীর্তনের তালিম। কাজী নজরুল ইসলামের ও বিশেষ স্নেহ ধন্য ছিলেন এই মানুষটি। ওনার গানেও তিনি সুর দিয়েছেন এবং গেয়েছেন ও তাঁর রচিত প্রচুর গান। আর এক প্রবাদ প্রতিম সঙ্গীত শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সাথে ও তাঁর সখ্যতা ছিল আজীবন। তাঁরা দুজনে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নিয়েছিলেন একই গুরু র কাছে। সেই সঙ্গীত শিক্ষকের নাম ছিল ফণীভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রয়াত শিল্পীর সুযোগ্য ভাইপো শ্রী পরমানন্দ চৌধুরীর কাছে জেনেছি
“আমি’ ও ‘আমার চলার পথে গানটি তাঁকে প্রভূত জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল। তারপর 1942 সালে দিলীপ কুমার রায়ের মাধ্যমে হেমচন্দ্র সোমের সঙ্গে যোগাযোগ হলে তিনি HMV তে শিল্পী রূপে “ভাল যদি লেগে থাকে” ও ” দিয়ে যাব ফাল্গুন রাতে” রেকর্ড করেন। 1945 সালে মোহিনী চৌধুরীর অমর বাণীতে এবং সুরের যাদুকর কমল দাশগুপ্তের সুরে ” পৃথিবী আমারে চাই, রেখোনা বেঁধে আমায়” গানটি তাঁকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়। রেকর্ডের উল্টোপিঠের গানটি ও ছিল স্মরণীয়….”যেথা গান থেমে  যায়, দীপ নেভে হায়, মিলনের নিশিভোরে যদি মনে পড়ে সেথায় খুঁজিও মোরে….. যে গান দুটি সঙ্গীতপিপাসু শ্রোতা রা কোনোদিন ভুলতে পারবেন না বলেই মনে করি। ১৯৪৬ সালে আবার মোহিনী চৌধুরীর কথায় আর কমল দাশগুপ্তের সুরে তিনি গাইলেন “তখনো ভাঙেনি প্রেমের স্বপন খানি” যা আমি প্রথমেই উল্লেখ করেছি। এই গানের রেকর্ডের উল্টোদিকে ও ছিল আর একটি
সাড়াজাগানো গান ” জেগে আছি এক কারাগারে….”… শুধু এই গুলি ই নয় তাঁর আরও অজস্র গান আমাদের মনে চির স্মরণীয় হয়ে আছে…যার মধ্যে প্রচুর রবীন্দ্রসঙ্গীত যেমন আছে তেমন ই কীর্তনাঙ্গের গান ও আছে , নজরুলগীতি ও কাব্যগীতি ও আছে কারণ সঙ্গীতের সমস্ত ধারা তেই তিনি অবাধ অনায়াসে বিচরণ করতে পারতেন।
সুদর্শন এই মানুষটি অনেক ছবি তে তাঁর অভিনয় প্রতিভার ও স্বাক্ষর রেখেছিলেন। যেমন 1949 সালে “রাঙামাটি” বানীচিত্রে তিনি  নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন এবং “গোপাল ভাঁড়” ছবি তে মাতৃ সাধক কবি রামপ্রসাদ এর ভূমিকায় অভিনয় করেন। তাছাড়া জর্জ সাহেবের নাতনী, পাপের পথে, প্রতিশ্রুতি , পরাজয় ইত্যাদি ছবি তে সুযোগ পেয়েও অভিনয় করেননি পারিবারিক কারণে। ১৯৪৭ সালে দক্ষিনামোহন ঠাকুর এর সঙ্গীত পরিচালনায় পথের দাবী ছবি তে ও তিনি প্লেব্যাক করেন , মন্দির ছবি তে সুবল দাশগুপ্তের সুরে ” ম্যায় ভুখা হু” গানটি আজ ও শোনা যায়। ১৯৫১ সালে অদৃশ্য মানুষ ছবির সঙ্গীত পরিচালনা ও তিনি করেন। এছাড়াও রামানুজ, কুরুক্ষেত্র প্রভৃতি ছবি তে তিনি প্লেব্যাক করেছিলেন। কীর্তিমান এই সঙ্গীতময় পুরুষের জীবনদীপ নিভে যায় ১৯৯৩ সালের ৫ই ডিসেম্বর তাঁর বেহালাস্থিত বসত বাড়িতে।
জন্ম শতবর্ষে তাঁকে আমার অন্তরের শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানাই।


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment