জাতিভেদ প্রথা ও স্বামী বিবেকানন্দ – অঙ্কুর কৃষ্ণ চৌধুরী

ভারতীয় হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা বহু প্রাচীন কাল থেকেই প্রচলিত রয়েছে। এই প্রথার উদ্ভব বেশ জটিল ও নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রথাটি তার বর্তমান রূপ পেয়েছে। মূলত বর্ণব্যবস্থাকে ভিত্তি করেই এই প্রথা গড়ে উঠেছে। প্রাচীন ভারতে বর্ণ ছিল চারটি – ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। যার মধ্যে ব্রাহ্মণকে সর্বোৎকৃষ্ট ও শূদ্রকে নিকৃষ্ট মনে করা হত। বর্ণভেদ সংক্রান্ত প্রাচীনতম উল্ল্যেখটি পাওয়া যায় ঋকবেদের পুরুষ সুক্তে। সেখানে বলা হয়েছে আদি পুরুষের মুখ ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রিয় , উরু থেকে বৈশ্য এবং পা থেকে শূদ্রের জন্ম। কিন্তু যে মন্ত্রে এই বক্তব্য আছে তা ঋকবেদের আদি বা মূল অংশের নয়, মন্ত্রটিকে ঋকবেদে প্রবেশ করানো হয়। ঋকবেদের আদি অংশে ( যার সময়কাল খৃষ্টপূর্ব ১৫০০- ১০০০ অব্দ) বর্ণভেদ তথা জাতিভেদ এর কোনো প্রতিফলন নেই। বস্তুত বর্ণভেদ বা জাতিভেদের কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন – ভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ, ভিন্ন বর্ণের ভোজন নিষিদ্ধ, বংশানুক্রমিকভাবে একই পেশার অনুসরণ। এগুলির কোনোটাই ঋকবৈদিক সমাজে ছিল না।

অবস্থার পরিবর্তন ঘটে পরবর্তী বৈদিক যুগে(যার সময়কাল খৃষ্টপূর্ব ১০০০-৬০০ অব্দ) এই সময় বর্ণভেদ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলি লক্ষ্য করা যায়, অর্থাৎ ভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিবাহ, ভোজন নিষিদ্ধ হয়। ব্যক্তিকে বংশানুক্রমিকভাবে একই পেশা গ্রহণ করতে হতো। যদিও ভিন্ন বর্ণে বিবাহ নিষিদ্ধ ছিলো তাও পরবর্তী সময়ে ভিন্ন বর্ণ এ বিবাহ হতে থাকে। এই বিবাহের ফলে যে সন্তান জন্মাত সে তার পিতা বা মাতার বর্ণভুক্ত হতে পারতো না, তার পরিচয় হতো জাতি বা মিশ্রজাতি। তাদের জন্য নির্দিষ্ট পেশা থাকতো। যেমন – ব্রাহ্মণ কন্যার সাথে শূদ্র পুরুষের বিবাহ হলে তাদের সন্তানের জাতি হতো চন্ডাল, তার কাজ হত শবদাহ করা বা ঘাতকের ভূমিকা নেওয়া। এই জন্য বর্ণ সর্বদা চার কিন্তু জাতি অসংখ্য। কিন্তু যাদের নীচু জাতি হিসেবে সমাজের উচ্চবর্ণের লোকেরা চিহ্নিত করে, তাদের অবস্থা মোটেই ভালো ছিল না। উচ্চবর্ণের মানুষের অত্যাচার চলত তাদের উপর যা ঊনিশ শতকে চলে আসছিল। আর এই জাতিভেদের জন্যই হিন্দু সমাজ কখনো ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। এক হয়ে বাধা দিতে পারেনি বিদেশী আক্রমণকে। আর এই অনৈক্যের জন্য ব্রিটিশরা ভারতে তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছিল।

ঊনিশ শতকে ব্রিটিশ শাসনের ফলে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসার কারণে ও খৃষ্টান মিশনারীদের অনলস পরিশ্রমের ফলে ভারতীয় হিন্দু সমাজে এক আলোড়নের সৃষ্টি হয়। যার ফলে একদল মানুষ হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির নিন্দায় মেতে ওঠে। আর একদল মানুষ ছিলেন যারা হিন্দুধর্মের গৌরব প্রচার করে, তার কুসংস্কার দূর করে তার সংস্কারসাধনে প্রয়াসী হন। এই দ্বিতীয় দলেরই অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হলেন স্বামী বিবেকানন্দ, যিনি বুঝেছিলেন হিন্দু সংস্কৃতির এক বড় কুসংস্কার হলো জাতিভেদ প্রথা। তাই এই প্রথার বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়েছিলেন।

এবার আমরা দেখবো জাতিভেদ সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল? তাঁর বিভিন্ন উক্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে তিনি জাতি প্রথাকে দু ভাগে বিভক্ত করেছিলেন ১) জাতি শব্দের আদি ব্যবহার যার তিনি প্রশংসা করেছেন, ২) জাতি শব্দের পরবর্তী প্রয়োগ যার তিনি নিন্দা করেছেন। স্বামীজীর মতে, মূলে জাতির অর্থ ছিল ব্যক্তির নিজ প্রকাশ করবার স্বাধীনতা, ব্যক্তির মধ্যে যে গুণাবলী থাকতো তার ভিত্তিতেই সে তার পেশা নির্বাচন করত, সেই অনুযায়ী হত তার জাতি। আর এই ব্যবস্থা ছিলো সামাজিক সচলতার সহায়ক। স্বামী বিবেকানন্দ এই অর্থে জাতির প্রশংসা করেছেন যে তাঁর মতে, জাতি প্রথার উদ্দেশ্য হল সকলকে ব্রাহ্মণত্বে উন্নীত করা, তাঁর কাছে ব্রাহ্মণত্ব ছিল এক মহান আদর্শ।

জাতি শব্দের পরবর্তী প্রয়োগ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন, যখন জাতি আর গুণ নয় জন্ম দ্বারা নির্ধারিত হতে লাগলো সেই অবস্থাকে। এই সময় জাতিকে ধর্মের সাথে যুক্ত করে সমাজের গতি স্তব্ধ করে দেওয়া হল। বিবেকানন্দ বলেছেন, এই জাতি প্রকৃত জাতি নয়, জাতির প্রগতির পক্ষে মহাপ্রতিবন্ধক।

জাতি প্রথার এক কুশ্রী রূপ হল অস্পৃশ্যতা । স্বামীজী দেখেছিলেন যারা সমাজের মেরুদন্ড, যাদের পরিশ্রমের উপর ভর করে সমাজের উচ্চবর্ণের লোকেরা সুখে থাকে, তাদেরই অচ্ছুত করে রাখা হয়েছে। অস্পৃশ্যতা সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দের ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে তাঁর এক উক্তির মধ্যে। তিনি বলেছেন- আমাদের ধর্ম এখন রান্নাঘরে,ভাতের হাঁড়ি ইশ্বর আর ধর্মমত আমাকে ছুঁয়োনা আমি মহাপবিত্র।

জাতি প্রথার আরেক পরিণতি হল বিশেষ অধিকার। বিশেষ অধিকার বলতে বোঝায় – এক শ্রেণীর মানুষ জন্ম, ক্ষমতা ইত্যাদি দাবিতে অন্য মানুষ অপেক্ষা অধিক সুবিধা চায় বা পায়। স্বামীজীর মতে এই দাবি ধর্ম ও নীতি বিরোধী।বংশ নয় পরিবেশকেই তিনি চরিত্র নির্মাণে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ঊনিশ শতকের অনেক সমাজ সংস্কারক সমাজ সংস্কারে এগিয়ে এলেও বিশেষ অধিকার তাঁরা ছাড়তে চাননি। বিশেষ অধিকার সম্পর্কে স্বামীজীর সিদ্ধান্ত হল সকলের তুল্য ভোগাধিকার থাকা উচিত, বংশগত বা গুণগত অধিকারের তারতম্য উঠে যাওয়া উচিত।

বিবেকানন্দের এই চিন্তার প্রভাব পরবর্তী সময়ের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের চিন্তায় পড়েছিলো। গান্ধীজী ও নেতাজী এর নাম এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।

বর্তমানে আমরা একুশ শতকে বাস করছি। তবুও আমাদের দেশ জাতিভেদ প্রথার অভিশাপ থেকে এখনও মুক্তি পায়নি। এর থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন প্রকৃত শিক্ষার প্রকৃত বিস্তার। তবেই গড়ে উঠবে জাতপাতহীন  এক সোনার ভারতবর্ষ।

_____


FavoriteLoading Add to library

Up next

ননসেন্স রাতবিরেতে হাঁচেন কেনো গঙ্গাধরের মামা,দুপুরবেলায় রাঙা পিসি দিচ্ছে কেনো হামা।মিষ্টিমাসির বুধবারেই জ্বর কেনো আসে,ন' কাকু চাকরী কেনো ছাড়েন মে মাসে।হাবুদের...
গেম – সাবিহা সুলতানা...        অনেকক্ষন থেকে কলিংবেল টিপছে শাহেদ, কিন্তু ভেতর থেকে দরজা খোলার কোন লক্ষণই নেই। দরজায় কয়েকবার কান পাতে সে , নাহ, কেউ এগিয়ে আসছে বলেও মনে...
তোমাকে দিলাম -সৌম্য ভৌমিক... তোমাকে দিলাম হরফ আর শিলালিপি, আমার হৃদয় নিংড়ানো স্বরলিপি । তোমাকে দিলাম ঝুলন সাজানো বাড়ী, তোমার জন্য কাঙাল হতেই পারি। তোমাকে দিলাম সর্ষে ক্ষেতের হ...
মুখরোচক দইয়ের চপ বানিয়ে ফেলুন সহজেই – মালা ... কথায় আছে 'যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে,' | তবে আমাদের অর্থাৎ গৃহিণীদের কাছে এই প্রবাদবাক্যটি হয়তো তেমনভাবে খাটে না মূলত আমাদের সন্তান এবং পতিদেবতার সৌজন্যে ...
উত্তোরণ – সৈকত মন্ডল... যদি ভাবো এক লহমায় সরিয়ে নেবে নিজেকে, তবে থামো, এ সূর্য শেষ সকালের নয়... যদি মনে করো কফিনের নিস্তব্ধতায় মিলিয়ে যাবে, তবে বলে যাও, চেষ্টারও উর্দ্ধে ক...
হারানো সুর – সুস্মিতা দত্তরায়... চোখের জল বাঁধ ভাঙলো ইরার। চোখ ছাপিয়ে দুই গাল বেয়ে নেমে এলো অশ্রুধারা। দুই হাতে তা মুছে আবার ফিরে তাকাল ওই দোতলা বাড়ীটার দিকে। তারপর ধীর পায়ে উঠোনটা পে...
সক্রিয়তা, বিবেকানন্দের আলোকে... - সমর্পণ মজুমদার    "শক্তিই জীবন দূর্বলতাই মৃত্যু" -স্বামী বিবেকানন্দের এই বাণীতে জগৎ খুঁজে পাওয়া যায়। শক্তিই মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান উপাদান। স্...
মন মিলান্তি(পর্ব-৪~শেষ পর্ব)... #মন_মিলান্তি_পর্ব_৪ #মুক্তধারা_মুখার্জী #চরিত্র_ঘটনা_কাল্পনিক,#মিল_খুঁজে_পেলে_লেখিকা_দায়ী_নন😊 বমিটা হওয়ার পর থেকেই শরীরটা কেমন করছিল যেন শ্রেয়সীর। ত...
শাসন - সরোজ কুমার চক্রবর্ত্তী   ড্যাডি বলে প্রফেসার মম্  বলে ডাক্তার দাদু , দিদা বলে ভাই হতে হবে অফিসার l বই আর খাতা নিয়ে কাটে সারাক্ষণ, ভাল...
উপত্যকা – প্রজ্জ্বল পোড়েল... দুই মেরু জুড়ে একাকিত্বের অবস্থান, পথ হারিয়েছে বহু নাবিক তীব্র চুম্বকীয় শক্তিতে কম্পাস স্তব্ধ। ধূসর, সাদা মৃত্যুর উপত্যকা - এখানে সারা বছর বরফ ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment