টান – সুস্মিতা দত্তরায়

নাম ছিল তার নেপাল মাহাতো। আমরা ডাকতাম ‘নেপুদা’ বলে। হয়তো কখনও কোনো উঁচু ক্লাসের দিদি আদর করে এই নামটা দিয়েছিল, তারপর থেকে সেই নামটাই রয়ে গেছে। সে যাই হোক, সেই সদা হাস্যময় নেপুদা আমাদের সকলের খুব প্রিয় ছিল। স্কুলের যে গেটটা বন্ধ থাকতো, তার ওপাশে, রাস্তার ধারে সে ঠেলা লাগাতো।  আঁচার, চাটনি, আলুকাবলি, ফুচকা, ঝালমুড়ি – মেয়েদের যত ভাললাগার জিনিস, তার ঠেলায় থাকতো। আমাদের সরকারী স্কুল ছিল, স্কুল থেকেই রোজ টিফিন দিতো। আমরা রোজ খালি টিফিন কৌটো নিয়ে স্কুল যেতাম, টিফিনের ঘণ্টা পড়লে ক্লাসের ক্রমানুসারে লাইন দিয়ে টিফিন নিতাম। তারপর আবার ফাঁকা কৌটো নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। কিন্তু নেপুদার ঠেলার খাবারের নেশাই ছিল আলাদা। সপ্তাহে দু-তিন দিন ঐ ঠেলার জিনিস কিনে না খেলে আমাদের মন ভরতো না। টিফিনের সময় তাই ঐ গেটটার কাছে মেয়েদের ভিড় লেগে থাকতো।

সব মেয়েদের মধ্যে আমায় একটু বেশিই ভালোবাসতো নেপুদা। বরাবরই আমি বেশি টক আর ঝাল খেতে পারি না। আমি গেলে, নেপুদা আমার জন্য আলাদা করে আলুকাবলি বানাতো টক কম দিয়ে। ফুচকার জল বানিয়ে দিতো তেঁতুল কম দিয়ে। ঝালমুড়ি খেলে আমার মুড়িতে লঙ্কা দিতো না। এরজন্য মাঝে মাঝে এক- দু টাকা বেশি দিতে গেছি, নেয় নি। মাঝে মাঝে সে স্নেহাতুর চোখে আমার দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকতো। জিজ্ঞাসা করলে বলতো যে ওর বড় মেয়েটা নাকি আমার বয়সী, আর অনেকটা আমারই মত দেখতে। দেশের বাড়িতে ওর পরিবার থাকতো, স্কুলে ছুটি পড়লে বছরে দু-তিনবার দেশে যেতো। বলতো, আমায় দেখলেই নাকি ওর মেয়ের কথা মনে পড়ে যায়। বন্ধুদের অলক্ষে অনেক সময় আমায় দু-একটা ফুচকা বেশি দিতো। আমার ঝালমুড়ির ঠোঙায় অন্যদের থেকে বাদাম, চানাচুরও বেশি থাকতো। বন্ধুরা অনেক সময় এটা খেয়াল করতো, আর এই নিয়ে আমায় ক্ষেপাতো। বলতো, দেখবি একদিন নেপুদা রাবণের মতো গেটের গণ্ডি টপকে তোকে নিয়ে দেশে পাড়ি দেবে। আমি হাসতাম, আর এই কথাটাতে বেশ মজা পেতাম। একদিন স্বপ্নও দেখেছিলাম যে নেপুদা আমায় পুষ্পক রথে চাপিয়ে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। আমার হাতে ঝালমুড়ি, আর আমি সীতার গয়নার মতো বাতাসে মুড়ি ওড়াচ্ছি।

সেবার গরমের ছুটির পর স্কুল খুললে, একদিন কথায় কথায় নেপুদা বলল যে এবারে নাকি সে তার বড় মেয়ের বিয়ে দিয়ে এসেছে গ্রামেরই কোন এক গন্যমান্য লোকের ছেলের সাথে। শুনে অবাক হলাম। আমি তখন নবম শ্রেণীতে, পনেরো বছর বয়স। জিজ্ঞাসা করলাম, “ তুমি না বলেছিলে তোমার মেয়ে আমার সমান, এত কম বয়সে বিয়ে দিলে কেন?” উত্তরে বলল, “আমরা খুব গরীব। জামাইয়ের বয়স একটু বেশি হলেও পয়সাওয়ালা বাড়ির ছেলে। তাই হাতছাড়া করলাম না। জন্ম থেকেই মেয়েটা আমার শুধুই অভাব দেখেছে। এবার একটু সুখে থাকবে।“ দেখলাম চোখ দুটো আবার ছলছল করছে। তাই বিয়ের কথাটা শুনে রাগ হলেও কিছু আর বললাম না।

সেবার পুজোর ছুটিতে বাবা মায়ের সাথে মুম্বাই, গোয়া বেড়াতে গেলাম। পরের বার মাধ্যমিক, কোথাও যাওয়া হবেনা। তাই বাবা সেবার একটু দূরে, একটু বেশিদিনের জন্যই ঘুরতে নিয়ে গেলেন। খুব মজা হল। স্কুলে পুরো একমাসের ছুটি। কবে স্কুল খুলবে, বন্ধুদের আমার ঘোরার গল্প শোনাবো, এই অপেক্ষা আর সহ্য হচ্ছিলো না। যাই হোক, ভাইফোঁটা কাটিয়ে স্কুল খুলল। খুব গল্প করলাম বন্ধুদের সাথে। টিফিন টাইমে গেলাম গেটের কাছে, দেখি নেপুদা আসেনি। খুবই হতাশ হলাম, ভাবলাম, দেশ থেকে এখনো ফেরেনি বোধহয়। তারপর সপ্তাহ কেটে গেলো, নেপুদার দেখা নেই। স্কুলের যে দারোয়ান কাকু ছিল, তারও ঐ একই গ্রামে বাড়ি। তাকে জিজ্ঞাসা করাতে সে বলল, নেপুদার মেয়েকে নাকি শ্বশুরবাড়ির লোকেরা পুড়িয়ে মেরে ফেলেছে। নেপুদা ওর জামাই আর তার মা-বাবার বিরুদ্ধে ‘কেস’ করেছে, তাই থানা, পুলিশ, কোর্টকাছারি ছোটাছুটি  করতে হচ্ছে। ব্যাবসা বন্ধ। মনটা খারাপ হয়ে গেলো শুনে। মনে হল, যখন আমি মনের আনন্দে বাবা মায়ের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তখন আমারই সমবয়সী একটা মেয়ে শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেলো। পরে একদিন দারোয়ান কাকুর কাছে শুনলাম, আমাদের ‘গরীব’ নেপুদা, তার ঐ ‘বড়লোক’ বেয়াই এর বিরুদ্ধে আর লড়তে পারছে না। টাকা না পেয়ে উকিল ও আর কেস লড়তে চাইছে না। মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম- আমাদের দেশে টাকা না থাকলে সবকিছুতেই হেরে যেতে হয়।

বছর ঘুরে গেলো, শীতের ছুটির পর স্কুল খুলল। আমাদের সামনে মাধ্যমিক পরীক্ষা, তাই আর স্কুল নেই। মাঝে মাঝে স্কুলে যাই দিদিমনিদের থেকে কোন পড়া বুঝে নিতে। দেখি গেটের পাশে নতুন ঠেলাওয়ালা, একটা কমবয়সী ছেলে। ভাবি, এই বিশ্বে কোন স্থানই খালি থাকেনা, ভরাট হয়েই যায়।

এরকমই একদিন স্কুলে যাচ্ছি, হাতে টেস্টপেপার, অঙ্ক খাতা আর পেন। কয়েকটা অঙ্ক হচ্ছিলো না, তাই মালাদির কাছে যাচ্ছিলাম বুঝে নিতে। দেখি, আমাদের বাড়ির গলিটার মুখে ঠেলা নিয়ে দাঁড়িয়ে নেপুদা, যেন আমারই অপেক্ষায়। প্রচণ্ড অবাক হলাম, কয়েক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে ভাবলাম- ঠিক দেখছি তো? সংশয় কাটলে কাছে গেলাম। দেখলাম মুখে জমাট বাঁধা দুঃখ। চুপচাপ এক ঠোঙা ঝালমুড়ি বানিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো। আমার সাথে টাকা ছিলনা। বলল, “টাকা দিতে হবে না মা, এমনি দিলাম,খাও।“  বাড়ি থেকে জলখাবার খেয়ে বেরিয়েছিলাম। কিন্তু এতদিন পর ঐ ঝালমুড়ির লোভ আর সামলাতে পারলাম না। হাত বাড়িয়ে ঠোঙাটা নিলাম। হঠাৎ দেখি নেপুদা কাঁদছে, খুব কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে আমায় বলল, “তোমার বাবা তো মস্ত বড় উকিল, শহরে অনেক নামডাক, বল না একটু যদি আমার মেয়ের কেসটা দ্যাখে- মেয়েটা আমার মরে গেলো, বিচার পেল না। আমরা গরীব মা, তাই আইনও আমাদের পাত্তা দেয় না।“ আমারও কান্না পাচ্ছিল, ওর কান্না দেখে। যাইহোক, “বাবা কে বলব”- এই আশ্বাস দিয়ে ঠিকানা চাইলাম। বলল, দারোয়ান কাকুর থেকে নিয়ে নিতে। আস্তে করে মাথা নেড়ে স্কুলের দিকে পা বাড়ালাম। মনটা খুবই ভারাক্রান্ত। একহাতে বই খাতা, অন্য হাতে ঝালমুড়ি- খাওয়ার যেন আর ইচ্ছা নেই।

গেটে ঢুকতেই দারোয়ান কাকুর সাথে দেখা। তাকে নেপুদার সাথে দেখা হওয়ার কথা বলে ঠিকানা চাইলাম। শুনে সে বিস্ফারিত চোখে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। আমার কথার কোন জবাবই দিলনা। কিছুক্ষণ পর একটু ধাতস্ত হয়ে আস্তে করে আমায় বলল, -“তুমি ভুল দেখেছো মামনি, নেপাল বেঁচে নেই। বড়দিনের পরের দিন ওর জামাই আর তার বন্ধুরা মিলে পাথর দিয়ে মেরে, ওকে জঙ্গলে ফেলে দিয়ে যায়। পুলিশ থেকে শুরু করে গ্রামের সবাই সব জানে, প্রমাণও আছে। কিন্তু ওর বেয়াই গ্রামের মাথা, তাই তার বিরুদ্ধে বলার সাহস কারোর নেই।“

আমার তখন পা টলছে, মাথার ভিতর তোলপাড় শুরু হয়েছে, বই খাতা ধরা বাঁ হাতের রাশ আলগা হতে শুরু হয়েছে। নিজের অজান্তে চোখ চলে গেছে ডান হাতে ধরা সেই ঝালমুড়ির ঠোঙাটার দিকে-  সেখানে বড় বড় হরফে খবর হয়ে রয়েছে নেপুদার প্রাণহীন রক্তাক্ত দেহটা।


FavoriteLoading Add to library

Up next

ফাঁস - সিদ্ধার্থ নীল   জুতো জোড়ার ডানপায়েরটি ডান ও বাঁপায়েরটি বাঁয়ে ক্ষয়ে এসে একটু হেলে থাকছে। বহুদিনের অত্যাচার, রোদ বৃষ্টি সয়ে সয়ে আজ এই অবস্থা।...
সত্যজিতের চিড়িয়াখানা-প্রচুর আলোচনা ও সামান্য সমালো... একটা সিনেমা তৈরির পেছনে যে ইন্টারেস্টিং গল্পগুলো থাকে তা দিয়েই হয়তো আরেকটা সিনেমা বানানো হয়ে যেতে পারে। এরকম বহু ছবি আছে যা তৈরি হতে হাজারো বাধা এসেছি...
বেদনার ভাষা – ফারিন ইয়াসমিন... জীবন মাঝে মাঝে স্বপ্নভঙ্গ ও ব্যর্থতার মধ্যেকার শূন্যতায় নিয়ে যায় এক বিস্ময়কর স্বাদ হৃদয়ে মেশাবে বলে। অপার শূন্যতায় মিলিয়ে যাওয়ার পরও তোমার স্মৃত...
পুজো – ডঃ মৌসুমী খাঁ... পুজো আমার শিউলি ফোঁটা ভোর নীলাকাশ জুড়ে পেঁজা তুলোর মেঘ, বাতাসে ঢেউ তোলা কাশের বন আকাশ ভরা সোনা রোদের আলো , ক্ষেত জোড়া সবুজ ধানের শিষ কুমারটুলির স...
শেষ ঠিকানা -স্নিগ্ধা রায়... অস্তমিত সূর্যের গোধূলী আলোয় ম্লান হয়ে আসা দিনের শেষে ক্লান্ত বিধ্বস্ত পায়ে তখন শুধুই ঘরে ফেরার তাগিদ, শ্মশানের অশ্বত্থ গাছের ডালে চলছে কাক চিলের মিট...
মুক্তি - রুমা কোলে   কোন এক এলোমেলো বিকেলে পড়ন্ত রোদের আঙিনায়, এক বন্য পাখি বসেছিল অনেকক্ষণ, ওড়েনি তার ঠিকানায় l পরম যত্নে,পরম আদরে পুষেছিলাম ...
অমাবস্যার রাত – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়...      আমার দাদু বরুণদেব মুখোপাধ্যয়ের জীবনে এমন ঘটনা লক্ষ্য করেছিলেন মৃত্যু পাঁচ বছর আগে থেকেই। অমাবস্যার রাতেই এই ঘটনা একমাত্র ঘটতো। দাদুকে বহু ডাক্তার...
শিকাগো ও স্বামীজী – শান্তনু ভট্টাচার্য্য... স্বামীজীর শিকাগো ভাষণ সম্পর্কে রোঁমা রোলাঁ বলেছিলেন,- "  His speech was like a tongue of flame". অথচ এই " অগ্নিবর্ষণ" এর আগে এই  " cyclonic monk" যথেষ...
বৃষ্টিভেজার গান   - সৌম্যদীপ সৎপতি, চায়ের কাপের কুণ্ডলি ধোঁয়া, আকাশ ঝরায় অভিমান কাকভেজা মন আত্মমগন, পাগলা হাওয়ায় অভিযান মেঘেদের ভীড়ে নস্টালজিয়া, বজ্রে আকাশও দেয় ...
ভয়টা কীসের – সৌম্যদীপ সৎপতি... বড়াই শুনে মনে তো হয় উল্টে দেবে সরকারই, শুনতে পেলুম সেই তোমারই ভূতের নাকি ডর ভারি! লজ্জা কিসের? আচ্ছা রোসো, ধৈর্য ধরে খানিক বসো, বাতলে দিচ্ছি ভূত ভ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment